ধর্মপ্রচার, অপপ্রচার ও অর্থলিপ্সা : মুসলিম সভ্যতায় ওয়াজের ইতিহাস

রাকিবুল হাসান :

ইসলামি সভ্যতায় সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে ওয়াজ সংস্কৃতিতে। রাসূল সা. এর যুগে, তার পরবর্তীতে হজরত আবু বকর রাদি. এর পুরো খেলাফতকাল এবং হজরত ওমর রাদি. এর খেলাফতকালের কিছু অংশ পর্যন্ত বক্তাদের ওয়াজের সংস্কৃতি ও প্রচলন ছিলো না। বক্তাদের ওয়াজের প্রচলন শুরু হয় হজরত ওমর রাদি. এর শাসনকালে। তিনিই অনুমতি দেন ওয়াজের। তবে তার এবং হজরত উসমান রাদি. এর খেলাফতকালে কুরআনের বাইরে গিয়ে ওয়াজ করার অনুমতি ছিলো না। কুরআনের গল্প, উদাহরণ, উপদেশ—এই ছিল বক্তৃতার বিষয়। ‘নাওয়াসিখুল কুরআন’ গ্রন্থে ইবনুল জাওযি (মৃ:৫৯৭) লিখেন—হজরত আলী রাদি. কুফার মসজিদে আবু ইয়াহইয়াকে ওয়াজ করতে নিষেধ করেন। কারণ তিনি কুরআনের ‘নাসেখ-মানসুখ’ বুঝতেন না।

কিন্তু উমাইয়াদের শাসনামলে এসে ওয়াজ সংস্কৃতিতে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। উমাইয়া শাসকরা ওয়াজকে ব্যবহার করতে শুরু করেন তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার এবং রাষ্ট্রীয় হুকুমত অক্ষুণ্ন রাখতে। তখন শাসকদের রীতিনীতি এবং বিধিনিষেধের খপ্পরে পড়ে যায় ওয়াজ। সেই থেকে শুরু ওয়াজের ভিন্ন এক যাত্রা। তারপর ওয়াজে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী লক্ষ্য জড়িত হয়। শাসকদের লেজুড়বৃত্তি, ব্যক্তিগত পকেট ভারীর চিন্তা, জনপ্রিয়তার লোভ ইত্যাদি। মুসলিম সভ্যতায় ওয়াজে ঢুকে পড়া এই কদর্যতা এবং পঙ্কিলতার একটা ফিরিস্তি এই লেখায় তুলে ধরবো। তবে ওয়াজের ময়দানে হকপন্থী আলেমদের প্রভাবও কোন অংশে কম ছিল না।

ওয়াজে শাসকদের হস্তক্ষেপের সূচনা

ওয়াজে শাসকদের হস্তক্ষেপের সূচনা শুরু হয় উমাইয়াদের শাসনামলে। ওয়াজ সংস্কৃতিকে তারা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করে। স্বাধীনভাবে ওয়াজ করার পরিবর্তে বক্তাদের ওপর তারা চাপিয়ে দেয় বিধিনিষেধ। ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে আল্লামা ইবনে হাজার (মৃ:৮৫২) লিখেন—হজরত উসমান রাদি. এর পক্ষে শামের গভর্নর তখন হজরত মুআবিয়া ইবনে সুফিয়ান রাদি. (মৃ:৬০)। তিনি বিখ্যাত তাবেয়ি কাব আল আহবারের নিকট এলেন। কাব রহ. বয়ান করছিলেন। মুআবিয়া রাদি. তাকে বললেন, ‘রাসূল সা. বলেছেন, বয়ান করবে কেবল আমির, অথবা আদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তি।’ পরবর্তীতে মুআবিয়া রাদি. অনুমতি দেয়া পর্যন্ত কাব রহ. আর বয়ান করেননি।’

