তিতুমীরের শাহাদাত বার্ষিকী আজ, বাংলার মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে কতটা জানেন?

তিতুমীরের শাহাদাত বার্ষিকী আজ, বাংলার মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে কতটা জানেন?

ফাতেহ ডেস্ক :

ব্রিটিশ বেনিয়ার অত্যাচার থেকে এ দেশের অসহায় মানুষের মুক্তির জন্য এক আপসহীন সংগ্রামীর নাম শহীদ তিতুমীর। সাহসী তিতুমীর ইসলামের ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার সাধন এবং শিরক-বিদয়াত থেকে মুসলমানদের মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। তিতুমীরের এ লড়াই পাক-ভারত মুসলিম ইতিহাসের এক অনন্য বীরত্বগাঁথা এবং এক গৌরবময় অধ্যায়।

জন্ম ও শিক্ষা

সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশপরগণা জেলার বারাসাতের অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে ১৭৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মীর হাসান আলী আর মা আবেদা রোকাইয়া খাতুন। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান।

বাল্যকালে তিনি পড়ালেখা করেন সে সময়ের শ্রেষ্ঠ কয়েকজন পন্ডিতের কাছে। আরবী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে তিনি পান্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে কোরআনের হাফেজ হন। পড়ালেখা শেষ করে তিনি মক্কা গমন করেন। সেখানে তাঁর সাথে দেখা হয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংস্কারক সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভির সাথে। তিনি ১৮২১ সালে সাইয়্যেদ বেরলভির সাথে মক্কা, মদীনা, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মিশর, আফগানিস্তান সফর করেন এবং সমকালীন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাত ও মতবিনিময়ের সুযোগ পান। এই ভ্রমণেই তিনি মুসলিম বিশ্বের সমকালীন সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

কর্মতৎপরতা

১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে যান। তিনি সেখানে স্বাধীনতার অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সেখান থেকে এসে (১৮২৭) তিতুমীর তাঁর গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে ‘তাহ্বান্দ’ নামে এক ধরনের বস্ত্র পরিধান শুরু করেন। তিতুমীর হিন্দু জমিদার কর্তৃক মুসলমানদের উপর বৈষম্যমূলকভাবে আরোপিত ‘দাঁড়ির খাজনা’ এবং মসজিদের করের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিতুমীর ও তাঁর অনুসারীদের সাথে স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হতে থাকে। আগেই তিতুমীর পালোয়ান হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ধর্মীয় অনুশাসন সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এই দুটি ছিল তাঁর মৌলিক কর্মসূচী। তাঁর আহবান ছিল বিরান হয়ে যাওয়া মসজিদ সংস্কার করে নামাজের ব্যবস্থা করা, পূজার চাঁদা দান কিংবা তাতে অংশ নেয়া থেকে মুসলমানদের বিরত রাখা, শিরক-বিদায়াত হতে দূরে থাকা, মুসলমানদের মুসলিম নাম রাখা, মুসলমানদের ধুতি ছেড়ে লুঙ্গি বা পাজামা পরা, পীরপূজা ও কবরপূজা না করা ইত্যাদি। তিতুমীরের ধর্মীয় দাওয়াতের মূলকথা ছিল, জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসুলের (স.) নির্দেশ পরিপালন সম্পর্কিত। এটি ছিল মূলত ভারতবর্ষের মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন পুণর্গঠনের এক বৈপ্লবিক কর্মসূচী।

তিতুমীরের আহবান ছিল অত্যাচারী জমিদারী প্রথার বিরুদ্ধেও। তাঁর একটি শ্লোগান ছিল, লাঙ্গল যার, জমি তার। তাঁর বক্তব্য ছিল, যার শ্রমের ফসল তাকেই ভোগ করতে দিতে হবে। এই অভাবনীয় আহবানের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলার কৃষকদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে নির্যাতিত দরিদ্র কৃষকদের সমন্বয়ে একটি দল।

তিনিই ১৮২৫ সালে সর্বপ্রথম হিন্দু জমিদার ও ইংরেজ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৮৩১ সালে তিতুমীর নারিকেল বাড়িয়ায় নিজের পরিকল্পনায় তৈরি করেন আশ্চর্য বাঁশের কেল্লা। সেখানে ছিল বৃহৎ বিস্তীর্ণ এক আম্রকানন। পলাশীর সে আম্রকাননের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বলা যায় পলাশীর আম্রকাননের যুদ্ধক্ষেত্রের মতোই হৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের আরেক সংগ্রামের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ তিতুমীরের এই দুর্ভেদ্য বাঁশের কেল্লা।

তিতুমীরের আন্দোলন ছিল নিয়মতান্ত্রিক। ব্যাপক নির্যাতিত জনগণের পক্ষ থেকে তিনি স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিকারের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনের কাছে তথ্য প্রমাণসহ লিখিত আবেদন জানান। এতে হিন্দু জমিদাররা তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে কৃষ্ণদেব রায় (পুর্ণিয়া), কালী প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, রামনারায়ণ (তারাগুনিয়া), গৌরী প্রসাদ চৌধুরী (নাগরপুর) প্রমুখ জমিদার সদলবলে তিতুমীরকে আক্রমণ করেন। অপূর্ব বীরত্ব ও দক্ষতার সাথে তিতুমীর এই সম্মিলিত আক্রমণকে নস্যাৎ করে দেন। এভাবে জমিদাররা তাঁর হাতে পরাজিত হলে তিনি চব্বিশপরগণা, নদীয়া ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশব্যাপী একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

