আল্লামা ইকবাল : যাঁর কবিতা ও দর্শনে জেগেছে মুসলিম বিশ্ব

কাজী মাহবুবুর রহমান :

(উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে আল্লামা ইকবাল গুরুত্বপূর্ণ নানা কারণে প্রাসঙ্গিক। এ ভূখণ্ডে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের স্বপ্ন সর্বপ্রথম তিনিই দেখেছিলেন। কবিতা ও দর্শনে যেমন তিনি অনন্য, রাজনীতিতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর কবিতা ও দর্শনে উপমহাদেশের মুসলমান তো বটেই, বিশ্ব মুসলিমও নানাভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে। সেই ধারা আজও চলমান। মহান এ মনীষীর জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর ভোরে চতুর্দিকে ফজরের আজান ধ্বনিত হবার মুহূর্তে তিনি পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলেছিলেন। জন্মবার্ষিকীতে তাঁর স্মরণে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের পাঠকদের জন্য লিখেছেন কাজী মাহবুবুর রহমান।)

১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে এক উত্তাল, অশান্ত সময়। শুক্রবার ফজরের আজানের পর বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট নগরীতে এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা ইকবাল। একতলা একটি জীর্ণ বাড়ির যে প্রকোষ্ঠে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তা এখনও পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য এটি একটি দর্শনীয় বাড়ি।

‘ইসলামের জন্য দীর্ঘজীবি হও’

ইকবালের পূর্ব-পুরুষগণ কাশ্মীর থেকে হিজরত করে শিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ নুর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন শিয়ালকোটের অন্যতম টুপি-ব্যবসায়ী এবং অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন সৎ মানুষ৷ আল্লামা ইকবালের পিতার হৃদয়ে পবিত্র ইসলামের প্রতি কতটা ভালবাসা ও আঁকুতি ছিল, তা দুইটি ঘটনার মধ্য দিয়ে জানা যায়। আল্লামা ইকবালের জন্মের পর প্রথম যখন তাঁকে পিতার কোলে দেয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তোমার এই জীবন ইসলামের কোনো উপকারে আসে তাহলে দীর্ঘজীবী হও, অন্যথায় এ জীবন মূল্যহীন।’ শিয়ালকোটের সেই জরাজীর্ণ ঘরের মেঝেয় পিতার কোলে বসে ইকবাল কি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের মূল্য? সেই মূল্যবোধই কি মুসলিম হোমল্যান্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা আল্লামা ইকবালকে তাড়া করে গেছে সারাজীবন?

শিক্ষা-দীক্ষা

মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ইকবাল মাওলানা গোলাম হাসান ও সৈয়দ মীর হাসানের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্কচ মিশন স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মীর হাসান মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে খুব আগ্রহী ছিলেন। পিতা শেখ নুর মুহাম্মদের অনুমতিক্রমে ইকবালকে তিনি স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করেছেন। ইকবালের সঙ্গে তাঁর বাবার ঐতিহাসিক দ্বিতীয় ঘটনাটি এখানে ঘটে। বাবা বললেন, ‘যদি স্কুল থেকে ফেরত এসে অবশিষ্ট জীবনে ইসলামের খেদমত করতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেব।’

ইকবাল কথা রেখেছিলেন। পিতার সঙ্গে কৃত ওয়াদা ইকবাল জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন।

প্রাথমিক স্তর থেকে এফএ পর্যন্ত দশ বছরকাল তিনি সৈয়দ মীর হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহণ করেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৈয়দ মীর হাসান অভিনব পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণ ইকবালের মনে ঐকান্তিক পিপাসা জাগিয়ে তোলেন। ১৮৮৮ সালে প্রাথমিক, ১৮৯১ সালে মিডল এবং ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি ও মেডেলসহ উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৫ সালে ইকবাল ঐ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন এবং একই বছর ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে লাহোর গমন করেন। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে ১৮৯৭ সালে স্নাতক ও ১৮৯৯ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। একই বছর তিনি লাহোরের ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শন শাস্ত্রে অধ্যাপনার চাকরি গ্রহণ করেন।

মহাপুরুষের জীবন

আল্লামা ইকবালের জীবন ছিল আপাদমস্তক কীর্তিমান এক মহাপুরুষের জীবন৷ জীবনের প্রতিটি লক্ষ্য ও দর্শনকে তিনি ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও তৎপরতার মাধ্যমে সফলতার মুখ দেখান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিশেষ করে মুসলমানদের দুঃখজনক চিত্র তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুসলমানদের উত্তরণ আর সম্ভব নয়। মুসলমানদের প্রতিটি সমস্যায় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে আমৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির কঠিন মাঠে বিচরণ করেন তিনি।

১৯২৬ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে বৃটিশ সরকার ভবিষ্যৎ ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পটভূমি তৈরির জন্য ‘সাইমন কমিশন’ প্রেরণ করলে কংগ্রেস দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবাল নওয়াব জুলফিকার আলি খান ও মাওলানা মোহাম্মদ আলির সাথে যৌথভাবে এক বিবৃতি প্রকাশ করে কমিশনকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলেন, যদি আমরা কমিশনকে সহায়তা না করি তবে বৃটিশরা মুসলমানদের স্বার্থকেই বিঘ্নিত করবে। আল্লামা ইকবালের এই ধারণা বৃটিশদের শাসন পরিচালনায় মুসলমানরা হারে হারে টের পেয়েছিল। বৃটিশরা সবসময় মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করার কারণে মুসলমানদেরকেই প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করছে। যা তাদের দীর্ঘ দিনের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

