‘আমাদের শানকীতী ধারা’ : শায়েখ ওলিদুদ দাদোর সাক্ষাৎকার

(মৌরিতানিয়ার প্রসিদ্ধ আলেম ফকিহ মুহাম্মদ আল হাসান ওলিদুদ দাদো শানকীতী। দেশটির ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাকাঠামো সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত বলেছেন এই সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আল জাজিরার লেখক ইবরাহিম দুয়াইরি। ভাষান্তর করেছেন রাকিবুল হাসান।)

আল জাজিরা : শুরুতেই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি—সাক্ষাৎকার দেবার জন্য আপনি আপনার মূল্যবান সময় বের করেছেন। পাঠকরা সবসময়ই জানতে চায় বড়দের বেড়ে উঠার বিষয়ে। আমরা আপনার বেড়ে উঠার গল্প শুনতে চাই। জানতে চাই আপনাদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপদ্ধতি কেমন ছিল?

দাদো : আমি অনুকরণীয় কেউ নই। আমার জীবন-যাপনও সন্তুষ্টজনক নয়। আমার ইলম কম, গ্রহণযোগ্যতা কম। তবুও আমার জীবনের সূচনাপর্বের কিছু গল্প শুনাবো কেবল।

আমার মনে পড়ছে—আমার বয়স যখন পাঁচ বছর শেষ হচ্ছে, আমার দু’বছরের বড় এক আত্মীয়কে স্লেটে আরবি হরফ লেখা শেখানো হচ্ছিলো। তাকে দেখে আমার ঈর্ষা হচ্ছিলো। আমি কেঁদে ফেললাম। তখন আমার ফুপু আমাকেও স্লেটে আরবি হরফ লিখে দিল। খুব অল্প সময়ে তার কাছে হরফগুলো শিখে ফেললাম। এরপর ওয়ারশের বর্ণনায় নাফে মাদানির কেরাতে কুরআন পড়তে শুরু করলাম। আমার বয়স সাত না পেরুতেই হিফজ শেষ করে ফেললাম।

তখন ‘তামইযুল মামি’ নামক একটি কারিকুলামে বাচ্চাদের পড়ানো শুরু হতো। কারিকুলামের নামকরণ আল্লামা মুহাম্মদ মামি শানকীতীর (মৃ: ১৮৭৬খৃ./১২৯২হি.) নামে। এই কারিকুলামে বাচ্চাদেরকে তাদের মেধা এবং বয়স অনুযায়ী শিক্ষা দেয়া হতো। আর শিক্ষাটা দিতো তাদের মা। পড়ানোর সময়টা ছিল মাগরিব থেকে ইশা।

পড়ানোর পদ্ধতি ছিলো—মা তার বাচ্চার সামনে কুরআনের একটি আয়াত বা হাদীসের একটি লাইন অথবা কবিতার একটি পঙক্তি পড়তেন। বাচ্চারা তা মুখস্থ করতো। তারপর মা তার বাচ্চাকে পঠিত অংশটুকুর বিভিন্ন দিক জিজ্ঞেস করতেন। বাচ্চাদের ‘তামইযুল মামি’ কারিকুলাম পড়ানো শুরু হতো বুসিরির (মৃ: ১২৯৫খৃ./৬৯৬হি.) এই কবিতা দিয়ে।

قد تُنْكِرُ العَينُ ضوءَ الشمسِ مِنْ رَمَدٍ ** ويُنْــكِرُ الفمُ طــعْمَ الماءِ مِنْ سَقَمِ

মা জিজ্ঞেস করতেন, ‘قد’ শব্দটি ইসম, ফেয়েল, নাকি হরফ? এটা মুরাব নাকি মাবনি? মাবনি হলে এটা সাকিনের ওপর মাবনি, নাকি হরকতের ওপর? এরপর মা জিজ্ঞেস করতেন ‘قد’ এর তিনটি অর্থ—স্বল্পতা, নৈকট্য, নিশ্চিত করা। এরপর জিজ্ঞেস করতেন নাহুর নিয়ম অনুযায়ী এর আমল কেমন হবে?

মা এরপর সামনে শব্দে যেতেন। ‘قد’ এর পরের শব্দ ‘تُنْكِرُ’। মা জিজ্ঞেস করতেন, এটা ইসম, ফেয়েল, না হরফ? তারা বলতো, ফেয়েল। তখন প্রশ্ন করতেন, এটা কোন প্রকার ফেয়েল? মুরাব না মাবনি? ইরাব কি? ইরাবের আলামত কি? ফেয়েলের মাদ্দা কি? মাদ্দার হরফ দিয়ে সম্ভাব্য কতগুলো শব্দ তৈরী হতে পারে, এবং সেই শব্দগুলোর অর্থ কি—এসবও জিজ্ঞেস করতেন।

কেউ সঠিক উত্তর দিত, কেউ ভুল উত্তর দিত। ভুল হলে মা ঠিক করে দিতেন। আমার মনে পড়ে, সেই ছোট বয়সে মা আমাকে এই পঙক্তি বলেছিলেন—

شَجاكَ أظُنُّ رَبْعُ الظاعنينا ** ولمْ تَعْبأ بقولِ العاذلينا

পঙক্তির বিশ্লেষণ করে আমি বলেছিলাম, ‘شَجاكَ’ ফেয়েলে মাজি; ফায়েল জমিরে মুসতাতির; মাফউল كَ। আমার বিশ্লেষণ শুনে আমার ভাইয়েরা হেসে উঠলো। কেননা আমি ভুল করে ফেলেছিলাম। এটা ফেয়েল নয়, বরং মাসদারে মুজাফ। লজ্জায় আমি তখন কান্না করতে শুরু করলাম।

এই বয়েসী শিশুদের জন্য বিশেষ কিছু কিতাব ছিল। সে বয়সে ইলমে নাহুর প্রাথমিক কিতাব হিসেবে পড়েছি ‘আজরুমিয়াহ’; তবে মনে পড়ছে না এটা স্লেটে লিখে পড়েছিলাম, নাকি কাগজে লিখে। ফিকহের প্রাথমিক কিতাব হিসেবে পড়েছিলাম ‘মুখতাসারুল আখজারি’; লেখক কিতাবটির শুরুতে ইসলামের সর্বসম্মত কিছু মূল্যবোধ, প্রারম্ভিক কিছু আলোচনা তুলে ধরেছেন। এরপর সালাত এবং তাহারাতের আলোচনা করেছেন।