আল্লামা ইবনে হাজার আরেকটি ঘটনা লিখেছেন ‘রফউল ইসরি আন কুজাতিল মিসরি’ গ্রন্থে। সিফফিন যুদ্ধে বিজয়ি হয়ে ফেরার পর হজরত আলী রাদি. তার বিরোধীদের ডেকে পাঠালেন। মুআবিয়া রাদি. এর নিকট খবর এলো। সকাল-সন্ধ্যা যিনি ওয়াজ করতেন, মুআবিয়া রাদি. তাকে আদেশ করলেন, ‘আমার জন্য এবং শামবাসীর জন্য দোয়া করুন।’

এইযে বক্তাদের বক্তৃতায়, আচরণে একটা পরিবর্তন আসছিলো, ইমাম লাইস ইবনে সাদ (মৃ: ১৭৫) তা ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি লিখেছেন—’তখন দুধরণের ওয়াজের প্রচলন হলো। এক—উন্মুক্ত ওয়াজ। এখানে অনেক মানুষ জমা হতো। বক্তা ওয়াজ করতেন। নসিহত করতেন। বক্তা এখানে স্বাধীন, ইচ্ছাধীন। দুই—মুআবিয়া রাদি. প্রবর্তিত বিশেষ ওয়াজ। এর জন্য একজন বক্তাকে দায়িত্ব দেয়া হতো। ফজর নামাজ পড়ে তিনি হামদ ও ছানা পাঠ করতেন। রাসূল সা. এর ওপর দুরুদ পড়তেন। তারপর খলিফা, তার পরিবার, সাম্রাজ্য এবং সৈন্য-সামন্তদের জন্য দোয়া করতেন। কাফের এবং শত্রুদের জন্য বদদোয়া করতেন।’

উমাইয়াদের চেয়ে কম ছিলো না আব্বাসী শাসকরা। তারা উমাইয়াদের চেয়ে বেশী বক্তা নিয়োগ দিয়েছিলো। ‘আল মারিফাতু ওয়াত তারিখ’ গ্রন্থে ফাসাভি (মৃ:২৭৭) লিখেন, ‘উমাইয়াদের বিখ্যাত একজন বক্তা ছিলেন আবুল হাইসাম সুলাইমান ইবনে আমর উতওয়ারি (মৃ:৯১)। তিনি উমাইয়াদের ওয়াজ করতেন। মাতিয়ে রাখতে পারতেন শ্রোতাদের। তিনি যখন আব্বাসিদের এক জনসভায় ওয়াজ করলেন, উমাইয়ারা তাকে বরখাস্ত করে দিলো। প্রতিবাদ করে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা যেভাবে বলেছো, সেভাবেই বক্তৃতা দিয়েছি। তোমাদের কথামতো ওয়াজে কথা কমিয়েছি, বাড়িয়েছি। তবুও আমাকে বরখাস্ত করে দিবে?’

রাজনৈতিক প্রচার-স্বার্থে বক্তা নিয়োগ

আল্লামা ইবনে আসির (মৃ:৬৩০) তার ‘আল কামিল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আব্বাসি সেনানায়ক আবু মুসলিম খোরাসানি হাশেমি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন। তখন তিনি কাসেম ইবনে মাজাশি’ তামিমিকে (মৃ:১৫৮) নিয়োগ দিয়েছিলেন। আসর নামাজ পড়ে তিনি আবু মুসলিমকে গল্প শুনাতেন, ওয়াজ করতেন, বনি হাশেমের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতেন এবং বনি উমাইয়াদের দোষত্রুটি তুলে ধরতেন।’

সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরও আব্বাসীদের এই কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক স্বার্থে যখনই প্রয়োজন হয়েছে, মতবাদ প্রচারের জন্য বক্তা নিয়োগ দিয়েছে। তাবারি (মৃ: ৩১০) তার ইতিহাসগ্রন্থে ২৮৪ হিজরির ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন—খলিফা মু’তাজিদ (মৃ: ২৮৯) মিম্বরে দাঁড়িয়ে মুআবিয়া ইবনে সুফিয়ানের ওপর লানত দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। এবং আদেশ দিয়েছিলেন, মুআবিয়ার নিন্দায় বই লিখে যেন মানুষকে পড়ানো হয়। কিন্তু তার উজির আব্দুল্লাহ ইবনে সুলাইমান ইবনে ওহাব (মৃ:২৮৮) তাকে বললেন, ‘এমন করলে জনগণ ক্ষেপে যাবে। উত্তেজিত হয়ে পড়বে।’ রাজনৈতিক দৃষ্টিতেই পরবর্তী আর এমন করা হয়নি।

