আমীন আল হুসাইনী : ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতির শেষ লড়াই

রাকিবুল হাসান :

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, উসমানি খেলাফতের মসনদ থেকে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে উচ্ছেদের পর, যখন বিশ্বব্যাপী ইহুদি ও জায়নিস্টরা ফিলিস্তিনের দিকে পা বাড়ায় সেখানে তাদের আবাস গড়ার জাতীয় স্বপ্ন নিয়ে, ঠিক তখন উন্মেষ ঘটে আমীন আল হুসাইনীর। ফিলিস্তিনি জনগণ ও সমগ্রবিশ্বের হৃদয়ে জন্মভূমি বাঁচিয়ে রাখার তীব্র চেতনা ছড়িয়ে দিতে যিনি ব্যয় করেছিলেন তার জীবনের অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময়। তিনি কেবল ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামের আইকন-ই নন, বরং তিনি ফিলিস্তিনি ইতিহাসের এক কঠিনতম আন্ধকারে আচ্ছন্ন সময়ের দীপ্ত আলোকবর্তিকা। ফিলিস্তিনে ইচ্ছামত ইহুদি অভিবাসনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের দখল যখন শুরু হয়, সেই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তিনি সাহসের চিৎকার তুলেছিলেন। ধর্ম এবং রাজনীতি—দুটোর অপূর্ব সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। তার পেছনে জড়ো হয়েছিলো, আশা ও নির্ভরতায় তার নেতৃত্বের প্রতি শক্ত সমর্থন জানিয়েছিলো ফিলিস্তিনের জনগণ।

বেড়ে উঠার গল্প

১৮৯৭ সালে কুদস শহরে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মদ আমীন আল হুসাইনী। এ বছরই থিউডরহার্জলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব জায়নিস্ট সম্মেলন। যে পরিবারে তার জন্ম, সম্মান, পদবী ও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে তা ঈর্ষণীয়। বাবা তাহের আফেন্দি ইবনে মুস্তফা হুসাইনী (১৮৪২-১৯০৮) দীর্ঘ ৪০ বছরের অধিক কুদস শহরের মুফতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বংশ পরম্পরা গিয়ে মিলিত হয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাতি হুসাইন ইবনে আলী রা. এর সাথে। এই পরিবারটি ১৭৯১ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত পালন করেছে কুদস শহরে ফতোয়া দেয়ার দায়িত্ব। পাশাপাশি সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের শাসনকালে প্রশাসনিক ও ধর্মীয় অন্যান্য বিষয়ের দায়িত্বও আঞ্জাম দিয়েছে সুচারুভাবে।

কুদস শহরের মাদরাসায় পড়াশুনা করেছেন আমীন আল হুসাইনী। নয় বছর বয়সে পবিত্র কোরআন শরীফের হিফজ সম্পন্ন করেছেন । তারপর চৌদ্দ বছর বয়সে তার পিতা তাকে পাঠিয়ে দিলেন মিসরে, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে পড়ায় তার মন বসে না, কেমন উদাসীন উদাসীন লাগে। উদাসীনতা কাটাতে একসময় শেখ মুহাম্মদ রশিদ রেজা প্রতিষ্ঠিত হাউজ অফ কল অ্যান্ড গাইডেন্সে আসা যাওয়া শুরু করেন। রশিদ রেজা ছিলেন জাতির বাস্তবতা এবং জনগণের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রতি আগ্রহী এক চিন্তাপুরুষ। আমিন হুসাইনি তার বক্তৃতা শুনতে লাগলেন। এরপর তিনি ভর্তিহন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে। এখানে নতুন দিগন্তের দেখান পান আমীন আল হুসাইনী। এখানের ক্লাসের ধরন, লেকচারের সারগর্ভ আলোচনা জামিয়া আযহার থেকে একদম আলাদা। কিন্তু খুব বেশিদিন এখানে পড়ার সুযোগ হয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪-১৯১৮ এই চারটি বছর ক্লান্তকরে রাখে পৃথিবী। অস্থির করে রাখে মানুষের জীবন।

