আল মাহমুদের কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্যের বয়ান

রাকিবুল হাসান:

আল মাহমুদের কবরের এপিটাফে লেখা আছে বিশ্বাসের সৌরভমাখা একটি কবিতা। কবিতার প্রতিটি লাইন থেকে ঝরে পড়ছে যেন নিবেদন, সমর্পণ, উদযাপন। মাশুকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আশেকের মনে যেমন উদ্বেলিত আনন্দের উচ্ছ্বাস থাকে, সেই উচ্ছ্বাসটুকু দেখতে পাই তার এপিটাফে খোদাই করা কবিতায়। কবিতাটি এখন আমাদের দোলায়। বিশ্বাসের অনুভবে আন্দোলিত করে।
‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে/মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’

সবাই মৃত্যুকে জয় করার কথা বলে। জীবনের খেলাঘরে থেকে যাওয়া এলোমেলো খেলনাগুলোর জন্য আক্ষেপ করে। আল মাহমুদ আক্ষেপ করেননি, বরং ঈদের আনন্দে মৃত্যুকে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। অন্য কবিদের সঙ্গে আল মাহমুদের এইখানেই ফারাক। এজন্যই আল মাহমুদ বলেছিলেন, আমি যখন দাঁড়াই সবাইকে ছাড়িয়ে যাই। এই সাহসের বলেই তিনি এখন বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি। সোনালি কাবিনে যিনি কিনে নিয়েছেলেন আমাদের ভালোবাসা। আমাদের হৃদয়ে সুন্দরের রাজত্ব করার অধিকার।

নারী ও প্রেমের জন্য মূলত আমি আল মাহমুদকে পড়তে শুরু করেছিলাম। মুগ্ধ হচ্ছিলাম তাঁর কাব্যকুশলতায়। পড়ার বিস্তৃতি যখন বাড়ল, তাঁর বিশ্বাসের কবিতাগুলোর খোঁজ পেলাম। একটু একটু করে পড়তে শুরু করলাম।

তিনটি পর্বে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে কবির বিশ্বাসের বয়ান। বিশ্বাসের আলোয় অতীত থেকে বর্তমান, তারপর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েছেন স্বপ্নালু চোখে।

কবির প্রথম পর্বের কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্য চর্চার সূচনা ঘটে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর। এই কাব্যগ্রন্থের দুটি কবিতা ’অন্ধকারে একদিন’ এবং ‘নূহের প্রার্থনা’য় শিল্পিতস্বরে তুলে ধরেছেন ইসলামি ঐতিহ্যের প্রসিদ্ধ দুটি ঘটনা। অন্ধকারে একদিনে বলেছেন আদম-হাওয়ার জান্নাতে বসবাস এবং শয়তানের প্ররোচিত করার গল্প। ‘মায়াবী কথার ফাঁকে বোঝালো সে: প্রভুর শহরে আমি নাকি যেতে পারি! অপরূপ নিষিদ্ধ বিতান পার হয়ে চোখের পলকে অলৌকিক ফলবতী বৃক্ষের নিচে।’ (অন্ধকারে একদিন : লোক লোকান্তর)

নূহের প্রার্থনা কবিতায় বর্ণনা করেছেন নুহ আ.-এর সময় সংঘটিত মহাপ্লাবনের কাহিনি। চারদিকে থৈ থৈ জল। দিকচিহ্নহীন জলে নৌকায় ভেসে চলছে কয়েকজন। তাদের মুখে প্রার্থনা আর পাপে লিপ্ত না হবার মিনতি। ‘আকাঙ্ক্ষার মতো সিক্ত মোহময় মাটিতে কি আমি রাখবো প্রথমই পা? অথবা যে প্রশংসার বাণী আমরা ধারণ করি হৃদয়ের কোমল কৌটোয় তার কোনো কলি উচ্চারিত হবে এই অধমের নত মুখ থেকে? আদমের কালোত্তীর্ণ সেই পাপ যেন হে প্রভু আবার কভু ছদ্মবেশী সাপের মতন গোপন পিচ্ছিল পথে বেরিয়ে না আসে। (নূহের প্রার্থনা, লোক লোকান্তর)

লোক লোকান্তরের পরবর্তী দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিন’-এ উল্লেখ করার মতো ইসলামি ঐতিহ্যের বয়ান করেননি। বাঙালি ও লোক-ঐতিহ্যের সফল ব্যবহার করেছেন।

