এতেকাফ : মসজিদের আদব ও মর্যাদা

জুবাইর আহমাদ আশরাফ:

এতেকাফকারী যেহেতু দীর্ঘ সময়ব্যাপী লাগাতার আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান করবেন, এ জন্য এখানে মসজিদের মর্যাদা ও আদব নিয়ে আলোচনা করাও সঙ্গত মনে হয়।

মসজিদ আল্লাহর ঘর। আল্লাহ তাআলা মহান মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে মসজিদও বিশাল মর্যাদার অধিকারী হয়ে গেল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান মসজিদ। এ জন্যই রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

اَحَبُّ الْبِلَادِ اِلَى اللهِ مَسَاجِدُهَا.

‘মসজিদই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জায়গা।’ (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস ৬৯৬)

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জায়গাই বলেননি, বরং বলেছেন, ‘মসজিদ হল জান্নাতের বাগান।’ (সুনানুত তিরমিযী, হাদীস ৩৫০৯)

মসজিদ যেহেতু জান্নাতের অংশ, তাই মসজিদে এবাদত করলে যেমনিভাবে সওয়াব বেশি হবে, তদ্রুপ মসজিদে গোনাহ করলেও গোনাহের বোঝা ভারি হবে। অন্যের সঙ্গে ঝগড়া করা, কাউকে গালি দেওয়া অপরাধ। এ অপরাধ মসজিদে করলে আরও বড় গোনাহ হবে। এতেকাফকারীকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, কারো সঙ্গে তার যেন ঝগড়া, কথা কাটাকাটি ও তর্কবিতর্ক না হয়। মসজিদে চিৎকার, চেঁচামেচি ও জোরে জোরে কথা
বলা যাবে না। রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, কেয়ামতের অন্যতম এক আলামত হল,
মসজিদে জোরে জোরে কথা বলা।

وَظَهَرَتِ الْاَصْوَاتُ فِى الْمَسَاجِدِ. (সুনানুত তিরমিযী, হাদীস ২২১১)

মসজিদে এমনভাবে যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করা যাবে না, যার দ্বারা অন্যের এবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে এতেকাফ করছিলেন। তিনি তাঁর তাঁবু থেকে শুনতে পেলেন, কোন কোন লোক জোরে জোরে তিলাওয়াত করছে। তিনি পর্দা সরিয়ে বললেন,

اَلَا كُلكُم يُنَاجِىْ رَبَّهٗ، فَلَا يُؤْذِيَنَّ بَعْضُكُمْ بَعْضًا وَلَا يَرْفَعَنَّ
بَعْضُكُمْ عَلٰى بَعْضٍ فِى الْقِرَاءَةِ فِى الصَّلَاةِ.

‘তোমাদের প্রত্যেকেই আল্লাহর সঙ্গে সঙ্গোপনে কথা বল, অতএব একজন অপরজনকে কষ্ট দিও না, একজন অপরজনের উপরে উচ্চরবে নামাযেও তিলাওয়াত করো না।’(আল মুসতাদরাক, হাদীস ১১৬৯)

এতেকাফকারীর কোন মালসামান, টাকাপয়সা হারিয়ে গেলে মসজিদে হৈচৈ করবে না। হারানোর ঘোষণাও দিবে না। বরং ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিঊন পড়ে নীরবে সে বস্তু পাওয়ার জন্য বা উত্তম বিনিময় পাওয়ার জন্য আল­াহর কাছে দুআ করবে। রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

مَنْ سَمِعَ رَجُلًا يَنْشُدُ ضَالَّةً فِى الْمَسْجِدِ فَلْيَقُلْ لَا اَدَّاهَا اللهُ اِلَيْكَ، فَإِنَّ
الْمَسْجِدَ لَمْ تُبْنَ لِهٰذَا.