যুদ্ধ থেমে গেলে আমীন আল হুসাইনী পাড়ি জমান ইস্তাম্বুল। ভর্তি হন এক মিলিটারি স্কুলে। সেখান থেকে স্নাতক শেষ করে আযমির এবং কৃষ্ণ সাগর এলাকায় তুর্কী ইসলামি সৈন্যদলের অফিসার হিসেবে যোগ দেন। কৃষ্ণ সাগরের এই এলাকায় ইহুদিদের বসবাস ছিলো। ১৯১৬ সালে মিসর থেকে ফিলিস্তিন ফিরে আসেন আমিন হুসাইনি। এসেই ফিলিস্তিনি জনগণকে জাগাতে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে আরব ক্লাবের নেতৃত্বে গড়ে তুলেন বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সমিতি। তিনি তার বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে অটোমান সেনাবাহিনির মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

আরব ক্লাব এবং আমীন আল হুসাইনীর এইসব চঞ্চলতা ইহুদি এবং জায়নিস্ট আন্দোলনের নেতাদের নাড়া দেয়। ওয়াইজম্যানেরএক রিপোর্টে বিষয়টির বিবরণ এসেছে এইভাবে—’ইহুদিদের বিরুদ্ধে কৃষকদের জাগাতে তারা গ্রামে গ্রামে প্রতিনিধি প্রেরণ করছে। ইহুদিদের বিরুদ্ধে গেরিলা হামলা চালানোর জন্য তৈরী করছে ভয়ংকর সব সংঘঠন। তারা আমাদের বিরুদ্ধে খুব বৈরী মনোভাব তৈরীর চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের অনেকেই পুলিশে চাকরি করে, ফলত বিষয়টি তাদের জন্য আরও সহজ হয়ে যাচ্ছে। শঙ্কার আরও একটি কারণ হলো, এদের যুব সম্প্রদায় শিক্ষিত, ইউরোপ থেকে পড়ে আসা। ইহুদিদের চাল চলন তাদের নখদর্পনে।’

ফতোয়া দেয়ার দায়িত্ব

এতদিন কুদস শহরের মুফতির দায়িত্ব পালন করছিলেন আমীন আল হুসাইনীর বড় ভাই কামেল হুসাইনি। ১৯২১ সালে তিনি মারা যাবার পর, মুফতির শূন্য পদের জন্য চারজনের আবেদন পড়ে। কিন্তু এই পদের জন্য শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হন আমীন আল হুসাইনী। তারপর ১৯২২ সালে আওকাফ এবং শরিয়া আদালত প্রশাসনের সুপ্রিম ইসলামিক কাউন্সিলের প্রধান নির্বাচিত হন। দয়িত্ব পাবার পর আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজে নেমে পড়েন আমিন হুসাইনি। ব্রিটিশ ও জায়নিস্ট চক্রান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি ভাবলেন ফিলিস্তিনি জনগণের স্বার্থের বিষয়টি। ব্রিটিশ ও জায়নিস্টদের নির্যাতনে ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা ফুটিয়ে তুলতে মিসর, ইরাক, আরব আমিরাত, ইরান, ভারতএবং আফগানিস্তান সফরকারী প্রতিনিধি দলে তিনি ইচ্ছে করেই যুক্ত হন।