এই বয়েসী শিশুদের রাসূল সা. এবং সাহাবিদের জীবনী শেখানো হতো। প্রতি রাতে মা তাদের বাচ্চাদের গল্প শুনাতেন। কোনো কোনো গল্প বেশ লম্বা হলে, কয়েকদিনে ভাগ করে শুনাতেন। একদিনে কতটুকু শুনাবেন, মায়েদের নিকট তাও নির্দিষ্ট ছিল। যেমন কেউ বদর যুদ্ধের গল্প শুনাচ্ছেন। একদিন শুনাতেন নজর ইবনে হারেস এবং উকবা ইবনে আবি মুঈতের হত্যা পর্যন্ত। আরেকদিন শুনাতেন রাসূল সা. এর রাওহা পৌঁছা পর্যন্ত। এই জায়গাগুলো মায়েদের নিকট খুব প্রসিদ্ধ ছিল।

মায়েরা গল্পগুলো শুনাতেন মৌরিতানিয়ার প্রচলিত সুন্দর ঢঙে। ছোট বয়সেই বাচ্চারা গল্পে গল্পে শিখে যেতো বড়দের নাম, বংশ-পরিচয়। আমি তখন ছোট। আমার খালু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমরকে চিনো? আমি বললাম, চিনি তো। তিনি আগে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমি তখন কল্পনা করছিলাম, মেহমান হিসেবে তিনি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। ছোট হলেও জানতাম তার ডাকনাম আবু আবদুর রহমান। তার মা যায়নাব বিনতে মাজউন। তার দাদি হানতামা বিনতে হাশেম। আমরা জানতাম, ছোট বয়সে তিনি বাবার সঙ্গে হিজরত করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের এতকিছু জানতাম, তার চেহারা-আকৃতি চোখে ভেসে উঠতো। এভাবে প্রতিটি সাহাবির গল্প শোনানো হতো।

এসব গল্পের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হতো বিভিন্ন কবিতা। কবিতাগুলো বাচ্চাদের মুখস্থ করতে হতো। চাই সেটা বদর বা উহুদ সম্পর্কে হাসান ইবনে সাবেত (মৃ:৬৭৩খৃ./৫৪হি.) এর কবিতা হোক, কিংবা কাব ইবনে মালেক (মৃ:৬৬৭খৃ./৫০হি.) অথবা অন্য কোনো সাহাবির কবিতা হোক। এর পাশাপাশি ইসলামপূর্ব মুশরিকদের কবিতাও মুখস্থ করানো হতো। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে যাবা’রি (মৃ:৬৩৬খৃ./১৫) এবং যিরার ইবনে খিতাব (মৃ:৬৩৪খৃ./১৩হি.) এই দুই কুরাইশির কবিতা। কুরআনে বর্ণিত অন্যান্য নবিদের গল্পও শুনানো হতো। মনে পড়ে, হজরত ইউসুফ আ. এর কাহিনী শুনে আমরা প্রচণ্ড কেঁদে উঠতাম।

সাপ্তাহিক এবং বার্ষিক কুরআন হিফজ প্রতিযোগিতা হতো। বার্ষিক প্রতিযোগিতা হতো রমজান কিংবা রবিউল আউয়াল মাসে। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহায় দুটি প্রতিযোগিতা হতো। মায়েরা তাদের বাচ্চাদেরকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতেন।

এই বয়সেই কবিতা, বিশেষ করে জাহেলি যুগের কবিতার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়ে যেতো। যেমন—শানফারার (মৃ:৫২৫খৃ.) ‘কাসিদায়ে লামিয়াতুল আরব’; ছয় জাহেলি কবির দিওয়ান। জাহেলি যুগের মার্সিয়া রচনাকারী কবিদের মার্সিয়াও পড়া হতো। যেমন— নিজের ভাইয়ের জন্য খানসার (মৃ:৬৪৪খৃ/২৪হি.) মার্সিয়া, মুনতাশার ইবনে ওহহাবের জন্য আ’শার (মৃ:৬২৯খৃ/৭হি.) মার্সিয়া।

এরপর শিশুদেরকে ছয় কবির কবিতা মুখস্থ করানো হতো। তার পরিমাণ প্রায় দুই হাজার পঙক্তি। কবিতা মুখস্থ করানো শুরু হতো ইসলামি কবিদের কবিতা দ্বারা। যেমন গাযওয়া ব্যতীত অন্য প্রসঙ্গে হাসান ইবনে সাবেতের কবিতা। তবে এই বয়সে মৌরিতানিয়ার স্থানীয় কবিদের কবিতাও বাচ্চাদের পড়ানো হতো। চাই তারা সমকালীন কবি হোক কিংবা পূর্ববর্তী। আমি পড়তাম আমার নানা মুহাম্মদ আলী ইবনে আবদুল ওয়াদুদ (মৃ:১৯৮১খৃ/১৪০২হি.) এর কবিতা। এ সম্পর্কিত আমার একটা গল্প আছে।

একবার নানার সঙ্গে গাড়িতে করে তার এক আলেম বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছিলাম। পথেই নানা তার পরলোকগত বন্ধুর স্মরণে মার্সিয়া বলতে শুরু করলেন। তিনি একটি পঙক্তি বলেন, আমাকে হিফজ করার নির্দেশ দেন। এরপর আরেকটি পঙক্তি বলেন। আমরা যখন বাড়ি পৌঁছলাম, নানা বললেন, হে মুহাম্মদ হাসান, পুরো কাসিদাটা শুনাও। আমি পুরো কাসিদাটি শুনিয়ে দিলাম। এতে বিশের অধিক পঙক্তি ছিল।

আল জাজিরা: ঐতিহ্যবাদী শিক্ষার প্রধান আবশ্যক তিনটি অনুষঙ্গ—শায়খ, ছাত্র এবং শিক্ষাপদ্ধতি। এগুলো আপনি কিভাবে দেখেন?

