জাতীয় বাজেট ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ

আশরাফ উদ্দিন খান

গত ১৩ জুন দেশের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অংকের বাজেট, যার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন : বাজেট : ধর্মীয় সমাজে নেই গঠনমূলক আলোচনা

বাজেট যেহেতু একটি দেশের সরকারের অর্থ বছরের যাবতীয় আয়-ব্যায়ের দলিল হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে এবং এর মাধ্যমে সরকারের ব্যয় ও সেই অনুপাতে রাজস্ব আদায় নির্ধারিত হয়, তাই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয় প্রতি বছরই। সরকারের তরফ থেকে এর পক্ষে যুক্তি ও প্রশংসা পেশ করা হয় আর বিরোধীদলের পক্ষ থেকে এর অসারতা ও দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়। বাজেটের ব্যাপারে আমাদের দেশের সাধারণ সাংস্কৃতি অনেকটা এমনই। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তি করে এর বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাও করা হয়ে থাকে।

অনেকের বিশ্লেষণে এটা উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বাজেটের সামান্য কিছু উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়ের মধ্যে হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিরাট অংকের বরাদ্দ এবং তরুণদের ব্যবসার জন্যে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ। এর বাইরে অন্যান্য খাত প্রায় অভিন্ন হিসাবেই আছে। জাতীয় দৈনিকসমূহে বিভিন্ন মতামত ও বিশ্লেষণ পেশ করা হচ্ছে। কোনো বিশ্লেষণের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘নতুন গন্তব্য, তবে পথ পুরাতন’ অথবা ‘প্রস্তাবিত বাজেট পুরাতন উদ্বেগ দূর করতে পারবে কি না?’ ইত্যাদি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর বাজেট পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক খাতগুলো ভারসাম্যহীন যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে প্রকট করে তুলবে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ঘোষিত বাজেটে সর্বজনের কথা বলা হলেও বাস্তবে গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থ হাসিল হবে। বাজেটে জনগণের মৌলিক সমস্যা সমাধানের পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, অসমতা, বেকারত্ব, সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক খাতগুলো অবহেলিত রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা ও জনগণের সেবা পাওয়ার দুষ্প্রাপ্যতা সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এই বাজেটে লক্ষণীয় নয়, বরং অর্থনীতি ক্রমাগত একটি ঋণ চক্রজালে জড়িয়ে পড়ছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর মন্তব্য হচ্ছে : শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাত সবচেয়ে অবহেলিত। এই খাতে অবকাঠামো খরচ বাড়লেও গুণগত মান পড়ছে। বিদেশ থেকে জনশক্তি আনতে হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারত প্রায় এক হাজার কোটি ডলার অভিবাসী আয় হিসেবে পেয়েছে। ব্যক্তি প্রতি স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার খরচ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশে ব্যক্তিপ্রতি স্বাস্থ্য খাতে খরচ মোট খরচের ৬৭ শতাংশ। ভারত (৬২ শতাংশ), পাকিস্তান (৫৬ শতাংশ), নেপাল (৪৭ শতাংশ) ও ভুটান (১৮ শতাংশ)। খরচ বেড়েছে, মান বাড়েনি। (নয়া দিগন্ত, ১৫ জুন, ২০১৯)

শিক্ষা খাতে বাজেটে উল্লেখিত ব্যয়ের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা (পরিচালনা ও উন্নয়ন) খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৪০৪১ কোটি, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে ২৯৬২৪ কোটি, কারিগরি মাদরাসা শিক্ষা খাতে ৭৪৫৩ কোটি, সর্বমোট ৬১,১১৮ কোটি টাকা। প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সামনে রেখে বাংলাদেশের যে অবস্থান সামনে আসে সেটা রীতিমত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

‘শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কম বরাদ্দ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বে অন্যতম বাংলাদেশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের যে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। যা জিডিপির মাত্র ২.১ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে এ খাতে বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তানও জনগুরুত্বপূর্ণ খাতটিতে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়। এবারের বাজেটেও তার থেকে বিশেষ উত্তরণ দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর হিসাব বলছে, শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ তার জিডিপির যে অংশ ব্যয় করছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকারি এই সংস্থাটির ২০১৬-১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী ভারত ৩.০৮ শতাংশ, পাকিস্তান ২.৭৬ শতাংশ, আফগানিস্তান ৩.৯৩ শতাংশ, মালদ্বীপ ৪.২৫ শতাংশ, নেপাল ৫.১০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ২.৮১ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়েছিল। (ইসলাম টাইমস, ১৫ জুন, ২০১৯)