বিপ্লবের সময়গুলো

ফিলিস্তিনি জনগণের হৃদয়ে বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন আমীন আল হুসাইনী। ১৯২০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি তার একদল বন্ধুর সহায়তায় বায়ারিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইহুদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহের সূচনা করেন। ইহুদিদের এক অনুষ্ঠানের দিনে পতাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ফিলিস্তিনি জনগণ। সুযোগ কাজে লাগান আমীন আল হুসাইনী। সবার সামনে বক্তৃতা দিয়ে গরম করে তুলেন রক্ত, জাগিয়ে তুলেন নিজেদের অধিকার রক্ষার প্রতিজ্ঞা। মুসলিম-ইহুদি সংঘর্ষে মারা পড়ে পাঁচ ইহুদি এবং চার ফিলিস্তিনি। পাশাপাশি কয়েকজন ব্রিটিশ সেনা ছাড়াও উভয় পক্ষের দশের অধিক লোক আহত হয়। ইংরেজ সরকার আমিন হুসাইনি এবং তার সহকর্মীদের গ্রেপ্তারের আদেশ জারি করে। কৌশলে আমীন আল হুসাইনী পালিয়ে যান পূর্ব জর্ডানে।

কিন্তু ইহুদিরা এই সময় আরেকটু এগিয়ে যায়। তারা বুরাক প্রাচীরে নিয়মিত যাতায়াত তো করতোই, কিন্তু এবার তল্পিতল্পা নিয়ে চলে এলো। ১৯২৮ সালে বুরাক প্রাচীর তাদের ধর্মের জন্য বিশেষ বলে দাবি করে বসলো। ক্ষোভে ফুঁসে উঠলো ফিলিস্তিনি জনতা। তাদেরকে প্রাচীরের কাছে আসার অনুমতি দেয়া মানে তো, তাদের হয়ে যাওয়া নয়! কুদস শহরের মুফতি আমিন হুসাইনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে লিখে পাঠালেন, ইহুদিরা যেন তাদের এই অহেতুক এবং লোভাতুর দাবি থেকে ফিরে আসে। শুধু এতটুকুই নয়, তিনি বিশাল এক ইসলামি সম্মেলনের আয়োজন করলেন। সম্মেলনে তুলে ধরলেন বিভিন্ন দফা। তারমধ্যে অন্যতম একটি দফা হলো—’ইহুদিরাযে এতদিন বুরাক প্রাচীরের কাছে আসতে পেরেছে, এটা মুসলমানদের অনুগ্রহ। এই জায়গাটি সম্পূর্ণ ইসলামিক দান।’ ব্রিটিশরা প্রলোভনদেখিয়ে, ৫০ মিলিয়ন টাকা ঘুষ দিয়ে আমিন হুসাইনিকে দমাতে চাইলো, পারলো না। তিনি ফিরিয়ে দিলেন তাদের লালসার হাতছানি। ইহুদি যড়যন্ত্র ও ব্রিটিশদের অসাধু পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যক্ত করলে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।

ইহুদিদের বুরাক প্রাচীর দখলের বারংবার প্রচেষ্টা ১৯২৯ সালে সংঘর্ষের জন্ম দেয়। এই সংঘর্ষে ১০ জন মারা যায় এবং উভয় পক্ষ থেকে আহত হয় আরও কয়েকজন। এখানে ইহুদিদের সহায়তায় আবার নাক গলায় ব্রিটিশরা। দশজন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে তিনজনকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ইহুদি এবং জায়নিস্টদের আগ্রাসন এখানেই থেমে থাকে না, এগিয়ে যায়।

ফিলিস্তিনে ১৯৩১ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা তাদের ব্যাপক আবাসনের অনুমতি দেয়। লেবানন, সিরিয়ার মতো বাইরের দেশে বাস করা ফিলিস্তিনি ভূ-মালিকদের থেকে ভূমি কেনার মাধ্যমে জায়নিস্টদের এই আগ্রাসন গতি পায়। এই গতি রুখতে উঠে দাঁড়ান আমীন আল হুসাইনী। তিনি ভূ-মালিকদের তাদের জমিগুলো ইসলামিক কাউন্সিলের কাছে বিক্রি করতে রাজি করান এবং ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে দান করার জন্য উৎসাহিত করেন। যেন ইহুদিরা জমিগুলো কিনতে না পারে। তিনি ফতোয়াও জারি করেন—ফিলিস্তিনের জমি যারা ইহুদিদের কাছে বিক্রি করবে, তারা ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে। তাদের জানাযার নামাজ পড়া হবে না, মুসলমানদের কবরে দাফন করা হবে না।