দাদো: এগুলো আবশ্যক, কিন্তু এগুলোই সব নয়। বরং জিনিস তিনটি হলো শর্ত। শায়খ ছাড়া মানুষের ইলম অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই আবু হাইয়ান উন্দুলুসি (মৃ:১৩৪৫খৃ/৭৪৫হি.) বলেছেন, ‘শায়খ ছাড়া যদি ইলম অর্জন করো, সিরাতে মুসতাকিম থেকে বিচ্যুত হবে। সংশয় তোমাকে ঘিরে ধরবে।’ শরঈ নুসুসের ক্ষেত্রে শায়খের প্রয়োজনীয়তা সুস্পষ্ট। অহি নাজিল যখন শুরু হলো, রাসূল সা. এর নিকট হজরত জিবরাঈল আ.কে পাঠানো হয়েছে। হজরত মুসা আ. হজরত খিজির আ.কে বলেছিলেন—’আমি কি আপনাকে এই শর্তে অনুসরণ করব যে, আপনাকে যে সঠিক জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তা আমাকে শিক্ষা দিবেন?’ (সূরা কাহাফ:৬৬)

শায়খকে হতে হবে কল্যানকামী, অভিজ্ঞ আলেম। কোনো শায়খের যদি বিশেষ বিষয়ে পারদর্শিতা থাকে, তার কাছ থেকে ঐ বিশেষ বিষয়ের ইলম অর্জন করা উচিত। বাকি ইলম অন্য শায়খ থেকে অর্জন করবে।

এরপর আসে কিতাবের প্রসঙ্গ। কিতাব হলো একজন ছাত্রের দ্বিতীয় শায়খ। কিতাবের মধ্যে ভাগ রয়েছে। যেমন কিছু কিতাব ক্লাসে পড়ানোর জন্য। শায়খগণ নির্দিষ্ট করে দেন, মুখস্থ করান। যে প্রতিষ্ঠানে আমি পড়েছি, সেখানে ৪৮ প্রকার ইলম পড়ানো হয়েছে। সহজ থেকে শুরু করে কঠিন বিষয়ের দিকে এগিয়েছে শিক্ষা কারিকুলাম। ক্লাসের কিতাবের বাইরে নিজস্ব মোতালাআর কল্যাণেও ইলমের দিগন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই মুতালাআ পত্রিকা-দেয়ালিকাও হতে পারে। শৈশবে আমাদের বাড়িতে পত্রিকা আসত। পত্রিকার পাতাগুলো আমরা সবাই ভাগ ভাগ করে পড়তাম। একজনের একপাতা পড়া শেষ হলে আরেকজনের সঙ্গে পাতা বদল করতাম। মোতালাআর জন্য অনেক কিতাব আছে, শরাহ আছে। এগুলো পড়তে শায়খের ব্যাখ্যার দরকার হয় না। মুতালাআ করার অন্যতম শর্ত হলো আগ্রহের সঙ্গে মুতালাআয় ডুবে যাওয়া।

মুতালায় কেউ এত মগ্ন হয়ে যায়, সে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়। মনে পড়ে— ঐতিহাসিক মুহিউদ্দিন মারাকেশির ‘আল মু’জিব ফি তালখিসি আখবারিল মাগরিব’ গ্রন্থটি যখন প্রথম আমার হাতে আসে, এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম তাতে, মাগরিব নামাজ পড়তে ভুলে গেছি। সন্ধ্যার অন্ধকার বইয়ের পাতা কালো করে দিলে আমার সম্বিৎ ফিরে আসে। সে যুগের বাচ্চারা বই বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে যেত। আমার নাক থেকে রক্ত পড়ার একটা রোগ ছিল। কিতাব মুতালাআয় এমন ডুবে যেতাম, ওসব খেয়াল থাকতো না। যখন নাক থেকে রক্তের ফোঁটা বইয়ের পাতায় পড়তো, তখন টের পেতাম। এখনও আমার কাছে কিছু কিতাব আছে, কিতাবগুলোর পাতায় নাক থেকে চুয়ে পড়া রক্তের দাগ।

শায়খ এবং কিতাবের পর শিক্ষাজীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রতিযোগী সঙ্গী। মায়ের আঙিনা ছেড়ে বাচ্চারা যখন বাইরে ইলমের মজলিসে যায়, তখন সে তার সহপাঠীর মুখোমুখি হয়। সহপাঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা মানুষের সত্ত্বার বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি গঠনে প্রতিযোগিতা সেই পুরাতন কাল থেকেই প্রভাব রেখেছে। নতুন কিছু নয়। তাই একজন ছাত্রের দরকার একজন প্রতিযোগী সঙ্গী ; যার সঙ্গে সে সময় কাটাবে, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক করবে, আলোচনা-সমালোচনা করবে, হিফজ-মুতালাআ-মুজাকারা-সুন্দর হাতের লেখায় প্রতিযোগিতা করবে। তখন হাতের লেখার প্রতিযোগিতাও হতো। কারণ আমাদের দেশে তখন প্রকাশনা ছিল না। অধিকাংশ কিতাব হাতে লেখা হতো। কখনো শর্ত দেয়া হতো, কিতাবটি ছাত্রকে তার নিজের হাতেই লিখতে হবে। তখন তারা বাবার নুসখাটি তার কোনো কাজে আসতো না।

কখনো মায়েরা ছেলেদের বলতেন, তোমার লেখাটি আমি লিখে দিচ্ছি। তুমি হিফজ করো। প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হও। আমার কাছে এখন আমার দাদির হাতে লেখা ৪১টি কিতাব আছে। এরমধ্যে ‘ثِماني الدُّرَر في شرح المختصر শিরোনামে একটি ফিকহের কিতাব আছে। কিতাবটির লেখক আল্লামা আবদুর কাদির ইবনে মুহাম্মদ মাজলিসি শানকীতী (মৃ:১৯১৪খৃ/১৩৩৭হি.)। কিতাবটি হাতে লেখায় সাত খণ্ড। যদি ছাপা হয়, তাহলে ২১ খণ্ডে পরিণত হবে!