মুসলমান শাসনের অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরি মুসলমান ভাই-বোনদেরকে সহযোগিতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরিরা আঞ্জুমান নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মূলত কাশ্মীরি। তাঁর পূর্বপুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়েই কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন।

১৯৩০ সালের দিকে মুসলমানদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন অত্যধিক পরিমাণে বেড়ে যায়। ডোগরা মহারাজার ক্রমবর্ধমান জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে লাহোরে সর্বভারতীয় কাশ্মীর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে কাশ্মীর প্রশাসনের অন্যায় নির্যাতনের সমালোচনা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। আল্লামা ইকবাল এই প্রস্তাবের প্রতি একাত্মতা পোষণ করেন। এ সময় তিনি মুসলিম কনফারেন্সের সভাপতি ছিলেন। তিনি কাশ্মীরিদের সার্বিক সমস্যার কথা সরকারের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরেন। এর প্রেক্ষিতে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কাশ্মীরিদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়।

১৯৩২ সালে আলোয়ার রাজ্যের মহারাজা কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানগণ ‘খাদেমুল মুসলিমিন’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করালে মহারাজার সরকার এটিকে বেআইনি ঘোষণা করে। এ অন্যায় আদেশের প্রতিবাদে মুসলমানরা বিক্ষোভ করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে শহিদ হন প্রায় এক শত মুসলমান। এরপর শুরু হয় গণ-গ্রেফতার। বাড়ি-ঘরে ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানগণ। এই অন্যায় আচরণের প্রতিকার চেয়ে আল্লামা ইকবাল ভাইসরয় লর্ড ওয়েলিংটনের নিকট একটি স্মারক লিপি পেশ করেন। পরিণতিতে মুসলমানগণ ফেরারি জীবন ছেড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পায়।

১৯৩৬ সালে আল্লামা ইকবাল পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভাপতি নিযুক্ত হন। একই সালে পাঞ্জাব মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ঘোষণা করা হয় তাঁকে। ১৯৩৮ সালে লাহোরে মসজিদের দখল নিয়ে শিখ-মুসলমান দাঙ্গার সময় আল্লামা ইকবাল মসজিদ পুনরুদ্ধারে শাহাদাত প্রত্যাশী মুসলমান যুবকদের উৎসাহ যোগান। এক কথায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

এরপরও কেউ কেউ আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমালোচনা করেন। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে একজন মুসলমানের এরচেয়ে কতটুকু বেশি করার সুযোগ ছিল তা কিন্তু প্রশ্ন সাপেক্ষ। সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় মুসলমানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে আল্লামা ইকবালের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলিম লীগের অধিবেশনে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবিই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সূচনা করে। আজকের ক্ষমতাধর মুসলিম পাকিস্তান রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন আল্লামা ইকবাল।

স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারলেন না

একজন নেতা, লেখক কিংবা একজন দার্শনিকের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন হয়তো সেটাই, যেদিন তিনি দেখতে পান, তাঁর মস্তিষ্ক-নিসৃত একটি চিন্তা পৃথিবীর বুকে বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আল্লামা ইকবালের জীবনে সেই মহানন্দের দিনটি তাঁর জীবদ্দশায় আসেনি৷ যেদিন দক্ষিণ-এশিয়ায় তাঁর স্বপ্নের স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন বস্তবে রূপ নেয়, দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের পয়লা আগস্ট। ইকবাল সে দিনটি পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেননি।

১৯৩০ সালের ২৪ মার্চ লাহোরের মিন্টু পার্কে জনসমুদ্র এসে হাজির হয়েছিল ইকবালের ‘মুসলিম হোমল্যান্ড’ ধারণাকে স্বাগত জানাতে। এই ধারণা কবি ইকবাল দিয়েছিলেন ১৯৩০ সালের ৩০ ডিসেম্বর, এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে। তাঁর এই ধারণা এই সম্মেলনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার দুই বছর আগেই তিনি এই জাগতিক দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তাঁর জীবনে একটি স্মরণীয় দিন ছিল সেটি, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ বিদ্রোহ করেছিল বর্বর সামন্ত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। তিনি সেই দিনটিতে দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর আলাদা ‘মুসলিম হোমল্যান্ডের’ স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়িত হবে।

