আবুল হাসান আলী নাদাবীর শিক্ষাচিন্তা

আশরাফ উদ্দিন খান

আবুল হাসান আলী নাদাবী রহমতুল্লাহি আলায়হির জন্ম ৫ ডিসেম্বর, ১৯১৩ সালে। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ। তিনি তাঁর চিন্তা, দর্শন, লিখনির মাধ্যমে মুসলিম শিক্ষিত সমাজের চিন্তা-চেতনার মধ্যে পরিবর্তন ও সংস্কারের চেতনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

১৯৩৪ সালে তিনি দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং তাফসির, হাদিস, যুক্তিবিদ্যা, আরবি সাহিত্য ও ইতিহাসের শিক্ষা দেন। ১৯৪৩ সালে দ্বীনি শিক্ষার জন্য তিনি ‘আন্জুমানে তা’লীমাতে দীন’ নামক একটি এ্যসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি নদওয়াতুল উলামার প্রশাসনিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে নদওয়াতুল উলামার তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের পরিচালক সাইয়্যেদ সুলাইমান নদভীর অনুরোধে তিনি শিক্ষা বিভাগের উপপরিচালকের পদ গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৪ সালে সুলাইমান নদভীর ইন্তেকালের পর তিনি শিক্ষা বিভাগের পরিচালক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে বড় ভাই আব্দুল আলী আল হাসানীর মৃত্যুর পর তিনি নদওয়াতুল উলামার মহাসচিব নির্বাচিত হন।
১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ কমিটির একজন সদস্য ছিলেন। ১৯৬৮ সালে সৌদি শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ বিভাগের পাঠ্যসূচী প্রণয়নে পরামর্শ দেয়ার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

তিনি ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৯ সালে ইন্তেকাল করেন। (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

উম্মতের শিক্ষা নিয়ে তাঁর চিন্তা

মুসলিম উম্মাহর শিক্ষা নিয়ে নাদাভী রা. অনেক বেশী চিন্তিত ছিলেন। শিক্ষা ব্যবস্থাকে তিনি উম্মতের ‘জীবন-মরণের বিষয়’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছিলেন। শিক্ষা নিয়ে তাঁর চিন্তার আলামত তাঁর ইলমি জীবনের শুরু থেকেই প্রকাশ পায়। তিনি নিজে এই সম্পর্কে বলেন, শিক্ষা ও তারবিয়াত নিয়ে অনেক দিন আগ থেকেই আমি ফিকির শুরু করি। এই বিষয়ে আমার প্রথম গবেষণা প্রকাশ পায় ‘আল-বিলাদ আস-সাউদিয়া’ পত্রিকায় ১৯৫০ সালে। ‘মুসলিম বিশ্বে শিক্ষা ও জ্ঞান পরিচালনার পদ্ধতি কি হবে?’ এই শিরোনামে ধারবাহিক ভাবে প্রকাশিত একটি গবেষণা।

এরপর আমি আমার আরেকটি কিতাবে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি যার শিরোনাম ছিল “আস-সিরা’ বাইনাল ফিকরাহ আল-ইসলামীয়াহ ওয়াল ফিকরাহ আল-গারবিয়াহ ফিল আকতার আল-ইসলামীইয়াহ”। এছাড়া নাদাভি রা. বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষে শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার উদ্দেশ্য, বিদ্যমান সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, শিক্ষার ইসলামীকরণ নিয়ে অনেক গবেষণা ও আলোচনা করেছেন। তাঁর সেই সকল আলোচনার অনেক অংশ আমাদের সামনে বর্তমানে প্রবন্ধ বা বই আকারে বিদ্যমান রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে শিক্ষা বিষয়ে তাঁর কয়েকটি বক্তব্য ও বইয়ের নাম নিম্মরুপঃ
আহাম্মিয়াতুত তারবিয়াহ ওয়াত তা’লিম ফিল আকতার আল-ইসলামিয়াহ
সিয়াসাতুত তারবিয়াহ ওয়াত তা’লিম আস-সালিম
কাইফা তুয়াজ্জাহুল মায়া’রিফ ফিল আকতার আল-ইসলামীইয়াহ
নাহওয়াত তারবিয়াহ আল-ইসলামীইয়াহ আল-হুররাহ
বর্তমান প্রবন্ধে, সেই সকল রচনা থেকে শিক্ষা বিষয়ক তাঁর চিন্তাধারা অনুসন্ধানের চেষ্ঠা করা হয়েছে।