আল জাজিরা: আপনার প্রথম শায়খ কে? তার পড়ানোর ধরণ কেমন ছিল?

দাদো: মা, দাদি, নানি, খালা, ফুপু সবার নিকট পড়েছি। এই নারীগণ আমার প্রথম শায়েখ। এরপর বাবার কাছে কেরাত পড়েছি, ঈসা ইবনে মিনা মিসরির (মৃ:৮৩৫খৃ/২২০হি.) রেওয়ায়াতে নাফের কেরাতের ইজাযত নিয়েছি। তার কাছে উলুমুল কুরআনের প্রাথমিক বিষয়গুলো পড়েছি। এরপর পড়েছি আমার দাদা আল্লামা মোহাম্মদ আলীর নিকট। তার নিকট টানা ৯ বছর ছিলাম। এ সময়ে তার নিকট হাদীসের নয়টি কিতাব, নাহু-সরফের ৫৮টি কিতাব, মালেকি এবং অন্যান্য মাজহাবের প্রচুর কিতাব তার নিকট পড়েছি। তার মুখ থেকে কাজি ইয়াজ রহ. (মৃ:১১৫০খৃ/৫৪৪হি.) এর ‘আশ শিফা’ শুনেছি ১৩ বার। ইবনে হাজার রহ. (মৃ:১৪৪৮খৃ/৮৫২হি.) এর ‘ফতহুল বারি’ পরিপূর্ণ শুনেছি পাঁচবার। তাফসিরে কুরতুবি (মৃ:১২৭২খৃ/৬৭১হি.) আমি তাকে শুনিয়েছি ছয়বার। এগুলো সম্পন্ন করেছি আমি ক্লাসের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে।

আমার দাদার পড়ানোর ধরণ খুব প্রসিদ্ধ ছিল। প্রথমেই তিনি মতনের শব্দ এবং পরিভাষা খুলে খুলে বলে দিতেন। তারপর প্রতিটি অংশের দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করতেন।

আল জাজিরা: আপনার শায়খের ক্লাসে বিভিন্ন বিষয় পড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো তারতিব ছিল? তার দৈনিক রুটিন কেমন ছিল?

দাদো: অবশ্যই তারতিব ছিল। একই সময়ে তো দু বিষয় পড়ানো যায় না। তবে আমি একটু সুযোগ বেশি পেতাম। সকালে ছাত্রদের সঙ্গেও পড়তাম, শায়খ রাতে আমাকে আলাদাভাবেও পড়াতেন।

তার দৈনিক রুটিন ছিল—ভোর চারটার দিকে আমাদেরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন। অজু, মেসওয়াক করে আমরা নামাজের প্রস্তুতি নিতাম। তিনি আজান দিতেন। মসজিদে ইমাম ছিলেন আমার বাবা। ফজর নামাজের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকির-আযকার করতেন; জায়গা থেকে উঠতেন না। সূর্যোদয়ের পর দু রাকাত নামাজ পড়ে ঘরে ফিরতেন। ঘরে এসেই দেখতেন ছাত্ররা বসে আছে। দু ধরণের ছাত্র আসতো। এক—একটি কিতাব কয়েকজন একসঙ্গে পড়তো। দুই. একটি কিতাব একজনই পড়তো। যে আগে আসতো, তাকে আগে পড়াতেন। চাই সে যে দলেরই হোক। একজন লোক নিয়োগ দিয়েছিলেন রেজিস্ট্রার বহি দেখাশোনার জন্য। তিনি সিরিয়াল অনুযায়ী নাম লেখতেন।

শায়খ বহির সিরিয়াল অনুযায়ী পড়ানো শুরু করতেন। টানা জোহর পর্যন্ত পড়াতেন। জোহরের মসজিদে মেহমান, ফতোয়া তলবকারীদের সঙ্গে কথা বলতেন। তারপর ঘরে এসে বিশ্রাম করতেন আসর পর্যন্ত। আসরের পর ইজাযাত দেবার সময়। তখন ছাত্ররা তাকে পড়ে শুনাত। তিনি তার সত্যায়ন করতেন। ছাত্র কখনো তার থেকে বর্ণিত সনদসহ পড়তো, কখনো তিনি মতনের বিভিন্ন সনদ বলতেন। ইজাযত দেয়া শেষ হলে তিনি কুরআন তেলাওয়াত করতেন। দৈনিক তিনি এক চতুর্থাংশ কুরআন পড়তেন। এরপর তিনি দরস দেয়া শুরু করতেন বিভিন্ন কিতাব। এই দরসে পরিবারের লোকেরা অংশ নিতো। এই দরসেই আমি উল্লিখিত কিতাবগুলো শুনেছি, পড়েছি। শায়খ ইশার পর দরস দিতেন নারীদের। তাদের ক্ষেত্রেও যারা আগে আসতো, তারা আগে দরস পেতো।

আল জাজিরা: প্রতিষ্ঠানে আপনি কী কী ইলম শিখেছেন?

দাদো: আমি ৪৮ ধরণের ইলম শিখেছি।

ইলমুল কুরআনে পড়েছি—ইলমে তাজভিদ, রসম, যবত, তাফসির, আয়াতে আহকামের তাফসির, মুফাসসির এবং কারীদের স্তর, উলুমুল কুরআন। হাদীসে পড়েছি—উলুমুল হাদীস, জারহ-তাদীল, সনদ, তাখরিজ, রিজাল, হাদীসের মতন, শরাহ, সুন্নাহর ইতিহাস। ইলমুল ফিকহে পড়েছি—ফিকহে মাজহাবি, তুলনামূলক ফিকহ, ইলমুল ফারায়েজ, আদাবুশ শরঈয়্যাহ, ইলমু উসুলিল ফিকহ, কাওয়ায়েদে ফিকহিয়্যাহ, আসলের উপর কেয়াস করে ফুরু’ বের করা, ইলমুল আশবাহ ওয়ান নাজায়ের, ইলমুল ফুরুক ওয়াল ইসতিসনা, বিভিন্ন মাজহাবের ফকিহদের জীবনী।