এই সময় আমীন আল হুসাইনী ইহুদিদের জমি ক্রয়ের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করার জন্য সম্মেলনের আয়োজন করেন। কুদস শহরের আশপাশের মেয়রদের বলেন, ‘ইহুদিদের কাছে অল্প কিংবা বেশি জমি বিক্রি করা, অথবা বিক্রির দালালি করা কিংবা কথায়, কাজে মধ্যস্থতা করা মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে খেয়ানত করা। শুধু বিক্রি নয়, বরং প্রতিবাদ না করে চুপ থাকা কিংবা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করাও খেয়ানত। বিষয়টা যেন মাথায় থাকে।’

আমীন আল হুসাইনী জানতেন ইহুদি ও ব্রিটিশদের তুলনায় অস্ত্রশস্ত্রে ফিলিস্তিনিরা নিতান্তই দুর্বল। তাই সবসময় সশস্ত্র সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতেন। বরং শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে চাইতেন। কিন্তু ১৯৩৫ সালে ইযযুদ্দিন কাসসামের শাহাদাত, ইহুদিদের আধিপত্য এবং কৃষকদের তাদের জমি ও ভূমি থেকে উচ্ছেদের পর, আমিন হুসাইনি সশস্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, এটা ছাড়া এখন আর কোন গতি নাই। ১৯৩৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে, যখন শেখ ফারহান সাদীর নেতৃত্বে শেখ কাসসামের বন্ধু ও সহকর্মীরা তুলকর্ম ও জেরুজালেমের রাস্তায় ইহুদিদের গাড়িতে হামলা করে, কার্যত তখনই সশস্ত্র সংগ্রামশুরু হয়ে গেছে। এই হামলায় দু’জন ইহুদি মারা যায়। এরপর কয়েকবার ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের মাঝে সংঘর্ষ হয়। ফিলিস্তিনি জনগণ শহরজুড়ে হারতাল ও অবরোধ পালন করে।

ইহুদিদের সহায়তায় মাঠে তখন তৎপর ব্রিটিশ বাহিনী। একপ্রকার তারা ইহুদিদের ঢাল হয়েই দাঁড়াত সবসময়। সংগ্রামের এই ডামাডোলে আমিন হুসাইনি সৌদি এবং সিরিয়ায় যান। ফিলিস্তিনি সংগ্রামীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য ইরাক ও পূর্ব জর্ডানের সাথে যোগাযোগ করেন। পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য তার সভাপতিত্বে গঠন করেন আরব কমিটি। ব্রিটিশরা দ্বিতীয়বারের মতো আমিন হুসাইনিকে প্রলোভন দেখিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। আমীন আল হুসাইনী স্মৃতিচারণকরে বলেন, ‘তার যখন আমাকে ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে ব্যর্থ হলো, তারা আমাকে হত্যার হুমকি দিলো। আমাকে পাঠানো তাদের শেষ চিঠিতে তারা লিখেছিলো, ”ইংরেজরা তাদের স্বার্থ ও সাম্রাজ্যের স্বার্থে সবকিছু করতে পারে। এমনকি নির্মমভাবে হত্যাও করতে পারে। তাই তেমাকে পরামর্শ দিচ্ছি, পরিবার পরিজন নিয়ে শান্তিতে বসবাস করো।’

আমিন হুসাইনি কুদসে জার্মানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করে জায়নিস্টদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। এদিকে ব্রিটিশদের দেশ বিভাগের ঘোষণা নতুন করে আগুনে ঘি ঢালে। ফিলিস্তিনি সংগ্রামীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ গভর্নর অ্যন্ড্রুজকে হত্যা করে। যে গভর্নর ফিলিস্তিনিদের থেকে জোর করে জমি নিয়ে ইহুদিদের দিয়ে দিত। গভর্নরের হত্যার পর আরব কমিটির বৈধতা নাকচ করে আইন জারি করে ব্রিটিশ সরকার এবং কমিটির সদস্যদের সিসিলিতে নির্বাসন দেয়। নির্বাসনের পাল্লায় না পড়ে আমি হুসাইনি পালিয়ে লেবাননে চলে যান। ১৯৩৯ সালে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।