কবির দ্বিতীয় পর্বের কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্যের রূপায়ন করেছেন হাতখুলে। এই পর্বেই ইসলামি ঐতিহ্য থেকে এগিয়ে গেছেন নিজস্ব বিশ্বাস, সুনির্মল অনুভবের রাখডাকহীন বর্ণনার দিকে। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থে কবি স্পষ্টভাবে কোরআনের আদর্শ গ্রহণের আজান উচ্চকিত করেন। ‘আমি জনমানবহীন বিরান নগরীর পরিত্যক্ত পাথরে আল্লার আদেশ পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে সেই মহাগ্রন্থের কাছে নেমে এলাম। যখন দু’হাত বাড়িয়ে তা বুকের কাছে তুলে আনতে যাবো, খোলা পৃষ্ঠায় একটি আয়াতের ওপর নজর পড়লো :
“এই ভাবে বহু শহর আমি ধ্বংস করেছি যেহেতু তা ছিল অন্যায়কারী,
ফলে তা ধ্বংসস্তূপ হয়ে রয়েছে-আর পরিত্যক্ত কূপ, আর উঁচু চূড়ার প্রাসাদ।”
বহু চেষ্টায়, বহু হোঁচট ও হুমড়ি খেতে খেতে আমি আমার পুরোনো আবাসস্থলে পৌঁছলাম। আমার ঘরভাঙা ইটের ঢিবির মতো উঁচু হয়ে আছে। আমি আমার সন্তানদের নাম ধরে বিলাপ করলাম।’ (‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)

এই কাব্যগ্রন্থে হেদায়াতের হাওয়ায় দুলে উঠেছিল ঈমানের মায়াবী পর্দা। মায়াবী পর্দা দোলাতে দোলাতে ইসলামি ঐতিহ্যের আলাপটাও সেরে নিয়েছেন। মুসা আ. সিনাই পর্বতে গিয়েছিলেন তাওরাত আনতে। এই ফাঁকে তাঁর উম্মতেরা লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল বাছুর পূজায়। ‘ধাতুর ওলান’ কবিতায় এর বর্ণনা দিয়েছেন: ‘মানুষ আবার দেখো সোনার গাভীর কাছে যায়; পেছনে পর্বতশীর্ষে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মতো সুন্দর আওয়াজে পবিত্র অক্ষরগুলো ঝরে যায়, আয় ফিরে আয়! আর সে আহ্বান শোনো বিবেক ফাটিয়ে দিয়ে বাজে।’ (‘ধাতুর ওলান থেকে’, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)

অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না কাব্যগ্রন্থের ‘ইহুদিরা’ ও প্রহরান্তের পাশফেরা কাব্যগ্রন্থের ’ইউসুফ’ কবিতায় ঐতিহ্যের রূপায়ন করেছেন।

অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না কাব্যগ্রন্থের ’হযরত মুহম্মদ’ কবিতায় কবি জীবন ও জগৎ বিনির্মাণে হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শের অবদানের কথা ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে কবি তাঁর মহিমা, জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব, মহাকালিক ব্যাপ্তি, কৃতিত্ব ও বিচ্ছুরিত আলোর জয়গান গেয়েছেন সংহত কাব্যভাষায়। ‘লাত্-মানাতের বুকে বিদ্ধ হয় দারুণ শায়ক যেসব পাষাণ ছিল গঞ্জনার গৌরবে পাথর এঁকে একে ধসে পড়ে ছলনার নকল নায়ক পাথর চৌচির করে ভেসে আসে ঈমানের স্বর। লাঞ্ছিতের আসমানে তিনি যেন সোনালি ঈগল/ ডানার আওয়াজে তাঁর কেঁপে ওঠে বন্দীর দুয়ার;/ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জাহেলের সামান্য শিকল/ আদিগন্ত ভেদ করে চলে সেই আলোর জোয়ার।’ (‘হযরত মোহাম্মদ’, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