ইলমুল লুগাতে পড়েছি—কবিতা, নাহু, সরফ, বালাগাত, ইলমু আরূজ ওয়াল কাওয়াফি, ইলমু ফিকহিল লুগাত। ইলমুর রেওয়ায়াতে পড়েছি—সিরাত, বংশনামা, ইসলামি ইতিহাস, সাধারণ ইতিহাস, সভ্যতা ও নগরায়নের ইতিহাস। ইলমুল আকলিয়্যাতে পড়েছি—ইলমুল কালাম, মানতেক, ফালসাফা। ইলমুত তরবিয়াতে পড়েছি—তাসাউফ, সুলুক। ইলমুল আদাবে পড়েছি—সফরের, শিক্ষার, সুহবতের আদব। এছাড়াও আরও পড়েছি। সেসব মিলিয়ে ৬৩ ধরণের ইলম হবে।

আল জাজিরা: আপনাদের শিক্ষাক্রমে মৌরিতানিয়ার আলেমগণ কর্তৃক গৃহিত সবচে গুরুত্বপূর্ণ দিক কোনটি?

দাদো: ইলম এই উম্মতের সম্মিলিত অধিকার। কিন্তু তবুও যারা সুখে থাকে, প্রাচুর্যে থাকে, তাদের ভাগ্য ইলম কমই জুটে। যারা দুখে থাকে কষ্টে বিবর্ণ থাকে, বেশি ইলম জুটে তাদেরই। কারণ তারা মুখস্থের ওপর বেশি জোর দেয়। পক্ষান্তরে যারা বড় বড় শহরে থাকে, কিতাবের প্রাচুর্যে থাকে, তারা এটা করে না।

কায়রো, হায়দারাবাদসহ যেসব শহরে প্রকাশনা আছে, তাদের সঙ্গে মৌরিতানিয়াকে মেলালে চলবে না। কারণ মৌরিতানিয়ায় ছাপা কিতাব পৌঁছত খুব কম। তাই তাদের কাছে যে কিতাব পৌঁছত, তা তারা মুখস্থ করে ফেলতেন। ছাত্রকালে আমিও মতন মুখস্থ করেছি। যেমন—ইবনে মালেক উন্দুলুসির (মৃ:১২৭৪খৃ/৬৭২হি) নাহু-সরফের কিতাব ‘লামিয়াতুল আফআল’, যেটাতে আল্লামা হাসান ইবনে যাইন শানকীতীর (মৃ:১৮৯৮খৃ/১৩১৫হি) হাশিয়া ছিল। আল্লামা মুখতার ইবনে বুনা শানকীতীর (মৃ:১৮০৫খৃ/১২২০হি) ‘আল জামে বাইনাত তাসহিল ওয়াল খাসাসাহ’র সঙ্গে ‘আলফিয়াতু ইবনে মালেক’। ইবনে হিশাম মিসরির (মৃ:১৩৬০খৃ/৭৬১হি) ‘আওজাহুল মাসালিক’।

বাচ্চাদেরকে ফন্নে হাদীস পড়ানো শুরু হতো ইমাম নববি রহ. এর ‘আল আরবাউনান নাবাবিয়্যাহ’ এবং মাকদিসির ‘আল উমদাহ’ দিয়ে। এরপর পড়ানো হতো ইমাম মালেক রহ. এর ‘মুয়াত্তা’, বুখারি ও মুসলিমের সহিহাইন, এরপর বাকি ছয় কিতাব। সিরাত এবং বংশনামা পড়ানো শুরু হতো আল্লামা আহমদ বাদাবি শানকীতী (মৃ:১৭৯৩/১২০৮হি) এর ‘নাযমুল গাযাওয়াত’, ‘নাযমুল আনসাব’, ‘নাযমুল খাতেমা’ ইত্যাদি দিয়ে। পড়ানো হতো ইবনে খতিব উন্দুলুসির (মৃ:১৩৭৪/৭৭৬হি) ‘নাযমুদ দুয়াল’। শামায়েল পড়ানো হতো ইমাম তিরমিজি রহ. এর ‘শামায়েল মুহাম্মাদিয়্যাহ’; ইবনে কাসির রহ. এর ‘শামায়েলে রাসূল’; আল্লামা ইবনে মুত্তালি শানকীতীর ‘নাযমুশ শামায়েল’।

মুসতালাহে হাদীস পড়ানো শুরু হতো আল্লামা সাইয়েদ আব্দুল্লাহ শানকীতীর (মৃ:১৮১৮খৃ/১২৩৩হি) ‘তালিআতুল আনওয়ার’ দিয়ে। তারপর পড়ানো হতো ‘আলফিয়াতু হাফেজ ইরাকি’। কেউ পড়তো ‘মুকাদ্দামাতু ইবনিস সালাহ’, সুয়ুতি রহ. এর ‘তাদরিবুর রাবি’। ইলমুল ফিকহ পড়ানো শুরু হতো ‘মুখতাসারু আখজারি’ এবং ‘নাযমু ইবনে আশের’ দিয়ে। ফিকহে মুকারিন পড়ানো শুরু হতো ইবনে জুযা উন্দুলুসি (মৃ:১৩৪১খৃ/৭৪১হি) এর ‘আল কাওয়ানিনুল ফিকহিয়্যাহ’ দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে বড় বড় কিতাব পড়ানো হতো। উসূলুল ফিকহ পড়ানো শুরু হতো ইমামুল হারামাইন জুয়াইনি রহ. (মৃ:১০৮৫খৃ/৪৭৮হি) এর ‘আল ওরাকাত’ দিয়ে। এরপর পড়ানো হতো সুয়ুতি রহ. এর ‘আল কাওকাবুস সাতি’; আব্দুল্লাহ শানকীতীর ‘মারাকিস সুউদ’।

আল জাজিরা: কেউ কেউ প্রশ্ন করে, মতন পড়া এবং হিফজ করা ছাড়া আলেম হবার সম্ভাবনা কতটুকু?

