চামড়ার দামের নিম্নগতি : বিকল্প যেসব পন্থা নিয়ে ভাবতে পারে মাদরাসাগুলো

বিশেষ প্রতিবেদক

কোরবানির পশুর চামড়ার দাম প্রতিনিয়ত কমছে। গত সাত বছরে ক্রমান্বয়ে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সাত বছর আগে ৯০ টাকা বর্গফুট দরে বিক্রি হওয়া গরুর চামড়া এবার বিক্রি হবে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়। সরকারই এই দর নির্ধারণ করে দিয়েছে। চামড়ার ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বিক্রি ও চাহিদা উভয়ই কমেছে। এর ফলে চামড়ার দামও কমে গেছে।

চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের কওমি মাদরাসাগুলো। কারণ জনগণের অনুদানে পরিচালিত এসব মাদরাসাগুলোর বাৎসরিক আয়ের একটা বড় অংশ কোরবানির পশুর চামড়ার সঙ্গে জড়িত। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন ইসলামি রাজনীতিবিদরা চামড়ার দাম কমিয়ে দেয়াকে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই দেখছেন। তাঁরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে একটি মহল থেকে মাদরাসাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্য বিক্রি ও তার মূল্য কমে যাওয়ার কারণে দেশে চামড়ার দাম কমে গেছে এমন দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি ইউসুফ সুলতান। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কিছুটা কমলেও আমাদের দেশে আনুপাতিক হারে অনেক বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত ট্যানারি মালিক সমিতি ও সরকার সমঝোতার ভিত্তিতে এ ধরণের দাম নির্ধারণ করেছে।’

ইউসুফ সুলতান বলেন, ‘ইসলাম এ ধরণের দাম নির্ধারণ করে দেওয়াকে পছন্দ করে না। ইসলাম মনে করে, স্বাভাবিক যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতেই পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হবে। এতে করে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে লাভবান হয়। যদিও খেলাফতে উসমানিয়ার শাসনামলে দেখা গেছে, কিছু কিছু বিষয়ে রাষ্ট্রই দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। বর্তমান সরকারও দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে। তবে যদি একান্ত প্রয়োজন বলে মনে হয়, তবেই এটা করতে পারবে। তা না হলে স্বাভাবিক যোগান ও চাহিদার ওপরেই দামকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। শুধু চামড়া নয়, সর্বক্ষেত্রে সরকারের যোগান ও চাহিদার ওপর মূল্যকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। যাতে করে সেখানে কোনো ধরণের সিন্ডিকেট তৈরি না হয়।’

ক্রমাগত চামড়ার মূল্য কমে যাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মাদরাসাগুলো। এ সঙ্কট কীভাবে মোকাবেলা করা উচিত এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মাদরাসাগুলো সাধারণত জনগণের অনুদানের ওপর নির্ভর করে চলে। চামড়া বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থে মাদরাসাগুলো তাদের বাৎসরিক ব্যয়ের একটা বড় অংশের যোগান দিচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট একটি আয়ের উৎস নিয়ে বসে না থেকে মাদরাসাগুলো অন্যান্য প্রকারের সদকা প্রদানে মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে। নতুন আয়ের উৎস নিয়ে তাদেরকে ভাবতে হবে। তাহলে মাদরাসার অর্থায়ন নিয়ে এমন খেলার সুযোগটা কেউ পাবে না।

তিনি বিকল্প আয়ের উৎসের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে একসময় শুধু তেলই আয়ের বৃহৎ উৎস ছিল। কিন্তু যখন কৃত্রিমভাবে তেলের দাম কমানো হলো, তখন সেখানে তারা বিকল্প অন্যান্য আয়ের উৎসের দিকে গিয়েছে। মাদরাসাগুলোকেও এমন বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বের অনেক মুসিলম দেশে বিকল্প আয়ের উৎস দিয়ে মাদরাসা পরিচালিত হয়ে আসছে। সেখানে সরকারি ও অন্যান্য ফান্ডও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মাদরাসাগুলো যাকাত ও সদাকার বাইরে ‘ওয়াকফ’কেও প্রমোট করতে পারে বা ওয়াকফের কথা মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারে। সে ক্ষেত্রে ‘কেশ ওয়াকফ’ বা নগদ ওয়াকফ বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে। কেশ ওয়াকফের মূল কথা হচ্ছে, জমি বা স্থায়ী সম্পত্তি ওয়াকফ না করে নগদ অর্থ ওয়াকফ করা। সে নগদ অর্থকে আবার অন্য কোথাও বিনিয়োগ হিসেবে দেওয়া। যেমন, কেউ ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা মাদরাসার নামে ওয়াকফ করে দিলো। তারপর সে অর্থ ব্যবসায় বা ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ খাতে রেখে এর লাভ্যাংশ মাদরাসায় দিয়ে দেওয়া হল।

‘ওয়াকফ-এর আরও কয়েকটি উদাহরণ আমরা বর্তমান বিশ্বে দেখতে পাই। যেমন কোনো রেস্টুরেন্টের একটি চেয়ার বা টেবিল মাদরাসার নামে ওয়াকফ করে দেওয়া যেতে পারে। এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ মাদরাসায় দিয়ে দেওয়া হবে। অথবা বিমানের কোনো সীট বা বাসের সীট মাদরাসার নামে ওয়াকফ করা থাকবে। অথবা ব্যবসার লাভ্যাংশের নির্দিষ্ট একটি অংশ ওয়াকফ করা যেতে পারে। এ ধরণের বিভিন্ন ওয়াকফ পদ্ধতি বিশ্বে জনপ্রিয় হচ্ছে। শুধু যাকাত বা ফেতরার টাকায় নির্ভরশীল না হয়ে মানুষকে এ ধরণের ওয়াকফ পদ্ধতিতে উৎসাহ করা যেতে পারে। আমরা এর মাধ্যমে মানুষকে আরও বেশী সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে উৎসাহিত করে তুলতে পারি। মানুষ যেন বিলাস বহুল জীবনে আকৃষ্ট না হয়ে সমাজমুখী কাজে আগ্রহী হয়ে উঠে। এর জন্য ওয়াকফ পদ্ধতি বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারে।’