আকরম খাঁ : বাংলা সাংবাদিকতার পথিকৃৎ

আবু জর

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বাঙালি মুসলিম জাগরণের এক অবিস্মরণীয় যুগপুরুষ। বঙ্গীয় মুসলমানের আধুনিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তিনি বরণীয় ব্যক্তিত্ব।

একসময়কার আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাংলা সংবাদপত্র দৈনিক আজাদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে মুসলিম সমাজকে জাগাবার জন্যই এই পত্রিকার প্রকাশ। বাঙালি মুসলমানের ভাষা হিসেবে বাংলার পক্ষে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর ভূমিকা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের প্রেক্ষিতে ছিল ঐতিহাসিক। শুধু বঙ্গীয় মুসলিম রেনেসাঁ নয় বৃহত্তর বাঙালি চেতনা বিকাশেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাথমিক জীবন

মোহাম্মদ আকরম খাঁর আবির্ভাব উনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তি পর্বে। ১৮৬৮ সালে ৭ জুন পশ্চিম বঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বশিরহাটে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ গাজী মাওলানা আব্দুল বারি খাঁ ও মাতা বেগম রাবেয়া খাতুন।

ভারত তখন বিদেশি শাসন-শোষণে বন্দি। ১৮৫৭ সালের প্রথম আযাদি সংগ্রামে ব্যর্থ হবার পর দেশবাসী হতাশায় আচ্ছন্ন। মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর। এই দুঃসহ দুরবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ বলেন, ‘যে যুগে মাওলানা সাহেবের কর্মজীবন শুরু, সে ছিল মুসলিম বাংলার পক্ষে অবিশ্রান্ত দুর্যোগের অমানিশা। বহুদিন আগে নিভে যাওয়া জ্ঞানের প্রদীপ তখনো সমাজের বুকে আবার জ্বলে উঠে নাই। প্রতিবেশী সমাজের জমিদারদের জুলুম ও মহাজনের শোষণ–উভয় প্রকারে অতিষ্ঠ মুসলিম কৃষকদের কতক আত্মরক্ষার জন্য সাপ ও বাঘ ভরা আসামের জঙ্গলে চলে গেছে; বাকিরাও ঐ উদ্দেশ্যে তল্পীতল্পা বাঁধতে উদ্যত। ঘুঘু চরানো ভিটার নিঃস্ব চাষী-পরিবার ভাঙা কুলা, ছেঁড়া কাঁথার পুঁটলি কাঁধে অতি হাহাকারে আকাশ বাতাস কাঁদিয়ে আসামের পথে চলেছে, সে দৃশ্য যারা নিজ চোখে না দেখেছে তারা তার নির্মমতা হাজার ভাগের একভাগও আজ উপলব্ধি করতে পারবে না। সেই নৃশংস অভিযানের বিরুদ্ধে যারা বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মওলানা সাহেব তাঁদের কতিপয়ের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। আমরাও তাঁদের চেলাদের মধ্যে গণ্য ছিলাম।’

শিক্ষা

শৈশবে গ্রামের মক্তবে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি ছিল তার আশৈশব অনুরাগ। মক্তবের পরপর ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে ইংরেজি স্কুল ছেড়ে কলিকাতা আলিয়া মাদরাসায় এসে ভর্তি হন। এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

রাজনীতি

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবন আরম্ভ করেন। মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগের একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৮১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি খেলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

১৯২০ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে তিনি নিখিল ভারত খেলাফত আন্দোলন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনে খেলাফত আন্দোলনের অন্যতম নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এবং মওলানা মজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। আকরাম খাঁর দায়িত্ব ছিল তুর্কি খেলাফত থেকে ফান্ড সংগ্রহ করা। ১৯২০-১৯২৩ সময়ের মধ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন স্থানে জনসভা বা সম্মেলনের আয়োজন করে খেলাফত আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলন গতিশীল করার চেষ্ঠা করেন। হিন্দু মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ক্ষেত্রে ১৯২২ সালে আকরম খাঁ চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টির পক্ষ নেন এবং ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট সন্ধির সময়ও তিনি একই পক্ষে ছিলেন।

১৯২৬-১৯২৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং অন্যান্য সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলির কারণে আকরম খাঁ ভারতীয় রাজনীতিতে তার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং তিনি স্বায়ত্তশাসন পার্টি এবং কংগ্রেস থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে তিনি পর্জা বা গ্রাম্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৬ সালে তিনি গ্রাম্য রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে সক্রিয়ভাবে মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত হন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, পাকিস্তান মুসলিম লীগ, প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৪ সালে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়া হলে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান।

সাংবাদিকতা

১৯১০ সালে সাপ্তাহিক মোহাম্মদী ও দৈনিক খাদেম প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর ১৯২১ সালে উর্দু জামানা ও বাংলা দৈনিক সেবক প্রকাশ করেন। ১৯২৭ সালে পুনরায় মাসিক মোহাম্মদী প্রকাশ করেন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল এ পত্রিকা। বর্তমানে পত্রিকার বেশ কিছু সংখ্যা বাংলা একাডেমি, বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। মুসলিম সমাজকে জাগাবার জন্য ১৯৩৬ সালে তাঁর সম্পাদনায় দৈনিক আজাদ প্রকাশ করেন।

১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা আকরম দৈনিক আজাদ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। সেই সময় এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। মুসলিম লীগের সমর্থন যোগাতে এই বাংলা পত্রিকাটি সেই সময় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে পত্রিকার বহু পুরনো সংখ্যা সংরক্ষিত আছে।

সাহিত্য কর্ম

তিনি কতটা আধুনিকমনস্ক এবং উত্তরণমুখী ছিলেন, তার রেখে যাওয়া রচনাবলীই তার উৎকৃষ্ট প্রমান। বাঙালী সমাজের আজও পর্যন্ত দ্বিধায় ভুগতে থাকা সমস্যাগুলি নিয়ে তিনি ভেবেছিলেন সেই বিশ শতকের গোড়াতেই। নিম্নে কিছু পুস্তক উল্লেখ করা হলো–

১. সমস্যা ও সমাধান
২. আমপারার বাংলা অনুবাদ
৩. মোস্তফা-চরিত
৫. মোস্তফা-চরিতের বৈশিষ্ট্য
৬. বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রীষ্টান ধর্ম
৭. মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস
৮. তাফসীরুল কোরআন(১-৫ খণ্ড)
৯. মুক্তি ও ইসলাম

মৃত্যু

মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৮ আগস্ট ১৯৬৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার বংশালে আহলে হাদিস মসজিদে প্রার্থনারত অবস্থায় তাঁর ইন্তেকাল হয়।