কবির মরমী মনোভাবের উন্মেষ হয় দ্বিতীয় পর্বের কবিতায়। স্রষ্টার কথা বলেন। মনের আরজি নিবেদন করেন। মিথ্যাবাদী রাখাল কাব্যগ্রন্থের ‘আলো নিরাকার’ কবিতায় বলেন, ‘নিয়মের সুতোগুলো ধরে আছে তোমারই আঙুল ঘূর্ণাবর্তে তুমি নেই, ঘুরে যায় নক্ষত্র নীলিমাবিলুপ্তির নেশা যেন আমাদেরই অস্তিত্বে আকুল আরম্ভ অদৃশ্য যার কেন খুঁজি তারই পরিসীমা? কালের বিচারে তুমি মহাকাল, অনন্ত সময় আমি এক কবি মাত্র, গুণ গাই, আমার কী ভয়।’

দোয়েল ও দয়িতা কাব্যগ্রন্থের ‘হে আমার আরম্ভ ও শেষ’ কবিতায় বলেন, হে আমার আরম্ভ ও শেষ। অনন্তের কিনারা আমার এবার আমাকে নাও। অপ্রস্তুত আত্মা আমি। কিন্তু জানি তুমি ছাড়া আমার দোদুল্যমান শরীরের নৌকাখানি অন্যঘাটে জমায়নি পাড়ি। পারানির কড়ি নেই। কিন্তু ছিল তোমাকে ভরসা। পাপী আমি। কিন্তু জানি বহুদূরে আছে এক ক্ষমার তোরণ। ভ্রান্ত আমি। কিন্তু জানি আছে এক দয়ার্দ্র হাসির দীপ্তি অনন্তে, অসীমে। হে আমার আরম্ভ ও শেষ !’

কবির মরমী মনোভাবের পূর্ণতা পায় তার তৃতীয় পর্বের কবিতায়। স্রষ্টাকে পাওয়ার আকুলতা। স্রষ্টার দরবারে নিজেকে সমর্পণের ব্যাকুলতা কবিকে তাড়িত করে। দ্বিতীয় ভাঙন কাব্যগ্রন্থের ’ভরহীন’ কবিতায় বলেন, ‘স্তব্ধতার মত শুধু বলে ওঠা, তোমাকে পেলাম। তোমার নামে প্রেমদরিয়ার ঢেউয়েরা লাফায়নুনের গুঞ্জন ওঠে আটলান্টিকে, কি অশান্ত জলনামের মহিমা গায় মেঘপুঞ্জ। পাখির কুলায়নামের জিকির ওঠে। দশদিকে তোমার গজল। অন্তিম পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি। আর নেই ভর এখন আমাকে ধর মেলে দিয়ে নূরের চাদর।’

দ্বিতীয় ভাঙন কাব্যগ্রন্থের ‘প্রার্থনার ভাষা’কবিতায় বলেন, ‘প্রার্থনার ভাষা দাও প্রভু, নির্জ্ঞান আত্মসমর্পণের সহজতা। আমি কি পাড়ি দিয়ে যাচ্ছি না হাঙরসংকুল সমুদ্রের চেয়ে দুরূহ যে আয়ু? সেই দিন এবং রাত্রি? উদয় আর অস্ত। আঁধার এবং আলো। পৌঁছুতে চাই প্রভু তোমার সান্নিধ্যে তোমার সিংহাসনের নিচে একটি ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে। যার পাখায় আঁকা অনাদিকালের অনন্ত রহস্য।’

একজন কবি কখনো তাঁর ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করতে পারেন না। ঐতিহ্যের নিবিড় পাঠের মধ্য দিয়েই আবিষ্কার করেন বর্তমানের শক্তি ও সম্ভাবনা। আগামীর স্বপ্ন ও উদ্দীপনা। আল মাহমুদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাসে লেগে আছে ইসলামি ঐতিহ্যের ছোঁয়া। তাই তিনি তাঁর ঐতিহ্যের কথা বলেছেন। সাহসের সমাচারে দেখিয়েছেন নিজের দৌড়। উড়াল কাব্যের ডানায় চড়ে মায়াবী পর্দা দোলাতে দোলাতে রচনা করে গেছেন ইতিহাস।

প্রভুর সান্নিধ্যে ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে উড়ে গেছেন বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ আল মাহমুদ। তাঁর পাখায় আঁকা অনাদিকালের অনন্ত রহস্য। এই রহস্যের উদঘাটন করতে করতেই আমাদের একজীবন কেটে যাবে।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদসোনালী কাবিনের কবির ৮৪তম জন্মদিন আজ
পরবর্তি সংবাদলকডাউনে সরকারি অফিসের কাজ ভার্চুয়ালি করার নির্দেশ