তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ : জুনায়েদ জামশেদের বদলে যাবার গল্প

তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ : জুনায়েদ জামশেদের বদলে যাবার গল্প

মুসান্না মেহবুব :

পাকিস্তানের বিখ্যাত ইসলামি সংগীত তারকা জুনায়েদ জামশেদ রহমতুল্লাহ আলায়হির ইন্তেকালের ৩ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর মর্মান্তিক এক বিমান দুর্ঘটনায় পাকিস্তানে তিনি ইন্তেকাল করেন। জুনায়েদ জামশেদ সকলের কাছে ছিলেন এক বিস্ময়ের নাম। বিস্ময় এবং গল্পে ভরা ছিল তাঁর জীবন। ছিলেন পপ তারকা, সেখান থেকে ফিরে ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে হয়েছেন বিশ্বখ্যাত দাঈ এবং ইসলামি সংগীত শিল্পী। তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমরা। সেই সঙ্গে আসুন জেনে নিই তাঁর জীবনের বৈচিত্র্যময় গল্পগুলো।

বদলে যাবার আগে

১৯৮৭ সালের কথা। পাকিস্তান তখনও পপ ব্যান্ডের সাথে পরিচিত না। নিতান্ত শখের বশে ক’জন তরুণ মিলে প্রতিষ্ঠা করে দেশের প্রথম পপ ব্যান্ড ‘ভাইটাল সাইন’। একটা দেশাত্মবোধক গানের হৃদয়স্পর্শী কথামালায় সুর ঢেলে তারা জায়গা করে নেয় গোটা পাকিস্তানবাসীর অন্তরে। দিল দিল পাকিস্তান- গানটি প্রথম গাওয়া হয়েছিলো দেশের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। পাকিস্তানবাসীর মনজয়ী এই কাফেলার মূল নায়কই হলেন জুনায়েদ জামশেদ। শখের বশে গাওয়া ‘দিল দিল পাকিস্তান’ তখনই একজন সৌখিন শিল্পীকে পরিণত করে পেশাদার শিল্পীতে।

১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখে পাকিস্তানের করাচির জামশেদ আকবর এবং নাফিসা আকবরের সংসার উজ্জ্বল করে ভূমিষ্ঠ হওয়া জুনায়েদের শিল্পী হবার কথা ছিলো না। অথচ নিয়তি তাকে এ পথেই টেনে এনেছিলো। না হলে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এ পথে আসবে কেন? জুনায়েদের বাবাও বোধহয় ছেলেকে নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখতেন না। বিমানবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অবশ্যই ছেলেকে একজন সৈনিক হিসেবেই কল্পনা করার কথা। ছেলের শখ এক্ষেত্রে অন্তরায়। শখের বশে প্রথম প্রথম তিনি বিভিন্ন স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে সঙ্গীতানুষ্ঠান করতেন। কিন্তু কালজয়ী সেই গানটা যখন তাকে আকাশচুম্বী সাফল্য এনে দেয়, জুনায়েদ তখন একটা অস্পর্শী নক্ষত্রে পরিণত হন। প্রেরণার যোগান নিয়ে যখন ‘ভাইটাল সাইন’কে মাধ্যম বানিয়ে সম্মুখে যাত্রা করার কথা, তখনই সেই ব্যান্ড ভেঙে যায়। সময়টা ছিল ১৯৯৫ সাল।

ব্যান্ড ভেঙে গেলেও জুনায়েদ জামশেদের কণ্ঠ কিন্তু থেমে থাকেনি। তিনি তখন এককভাবেই ক্যারিয়ার গড়তে আরম্ভ করেন। পাকিস্তানের প্রথম পপস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন নিজেকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের সঙ্গীত ‘কসম উস ওয়াক্ত কি’, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গীত ‘পালাটনা ঝাপাটনা’তে তাকেই তারা শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত করে।