মুসলিম জাহানের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ দৃষ্টি

মুসলিম জাহানের বেশির ভাগ অঞ্চল পশ্চিমা ঔপনিবেশের শিকার হয়। এই কারণে এই অঞ্চলের মুসলমানেরা পশ্চিমা শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, নীতি-আদর্শ, শিক্ষাদর্শন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, অথচ এই অঞ্চলের বোধ-বিশ্বাস, শিল্প-সাহিত্য ছিল পশ্চিমা বোধ-বিশ্বাস, শিল্প-সাহিত্য থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। যার ফলে মুসলিম জাহানে এমন একটি প্রজন্ম বা জামাত সৃষ্টি হয়েছে যারা ইসলামী বোধ-বিশ্বাস, ইমান-আকিদাকে নিজেদের ইমান-আকিদা হিসাবে মেনে নিতে পুরাপুরি প্রস্তুত হতে পারেনি”। (আহাম্মিয়াতুত তারবিয়াহ ওয়াত তা’লিম ফিল-আকতার আল-ইসলামিয়াহ, ৯)।

শিক্ষা ব্যবস্থা একটি জটিল ব্যবস্থা

‘শিক্ষা ব্যবস্থা একটি অতি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় এবং সেই সাথে অনেক জটিল একটি বিষয়ও বটে। শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ শুধুমাত্র কিছু বিষয়ের শিক্ষা প্রদান নয়, বরং এর উদ্দেশ্য একটি প্রজন্মের চিন্তা-চরিত্র তৈরি করা। এই গুরু দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া শুধুমাত্র পাঠ্য পুস্তকের অনুবাদ বা বাইরে থেকে শিক্ষক আমদানি করা বা বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে বা বিদেশে ছাত্রদেরকে শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করার মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং এর জন্যে দরকার গভীর ও সৃজনশীল গবেষণা ও নিজেদের তাহজিব-তামাদ্দুন অনুযায়ী পাঠ্য পুস্তক তৈরি করা এবং নিজেদের উপযোগী বিশেষ শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করা।’ (নাহওয়াত তারবিয়াহ আল-ইসলামিয়াহ আল-হুররাহ, 8)

ইসলামী শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করা জরুরি

‘জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের বিষয়ে যাদের অভিজ্ঞতা আছে এটা তাদের জানা বিষয় যে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পাঠ্যপুস্তকের দুটি দিক থাকে ; একটি বাইরের দিক, আরেকটি ভিতরের দিক যা সেই বিষয়ের চেতনা বা স্পিরিট। ইসলাম যে সকল জ্ঞান বা জ্ঞানের শাখা সৃষ্টি করেছে সেই সকল জ্ঞানের মধ্যে আল্লাহর প্রতি ইমান, তাকওয়া, আল্লাহ ভীতি, আখেরাতের প্রতি ইমান, আখলাক স্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত। পক্ষান্তরে যে সকল জ্ঞান গ্রীক সভ্যতার মাধ্যমে বা আধুনিক সভ্যতার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেখানে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায়, সেগুলোর মধ্যে বস্তুবাদী চিন্তা, নাস্তিকতা, আখেরাত অস্বীকার করার মত বিষয় বিদ্যমান। সুতরাং আধুনিক শিক্ষার নামে এই সকল পাঠ্য পুস্তক আমাদের মুসলিম শিক্ষার্থীদের সামনে পেশ করা একটি বিরাট অন্যায় ও না-ইনসাফ হিসাবে বিবেচিত হবে। এই ক্ষেত্রে, আমাদেরকে পাঠ্য পুস্তক ও শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে হবে। শিক্ষা সিলেবাসে ইমান ও আখলাকের ভিত্তি মজবুত করতে হবে।’ (নাহওয়া, ১৪)

নাদাবী রহ. সিলেবাসের কিছু গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নির্ধারণ করেছেন এইভাবে

কুরআনের শিক্ষা
সিরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর ইতিহাস ও সিরাত
শিক্ষার সাথে সাথে দীক্ষা বা তারবিয়াতের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা অর্থাৎ ইসলামী আমল ও আখলাকের প্রতি গড়ে তোলা, তাদের মধ্যমে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব কি সেই সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা
দাওয়াতের মেজাজ সৃষ্টি করা
শরীর চর্চার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা, যাতে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ভাবে শক্তিশালী ও মজবুত হয়ে গড়ে উঠতে পারে
এই সকল বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষক নির্বাচন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা একটি জরুরী বিষয় (নাহওয়া, ২৫)

পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব 

এটা স্পষ্ট যে শিক্ষা ব্যবস্থার পিছনে একটি স্পিরিট ও চেতনা কাজ করে, তাই যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আমরা সেই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তনকারীদের চিন্তা-চেতনা, বোধ-বিশ্বাস, জীবন ও জগতের প্রতি তাদের মনোভাবের প্রতিফলন দেখতে পায়। এবং সেই প্রতিফলন তাদের পাঠ্য পুস্তকের পাতায় পাতায় প্রকাশ পায়। এই অবস্থায় যদি এমন জাতির শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সামনে পেশ করি যাদের আকিদা, বোধ-বিশ্বাসের সাথে আমাদের আকিদা ও বোধ-বিশ্বাসের আমুল পার্থক্য রয়েছে তাহলে সেই শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হতে থাকে, এবং সকল ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আমাদের সংঘাত শুরু হতে থাকে। দ্বীন থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে। পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুসলিম উম্মার মাঝে আমদানি করার কারণে ঠিক এই বিরূপ প্রভাবই সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তাদের বোধ-বিশ্বাস, দর্শন, মূল্যবোধ শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম তরুণ সমাজের মাঝে সংক্রমিত হয়েছে –খুব সামান্য সংখ্যক ভাগ্যবান তরুণ ব্যতীত।
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব দেখাতে গিয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণকারী অস্ট্রিয়ার নাগরিক মুহাম্মাদ আসাদ এর রচনা থেকে কিছু উদ্বৃতি পেশ করেন: ‘ইউরোপের সাহিত্য বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেভাবে পড়ানো হচ্ছে তার একটি নেতিবাচক প্রভাব এই যে, এর মাধ্যমে মুসলিম তরুণ সমাজের চোখেই ইসলাম ধর্ম অপরিচিত ধর্ম হিসাবে প্রকাশ পাচ্ছে, একই অবস্থা ইসলামী ইতিহাসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ব্যাপারেও প্রযোজ্য, কারণ পশ্চিমা লেখক ও ইতিহাসবিদরা ইসলামী ইতিহাসের যে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছে তার মাধ্যমে ইসলামী ইতিহাস ও সভ্যতার উপর পশ্চিমা ইতিহাস ও সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করার চেষ্ঠা করা হয়েছে।’

তিনি (মুহাম্মাদ আসাদ) আরো বলেন, ‘অতীতে মুসলিম উম্মাহ বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে বিমুখ থাকার কারণে নিজেদের যে ক্ষতি সাধন করেছে সেই ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয় পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমদানি করার মাধ্যমে। জাগতিক ও বৈজ্ঞানিক দৈন্যতা ও পশ্চাৎপদতার ক্ষতির পরিমাণ অনুমান করা সম্ভব নয় পশ্চিমা বিশ্বের শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণের ক্ষতির সামনে। আমরা যদি ইসলামী সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই পশ্চিমা চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আজকের বাহ্যিক অবস্থা দেখা বুঝা যায় যে, মুসলিম উম্মাহ পশ্চিমা সমাজের আচার-আচরণ, অভ্যাসের অনুসরণ করা শুরু করেছে। এই অনুসরণের মাধ্যমে এক পর্যায়ে তারা তাদের দর্শন ও চিন্তা-চেতনাকে নিজেদের মধ্যে লালন করা শুরু করবে। কারণ এটা প্রমাণিত যে, মানুষ কারো বাহ্যিক অনুসরণ থেকে তার অভ্যন্তরীণ চিন্তা-চেতনার অনুসরণে বাধ্য হয়ে থাকে।’ (নাহওয়া, ৩২)
এই ধরণের ভবিষ্যৎ বাণী অনেক পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের করতে দেখা গেছে, যেমন লর্ড মেকালী, যিনি ভারত উপমহাদেশে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি তার এক প্রতিবেদনে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেওয়ার কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন : ‘আমাদের জন্যে জরুরী এমন একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করা যারা আমাদের মাঝে ও আমাদের অগণিত ভারতীয় প্রজাদের মাঝে অনুবাদক হিসাবে কাজ করতে পারবে। এই গোষ্ঠির রক্ত ও রঙ হবে ভারতীয়, তবে তাদের চিন্তা, ভাষা, রুচি হবে ইংরেজ।’ (নাহওয়া, ৩৩)

