ইজরাইল প্রতিষ্ঠাতার ছেলের রাজসাক্ষ্য : ‘ইহুদীবাদী প্রকল্পে আমি লজ্জিত’

রাকিবুল হাসান :

পশমের টুপি পরে দেয়ালে টাঙানো একটা ফটোগ্রাফের দিকে তাকিয়ে আছেন ৯২ বছর বয়সী ইজরাইলি লেখক ও গবেষক ইয়াকভ শারেট। ফটোগ্রাফটা তাঁর বাবা মোশে শারেটের; উদ্ধত শার্টের কলারে শোভা পাচ্ছে টাই। তিনি ইজরাইলের প্রতিষ্ঠাতা পিতা। ১৯৫৪-৫৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন ইজরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর দায়িত্ব পালন করেছেন ইজরাইলের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও। বাবার এই ছবির দিকে তাকিয়ে ইয়াকভ শারেট বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন, ‘আমি তার পুত্র। এতে আমার কোনো হাত নেই। প্রকৃতির নিয়মেই আমি তার ছেলে হয়েছি। তাই বলে তার পাপের ভার আমি নিতে পারব না।’

পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ব্রিটিশ মিডল ইস্ট আইয়ের সাংবাদিক সারাহ ড্রিম। দক্ষিণ ইজরাইলের নাকাব অঞ্চলের আবু ইয়াহইয়া নামের আরব্য গ্রামটির গল্প শুনতে এসেছেন তিনি। গ্রামটি আরবদের থাকলেও ইহুদীরা ১৯৪৮ সালে তাদের তাড়িয়ে দখল করে নেয়। দখল কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন আজকের এই ইয়াকভ শারেট। গল্পটা তারচেয়ে ভালো কেউ বলতে পারবে না। তিনি এখন সেই অনৈতিক দখলদারিত্বের জন্য অনুতাপে পুড়ছেন প্রতিনিয়ত। গল্পে গল্পে, স্মৃতির জগত হাতড়ে তিনি যতটুকু মনে আছে বলে গেছেন অকপটে।

ফিলিস্তিনে যেভাবে আগমন

ফিলিস্তিনে পা রাখা প্রথম জায়নবাদীদের একজন ইয়াকভের দাদা জ্যাকব শারেট। তিনি পরিবারসহ ইউক্রেনে বসবাস করতেন। ১৮৮২ সালে রাশিয়ান গণহত্যার পর তিনি ইউক্রেন ছেড়ে ফিলিস্তিন চলে আসেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ইহুদীদের নিজস্ব একটি ভূমির। পৃথিবীর তাবৎ দলছুট ইহুদীরা যদি এক এক করে এখানে এসে জড়ো হয়, তাহলে আলাদা ভূমির দাবি তোলা যেতে পারে। যদিও তখন ফিলিস্তিনে আরব ছিল ৯৭% এবং ইহুদী ছিল মাত্র ২%। কিন্তু জ্যাকব আবার রাশিয়া ফিরে আসেন। আরব মুসলিমদের নির্যাতনের কারণে নয়, বরং তাদের নিজেরা সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে।

এরপর ১৯০২ সালে রাশিয়ায় আরেকটি গণহত্যা সংঘটিত হলে পরিবারসহ ফিলিস্তিনে চলে আসেন ইয়াকভের বাবা মোশে শারেট। ফিলিস্তিনি মুসলিমরা তাদের স্বাগত জানায়। কারণ তখনও তারা ইহুদীদের শত্রু মনে করেনি। তারা সেখানে প্রাচীন আরবদের মতোই থাকতে শুরু করে। বাচ্চারা যেত আরবদের কিন্ডারগার্টেনে। মোশে আরবি শিখতেন, মেষ চড়াতেন।

মোশে ইস্তাম্বুলের অটোমান আইন অধ্যয়নসহ তার সমস্ত দক্ষতা ব্যয় করেন ইহুদীবাদী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ইজরাইল ভূখণ্ডটি ব্রিটিশরা তাদের অধীনে নিয়ে নেয় এবং নাম রাখে ‘মেন্ডেটরি প্যালেস্টাইন’। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ইহুদীবাদীদেরকে লেখা এক পত্রে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয় এবং বিপুলসংখ্যক ইহুদী ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে। এসময় শুরু হয় জমি দখল করে ইহুদী বসতি স্থাপনের কার্যক্রম। ইজরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আবহ ছড়িয়ে পড়লে ফিলিস্তিনি বিপ্লব শুরু হয়। ব্রিটিশদের সহায়তায় তাদের বিপ্লব চূর্ণ করে দেয় ইহুদীরা।

ইজরাইলের জন্ম

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইহুদীরা ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়। ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দেয়া এই ইহুদীরাই পরবর্তীতে ইজরাইলের মূল সামরিক বাহিনী গঠন করে। ১৯৪৪ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, ইয়াকভ শারেটও ব্রিটিশ বাহিনীর ভলান্টিয়ার হিসেবে যোগ দেন। তখন তিনি ১৭ বছরের তরুণ।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব পাশ করে ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীবাদীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইজরাইল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ড্যাভিড বেন গুরিয়ন ইজরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বেন গুরিয়নের পর ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী হন ইয়াকভের বাবা মোশে শারেট।

নাকাবের ঘটনা

১৯৪৮ সালের আগেই ব্রিটিশ প্রশাসনিক জেলা বেরশাভা (বিরে সাবআ) এবং গাজার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল নাকাব অঞ্চল। যা ফিলিস্তিনের প্রায় অর্ধেক ভূমি জুড়ে ছিল। মৃত সাগর এবং আকাবা উপসাগরের কল্যাণে এই অঞ্চলে ছিল পানির লোভনীয় ব্যবস্থা। নাকাব অঞ্চলে আড়াই লাখ আরব বাস করত। ইহুদীরা তক্কে ছিল অঞ্চলটি দখল করে নিতে। দখলের উদ্দেশ্যেই তারা সেখানে সেনা পাঠায়। স্থাপন করে ১১টি নিরাপত্তা চৌকি। এর একটি নিরাপত্তা চৌকির দায়িত্বে ছিলেন ইয়াকভ শারেট।