দাদো: আসলে এই মতনগুলো হিফজ করা ব্যতীত প্রকৃত তালেবে ইলম হওয়া সম্ভব নয়। শুধুই মুতালাআ কাউকে আলেম বানাতে পারে না। কারণ শুধু মুতালাআর মাধ্যমে তার কাছে কেবল গুটিকয়েক অর্থ জমা হয়। কিন্তু কেউ যখন মতন মুখস্থ করে ফেলে, তখন সেটা সবসময় থাকে। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, ‘আমি যেখানেই যাই, আমার ইলম সঙ্গে যায়। আমার অন্তর ইলম ধারণ করে রেখেছে, সিন্দুক পুরে রাখেনি। বাড়ি থাকলেও ইলম আমার সঙ্গে থাকে, বাজারে থাকলেও ইলম আমার সঙ্গে থাকে।’

আমাদের কতক শানাকীতী আলেম তাদের দৈনন্দিন পাঠদানের মতন হাজারবার পড়েন, যেন তা শক্তভাবে মুখস্থ হয়ে যায়। এবং শায়খের শরাহ শতবার করে তাকরার করেন। ইলমের পূর্ণতা এবং বুঝার জন্য মুখস্থা করাটা শর্ত। মুখস্থ বিদ্যা ঐ ইলমে নতুন করে কিছু উদ্ভাবন করারও সহায়ক হয়।

আল জাজিরা: প্রাচ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি সফর করেছেন। সেখান থেকে কিছু অর্জন করেছেন? আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

দাদো: ১৯৮৮খৃ/১৪০৮ হিজরিতে আমি প্রথম হজ করতে যাই। এরপর প্রায় ৩০ বার টানা হজ করেছি। হজ-ওমরার মওসুমে বড় বড় আলেমদের সঙ্গে দেখা হওয়ার একটা সুযোগ ঘটে। এমনই এক সফরে আমি রিয়াদে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ে দু বছর পড়েছি। এখানে আমি ফিকহে স্নাতক করেছি। এসময় আমি সমকালীন ইলমি পদ্ধতি, গবেষণার ধরণ, পাঠ উপস্থাপনের নতুন নতুন দিক লক্ষ্য করেছি। এছাড়াও গবেষণার বিভিন্ন উপায়, যা আমাদের দেশের মানুষেরা জানতো না, তাও শিখেছি। যেমন এই সফরে ইসলামি অর্থনীতি, আধুনিক পাঠ-পদ্ধতি এবং পাণ্ডুলিপি তাহকিক করা শিখেছি। আধুনিক চিন্তার কিতাবগুলো পড়েছি। বিভিন্ন আলেম-মাশায়েখদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমি কেবল হেজাযেই সফর করিনি, বরং মিসর এবং শামেও সফর করেছি।

আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল গবেষণা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কারণ, অধিকাংশ মাশায়েখের নিকট হিফজ, রেওয়ায়াত এবং বৈচিত্র্য নেই। বিশেষ বিষয়ে তাদের পাণ্ডিত্য আছে। মূলত, সমকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গবেষক তৈরী করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আলেম তৈরী করার জন্য নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ইলমি বড় কোনো কারানামা তারা আঞ্জাম দিচ্ছে না। বরং পরীক্ষা এলে শিক্ষক ছোট একটি অংশ পড়িয়ে দিচ্ছেন। কখনও এমন হয়, শিক্ষক যা পড়াচ্ছেন, তা তিনি নিজেই পরিপূর্ণভাবে বুঝে উঠেন না। এভাবে তো ভালো গবেষকই তৈরী হওয়া সম্ভব না, ফন্নি আলেম তৈরী তো দূর কি বাত!

আল জাজিরা: কোন কোন মতনের শরাহ সম্পূর্ণ করেছেন আপনি?

দাদো: মতনের শরাহ সংরক্ষণ করা আমার অভ্যাস ছিল না। এগুলো তৈরী করেছে আমার কিছু ছাত্র। কখনও কিছু প্রতিষ্ঠান এ কাজ আঞ্জাম দিয়েছে। যেমন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে ‘সহিহ বুখারি’র শরাহ করেছি; সরফের ‘লামিয়াতুল আফআল’ দুবার, নাহুর ‘আলফিয়াতু ইবনে মালেক’, উসুলুল ফিকহে আল্লামা সুয়ুতি রহ. এর ‘আল কাওকাবুস সাতে’, ইবনে আসেম গারনাতির ‘মুরতাকাল উসুল’, আল্লামা মাহনাজ শানকীতীর ‘সুল্লামুল উসুল’, আবু ইসহাক সিরাজির ‘শরহুল লুমা’, মুসতালাহে হাদীসের ‘আলফিয়াতুল ইরাকি’ এবং ‘উমদা’ শরাহ করেছি।

কাতারের ওয়াকফ মন্ত্রণালয় কয়েকটি কোর্সের আয়োজন করেছিল। তাতে ‘সাবআ মুআল্লাকাত’ শরাহ করেছি। এরমধ্যে শুধু ইমরাউল কায়েসের মুআল্লাকাটি তারা ছেপেছে। কাতারের কোর্সে ‘আত তামহিদ ফি তাখরিজিল ফুরু আলাল উসুল’ গ্রন্থটিরও শরাহ করেছি। কুয়েতের ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের কোর্সে আমার উসুলুল ফিকহের কিতাব ‘মারাতিবুদ দালালাহ’ এবং মুনযিরির ‘আল আরবাউনাল মুনযিরিয়্যাহ’ শরাহ করেছি। এরমধ্যে একটু বাড়িয়ে তারা আমার কিতাবটি প্রকাশ করেছে। ইউরোপে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কোর্স করেছি। লন্ডনে আবুল হাসান আশআরি রহ. (মৃ:৯৩৫খৃ/৩২৪হি) এর ‘মাকালাতুল ইসলামিয়্যিন’, তিলমসানির (মৃ:১৩৭০খৃ/৭৭১হি) ‘মিফতাহুল উসুল ইলা বিনাইল ফুরু আলাল উসুল’ এবং ইবনে যায়েদ কিরানভির (৯৯৬খৃ/৪৮৬হি) ‘আর রিসালাহ’ শরাহ করেছি।

আল জাজিরা: অনেকে অভিযোগ করে—মূল উৎস থেকে আরবীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাটা কঠিন। তাহলে তুরাসের কিতাবগুলো পড়ার সর্বোত্তম পন্থা কী হতে পারে?