পাকিস্তানের গ-ি পেরিয়ে আস্তে আস্তে জুনায়েদ বিশ্বসঙ্গীতাঙ্গনেও পোক্ত একটা আসন তৈরি করে নেন। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীতমঞ্চ দাপটের সঙ্গে কাঁপাতে থাকেন। একেকটা লাইভ কনসার্টে তার জন্যে অর্থের যে অঙ্কটা বরাদ্দ থাকতো, তা সে সময়ের অনেক বিশ্বখ্যাত শিল্পীও পেতেন না। জনপ্রিয়তার এই যখন অবস্থা, ঠিক তখনই এই জগতকে গুডবাই জানানোর কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন জুনায়েদ। ২০০২ সালে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ‘দিল দিল পাকিস্তান’ গাওয়ার মধ্য দিয়ে যেমন সঙ্গীত জীবন শুরু করেছিলেন, একই গানের মাধ্যমে ২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সঙ্গীত জগতকে বিদায় জানান তিনি।

১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৪ সাল অবধি পাকিস্তানের পপতারকা ছিলেন জুনায়েদ। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন পপ গীতিকার।

ওই ঘরানার সঙ্গীতাঙ্গনে রাজত্ব করা তার বিখ্যাত অ্যালবামগুলোর মধ্যে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘মেরা দিল’, ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘উস রাহ পর’, ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘দিল দিল পাকিস্তান’ উল্লেখযোগ্য। গিটার-বাদ্য সমেত তার গাওয়া সঙ্গীতের সংখ্যা কয়েক শতাধিক। এর মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তার তালিকায় ছিলো- ‘দিল দিল পাকিস্তান’, ‘সওলি সালোনি’, ‘ইয়ে শাম’, ‘এইতবার’, ‘তুম দূর থা’, ‘কেহ দো জো ভি’ ও ‘না তু আয়েগি’। জুনায়েদের প্রথম একক অ্যালবাম ছিলো ‘জুনায়েদ অব ভাইটাল সাইনস’। যা ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায়। মুক্তির সাথে সাথেই তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে অ্যালবামটি।

স্বল্পমেয়াদী তার এই সঙ্গীতজীবন পার্থিব জগতে কী দেয়নি তাকে! অর্থ-বিত্ত, সুনাম-সুখ্যাতি, ভক্তদের অফুরান ভালোবাসা সবই পেয়েছেন; তবু কোনো একটা জিনিসের অনুপস্থিতি তাকে অসুখী করে রেখেছিলো। নিজের ভেতর শান্তি পেতেন না এতকিছুর পরও। আর এই অসুখ এবং অশান্তিই তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ইসলামের সুনির্মল ঠিকানায়।

কীভাবে? চলুন, শুনে আসি তাঁর জবানিতেই।

যেভাবে বদলে গেলেন

ইউটিউবে বহুল প্রচারিত একটি ভিডিও আছে, যেখানে একটি অনুষ্ঠানে জুনায়েদ জামশেদকে বলতে শোনা যায়, তাঁর দীনের পথে ফিরে আসার গল্প। তিনি বলেন, ‘আমার আব্বা ছিলেন খুবই সৎ। কোনো হারাম তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারতো না। এ কারণে বাড়িতে কিছুটা সংযমের হালত বিরাজ করতো সবসময়। পরিবারের এই টানাটানির অবস্থা দেখে আমার মাথায় টাকা কামাই করার নেশা চাপলো। কিভাবে দু’হাতে টাকা কামাই করা যায়, সেই নেশায় হন্যে হয়ে উপায় খুঁজতে লাগলাম।

ছোটোবেলা থেকে আমার গলা ছিলো খুব সুন্দর। আমি সেই গলা কাজে লাগিয়ে সঙ্গীতচর্চা শুরু করলাম। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে চারদিকে আমার বিশেষ সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। এভাবে এক সময় আমি দেশের সেরা শিল্পীতে পরিণত হলাম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ আসতে থাকলো। বাংলাদেশ আর ভারত ছাড়া বিশ্বের সব দেশে গান গাইলাম। একেকটা গানে লাখ লাখ টাকা কামাই করতে লাগলাম। গাড়ি-বাড়ি সবই হলো। কিন্তু তারপরও মনে কেন যেন শান্তি পেতাম না।