হিটলার ও মুসোলিনির মুখোমুখি

লেবানন তখন ফ্রান্সের অধীনে। ফিলিস্তিনি সংগ্রামকে সমর্থন করতো লেখায়, বলায়, বক্তৃতায়। ১৯৩৯ সালে ব্রিটেন ফ্রান্সকে চাপ দিলো আমীন আল হুসাইনীকে তাদের কাছে হস্তান্তর করতে। বিষয়টি টের পেয়ে হুসাইনি বাগদাদে পালিয়ে যান। সেখানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রশিদ আলি কিলানির আন্দোলনকে সমর্থন দেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী জার্মানের সাথে আলোচনা চালু রাখেন। তার ভাবনা ছিলো—এই পরিস্থিতিতে জার্মানের সাথে জোট বাঁধা রাজনৈতিক চাহিদা। আর জার্মান ছিলো উসমানি খেলাফত, বিশেষ করে দ্বিতীয় আবদুল হামিদের মিত্র। এজন্য হুসাইনি ভাবছেন, জার্মান থেকে যদি আরবভূমির সম্পূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নেওয়া যায়! জার্মানও তার শত্রু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আরবের সাথে জোট বাঁধার সুযোগটি কাজে লাগায়। আমিন হুসাইনিকে এক চিঠিতে লিখে—’জার্মান আরব দেশগুলোর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং তার সমস্ত অধিকার স্বীকার করছে। আপনার জনগণের সব স্বপ্ন পূরণ করতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামরিক এবং বেসামরিক যত সহায়তা লাগে আমরা দিতে প্রস্তুত।’

এরপর আমীন আল হুসাইনী রোমে মুসোলিনির সঙ্গে দেখা করেন। আরব দেশগুলোর সম্পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার জন্য মুসোলিনিকে আহ্বান জানান। মুসোলিনি আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি বিবৃতি দেন—’ইতালি আরব দেশগুলোর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকার করছে। এই স্বাধীনতা অর্জন করতে যত সাহায্য প্রয়োজন, আমরা দিতে প্রস্তুত।’

এবার ইতালি থেকে আবার জার্মানে আসেন আমীন আল হুসাইনী। ১৯৪১ সালের ২৮ নভেম্বর এডলফ হিটলারের সাথে এক ঘণ্টা পয়তাল্লিশ মিনিট ব্যাপী এক বৈঠক করেন। বৈঠকে সরাসরি বিবৃতি দিতে আহবান জানান হুসাইনি। কিন্তু রাজনৈতিক এবং সামরিক কারণে সরাসরি বিবৃতি জানাতে অস্বীকার করেন হিটলার। কেননা এই বিবৃতি পেলে ফ্রান্স আরও চটে যাবে। তখন তিনি মাত্রই ককেশাস দখলের লক্ষ্যে বেরিয়েছেন। বৈঠকে আমীন আল হুসাইনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হিটলারকে—মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশদের পরাজয় এবং জার্মানের বিজয়ের পর আরব ইস্যুগুলোতে তারা কর্তৃত্বের সাথে কথা বলতে পারবে। এর এক বছর পর আমীন আল হুসাইনী হিটলার ও মুসোলিনি থেকে সরাসরি বিবৃতি আদায়ে সক্ষম হন। রাষ্ট্রীয় সেই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আরব দেশগুলের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ে যত সাহায্য প্রয়োজন, জার্মান দিতে প্রস্তুত।’