দাদো: তালিবুল ইলম, গবেষকদের জন্য তুরাসের কিতাব পড়া আবশ্যক। যদিও সমকালীন নতুন নতুন কিতাবগুলো তুরাসের কিতাবের খুব কাছাকাছি, তবুও তুরাসের মূল কিতাবগুলো পড়ার প্রয়োজনীয়তা কখনও ম্লান হবে না। বরং কোনো কোনো তুরাসের কিতাব আরও গভীর মনোনিবেশে পড়ার দাবি রাখে। যেমন নাহুর জন্য ‘কিতাবু সিবওয়াইহ’ ‘আলফিয়াতু ইবনে মালেক’ ইত্যাদি। নাহুর মূল কথাগুলে পড়ার জন্য এগুলো দ্বারস্থ হওয়া আবশ্যক। এভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ে মৌলিক কিতাবগুলো পড়তে হবে। এখন অনেক কিতাব তাহকিকসহ প্রকাশিত হয়েছে।

আর পাঠপদ্ধতি একেকজনের কাছে একেকরকম। কেউ একা একা পড়তে ভালোবাসে, পড়ায় মগ্নতা আসে। কেউ গ্রুপ হয়ে পড়তে ভালোবাসে। কারণ এতে একজনের সঙ্গে আরেকজনের মতবিনিময়ের সুযোগ হয়। আমার মনে হয়—এ দুটোর সমন্বয় থাকা উচিত। তাহলে একাকী পড়ার মগ্নতাও পাওয়া যাবে। আবার অপরের পর্যবেক্ষণ, মতামতও জানা যাবে।

আল জাজিরা: তুরাসের কিতাবগুলো এখন নতুন নতুন গেটআপে, আরও সহজ করে ছাপা হচ্ছে। তুরাসের ইলম এবং মাসআলাগুলোই নতুনরূপে লেখা হচ্ছে। এটাকে কেমনভাবে দেখেন?

দাদো: এটাকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখি। কারণ, প্রতিটা যুগের মানুষের উচিত তাদের কালের ভাষায়, তাদের উপযুক্ত করে কিতাবগুলো লেখা। তবে শর্টকাট না করে পুরো ইলমটুকুই আনা উচিত। বর্তমানে সবচে বেশি প্রয়োজন হলো ফিকহের কিতাবগুলো নতুন করে লেখা। পুরাতন উমপা-উৎপ্রেক্ষার জায়গায় নতুন উপমা যুক্ত করা। নতুন বাস্তবতার মাসআলা তুলে ধরা। পূর্বের অর্থনৈতিক লেনদেন থেকে বর্তমানের অর্থনৈতিক লেনদেন অনেক পরিবর্তিত। নতুন নতুন ব্যবসা, অর্থনীতির নিয়ম চালু হয়েছে।

আল জাজিরা: তুরাসের কিতাবগুলো ইসলামি কিংবা প্রাচ্যবিদ গবেষকরা তাহকিক করছে। বিষয়টা আপনি কিভাবে দেখছেন? আপনার জানামতে সবচে শ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক কে?

দাদো: তুরাসের কিতাব তাহকিকের যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে উপকৃত করুন। আগের তালেবুল ইলমগণ শুধু কিতাবই দেখতো না, বরং তারা কিতাবকে মূল নুসখার সাথে মিলিয়ে দেখতো। পরে হাশিয়া কায়েম করতো। মূলত মুসলিমগণ সবসময়ই পাণ্ডুলিপি তাহকিকে এগিয়ে ছিল। তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছেন শরফুদ্দিন ইউনিনি (মৃ:১৩০১খৃ/৭০১হি)। তিনি সহিহ বুখারির কয়েকটি নুসখা নিলেন এবং ১৬ জন আলেমকে ডাকলেন। বিভিন্ন নুসখার মধ্যে একটির সঙ্গে আরেকটিকে মেলালেন। পার্থক্য এবং অতিরিক্তগুলো মার্ক করলেন। তারপর যারাই বুখারির শরাহ করেছে এবং করছে, ইউনিনির তাহকিককৃত কিতাবটিই ছিল মূল ভিত্তি।

প্রাচ্যবিদরা সবসময় সমতা বজায় রাখেন না। কখনো ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন, কখনো তাহরিফ তথা পরিবর্তন করে ফেলেন। যেমন ইবনে আবি দাউদ সিজিস্তানির কিতাব ‘আল মাসাহিফ’ তাহকিক করতে গিয়ে প্রাচ্যবিদগণ এরমধ্যে পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটিয়ে ফেলেছেন। তবে অস্বীকার করবো না—ব্যতিক্রম কিছু প্রাচ্যবিদ তো আছেনই।

তবে সবচে সুন্দর পরিমিত তাহকিক করেছেন ইসলামি গবেষকগণ। তাদের মধ্যে রয়েছেন আহমদ শাকির (মৃ:১৯৫৮খৃ/১৩৭৭হি), তার ভাই মাহমুদ শাকির (মৃ:১৯৯৭/১৪১৮হি), তার মামাত ভাই আবদুস সালাম হারূন (মৃ:১৯৮৮খৃ/১৪০৮হি) প্রমুখ। এদের তাহকিকের উপর নির্ভর করা যায়। মিসরিয় প্রজন্মের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদ আবুল ফজল ইবরাহিম (মৃ:১৯৮০খৃ/১৪০০হি) এবং আলী মুহাম্মদ বাজাবি (মৃ: ১৯৯৭খৃ/১৩৯৯হি)। তাদের পর এসেছেন শায়খ আবদুল ফাত্তাহ হালাবি (মৃঃ১৯৯৪খৃ/১৩৯৯হি)।