২০০৩ সালের কথা। একদিন জুন মাসের প্রচ- গরমে করাচির রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। বাইরে তখন লু-হাওয়া বইছে। রাস্তায় পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা খুব কম। এমন সময় দেখি, তাবলিগের কিছু ভাই গাশতে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আর তাদের শরীর দিয়ে ঝর ঝর করে ঘাম ঝরছে। জামা-কাপড় সব ভিজে গেছে। তাদেরকে দেখে মনে মনে বললাম, লোকগুলো পাগল ছাড়া আর কী! নিজেদের আরামও নষ্ট করছে, অন্যদেরকেও বাড়ি থেকে বের করে কষ্টের মধ্যে ফেলার ফিকির করছে। পরক্ষণেই চিন্তা করলাম, আমি এই এসি গাড়িতে কতো আরামে বসে আছি। কিন্তু এরা কীসের জন্য নিজেদেরকে এই কষ্টের মধ্যে ফেলছে? কেন তারা এই ত্যাগ স্বীকার করছে? চিন্তাটা মাথায় আসতেই বিরক্তির বদলে এবার আলাদা একটা মমত্ব চলে এলো তাদের প্রতি।

তখন আমি তাদের দোআ নেয়ার জন্য গাড়ি ঘুরিয়ে একেবারে তাদের আমির সাহেবের সামনে গিয়ে ব্রেক কষলাম। আমির সাহেব হতচকিত হয়ে গেলেন। আমি গাড়ি থেকে তাকে সালাম দিলাম। তারপর বললাম, আপনারা অত্যন্ত ভালো কাজ করছেন। আমার জন্য দোআ করবেন। আমির সাহেব কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ইনশাআল্লাহ! দোআ করবো। এরপর আমি চলে এলাম। তারা মসজিদে চলে গেলেন।

উল্লেখ্য যে, আমির সাহেব সবার পিছনে ছিলেন বিধায় আমাদের এই সংক্ষিপ্ত মুলাকাত জামাতের দু’চারজন সাথী ছাড়া অন্যরা দেখতে পায়নি। মসজিদে যাওয়ার পর আমির সাহেব তার সাথীদের কাছে বললেন, জুনায়েদ জামশেদের সাথে আমার দেখা হয়েছে। এরপর তিনি কীভাবে আমার সাথে দেখা ও কথা হলো, তা বললেন। ওই জামাতে আমার স্কুল-জীবনের এক সহপাঠী ছিলো। সে আমার নাম শুনে বললো, আরে, সে তো আমার সহপাঠী। তার পেছনে মেহনত করা দরকার। তারপর সে কীভাবে যেন আমার মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করলো এবং আমার সাথে যোগাযোগ করলো।

একদিন আমার বাড়িতে এলো এবং সেদিন থেকে শুরু করে দীর্ঘ তিন বছর আমার পেছনে মেহনত করলো। কখনো আমার হাত ধরলো, কখনো আমার পা ধরলো, কখনো মাথার পাগড়ি খুলে আমার পায়ের কাছে রেখে দিলো। বলতো- জুনায়েদ! এখন তুমি যে সম্মানের মধ্যে আছো, এটা চিরস্থায়ী নয়। এটা একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আমি তোমাকে যে পথে আহ্বান করছি, প্রকৃত সম্মান সে পথেই আছে। এখন হয়তো তুমি বুঝতে পারবে না। কিন্তু একদিন তোমার বুঝে আসবে যে, আমিই তোমার প্রকৃত কল্যাণকামী।

এই তিন বছরে না বুঝে বিরক্ত হয়ে আমি বেশ কয়েকবার তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। কিন্তু আল্লাহর এই বান্দা কিছুতেই আমাকে ছাড়লো না। তিন বছর মেহনত করার পর আমাকে সে একদিনের জন্য তাবলিগে যেতে রাজি করালো। আমি একদিনের নিয়তে বের হলাম। একদিন শেষ হলো, আরেকটি দিনের জন্য অনুরোধ করলো। সেখানে গিয়ে আমার ভালো লাগলো। তাই তার কথা মেনে পরদিন থাকলাম। এরপর আবার আরও একদিনের জন্য থাকতে অনুরোধ করলো। আমি থেকে গেলাম। এভাবে একদিন একদিন করতে করতে আমার চিল্লা পুরো হয়ে গেলো।

