কওমি মাদরাসায় বাংলা ভাষা চর্চার হালহকিকত

মুসান্না মেহবুব :

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে বাংলা ভাষা চর্চা ও প্রয়োগে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। উর্দু-ফারসি থেকে বেরিয়ে এসে অনেক মাদরাসাই এখন শিক্ষার ভাষাকে আরবি-বাংলা করে নিয়েছে। পাশাপাশি মাদরাসা-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলা ভাষায় লেখালেখি ও সাহিত্য চর্চাও বেড়েছে ব্যাপক মাত্রায়।

বিগত এবং চলতি দশকে কওমি মাদরাসা থেকে পড়াশোনা সম্পন্নকারী তরুণ আলেমদের অনেকেই এখন লেখালেখির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ লেখক পরিচয়েই পরিচিত হয়ে উঠেছেন ধর্মীয় অঙ্গনে।

মাদরাসায় পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে লেখালেখি ও সাহিত্য সাধনায় মনোনিবেশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। রাজধানীসহ দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদরাসায় ছাত্র সংসদের তত্ত্বাবধানে সাহিত্য চর্চার সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা। এসব মাদরাসা থেকে আরবির পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও নিয়মিত দেয়ালিকা প্রকাশ করেন সাহিত্যমনা শিক্ষার্থীরা। নিজেদের লেখা দিয়ে বের করেন মানসম্মত লিটলম্যাগও।

সিলেটের জামিয়া গহরপুরের ছাত্রসংগঠন আন-নূর ছাত্রকাফেলা বছরে বেশ কয়েকটা দেয়ালিকা প্রকাশ করে। মাদরাসাটির বর্তমান শিক্ষক ও আন-নূরের সাবেক জিএস মুফতী মুহাম্মদ রাইহান বলেন, গহরপুর মাদরাসায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। সাহিত্য বিভাগ নামে ছাত্রকাফেলার সুচারু একটি বিভাগও রয়েছে। রয়েছে বাংলা বইয়ের সমৃদ্ধ পাঠাগার। ছাত্ররা এখানে বাংলা সাহিত্য পাঠ ও চর্চার অবারিত সুযোগ পান।

মুহাম্মদ রাইহান বলেন, আন-নূর থেকে বছরে বেশ কয়েকটা দেয়ালিকা বের হয়। মাহফিল উপলক্ষে বের হয় মানসম্মত লিটলম্যাগও। লেখা থেকে নিয়ে সম্পাদনা, প্রকাশনা, ছাপা—সবকিছুই মাদরাসার ছাত্ররা করে থাকেন।

গহরপুরের মতো সিলেটের আরও একাধিক মাদরাসায় দেয়ালিকা ও সাহিত্য ম্যাগাজিন বের করেন ছাত্ররা। রাজধানীর জামিয়া রাহমানিয়া, জামিয়া আরজাবাদ, খাদিমুল উলুম মাদরাসা, মালিবাগ মাদরাসাসহ বিভিন্ন মাদরাসায় বাংলা দেয়ালিকা বের হয় নিয়মিত। ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও এসব দেয়ালিকায় প্রকাশিত হচ্ছে গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া ও কবিতা। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই চাঁদা তুলে এসব দেয়ালিকা প্রকাশ করছেন।

অনেক মাদরাসায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লেখালেখি ও সাহিত্য চর্চার সুযোগ নেই। কিন্তু এসব মাদরাসার অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিউদ্যোগেই সাহিত্য করছেন অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে। অনেক শিক্ষার্থীর বইও বেরোচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা সম্পন্ন করার আগেই। ইসলামি ঘরানার প্রকাশকরা পেশাদরিত্বের সঙ্গে ছাপছেনও নবীন এসব লেখকের বই। রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদরাসার শিক্ষার্থী আহমাদ সাব্বির। ইতিমধ্যে বাজারে তাঁর একটি মৌলিক বই এসেছে। আরও একাধিক বই প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।

আহমাদ সাব্বির ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, মাদরাসা পরিসরে বাংলা চর্চা ব্যাপৃতি লাভ করলেও বড় বড় মাদরাসাগুলোতে এখনও নিজ উদ্যোগে ছাত্রদেরকে এ চর্চাটা করতে হয়। এবং ক্ষেত্র বিশেষে সাহিত্যচর্চাকারী ছাত্রদের সঙ্গে বিরূপ আচরণও করা হয়। বড় এবং পুরনো মাদরাসাগুলোর অনেকটিতেই প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সহযোগিতা পান না সাহিত্যপিয়াসী ছাত্ররা।

তবে সহযোগিতা না পাবার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন সাব্বির। তিনি বলেন, সাহিত্য করতে গিয়ে অনেক ছাত্র অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেন, ক্লাসের পড়া ঠিকমতো চালাতে চান না। ফলে উসতাদরা কঠোরতা অবলম্বনে বাধ্য হন। যার কারণে এই কঠোরতার আওতায় নিয়মতান্ত্রিক সাহিত্যচর্চাকারী ছাত্ররাও পড়ে যান।

সাব্বির মনে করেন, সাহিত্য করতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় উদাসীনতা প্রদর্শন নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকারক। তাই সাহিত্য চর্চা করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাকে শতভাগ অক্ষুণ্ণ রেখে। এতে উসতাদরাও যেমন সন্তুষ্ট থাকবেন, তেম্নি লেখালেখির ক্ষেত্রেও কোনো বাধাগ্রস্ততার শিকার হতে হবে না।