পরাজিত হিন্দু জমিদাররা ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের বুঝালেন তিতুমীর দেশদ্রোহী। বাংলা থেকে ইংরেজ ও হিন্দুদেরকে তাড়িয়ে তিতুমীর মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইংরেজ বেনিয়ারা তিতুমীরকে দমন করার উদ্যোগ আয়োজন করতে থাকে। ফলে সংঘাত শুরু হয়। তিতুমীর ইংরেজদের এদেশ থেকে বিতাড়নের জন্য তার সৈন্যদেরকে সংঘবদ্ধ করেন। স্বাধীনতার মন্ত্রে তাদের উজ্জীবিত করেন। তিনি ইংরেজদের বিতাড়িত করে বাংলার হৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প গ্রহণ করেন।

তিতুমীরের সাথে প্রথম যুদ্ধ করতে আসেন ইংরেজ সেনাপতি আলেকজান্ডার। সঙ্গে পাঠান পাইক, বরকন্দাজ প্রায় ৭৫০ জন। ইংরেজ সাহেবদের হাতে বন্দুক। কিন্তু তিতুমীরের বাহিনীর হাতে সড়কি, বল্লম ও তীরের অব্যর্থ নিশানা। ইংরেজ পক্ষের বহু পাইক বরকন্দাজ প্রাণ হারায়। প্রায় ৫০০ জমিদার সৈন্য ও ইংরেজ পরাজয় বরণ করে। ইংরেজ সেনাপতি আলেকজান্ডার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান।

দ্বিতীয়বার যুদ্ধে আসেন কর্নেল স্কট। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর মেজর স্কটের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী নারিকেলবাড়ীয়া অবরোধ করে। যুদ্ধ শুরুর আগে ইংরেজ বাহিনী ও তিতুমীরের মধ্যে একটি সংলাপের আয়োজন করা হয়েছিল। সংলাপে অংশ নেয়া তিতুমীরের প্রতিনিধি সম্ভবত ইংরেজী জানতেননা। ফলে সংলাপে তিতুমীরের বক্তব্যকে ইংরেজ মেজরের কাছে উপস্থাপন করছিলেন রাজচন্দ্র নামক জনৈক দোভাষী। দুঃখজনকভাবে দোভাষী তিতুমীরের পক্ষে বক্তব্যকে এমন বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছিল যে এতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মেজর স্কট গুলির নির্দেশ দেন। মূলত ইংরেজ বাহিনীর সুসজ্জিত আধুনিক অস্ত্রের সামনে তিতুমীরের লাঠি আর তীর সড়কি ছাড়া কোন অস্ত্রই ছিলনা। তবে গুলির মুখে এই দেশপ্রেমিক সাহসী মানুষগুলি পিছে হটেনি। ইংরেজ বাহিনীর গুলীর মুখে তিতুমীর ও তার সঙ্গীরা সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান। নির্বিচাওে গুলী চালাতে থাকে ইংরেজ সৈন্যরা।

গুলিতে তিতুমীর, তাঁর পুত্র গরহর আলীসহ ৫০ জন নিহত হয়। ২৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রাম তল্লাসি করে আরও ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এলাকার বাড়ীঘরগুলিতে আগুন দেয়া হয়। তিতুমীরসহ মৃতদেহগুলিকে প্রকাশ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যাতে তাঁদের শহীদ হিসেবে কেউ সম্মান দেখাতে না পারে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ১৯৭ জনের বিচার হয়। তন্মধ্যে তিতুমীরের প্রধান সহকারী গোলাম মাসুমের প্রাণদন্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন, ১২৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেয়া হয়। বিচারকালে ৪ জনের মৃত্যু হয়।

শেষকথা

১৯ নভেম্বর, ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের অন্যতম একটি স্মরণীয় দিন। এদিন ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, বাংলার বীর সাইয়েদ মীর নেসার আলী তিতুমীরের শাহাদাত দিবস।

শহীদ সৈয়দ মির নেসার আলী তিতুমীর আমাদের জাতীয় বীর। তিনি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে বলেন, “একটু পরেই হয়তো আমরা ইংরেজদের আক্রমণের শিকার হবো। তবে এতে ভয় পেলে চলবে না। এই লড়াই শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে। আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে। আজ থেকে প্রায় পৌনে দুশ’ বছর আগে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য তিতুমীর প্রথম যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। বীর তিতুমীর তার বীরত্বের জন্যই ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। জীবনের বিনিময়ে তিনি সত্যের পথে লড়াই করলেন। তাঁর এই দৃঢ়তা ও অনবদ্য প্রেরণা আজও বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানকে অনুপ্রাণিত করে, আবেগতাড়িত করে।

বিজ্ঞাপন