কিন্তু ব্রিটিশ রেজুলেশনে নাকাব অঞ্চলটি দেয়া হয় আরবদেরকেই। ফলে ব্রিটিশদের অগোচরেই চলতে থাকে কার্যক্রম। ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরাইল যুদ্ধে নাকাব দখল করে নেয় ইজরাইল। এসময় এ অঞ্চলে ইহুদীদের হাতে নিহত হয় প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনি। জীবিতদের করা হয়েছিল বহিষ্কার। ফিলিস্তিনিদের ঘরে ঘরে ঢুকে ইহুদী সেনারা চালায় লুটপাটের মহাযজ্ঞ। সেই যজ্ঞের অংশীদার ছিলেন ইয়াকভ শারেট।

শুধু নাকাব নয়, পুরো ফিলিস্তিন থেকেই আরবদের তাড়াতে চায় ইহুদীরা। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি ইহুদীদের একটি গোপন নথি প্রকাশ করে আল জাজিরা। তাতে দেখা যায়, ১৯৪৮ সালে নাকাবা দখলের সময় থেকেই পুরো ফিলিস্তিন থেকে আরবদের বাস্তুচ্যুত করা ইহুদীদের লক্ষ্য।

ইয়াকভ শারেটের অবস্থান

১৯৪৮ সালে আরব-ইজরাইল যুদ্ধ এবং ইজরাইল প্রতিষ্ঠার পর ইয়াকভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ান ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। এরপর রাশিয়ার মস্কোতে ইজরাইলি দূতাবাসে কূটনীতিক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু রাশিয়া তাকে ‘জায়নিজমের প্রচারক’ এবং ‘সিআইএ’র গুপ্তচর আখ্যা দিয়ে বহিষ্কার করে দেয়। রাশিয়া থেকে বহিষ্কারের পর ইজরাইল ফিরে সাংবাদিকতা শুরু করেন। অবসর গ্রহণের পর গড়ে তোলেন মোশে শারেট হেরিটেজ সোসাইটি। এখান থেকে প্রকাশ করেন তার বাবার ডায়েরি, রাজনৈতিক ডকুমেন্টস। তার বাবার ডায়েরিগুলো পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ডায়েরিগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ইয়াকভ শারেট এখন জায়নবাদী নন। তার পিতার কাজগুলোকে তিনি অবৈধ বলেই আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘জায়নবাদীদের লক্ষ্য ছিল তাদের একটা ভূমি হওয়া। কিন্তু তারা সে লক্ষ্য ছাপিয়ে এখন দখলদারিত্ব শুরু করেছে। নিজ ভূমিতেই সন্তুষ্ট থাকেনি, বরং বাইরেও হাত বাড়িয়েছে।

আমি যখন দেশে ফিরে নাকাবায় যাই, লজ্জায় মাথা নুয়ে আসে। বিশেষত যখন পুরোনো পারিবারিক গ্রাম আইন সিনিয়াতে যাই। আরবরা কত স্নেহে আমাদের গ্রহণ করেছিল। আর আমরা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছি। এরপরও ১৯৬৭ সালের আরব-ইজরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের প্রায় অংশ দখল করে নেয় ইহুদীরা। দেশে ফিরে এসব দেখে লজ্জিত বোধ করতে থাকি এই ভেবে যে, ইজরাইলি সেনাবাহিনীতে আমি কোনোদিন ছিলাম। আগে তো আমি ছোট ছিলাম, বাবার ওপর কথা বলতে পারতাম না। কিন্তু এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রাষ্ট্রীয় আর কিছুতে আমি থাকব না।’

শেষ তিনটি প্রশ্ন

সারাহ ড্রিম ইয়াকভকে প্রশ্ন করেছিলেন, তেলআবিবে কেমন আছেন এখন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ভালো নেই, পালাতে পারলেই বাঁচি। পরিবার সঙ্গ দিলে অন্য কোথাও চলে যেতাম। নাকাবায় যে লজ্জাজনক কাজ করেছি, ওখানে যেতে পারি না। তেলআবিব মনে হয় না নিজের, নেতানিয়াহুর সময়ে আমরা মারাত্মক খারাপ অবস্থায় আছি। অস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। ইজরাইল এখন পাপ করছে, পাপ।’

সারাহ ড্রিম জিজ্ঞেস করলেন, ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন আপনি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘তাদের নিয়ে খুব খারাপ লাগছে আমার। আমার স্পষ্ট বক্তব্য—ইজরাইল তাদের সঙ্গে নাৎসি জার্মানির মতো আচরণ করছে। এটা জাতিগত বিদ্বেষ। এই বক্তব্যের কারণে আমাকে ইহুদীবিরোধী বলা হবে, হোক। ইহুদীদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র কায়েম করে শত্রুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু দেখুন—তারা আজ রাষ্ট্রের বাইরে অপরাধ করতে করতে সবচে গুরুতর অভিশাপ বহন করে চলছে।’

সারাহ ড্রিম জিজ্ঞেস করলেন, ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য আপনার ভবিষ্যদ্বাণী কী? তিনি বলেছিলেন, ‘বিরাট বিপর্যয়ে পড়বে ইহুদিরা। ইজরাইল একটি পরাজিত রাজ্যে পরিণত হবে।’

সূত্র : মিডলইস্ট মনিটর, আল জাজিরা