শেষদিকের আব্বাসী শাসকরা মিসরে ফাতেমিদের সঙ্গে রাজনৈতিক যুদ্ধেও বক্তাদের ব্যবহার করেছিলো। সেসময় রাজনৈতিক প্রভাবদুষ্ট বক্তারা শাসকদের পক্ষে কথা বলত, বই লিখত। বিরোধীদের নিন্দায় স্রোত বইয়ে দিত। ইবনে রজব হাম্বলি (মৃ: ৭৯৫) তার ‘যাইলু তাবকাতিল হানাবিলাতি’ গ্রন্থে লিখেন—বিখ্যাত বক্তা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযির (মৃ: ৫৯৭) মুসতাজি বিল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক ছিলো। তিনি একটি বই লিখেছিলেন: ‘আল মিসবাহুল মুজি ফি দাওলাতিল মুসতাজি’। খলিফা তাকে বদর গেইটের নিকট ওয়াজের মজলিস বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তাকে টাকা-পয়সাও দিয়েছিলেন।

ব্যাতিক্রমও ছিলেন অনেক

ওয়াজের ময়দানে সবাই যে শাসকদের লেজুড়বৃত্তি করতেন, এমন নয়। অনেকেই ছিলেন এর বিপরীত। তারা কারও কথায় আপোষ করতেন না। শাসকদের নসিহত করতেন, সতর্ক করতেন। যেমন—আবু মুসলিম খাওলানি (মৃ: ৬২), সিয়ারু আ’লামিন নুবালায় আল্লামা যাহাবি যাকে বলেছেন ‘তাবিয়েদের সর্দার এবং কালের যাহিদ’, উমাইয়া খলিফাদের সাথে তার আচরণ, আব্বাসি খলিফা মানসুরের (মৃ:১৫৮) সাথে মু’তাজিলি ইমাম আমর ইবনে উবাইদ (মৃ:১৪৪) এবং শাবিব ইবনে শাইবা (মৃ: ১৭০) এর আচরণ, হারুনুর রশিদের (মৃ: ১৯৩) সাথে ইবনুস সামাক (মৃ: ১৮৩) এবং ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (মৃ: ১৮৭) এর আচরণ। যারা তখন সত্য বলতেন, এরা তার উদাহরণ। এদের ক্ষেত্রেই উপযুক্ত যাহাবির একটি কথা—’প্রথম যুগে কিছু ওয়ায়েজ ছিলেন। তারা ইলমে-আমলে উভয় দিক দিয়েই ছিলেন আভিজাত্যের অধিকারী।’

মাজহাবি বক্তা এবং বিভক্তি

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বক্তাদের মাজহাব এবং আকিদা। মাজহাবকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিভক্তি কখনো কখনো বিরাট ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়াতো। সব বক্তাই তার বাগ-যোগ্যতা, ভাষার মনোহরিত্ব ব্যবহার করতো তার মাজহাবের প্রচার প্রসারে। বিপক্ষ মাজহাবকে তুলোধুনো করতো বড় নির্মমভাবে। এভাবেই সৃষ্টি হতো গোলযোগ, ফিতনা। গোলযোগ দমাতে আবার হস্তক্ষেপ করতো শাসকগণ।