মরক্কো, আরব, শাম, ইরাক, জর্ডান, হিন্দ—সব জায়গার ইসলামি গবেষকরাই গবেষণা করেছেন। গবেষকগণ কখনো কখনো নির্দিষ্ট কারো তুরাসের তাহকিক করেছেন। যেমন শায়খ মুহাম্মদ আবুল আজফান (মৃ:২০০৬খৃ/১৪২৭হি) মালেকি তুরাসের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। জীবিতদের মধ্যে ইরাকি গবেষক বাশার আওয়াদ তাহকিক করেছেন আল্লামা যাহাবির তুরাস।

আমাদের ইসলামি বিশ্বে তাহকিকের বিশাল জাগরণ হয়েছে। এতে ইলম, আলেম সবাই উপকৃত হয়েছে। তুরাসগুলো সংরক্ষিত থেকেছে। তবে তুরাসের তাহকিককৃত কিতাবগুলোতেও ভুল থাকে মাঝেমধ্যে। কারণ, গবেষক হয়তো একটা নুসখা দেখেছেন, দ্বিতীয় নুসখা দেখেননি। অথবা মূল নুসখার কোনো লাইন মুছে গেছে যেকোনো কারণে। ফলে ভুলের সৃষ্টি হয়েছে।

আল জাজিরা: আপনার দৃষ্টিতে তুরাসের মাপকাঠি কী? কোন কোন কিতাবগুলোকে আমরা তুরাসের ক্যাটাগরিতে ফেলতে পারি?

দাদো: মূলত তুরাস বলা হয়—যে ঐতিহ্যের প্রতি মানুষ আগ্রহী হয়। আমাদের সভ্যতায় তুরাস কয়েক প্রকার। এক—ইসলামের যুগে মুসলমান এবং অন্যদের দ্বারা উৎপাদিত। দুই—প্রাক ইসলামি আরব থেকে বর্ণিত কবিতা-সংবাদ। তিন—অন্যান্য জাতি তথা গ্রীক, পার্সিয়ান, ভারত এবং অন্যান্য জাতির ভাষা থেকে অনুবাদ। এগুলো সবই আমাদের তুরাসের অংশ। কারণ, এ জাতির সাংস্কৃতিক গঠন, সাহিত্য-মানস এবং ইলমি ব্যক্তিত্ব গঠনে জিনিসগুলো ভূমিকা রেখেছিল। এখন আমাদের তুরাসের অংশ হয়ে গেছে জাহেলি যুগের ছয় কবির কবিতা, দিওয়ানে হামাসা। তুরাসের অংশ হয়ে গেছে গ্রীক মানতেক-ফালসাফা, অন্যান্য জাতির ভাষা থেকে অনূদিত সাহিত্যকর্ম, যেমন ‘কালিলা ওয়া দিমনা’।

ইউনেস্কোর মানদণ্ডে আরেকটা সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। এই মানদণ্ড একটা জিনিসকে সমস্ত সভ্যতার অংশগ্রহণে সার্বজনীন করে তুলে।

আল জাজিরা: অন্যান্য জাতির তুরাস গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে মুসলমানদের নীতি কেমন হওয়া উচিত। ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় সাসানি ফরাসি প্রভাব সম্পর্কে যা বলা হয়, তার আলোকে?

দাদো: এখানে লুকোছাপার কিছু নেই যে আমরাও অন্যান্য জাতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি। আমি মনে করি— সমস্ত সভ্যতা বৈশ্বিক, সার্বজনীন। রাসূল সা. খন্দক খননের চিন্তাটি নিয়েছিলেন পারসিক সভ্যতা থেকে। সিলমোহরের ধারণাটি নিয়েছিলেন রোমান সভ্যতা থেকে। অন্যান্য জাতির যা কিছু ভালো, উপকারী, সঠিক, তা গ্রহণে মুসলমানদের কোনো বাঁধা কিংবা ইতস্ততা ছিল না। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরবদের তো সুগঠিত শাসনকাঠামো ছিল না। তারা ছিল বেদুঈন। ইসলামি সাম্রাজ্য যখন বিস্তৃত হলো, স্বভাবতই তখন অন্যদের থেকে কিছু গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তবে বিচার-বিবেচনা ছাড়া অন্যদের কিছু গ্রহণ করা হয়নি। বরং পাঠ এবং অভিজ্ঞতার পর গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্রাজ্যের যখন কোনো সভ্যতার কিতাব প্রয়োজন হয়েছে, অর্থ খরচ করে দক্ষ অনুবাদক দিয়ে তা অনুবাদ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইতিবাচক দিকও আছে, নেতিবাচক দিকও আছে। অধিকাংশ সময় আমরা অপর সভ্যতার সর্বোত্তম বিষয়গুলোই গ্রহণ করেছি। এক্ষেত্রে অনুবাদকৃত বিষয়ে পৌত্তলিক ধারণার স্পর্শও যেন না লাগে, আলেমগণ তার প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রেখেছেন সবসময়।

বিপরীতে ইসলামি সভ্যতা দ্বারাও আধুনিক ইউরোপীয় নবজাগরণসহ অন্যান্য জাতি প্রভাবিত হয়েছে। এমনকি ‘নেপোলিয়ন আইন’ ফিকহে মালেকির ভিত্তিতে ছিল। ইউরোপীয়রা এবং অন্যান্যরা আমাদের মনীষীদের থেকে চিকিৎসাবিদ্যার অনেক কিছু গ্রহণ করেছে। মনীষীদের মধ্যে অন্যতম—ফারাবি (মৃ:৯৫০খৃ/৩৩৯হি); ইবনে সিনা (মৃ:১০৩৭খৃ/৪২৮হি); ইবনে রুশদ (মৃ:১১৯৮খৃ/৪৩০হি); ইবনুল বায়তার (মৃ:১২৪৮খৃ/৬৪৬হি)। তাদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই ইউরোপ তৈরী করেছে আধুনিক চিকিৎসা। এমনিভাবে ফালসাফা, ভূগোল এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানেও অন্যান্য জাতি মুসলমানদের উপর নির্ভরশীল!

বিজ্ঞাপন