নাদাবী রাহ.-এর মতে, ‘পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ইসলামী ধ্যান-ধারণা, তাহজিব-তামাদ্দুন ধ্বংস করার একটি সুক্ষ্ম চেষ্টা। ইতিপূর্বে যারা সরাসরি ইসলামী ধ্যান-ধারণা, সভ্যতা ধ্বংস করার চেষ্ঠা করে আসছিল তারা এবার সুক্ষ্মপথে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তা পরিপূর্ণ করার চিন্তা করল। সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে তারা এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা শুরু করে এবং তারা এই পথে বেশ সফলকাম হয়ে যায়”। আল্লামা ইকবাল রা. এর একটি উক্তির উদ্বৃতি দিয়ে তিনি বলেন “যে জ্ঞান বা বিদ্যা অধ্যয়ন করছ, সেই ব্যাপারে সতর্ক থেকো, কারণ এর মাধ্যমে একটি সমগ্র উম্মতের চেতনা (রুহ) শেষ করে দেওয়া যায়।’ ‘শিক্ষা হচ্ছে এমন একটি উপাদান যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্বকে ‘গলিয়ে’ যেমন ইচ্ছা তেমন ভাবে গঠন করা হয়ে থাকে। পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে দ্বীন, আখলাক, মরুয়াতের উপর একটি বিরাট চক্রান্ত।’ (নাহওয়া, ৩৪-৩৬)

আজকের বাস্তব অবস্থার মাধ্যমে উপরে উল্লেখিত বিষয়ের সত্যতা প্রমাণিত হয়। আজকে অনেক শিক্ষিত মানুষের বিশ্বাসের অবস্থা এই “… ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিষয়, যার সাথে রাষ্ট্র বা শাসন ব্যবস্থার কোন সম্পর্ক নেই, দ্বীন, দ্বীনের আলেম-উলামা আমাদের উন্নতি, অগ্রগতি, আবিস্কারের পথে প্রধান বাধার একটি বাধা, নারীকে পুরুষের মত সকল বিষয় ও কাজের সমান অধিকার প্রদান করতে হবে, পর্দা প্রথা হচ্ছে মধ্য যুগের একটি অন্ধকার প্রথা, পর্দা প্রথার বিলুপ্ত করা হচ্ছে সংস্কার ও উন্নতির পথের প্রধান পদক্ষেপ। বিবাহ, তালাক, মিরাস ইত্যাদির আইন হচ্ছে মধ্য যুগীয় আইন যা বর্তমান এই আধুনিক সময়ের জন্যে উপযুক্ত নয়। এই সকল কিছুকে আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা ও আইন-নীতির মাধ্যমে পরিবর্তন ও সংস্কার করা সময়ের দাবী। এই সকল চিন্তা এখন অনেক শিক্ষিত যুবকের চিন্তার একটি প্রধান অংশ। এই সবকিছু সম্ভব হয়েছে পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও শাসকগণ হয়ত সরাসরি পশ্চিমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে আর না হয় দেশে বিদ্যমান সেই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করেছে।

এই সকল কারণেই মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে সেখান দুই ধরণের ভিন্ন ভিন্ন ধ্যান-ধারণা বিরাজ করছে। এক শ্রেণীর মানুষের চিন্তা-চেতনা ইসলামী ধ্যান-ধারণা দ্বারা শাণিত, আর আরেক শ্রেণীর মানুষের চিন্তা-চেতনা পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা দ্বারা শাণিত। এই দুই চিন্তার মাঝে সবসময় সংগ্রাম অব্যাহত আছে, এবং স্বাভাবিক পরিণাম হিসাবে যার শক্তি বেশী সেই সবসময় জয় লাভ করছে। এটা শুধুমাত্র মুসলিম বিশ্বের একটি সমস্যা যে, এখানে এমন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত যার মূল ধারণার সাথে এই উম্মতের জীবন দর্শন, বোধ-বিশ্বাসের কোন সম্পর্ক নেই।

শিক্ষা দর্শন :

