অনলাইনে ধর্মীয় শিক্ষা : যেতে হবে অনেক দূর

রাকিবুল হাসান:

কোভিড-১৯ এর কারণে বাংলাদেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থা এক চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে। মহামারী থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রাখতে মার্চ থেকেই বন্ধ মাদরাসাগুলো। পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে সহসা খুলবেও না। তাই মাদরাসার ক্লাসরুম তালাবদ্ধ থাকলেও অনেকেই খুলে বসেছেন অনলাইন ক্লাসরুম। অনলাইনেই চলছে বিভিন্ন কিতাবের নিয়মিত ক্লাস। কওমির শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে দেখছেন ইতিবাচক হিসেবেই।

আন নুহা ফাইভ মিনিট মাদরাসা—একটি অনলাইন লার্নিং প্লাটফর্ম। কওমি মাদরাসার সিলেবাসভুক্ত দশটি কিতাবের নিয়মিত ক্লাস করানো হচ্ছে এখানে। করোনার কারণেই কি অনলাইন ক্লাস শুরু করা? অনলাইন মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ফারাবি আহমাদ বলেন, ‘করোনার আগে থেকেই প্লান ছিল এমন একটি প্লাটফর্ম তৈরী করার, যেখানে কওমি মাদরাসার সিলেবাসভুক্ত কিতাবগুলোর অধ্যায়ভিত্তিক যাবতীয় ক্লাস রেকর্ডেট থাকবে। শুধু ক্লাস নয়, একজন কওমি ছাত্রকে যুগোপযোগী করে তোলার সম্ভাব্য সব নির্দেশনা-গাইডলাইনও থাকবে। কিন্তু করোনার কারণে সব মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও শুরু করা যাচ্ছে না ক্লাস। তাই আমরা ফেসবুকে লাইভ ক্লাসের ব্যবস্থা করি। ইতোমধ্যে দশটি কিতাবের নিয়মতি ক্লাস চলছে। লাইভ ক্লাসগুলো আমরা ফেসবুকের সঙ্গে ইউটিউবেও আপলোড করছি।’

অনলাইন মাদরাসাটির পরিকল্পনা কী—জানতে চাইলে ফারাবি আহমাদ বলেন, ‘করোনার প্রয়োজনে লাইভ ক্লাসগুলো করছি। কিন্তু আমাদের মূল পরিকল্পনা—কওমি মাদরাসার সব কিতাবের গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়গুলোর ভিডিও তৈরী করা। ইতোমধ্যেই ভিডিও তৈরী শুরু করে দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, ৪০ শতাংশ কাজ এগিয়েও গেছে। আগামী সাত-আট মাসের মধ্যে ভিডিওগুলো তৈরী করে ফেলতে পারলে আমরা অ্যাপ লঞ্চ করবো। কারণ, কন্টেন্ট না হলে তো অ্যাপ লঞ্চ করে লাভ নেই।’

বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন কওমি বিশেষজ্ঞরা। আপদকালীন এই সময়ে অনলাইন ক্লাসকে নতুন একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্রে হিসেবেও অভিহিত করেছেন তারা। কওমি মাদরাসার শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাপরিচালক মাওলানা যুবায়ের আহমাদ চৌধুরী বলেন, ‘করোনাকালীন এই অনলাইন ক্লাস ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। এই অবরুদ্ধ সময় আমাদেরকে প্রযুক্তির প্রতি সচেতন করে তুলেছে। এখন অনলাইন ক্লাস হচ্ছে। একসময় পূর্ণাঙ্গ অনলাইন মাদরাসাও শুরু হবে।’ বেফাক অনলাইন ক্লাস নিয়ে কিছু ভাবছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘বেফাক অনলাইন ক্লাস করবে না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কওমি শিক্ষকগণ অনলাইনে যে ক্লাস করছেন, তা চলতে পারে। ক্লাস না হওয়ার চেয়ে অনলাইনে ক্লাস হওয়া ভালো।’

তবে অনলাইন ক্লাস ও শিক্ষাদানের সংকট ও সম্ভাবনা ফিফটি ফিফটি। সম্ভাবনার চেয়ে সঙ্কটই এখন সবচে বেশি দৃশ্যমান। ধীরে ধীরে সঙ্কট কেটে গেলে সম্ভাবনার পাল্লা ভারী হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। সংকটের কথা তুলে ধরে ‘আন নুহা ফাইভ মিনিট মাদরাসা’র প্রধান ফারাবি আহমাদ বলেন, ‘যারা কাজ শুরু করে, তাদের সঙ্কট মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হয়। আমরাও কিছু সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছি। এক—অনেকে ক্লাসে ভালো পড়াতে পারেন। কিন্তু রেকর্ডেট ক্লাসে সময় মেপে কথা বলতে পারেন না। ফলে তাদেরকে আমাদের অনলাইন ক্লাসে আনলেও এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। দুই—আমাদের শিক্ষকগণ কম্পিউটার শিক্ষাটা তেমন জানেন না। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি। ফলে যা পড়াবেন, তা স্লাইড করে আনতে পারেন না। আমাদের নিজেদের তা তৈরী করতে হয়। তিন—দক্ষ টিম নেই। তবে আমরা টিম গঠন করতে শুরু করেছি। আরবি জানা, কম্পিউটার জানা কোনো দক্ষ আলেম আমাদের টিমে যুক্ত হতে পারেন।’

অন্য একটি সঙ্কটের কথা বললেন জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদরাসার একজন মুহাদ্দিস। তিনি বললেন, ‘কওমি মাদরাসার অধিকাংশ ছাত্রই ঢাকার বাইরে থাকে। অনেকে থাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। অনলাইনে ক্লাস করার মতো তাদের অনেকের কাছে ডিভাইস নেই, নেট এভেইলেবল না। ফলে অনেকে চাইলেও ক্লাসে যুক্ত হতে পারবে না।’ একই কথা বলেছেন বেফাকের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু।

এই সংকট প্রসঙ্গে আন-নুহার প্রধান ফারাবি আহমাদ বলেন, ‘সময়মতো হয়তো অনেকেই এসব অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে পারবে না। কিন্তু এর বিকল্পও আছে। কেউ ক্লাসে অংশ নিতে না পারলে পুনঃপ্রচার দেখার সুযোগ আছে, এ ছাড়া ফেসবুক ও ইউটিউবেও দেখে নেয়া যায়। তবে আমরা আরও ভাবছি। সময় নিচ্ছি। ছাত্রদের কাছে যত সহজে ক্লাসগুলো পৌঁছানো যাবে, ততই ভালো হবে।’

মাত্রই শুরু হলো এই অনলাইন ক্লাসরুমের যাত্রা। যারাই অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছেন, পরীক্ষামূলকভাবেই শুরু করেছেন। তাই এখানে সংকটগুলো যেমন চোখে পড়ছে, সম্ভাবনাগুলোও আশা দেখাচ্ছে। ক্লাসরুমের বিকল্প এই পথে অভ্যস্ত হতে আরও অনেকদূর পথ চলতে হবে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।