অন্যদিকে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য ছিল এই : এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে চাহিদামতো বরাদ্দ মিলেছে। এই নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, শুধু শিক্ষার মানোন্নয়নই নয়, এবারের বাজেটে শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকেও লক্ষ রাখা হয়েছে। দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অতীতের চেয়ে বার্ষিক বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে আনুপাতিক হারে। যে কারণে এর মানোন্নয়নে আশানুরূপভাবে কাজ করা যাবে। (প্রথম আলো, ১৪ জুন ২০১৯)

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যংকিং নিয়ে অনেকে অনেকভাবে আলোচনা করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থার পিছিয়ে থাকার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসাবে অনেকেই উল্লেখ করেছেন যে এখানে সৃজনশীল ও গবেষণামূলক শিক্ষার প্রবণতা ও পৃষ্ঠপোষকতা নেই, তেমনি নেই উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ ও অনুদান। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে এই ধারণাই আরও বেশি পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে।

ব্যক্তি হিসাবে, সমাজ হিসাবে ও জাতি হিসাবে উন্নত হওয়ার জন্যে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মাঝে উন্নয়নের চেতনার সৃষ্টি হয়, পরিবর্তনের ধারা সৃষ্টি হয়, নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করে…। তাই উন্নত জাতি শিক্ষাকে অন্য অনেক বিষয় থেকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের আগ্রহ ও যত্নের ধরণ থেকেই সেই জাতির উন্নতির ধারণা লাভ করা যায়। যেখানে উন্নত জাতির জন্যে শিক্ষা একটি অপরিহার্য বিষয়, সেখানে কোনো কোনো জাতির নিকট–বিশেষত শিক্ষার ব্যাপারে তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়–শিক্ষা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে আসে না, ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকে উৎপাদনশীল খাত মনে করা হয় না। যার ফলে দেশে কোনো ধরনের দুর্যোগ দেখা দিলে এই শিক্ষা খাতের বরাদ্দ থেকে অন্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন সমাজের সাধারণ চিত্র, যে কোনো পিতার আর্থিক অবস্থা অস্বচ্ছল থাকলে তিনি তাঁর সন্তানদেরকে শিক্ষা থেকে ফিরিয়ে এনে কাজে লাগিয়ে দেন এই ধারনায় যে এর মাধ্যমে তাঁর আর্থিক দিকটা কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা যেতে পারে।

অনেক গবেষণায় এটা দেখানো হয়েছে যে, শিক্ষা খাতে যেই পরিমাণ অর্থ খরচ করা হয় তার উপকার অন্যান্য খাত, যেমন কৃষি বা শিল্প খাত, থেকে অর্জিত উপকারের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণা বলছে, কর্মজীবীদেরকে এক বছরের শিক্ষার মাধ্যমে তাদের কর্মযোগ্যতা বৃদ্ধি করা গেলে তাদের কর্মক্ষমতা প্রায় ৯% গুণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ৯০% আমেরিকান কৃষিকাজে জড়িত ছিল, ১৯৬৩ সালে এসে এই হার আসে ১০%, কিন্তু এরপরেও কৃষি ক্ষেত্রে আমেরিকার অর্জন কমে যায়নি বরং পুর্বের চেয়ে আরো বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, এর পেছনে কারণ হচ্ছে এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার (বর্তমানে এই খাতে নিয়োজিত আছে ৩% লোক)। আরেক গবেষণায় দেখা যায় যে, শিক্ষা খাতে ব্যয়ের অর্থ ১০ বছরের মধ্যে ফিরে আসে, পক্ষান্তরে জমি সংস্কারের খাতে ব্যয় করা অর্থ ফেরত আসতে ১৮ থেকে ২০ বছরের সময় লাগে।

শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্যে দরকার যুগোপযোগী, সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা। আর সনাতন শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকতার চাহিদার আলোকে ঢেলে সাজানোর জন্যে দরকার উপযুক্ত গবেষণা ও দক্ষ জনবল। আর এই জন্যে দরকার শিক্ষা ও গবেষণা খাতে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ। তাই দরকার শিক্ষা-বান্ধব বাজেট।