প্রত্যেকটি জাতি তাদের নিজস্ব দর্শনের উপর ভিত্তি করেই তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে থাকে। এর একটি উদাহরণ হিসাবে শায়েখ নাদাভি রা. রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, “একজন প্রভাবশালী রাশিয়ান চিন্তাবিদ (M. C. Govern) বলেন, “রাশিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান বৈশ্বিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি সাধারণ অংশ নয়, বরং এই জ্ঞান-বিজ্ঞান হচ্ছে একটি স্বতন্ত্র ও আলাদা ভাগ, অন্যদের জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। আলাদা হওয়ার কারণ আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান একটি সুনির্দিষ্ট দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। যেহেতু যে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণার পিছনে ভিত্তির প্রয়োজন থাকে তাই আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তি হচ্ছে আমাদের বস্তুবাদী দর্শন যা আমাদের আদর্শের মহান নেতা কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন পেশ করে গিয়েছেন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গবেষণার সংগ্রামে আমরা যখন অবতীর্ণ হবো, তখন আমাদের হাতে অবশ্যই এই দর্শন থাকবে এবং এই দর্শনের বিরোধিতায় যারাই আমাদের সামনে আসবে তাদেরকে কঠিন হাতে দমন করতে হবে”। [নাহওয়া, ৬৪-৬৫]

অন্যদের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে গ্রহণ করা প্রসঙ্গে বলেন, “শিক্ষাবিদগণ এই বিষয়ে একমত যে, কোন দেশ বা জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা এমন কোন পণ্য নয় যা অন্যদেশ বা বাইরে থেকে আমদানি করা যেতে পারে, বরং শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যা প্রতিটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, দর্শন-উদ্দেশ্যের সাথে মিল রেখে তৈরি করতে হয়। শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে উত্তম ব্যাখ্যা হচ্ছে এটা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অভিভাবক ও শিক্ষকগণ তাদের নিজেদের বোধ-বিশ্বাস, ইমান-আকিদা, জীবন-জগতের প্রতি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তাদের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করে থাকে”। [আহাম্মিয়াহ… ১২-১৩]
“F. W. Garford তার বই “Education and Social Purpose”, (১৯৬২) তে উল্লেখ করেন: “শিক্ষা ব্যবস্থার সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ণয়ের মানদন্ড হচ্ছে সমাজের রীতিনীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটা ও না ঘটা। সমাজের রীতিনীতি ও মূল্যবোধ হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। কাজেই শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজের রীতিনীতি ও মূল্যবোধের মাঝে কোন ধরনের দুরত্ব ও ব্যবধান থাকতে পারে না। আরেক শিক্ষাবিদ Vernon Mallinson তার বই “An Introduction to The Study of Comparative Education”, (১৯৫৭) তে একই ধারণা পেশ করেছেন”। [আহাম্মিয়াহ… ১৪]

Dr. J. B. Conant তার বই “Education and Liberty” “শিক্ষা ও স্বাধীনতা” “শিক্ষা ব্যবস্থা কোন লেনদেন বা ক্রয়-বিক্রয় এর মত কোন বিষয় নয়, এবং এমন কোন ব্যবসায়িক পণ্যও নয় যা বাইরে রপ্তানী করা যায় বা বাইরের থেকে আমদানী করা যেতে পারে। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা যে, ইংল্যন্ড, ইউরোপ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থার ধারণা গ্রহণ করার কারণে একটা দীর্ঘ সময় আমাদের বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে”। [হাওলাঃ ৬৭]

শিক্ষার ইসলামিকরণ 

এই সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান হচ্ছে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে এমনভাবে ঢেলে সাজানো যা ইসলামী আকিদা, বোধ-বিশ্বাসের সাথে উপযুক্ত। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্য পুস্তক থেকে এমন সব উপাদান বের করে দেওয়া যা ইসলামী আকিদা ও বিশ্বাসের সাথে খাপ খায় না, বস্তুবাদি, নাস্তিক্যবাদ, ভোগবাদী সকল ধারণা ও উপাদান দূর করে সেখানে আল্লাহর প্রতি ইমান, আখেরাতের প্রতি ইমান, মানব জাতির কল্যাণ এই সকল ধারণা ও উপাদান প্রতিষ্ঠিত করা। ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান, অর্থনীতি সহ সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যেই এই ধারণা সৃষ্টি করতে হবে। মূলকথা এটাই যে, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া উম্মতের অবস্থার পরিবর্তন অন্য কোনভাবে হতে পারে না। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদেরকে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে হবে যাদের বুকে থাকবে ইসলামী আকিদা এবং মাথায় থাকবে আধুনিক বিজ্ঞানের সুন্দর সহাবস্থান। (নাহওয়া, ৪৫)