শিকড়-আকড়ে-থাকা মানুষ

একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞ আল্লামা ইকবাল ছিলেন প্রচণ্ড শিকড়-আকড়ে-থাকা মানুষ। যৌবনকাল কাটিয়েছেন ইউরোপের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে৷ কঠোর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের রস নিংড়ে এনেছেন৷ কিন্তু ইউরোপের জীবনধারায় গা ভাসাননি। ১৯২৩ সালে বৃটিশ সরকার ইকবালকে নাইট খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। তাঁর এই নাইটপ্রাপ্তিতে ভক্ত-অনুরাগীদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিরুদ্ধবাদী কবিরা ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা লিখে তাঁকে আক্রমণ করেন। এমনকি তাঁর বন্ধুরা চিঠি লিখে তাঁর মতামত জানতে চান এবং আশ্বস্ত হতে চান ঘটনা যেন কোনো ক্রমেই তাঁর স্বাধীন মতামত প্রকাশে কিংবা কওমের প্রতি খেদমতে বাধার সৃষ্টি না করে। আল্লামা ইকবাল বাকি জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে, তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলেননি। সকল বিবাদ-বিসংবাদের ঊর্ধ্বে গিয়ে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষগ্রহণ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের চিন্তা তাঁকে কখনো স্বার্থপর ও বিলাসী হয়ে উঠতে দেয়নি। তিনি সারাজীবন একজন দুঃখী মানুষ ও একটি অবরুদ্ধ পাখির বেদনায় কেঁদেছেন। হিন্দুস্তানের মাটির পক্ষে গেয়ে গেছেন নিষ্কলুষ প্রেমের গান। এজন্যই তিনি ইউরোপমুখী প্রফেসর ইকবাল না হয়ে হয়ে উঠেছেন আমাদের আল্লামা ইকবাল।

বিখ্যাত গ্রন্থ

১. ইলমুল ইকতিসাদ : অর্থনীতির উপর লেখা উর্দুভাষার প্রথম গ্রন্থ। তিনি এটি লাহোর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক থাকাকালে রচনা করেন।
২. তারিখ-ই-হিন্দ : বইটির মূল কপির সন্ধান পাওয়া যায় না এখন। এর একটি সংস্করণ অমৃতসর থেকে প্রকাশিত হয়।
৩. আসরার-ই-খুদি : আল্লামা ইকবালের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। এটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এ বই প্রকাশের পর সাড়া পড়ে যায় সর্বত্র। কিন্তু সুফি তরিকার অনুসারীরা এ পুস্তক প্রকাশকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে গ্রহণ করেননি। কেননা ইকবাল এ গ্রন্থে সুফি কবি হাফিজ শিরাজির তীব্র সমালোচনা করে ৩৫টি কবিতা লিখেছিলেন। উত্তেজনা এতই চরম আকার ধারণ করেছিল যে, ইকবালের চিন্তাধারার সমালোচনা করে খানবাহাদুর পীরজাদা মোজাফফর আহমদ ‘ফজলে রাজ-ই-বেখুদি’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতা প্রকাশ করেন। ইকবাল পরবর্তী সংস্করণে উল্লেখিত ৩৫টি কবিতা বাদ দিয়ে দেন। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ আর এ নিকলসন ১৯২০ সালে এর ইংরেজি তর্জমা প্রকাশ করেন।
৪. রমুজে বেখুদি : আসরার-ই-খুদিরই ক্রম সম্প্রসারিত এই সংকলনটি ১৯১৮ সালে রমুজে বেখুদি নামে প্রকাশিত হয়। আর্থার জন আর্বারি এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।
৫. পায়াম-ই-মাশারিক : এ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। এ সময় ইকবাল কবি হিসেবে অর্জন করেছেন সর্বজন স্বীকৃতি। তাঁর কবিতা এগিয়ে চলেছে পূর্ণ-পরিণতির দিকে। তিনি এ কাব্যে পাশ্চাত্য দর্শনের পাশাপাশি প্রাচ্যের কোরআনি চিন্তার ফসলকেও তুলে এনেছেন। এ কাব্যাটি গ্যেটের চিন্তাধারার অনুসরণে রচনা করেন। এতে মোট ৮০টি কবিতা সংকলিত হয়েছে।
৬. বাঙ্গ-ই-দারা : ইকবালের কবিজীবনের শুরু উর্দু কবিতার হাত ধরে। আর এই কাব্যটি উর্দু কবিতা সংকলন। উর্দুতেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ দেশাত্মবোধক এবং জনচিত্তে আগুন ধরানো কবিতাগুলো। ১৯২৪ সালে তিনি বাঙ্গ-ই-দারা নামে এসব উর্দু কবিতার সংকলনটি প্রকাশ করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলো দেশাত্মবোধক, প্রকৃতি প্রীতি ও ইসলামি অনুভূতি–এ তিনটি অংশে বিভক্ত।
৭. জবুর-ই-আজম : ইকবালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফার্সি কবিতা সংকলন জবুর-ই-আজম। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়। এর দুইটি অংশের প্রথম অংশে কবিতা ও গীত এবং দ্বিতীয় অংশের নাম গুলশান-ই-রাজ-ই-জাদিদ।

ইন্তেকাল

ব্যক্তিগত জীবনে আল্লামা ইকবাল ছেলে ড. জাবেদ ইকবাল ও মেয়ে মুনীরার জনক। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টা ১৪ মিনিটে চতুর্দিকে ফজরের আজান ধ্বনিত হবার মুহূর্তে ৬০ বছরের কিছু বয়েস নিয়ে এই মহান মুসলিম মনীষী ইন্তেকাল করেন।