চিল্লা থেকে ফিরে এসে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। গান-বাদ্য তো আল্লাহর নাফরমানির কাজ। তাই গান গাইতে ভালো লাগলো না। আবার চিন্তা করলাম, না গাইলে সংসার চলবে কী করে? এসব চিন্তা করে মনের সাথে লড়াই করে যেতে লাগলাম। এ সময় মাওলানা তারিক জামিল সাহেব বারবার আমাকে অভয় দিতে লাগলেন। হিম্মত যোগাতে লাগলেন। ফলে আমি গান গাওয়া একেবারে বন্ধ না করলেও সংখ্যা কমিয়ে দিলাম। সেই সাথে বন্ধুমহলে আস্তে আস্তে ঘোষণা করতে লাগলাম যে, গানের জগত থেকে আমি সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছি। এরপর আমি আগের পোশাক পরিত্যাগ করে ইসলামি লেবাস ধরলাম। দাড়ি একবার রাখি, একবার কাটি- এভাবে চলতে লাগলো।

২০০৬ সালের কথা। একদিন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জনাব জাফরুল্লাহ জামালি আমাকে ফোন করে বললেন, টিভিতে তোমাকে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে হবে। আমি বললাম, আমি তো গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, সেটা কেমন কথা! আমার অনুরোধ রাখবে না? আমি বললাম, আপনার অনুরোধ রাখতে পারি, কিন্তু আপনাকেও আমার একটা শর্ত মানতে হবে। তিনি বললেন, কী শর্ত? আমি বললাম, শর্ত হলো, এই গাওয়াই হবে আমার জীবনের শেষ গাওয়া। টিভিতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করার পর আমি গোটা জাতির সামনে ঘোষণা করে দেবো যে, আজ থেকে এই জগতের সাথে আমি সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।

তিনি আমার শর্ত মেনে নিলেন। সেদিন আমি গানের জগত থেকে সরে দাঁড়াবার কথা টিভিতে ঘোষণা দিয়ে দিলাম। তখন আমার মনের অবস্থা যে কী হয়েছিলো, তা আমি ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না।

এদিকে শয়তান কিন্তু বসে থাকলো না। আমার সংকল্প থেকে আমাকে টলাবার জন্য বিভিন্নভাবে সে জাল ফেলতে লাগলো। বড় বড় অফার আসতে লাগলো। একটিমাত্র গান গাওয়ার জন্য, একটিমাত্র শোতে অংশ নেয়ার জন্য লাখ লাখ টাকার প্রস্তাব আসতে লাগলো। কিন্তু আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে সব লোভ ত্যাগ করলাম। ইতোমধ্যে আমার ঈমানি পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলো। বেতন দিতে না পারার কারণে ছেলেমেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনলাম। গাড়িটা বিক্রি করে দিলাম। একসময় বাড়িও বিক্রি করে দিলাম। এরপর নগদ টাকা যা ছিলো, তা দ্রুত শেষ হয়ে আসতে লাগলো। সর্বশেষ যেদিন আমার পকেটে ১০০ টাকা ছিলো, সেদিন স্ত্রীর হাতে টাকাটা তুলে দিয়ে বললাম, এই আমার শেষ সম্বল! কাল থেকে সংসার কিভাবে চলবে, তা আমি জানি না। তুমি আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা চাইবে না। স্ত্রী ঈমানের তালিম অর্জন করেছিলো। বললো, আপনাকে সে চিন্তা করতে হবে না। আজ যিনি রিজিক দিচ্ছেন, আগামীকালও তিনিই রিজিক দেবেন।
বস্তুত আমার এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আমার স্ত্রীর অবদান অনেক বেশি। তার সহযোগিতা ও সমর্থন না পেলে আমার এই রাস্তায় আসা কষ্টকর হয়ে যেতো। সে-ই আমাকে আমার জগতে ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত করেছে। আল্লাহর উপর ভরসা করার তাগিদ দিয়েছে। তার অবদান এই জীবনে ভোলার নয়। আল্লাহ পাক তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