নাদাবী রাহ.-এর মন্তব্য 

‘শিক্ষা ব্যবস্থা একটি স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ ইস্যু। শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে তাদের বোধ-বিশ্বাস, ইমান-আকিদার উপর গড়ে তোলার একটি মাধ্যম। যে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় না সেই শিক্ষা ইসলামী শিক্ষা হতে পারে না, এই ধরণের শিক্ষার চেয়ে নিরক্ষতা মেনে নেওয়া অনেক উত্তম। শিক্ষা ব্যবস্থার অর্থ এই নয় যে, এর মাধ্যমে কিছু বিষয়, শাস্ত্র, মাতৃভাষা, বিদেশী ভাষা শিক্ষা দেওয়ায় ব্যবস্থা করা, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি জাতির চিন্তা-চেতনা, আদর্শ-আখলাক তৈরি করা উদ্দেশ্য।’ [নাহও, ৭-৮]
“এটা বাস্তব যে, শাস্ত্র ও কিতাবের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা বিদ্যমান। এটা প্রমাণিত যে, যে সকল শাস্ত্র বা কিতাব মুসলিম লেখকদের হাতে তৈরি বা লেখা হয়েছে তার মধ্যে আল্লাহর প্রতি ইমান, আখেরাতের প্রতি ইমান, তাকওয়া, আখলাকের প্রভাব বিদ্যমান, এর বিপরীতে প্রাচীন গ্রীক পন্ডিতদের হাতে তৈরি শাস্ত্র ও তাদের লেখা গ্রন্থের মধ্যে তাদের দর্শন ও আদর্শের প্রভাব বিদ্যমান, এখানে তাওহীদ, আখেরাত, আখলাকের এই সকল বিষয়ের উপস্থিতি দেখা যাবে না। কাজেই এটা হিকমতের সিদ্ধান্ত নয় যে, অন্যদের শাস্ত্র ও গ্রন্থ হুবুহু সেই অবস্থাতেই আমাদের শিক্ষার্থীদের সামনে পেশ করা হবে। বরং এই ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই সকল শাস্ত্র ইসলামের ধ্যান-ধারণা নিয়ে নতুন করে লেখতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের সামনে পেশ করতে হবে। এটা সকল বিষয়ের সাথেই সম্পর্কিত, অর্থাৎ ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান ও ব্যকরন থেকে শুরু করে, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য সকল শাস্ত্রের সাথে। কোন সন্দেহ নেই যে, এই কাজ অনেক কষ্টসাধ্য ও দীর্ঘ সময়ের কাজ। তবে এ ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই যদি আমরা সত্যিকারের মুসলিম উম্মাহ গড়ে তুলতে চাই। এটা কোন ব্যক্তিগত কাজও নয়, বরং এর জন্যে দরকার একাধিক জামাত, কমিটি, একাডেমীর সম্মিলিত কাজ”। [নাহও, ১০-১২]

শিক্ষা একটি ওসিলাহ;
“শিক্ষা একটি সমাজের মূল লক্ষ্য হতে পারে না, বরং শিক্ষা হচ্ছে মূল লক্ষ্য পর্যন্ত উপনীত হওয়ার একটি বিশেষ মাধ্যম বা ওসিলাহ”। এর উপর তিনি তিনটি মন্তব্য পেশ করেছেন। এখানে উল্লেখ করা হল :

বৃটিশ শিক্ষাবিদ Sirpercy Ninn এর মন্তব্য যা তিনি উইকপিডিয়াতে উল্লেখ করেছেন, “তারবিয়াহ এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিজ্ঞজনেরা দূরের কাছের বিভিন্ন মতামত পেশ করেছেন, তবে তাদের সকলের সংজ্ঞার মূলকথা এটাই যে তারবিয়াহ এর মূল ধারণা হচ্ছে যে কোন জাতির অভিভাবক শ্রেণীর পক্ষ থেকে তাদের নতুন প্রজন্মকে তাদের নিজস্ব জীবন-দর্শনের উপর তৈরি করার জন্যে প্রচেষ্টা করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হচ্ছে পূর্ববর্তী প্রজন্মের জীবন-দর্শন, জীবনধারা, কৃষ্টিকালচার নতুন প্রজন্মের হাতে অর্পণ করা”।

