কেমন চলছে ‘সরকারি’ দারুল আরকাম মাদরাসা?

কেমন চলছে ‘সরকারি’ দারুল আরকাম মাদরাসা?

মুসান্না মেহবুব :

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের আওতায় ‘দারুল আরকাম’ নামে দেশের প্রতিটা উপজেলায় দুটো করে মোট ১ হাজার দশটি বিশেষায়িত মাদরাসার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বিগত ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। প্রথম শিক্ষাবর্ষ ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে শিশু শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ছিল এর কার্যক্রম। চলতি শিক্ষাবর্ষে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে। কিন্তু সুচারুরূপে পাঠদানের জন্য মাদরাসাগুলোতে এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণের শিক্ষক নেই। নেই পরিকল্পনা মাফিক সিলেবাস ও শিক্ষাকার্যক্রম। অনেকটা হযবরল অবস্থায়ই চলছে নতুন ধারার এই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

নেই পর্যাপ্ত পরিমাণের শিক্ষক

বর্তমানে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৬টি ক্লাস রয়েছে এসব মাদরাসায়। ৬ ক্লাসে মোটামুটি ভালো পরিমাণের শিক্ষার্থীও রয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে সুচারুভাবে পাঠদান হচ্ছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই। বলছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর দারুল আরকাম মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা মামুন আবদুল্লাহ।

মাওলানা মামুন ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে জানান, সরকারের তরফ থেকে মাত্র তিনজন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দারুল আরকাম মাদরাসাগুলোতে। তিন শিক্ষকের মাধ্যমে ছয়টি ক্লাস পরিচালনা করা অনেকটা দুরুহ ব্যাপার। ফলে পাঠদানে বেশ ঘাটতি পোহাতে হচ্ছে তাঁদেরকে। কোনো কোনো মাদরাসায় স্থানীয় পরিচালনা কমিটি উদ্যোগী হয়ে নিজেদের অর্থায়নে বাড়তি দুই-একজন শিক্ষক রাখছেন, কিন্তু এতেও ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না।

নেই পরিকল্পিত সিলেবাসের বাস্তবায়ন

শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্বতন্ত্র সিলেবাস রয়েছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। সরকারিভাবে নানা নিরীক্ষা ও গবেষণার পর এই সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের সূত্র মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদির পাশাপাশি কুরআন তেলাওয়াত, হাদিস, আরবি ভাষা ও সাহিত্য এবং ফিকহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দারুল আরকামের সিলেবাসে। প্রতিটি বিষয়ের ওপর স্বতন্ত্র পাঠ্যবইও প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংকট এবং পরিচালনার অভাবে ছাত্রদেরকে এসব বিষয়ে পরিকল্পনা মাফিক পাঠদান করা হচ্ছে না।

প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো শিক্ষাপ্রধান

১ হাজার ১০টির মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রধানের দায়িত্বে কেউ নেই। তিন শিক্ষকের সকলেই সাধারণ শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করছেন। ফলে মাদরাসাগুলোতে দৈনন্দিন পরিচালনা, শিক্ষাদানে তদারকিসহ সার্বক্ষণিক দেখভালের যথেষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়।

৫ম শ্রেণির পরীক্ষার্থীরা সমাপণী পরীক্ষা দেবে কোথায়?

গত শিক্ষাবর্ষে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত থাকলেও এ বছর ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস চালু করা হয়েছে। ৫ম শ্রেণিতে সমাপণী পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দেয়, আর আলিয়া ধারার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে। কিন্তু দারুল আরকাম স্বতন্ত্র শিক্ষাধারা হিসেবে প্রবর্তিত হলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো স্বতন্ত্র শিক্ষাবোর্ড গঠিত হয়নি। ফলে, এ বছরের শিক্ষার্থীদের মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে যেকোনো আলিয়া মাদরাসা থেকে রেজিস্ট্রেশন করে ইবতেদায়ি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে।

শমসের নগর দারুল আরকামের শিক্ষক ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, দারুল আরকামের যে সিলেবাস এবং পাঠ্যবই, তা অনেকটা আরব বিশ্বের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর আদলে। ফলে বিষয়বস্তু চমৎকার হলেও শিক্ষার্থীদের আত্মস্থ করতে বেশ বেগ পেতে হয়।

নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক দারুল আরকামের আরেকজন শিক্ষক বলেন, স্বতন্ত্রধারার এই মাদরাসাগুলো যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। মাদরাসাগুলোর জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ আসছে। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নানা স্তরে দুর্নীতি থাকবার কারণে বরাদ্দ যথাস্থানে যথাযথভাবে পৌঁছুচ্ছে না, একই সঙ্গে মাদরাসাগুলোর সুচারু পরিচালনায়ও কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট অবহেলা আছে। ফলে প্রতিষ্ঠার দু বছর পরও এখনও এর শিক্ষাকাঠামো গোছালো হয়ে ওঠেনি।