‘যে কাউকে এ কথা বলতে শোনে যে, সে মসজিদে উচ্চরবে কোন হারানো বস্তু খোঁজ করছে, তবে সে যেন তাকে বলে যে, আল্লাহ তোমাকে যেন এ বস্তু ফিরিয়ে না দেন। কারণ মসজিদ এ জন্য নির্মিত হয়নি।’ (সুনানে আবু দাঊদ, হাদীস ৪৭৩)

মালসামান উপস্থিত করে মসজিদে ক্রয়বিক্রয় করা যাবে না। রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদকরেছেন, যদি কাউকে দেখ, মসজিদে মাল-আসবাব উপস্থিত করে লেনদেন করছে, তবে বলবে,
لَا اَرْبَحَ اللهُ تِجَارَتَكَ.

‘আল্লাহ তাআলা তোমার লেনদেনে যেন বরকত না দেন।’ (সুনানুত তিরমিযী, হাদীস ১৩২১)

মসজিদে অবস্থান করে শুধু এবাদত বন্দেগীর কথা বলা যাবে। পবিত্র রমযানে আল্লাহর ঘরে এতেকাফে বসে কোন মানুষের গীবত শেকায়েত করা যাবে না। গীবত ও পরচর্চা করার দ্বারা অনেক বড় গোনাহ হয়। যার গীবত করা হয় তিনি মাফ না দিলে মাফ পাওয়া যায় না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, একবার দুই ব্যক্তি মসজিদে জোহর বা আসরের সালাত আদায় করলেন। তারা উভয়ে রোযাদারও ছিলেন। রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায শেষ করেতাদের উভয়কে বললেন, তোমরা পুনরায় ওযু করে তোমাদের সালাত পুনরায় আদায় কর। আজকের রোযা পূর্ণ কর। পরবর্তীতে একদিন রোযার ক্বাযা করে নিবে। তারা বললেন, কী কারণে হে আল্লাহর রাসূল? উত্তরে তিনি এরশাদ করেন, যেহেতু তোমরা অমুকের গীবত করেছ। (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস ৪৮৭৩)

রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও এরশাদ করেছেন, গীবতের কাফফারা হল, নিজের জন্য এবং যার গীবত করা হয়েছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলবে,

اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لَنَا وَلَهٗ.

‘হে আল্লাহ! আমাকে ও তাকে ক্ষমা করে দিন।’ (ইমাম বায়হাকী, আদদা‘ওয়াতুল কাবীর, হাদীস ৫৭৫)

গীবত শেকায়েত ছাড়াও অর্থহীন কথা বা দুনিয়াবী কথা মসজিদে বলা যাবে না। দুনিয়াবী কথা বলার জন্য সারা দুনিয়া উন্মুক্ত।
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

يَأْتى عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يَكُوْنُ حَدِيْثُهُمْ فِى مَسَاجِدِهِمْ فِىْ اَمْرِ دُنيَاهُمْ فَلَا
تُجَالِسُوْهُمْ، فَلَيْسَ لِلّٰهِ فِيْهِمْ حَاجَةٌ.

‘এমন এক সময় আসবে, লোকেরা তাদের দুনিয়াবী বিষয়ের গল্প মসজিদে করবে। তোমরা তাদের সঙ্গে বসো না। তাদের এবাদতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই অর্থাৎ তাদের এবাদত কবুল হবে না।’ (শুআবুল ঈমান, হাদীস ২৭১২)

আল্লাহর ঘর মসজিদ সর্বদা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে মসজিদ ঝাড়– দিতেন। ইয়াকুব
ইবনে যায়েদ রহ. বলেন, রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং খেজুরের ডালা দিয়ে মসজিদ ঝাড়– দিতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৪০৪১)

মুত্তালিব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হানতাব রহ. বলেন,

اِنَّ عُمَرَ بنَ الْخَطَّابِ اَتٰى مَسْجِدَ قُبَاءٍ عَلٰى فَرَسٍ لَهٗ فَصَلّٰى فِيْهِ. ثُمَّ
قَالَ:
يَا يَرْفَأُ اٰتِنِى بِجَرِيْدَةٍ. قَالَ: فَأتاهُ بِجَرِيْدَةٍ، فَاحْتُجِزَ عُمَرُ  بِثَوْبِه، ثُمَّ
كَنَسَهٗ.