আরেক মার্কিন শিক্ষাবিদ Jhon Dewuy তার বই Democracy and Education” তে উল্লেখ করেন, “একটি জাতি সংস্কারের মাধ্যমে টিকে থাকে আর সংস্কারের ভিত্তি হচ্ছে শিশু-কিশোরদের শিক্ষা দেওয়া। একটি জাতি বিভিন্ন উপায়ে নিরক্ষর মানুষদেরকে তাদের নিজস্ব জীবন-দর্শন, বোধ-বিশ্বাসের উপযুক্ত ধারক বাহক হিসাবে গড়ে তুলে থাকে”।

আরেক জন Prof. Clark এর মন্তব্য, “তারবিয়াহ এর ধারণা পেশ করতে যত কিছুই বলা হোক না কেন, তারবিয়াহ এর শেষ কথা এটাই যে, এর মাধ্যমে প্রতিটি জাতির জীবন ও জগতের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি রক্ষা করা হয় এবং এটা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে অর্পন করার সংগ্রাম করা হয়ে থাকে”। [হাওলা, ৭১-৭৪]

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য 

নদাভী রা. এর মতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য এক কথায় প্রকাশ করা যায় আর তা হচ্ছে আল্লাহর পথের দায়ী তৈরি করা, যারা ইলমের গভীরতা, ফিকহ ও বাসিরাতের সাথে এবং দ্বীনের ইলম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিতির মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করার যোগ্যতা রাখে। এই উদ্দেশ্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্কিত সকল কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকা উচিত, অর্থাৎ এই প্রতিষ্ঠানের জন্যে যা কিছুই করা হোক না কেন এই লক্ষ্য যেন সামনে রেখেই তা করা হয়”। [নাওয়া, ৮৭]

নদভী রা. মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে একটি সিলেবাস প্রস্তাব করেন। তার সেই প্রস্তাবের মধ্যে ছিল: “ কুরআন, সুন্নাহ, সিরাতে-রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সিরাতের ব্যাপারে মুসতাশরিকিনদের মিথ্যা দাবী সম্পর্কে ধারণা দান, ইসলামী শরিয়াতের মাকাসিদ, শরিয়াতের দর্শন, ফিকহ, উসুলে ফিকহ, আরবী ভাষা ও সাহিত্য, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান উদাহরণ হিসাবে, অর্থনীতি, রাজনীতি, ভূগোল, ইতিহাস, ধর্মের ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান, ফিকির, দাওয়াহ ও ইসলাহের ইতিহাস। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপারে তিনি বলেন এই ক্ষেত্রে ইমাম গাজালি ও ইবনে তাইমিয়াহ রা. এর মত তাদের যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মত পারদর্শিতা অর্জন করতে না পারলেও এমন পর্যায়ের ধারণা অর্জন করা উচিত যাতে এই যুগের মানুষের সাথে খিতাব করতে পারেন”। [নাওয়া, ৯৬]

উপসংহার

৬০ বছরের অধিক সময় ধরে নাদাভী রা. শিক্ষকতার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। যার ফলে তিনি তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি ও বিদ্যমান ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে দুর্বলতা সম্পর্কে তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা সরাসরি পশ্চিমা শিক্ষা দর্শন ও ভিত্তির অনুগত হওয়ার কারণে এই শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম উম্মার ইমান-আকিদা, বোধ-বিশ্বাস, আমল-আখলাকের কি ক্ষতি হয়েছে সেই সম্পর্কে তিনি উম্মতকে ও উম্মতের দায়িত্বশীলদেরকে সতর্ক করেছেন। সেই ক্ষতি থেকে উম্মতকে রক্ষা করার জন্যে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে এবং তাতে ইসলামী রুহ ও চেতনা দ্বারা পরিমার্জন করার দিকে ইশারা করেছেন।

অন্যদিকে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্পৃক্তির দিকেও তিনি ইশারা করেছেন। তাঁর মতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এমন হওয়া উচিত যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন তাদের বুকে মজবুত ইমান থাকবে অন্যদিকে তাদের চিন্তায় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য ও তত্ত্ব বিরাজ করবে। তাঁর মতে শিক্ষার বিষয়টি হচ্ছে উম্মতের জন্যে বাঁচা-মরার মত একটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। যদি ইমান-আকিদা নিয়ে দুনিয়ায় ইজ্জতের সাথে টিকে থাকতে হয় তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামীকরণ ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।