অবস্থা যখন এই পর্যায়ে এসে পৌঁছলো, আর আমি যখন পরীক্ষার শেষ সীমায় এসে পৌঁছলাম, তখন আল্লাহ তাআলার রহমত ও সাহায্য আসা শুরু হলো। বস্তুত আল্লাহ তাআলা কোরবানি চান। কিন্তু তিনি কোরবানি নেন না। তিনি শুধু বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম আলায়হিস সালামকে তার প্রিয় পুত্র ইসমাঈল আলায়হিস সালামকে কোরবানি করার আদেশ দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি যখন কোরবানি দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন, ছেলের গলায় ছুরি চালিয়ে দিয়েছেন, তখনই আল্লাহ তাআলার সাহায্য এসে গেছে। আল্লাহ তাআলা দুম্বা পাঠিয়ে দিয়েছেন।

একই ধারাবাহিকতায় আল্লাহ তাআলা হয়ত আমার কোরবানিও কবুল করেছেন। তাইতো যখন আমি হারাম পথে রিজিক তলব করা ছেড়ে দিলাম, তখন পরীক্ষার শেষ সীমায় পৌঁছার পর তিনিই হালাল রিজিক আসার ব্যবস্থা করে দিলেন। এখন আমি পায়জামা-পাঞ্জাবি তৈরি করি। সারা পাকিস্তানে আমার ৪৫ টা শোরুম আছে। সবগুলো আমি চিনিও না। কোথাও আমার যাওয়াও লাগে না। আমি এখন একেবারে অবসর। প্রায় সারাবছর তাবলিগে সময় লাগিয়ে বেড়াচ্ছি। আগে গান গাওয়ার জন্য সারা বিশ্ব সফর করতাম, এখন দাওয়াতের কাজে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আর লাভ করছি মহান আল্লাহর মহব্বত আর অগডুত মানুষের ভালোবাসা।

শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমার গলাটাকেও কাজে লাগিয়ে দিলেন। একদিন মুফতি তকি উসমানি সাহেব ফোনে আমাকে খবর দিলেন। তার খেদমতে হাজির হলে তিনি একটা হামদ আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, এটা রেকর্ড করিয়ে ফেলো। হামদ রেকর্ড করিয়ে বাজারে ছাড়ার সাথে সাথে হৈ চৈ পড়ে গেলো। এরপর হামদ-নাতের অ্যালবাম তৈরি করে বাজারে ছাড়লে ২০০৭ সালে সারা পৃথিবীতে উর্দু অ্যালবামের সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড ভঙ্গ করলো। এভাবে বাজারে আমার ইসলামি গজলের অনেক অ্যালবাম ছড়িয়ে গিয়েছে। আমার মৃত্যুর পরেও এগুলো মানুষের মুখে মুখে জারি থাকবে। আগে থাকতো আমার গান, এখন থাকবে আমার গজল।

কিছুদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত মাদরাসা দারুল উলুম জাকারিয়ায় সফর করলাম। সেখানে ছাত্রদের মুখে মুখে আমার গজল উচ্চারিত হচ্ছে। শুনে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। দীনের খাতিরে আল্লাহ তাআলা আমাকে এতো সম্মান দান করেছেন। বস্তুত আল্লাহ তাআলা কারও ঋণ বাকি রাখেন না। সাথে সাথে শোধ করে দেন।

প্রকৃত বন্ধু তারাই যারা সবসময় বন্ধুর কল্যাণ কামনা করেন এবং বন্ধুকে সৎপথে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। অনুরূপভাবে আদর্শ স্ত্রী তারাই যারা স্বীয় স্বামীকে অন্যায় ও হারাম থেকে বাঁচানোর জন্য এবং গুনাহের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা ও সহযোগিতা করেন এবং এ কারণে যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট হাসিমুখে বরণ করে নেন। আমার হেদায়েতের পথে আসায় আমার সেই দীনি সাহায্যকারী বন্ধু ও আমার সহযোগিনী স্ত্রীর ত্যাগ আমার জীবনের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।