‘হযরত ওমর ফারূক রা. একবার ঘোড়ায় চড়ে মসজিদে কোবায় তাশরীফ আনেন। এখানে তিনি সালাত আদায় করেন। এরপর খাদেম য়ারফাকে বলেন, আমাকে একটি খেজুরের ডালা দাও। তিনি তা দিলেন। হযরত ওমর রা. কোমরে কাপড় বেঁধে কোবা মসজিদ ঝাড়– দেন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৪০৩৮)

হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

عُرِضَتْ عَلَىَّ اُجُوْرُ اُمَّتِىْ حَتّٰى الْقَذَاةُ يُخْرِجُهَا الرَّجُلُ مِنَ الْمَسْجِدِ.

‘আমার উম্মতের সব নেক আমলের সওয়াব আমার সামনে পেশ করা হয়েছে। এমনকি, কেউ কোন খড়কুটা মসজিদ থেকে বাইরে ফেলেছে, তাও পেশ করা হয়েছে।’ (সুনানে আবু দাঊদ, হাদীস ৪৬১)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, একজন মহিলা নিয়মিত মসজিদে ময়লা আবর্জনা কুড়াতেন। এক রাতে তাঁর ইনতেকাল হয়। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর জানাযা পড়িয়ে তাঁকে দাফন করেন। রাতের বেলায় রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আসা যাওয়ায় কষ্ট হবে মনে করে তাঁরা তাঁকে জানাননি। সকাল বেলায় রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

اِذَا مَاتَ لَكُمْ مَيِّتٌ فَاٰذِنُوْنِىْ اِنِّىْ رَأَيْتُهَا فِى الْجَنَّةِ لِمَا كَانَتْ تَلْقُطُ الَقَذٰى
مِنَ الْمَسْجِدِ.

‘যে কেউ মারা গেলে তোমরা আমাকে সংবাদ দিবে। এ মহিলাকে আমি জান্নাতে দেখেছি। যেহেতু সে মসজিদে ময়লা আবর্জনা কুড়াতো।’ (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ১৯৫৭)

মসজিদে থুথু ইত্যাদি ফেলা যাবে না। রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

اَلْبُزَاقُ فِى الْمَسْجِدِ خَطِيْئَةٌ.

‘মসজিদে থুথু ফেলা গুনাহ’। (সুনানুত তিরমিযী, হাদীস ৫৭৮)

মসজিদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি মসজিদ খুশবুযুক্ত করাও মুস্তাহাব। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা সিদ্দীকা রা. বলেন,

اَمَرَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِبِنَاءِ الْمَسَاجِدِ فِى الدُّوْرِ، وَاَن تُنَظَّفَ وَتُطَيَّبَ.

‘রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ বানাতে হুকুম দিয়েছেন। তিনি আরও হুকুম দিয়েছেন মসজিদ যেন পরিচ্ছন্ন রাখা হয় ও খুশবুযুক্ত করা হয়।’ (সুনানে আবু দাঊদ, হাদীস ৪৫৫)

আমাদের দেশে মসজিদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়, তবে খুশবুযুক্ত করা হয় না। আরবের মুসলিমগণ আজও মসজিদ পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সুঘ্রাণযুক্তও রাখেন। আমাদের দেশেও এর উপর আমল হওয়া চাই। (মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী, তুহফাতুল আলমাঈ, কিতাবুস
সালাত, ২: ৪৮৫)

যে সব জিনিস দুর্গন্ধ ছড়ায় তা মসজিদে খাওয়া, ব্যবহার করা ও রাখা নিষেধ। হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন, রাসূল ‍সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

مَنْ اَكَلَ مِنْ هٰذِهِ الشَّجَرَةِ الْمُنْتِنَةِ فَلَا يَقْرُبَنَّ مَسْجِدَنَا، فَاِنَّ
الْمَلَآئِكَةَ تَتَأْذّٰى مِمَّا يَتَأْذّٰى مِنْهُ الْأنسُ.

‘যে ব্যক্তি কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন খাবে, সে যেন মসজিদে না আসে। কারণ যে জিনিস দ্বারা মানুষের কষ্ট হয়, তার দ্বারা ফেরেশতাদেরও কষ্ট হয়।’ (মুসলিম শরীফ, হাদীস ৫৬৪)

বিজ্ঞাপন