ফিলিস্তিন ভাগ

আমীন আল হুসাইনী যখন বুঝতে পারলেন এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান পরাজয়ের পথে, তিনি নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানে ফ্রান্সের হাতে বন্দী হন। ফ্রান্স আমীন আল হুসাইনীকে ব্রিটিশদের হাতে হস্তান্তর না করে নিজেদের কাছেই বন্দী করে রাখে। এখান থেকে পালিয়ে আমিন হুসাইনি এবার চলে যান কায়রোতে। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত কড়াইয়ের মতো, টগবগ করে ফুটছে। কায়রোতে ১৯৪৬ সালে আমীন আল হুসাইনী আবার আরব কমিটি গঠন করেন। আরব দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে শুরু করেন। যদিও তিনি ফিলিস্তিন যেতে পারছেন না, কিন্তু তার হৃদয়ে প্রদীপের মতো সর্বক্ষণ জ্বলছিলো ফিলিস্তিন।

এরপরের বছর জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে আরব এবং ইহুদিদের মাঝে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এসময় লেবাননে বৈঠক করে আরব লীগ কাউন্সিল। বৈঠকে তারা ফিলিস্তিনিদের অস্ত্র সরবরাহ করার পাশাপাশি সিরিয়া, লেবানন, ইরাক এবং মিসরের বাহিনীকে ফিলিস্তিন সীমান্তে বা কাছাকাছি অবস্থান করানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন থেকে বেরিয়ে যায় ১৫ মে, ১৯৪৮। তাদের অস্ত্রগুলো রেখে যায় ইহুদিদের কাছে। ব্রিটিশরা বেরিয়ে যাবার পর পাঁচটি আরব দেশের সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে। কিন্তু আমিন হুসাইনি বাহিনীর ভেতর দ্বিধা বিভক্ত হওয়ার লক্ষণ, পদমর্যাদার সুষম বন্টনের অভাব এবং নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য নেতার কমতি লক্ষ্য করেছিলেন। সবচে ভয়ঙ্কর ছিলো—দু’মাস পর সেনাবাহিনী যুদ্ধবিরতি দিয়েছিলো। এই বিরতিতে ইহুদিরা নতুন উদ্যমে অস্ত্র সজ্জিত হবার সুযোগ পায়। তখন ব্রিটিশ সামরিক কমান্ডার গ্লোব পাশার আাদেশে ইহুদিরা নতুন করে আক্রমণ করে ফিলিস্তিনের অধিকাংশ এলাকা দখল করে নেয়। নেমে আসে চরম বিপর্যয়। হাজার হাজার মানুষকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে ১৯৪৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সরকার নির্বাচনের জন্য ফিলিস্তিন জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। আরব কমিটির চেয়ারম্যান আমিন হুসাইনিকে নির্বাচন কাউন্সিলের প্রধান নির্বাচিত করা হয়। তিনি সর্ব-ফিলিস্তিন সরকার গঠন করেছিলেন। সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আহমদ হিলমি পাশাকে। এই সরকারের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য ছিলো—ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা বাস্তবায়ন। তবে সরকার আরব ও আন্তর্জাতিক উভয় পক্ষের-ই বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এমনকি মিসর হস্তক্ষেপ করে আমীন আল হুসাইনী এবং কমিটির অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করে কায়রোতে নিয়ে যায়।

মিসর থেকে ছাড়া পেয়ে আমীন আল হুসাইনী বিভিন্ন দেশ সফর করেন ফিলিস্তিনি জনগণের চাহিদা তাদেরকে জানানোর জন্য। কিন্তু কাজ হয় না। খানিকটা বিধ্বস্ত হুসাইনি লেবাননে পাড়ি জমান। দীর্ঘ ৬০ বছর ফিলিস্তিনের জন্য সংগ্রাম করে মৃত্যুবরণ করেন লেবাননেই। নিজ জন্মভূমিতে শেষ নিঃশ্বাসত্যাগ না করতে পারার আক্ষেপ নিয়ে ইতি হলো এক মুক্তিকামী জীবনের। যে জীবন মানুষের, নিজের নয় একটুও।