আবুল কাসিম কুশাইরি (মৃ: ৫১৪), ইবনে শাকির কুতবি (মৃ:৭৬৪) যাকে ‘দ্বীন এবং মুসলিমদের আলেম’ বলেছেন, বাগদাদে তিনি একটি ওয়াজের মজলিস কায়েম করেছিলেন। প্রবল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল তার মজলিস। তিনি আকিদায় তার আশআরি মতবাদ প্রকাশ করেছিলেন। এরপরই তার এবং হাম্বলিদের মাঝে বিরাট দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দু’দলের লোকজন লড়াইয়ে নেমে আসে। তখন উজির নেজামুল মুলককে (মৃ: ৪৮৫) চিঠি লিখে বলা হয়, তাকে যেন তার দেশে ফিরিয়ে নেয়া হয়। নেজামুল মুলক তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে সম্মান দেন। দেশে থাকতেই তাকে আদেশ করেন।

‘আল মুনতাজাম’ গ্রন্থে ইবনুল জাওযি ৫১৬ হিজরির ঘটনাবলী লিখতে গিয়ে বলেন, ‘ওয়ায়েজ আবুল ফুতুহ ইস্ফারাইনি শাফেয়ী (মৃ: ৫৩৮) বাগদাদে এলেন। দীর্ঘ একটা সময় তিনি বাগদাদেই থাকেন। ওয়াজের মজলিস কায়েম করেন। আশআরি মাজহাব প্রচারে তিনি খুব বাড়াবাড়ি করতেন। তার এবং হানাফি ওয়ায়েজ গজনভির (মৃ: ৫৫১) মধ্যে সবসময় একটা লড়াই লেগেই থাকতো। মিম্বরে বসেই একজন আরেকজনকে কুৎসিতভাবেই আক্রমণ করতেন।

আল্লামা যাহাবি ‘তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে এমন অনেক ঘটনা লিখেছেন। এসব মাজহাবি দ্বন্দ্বে বিরক্ত হয়ে বাড়ির বাইরে বের হওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন ওয়ায়েজ সালামাহ মানবাজি (মৃ:৫৮০)। মানবাজের লোকেরা আশআরি মাজহাবের সমাদর করতো। হাম্বলি মাজহাবকে ঘৃণা করতো। তাদের ভেতর এই ঘৃণা ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো আরেক বক্তা দিমাগ। পরে সালামা এসে তাদেরকে সুন্দরভাবে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। ঘৃণা দূর করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মূর্খ জনগণ বুঝতে চায়নি। আরেক ওয়ায়েজ উসমান সাবুনি (মৃ: ৪৪৯)। তার বাবা ছিলেন নিশাপুরের বিখ্যাত ওয়ায়েজ। মাজহাবি দ্বন্দ্বের জেরেই তাকে অতর্কিতে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়।

এসব দ্বন্দ্ব মেটাতে কখনো কখনো ওয়াজের মাহফিল-মজলিস বন্ধ করে দেয়া হতো। অথবা শর্তসাপেক্ষে চালু রাখা হতো। ৩৮৯ হিজরিতে বাগদাদে সুন্নি এবং শিয়াদের মধ্যে বিরাট এক লড়াই হয়েছিলো। তার ফলে মাহফিল থেকে বক্তাদের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি শান্ত হলে এই শর্তে মাহফিলের অনুমতি দেয়া হয়—সংঘাত উসকে দেয়, এমন কোনো বিষয়ে কথা বলা যাবে না।

‘আস সুলুক লিমারিফাতি দুয়ালিল মুলুক’ গ্রন্থে মাকরিজি উল্লেখ করেছেন, ‘মিসরে ‘ইবনুন নাক্কাশ’ বলে পরিচিত শাফেয়ি ফকিহ শামসুদ্দিন দুক্কালির (মৃ:৭৬৩) বিপক্ষে আদালত বসানো হয়েছিলো। যাইনুদ্দিন আবদুর রহিম ইরাকি (মৃ:৮০৬) অভিযোগ করেছিলো, শামসুদ্দিন দুক্কালি শাফেয়ী মাজহাব অনুযায়ী ফতোয়া দেননি। আদালত তখন তার ফতোয়া দেয়ার অধিকার কেড়ে নেয়। শর্ত দেয়া হয়, একমাত্র কিতাব দেখেই তিনি ওয়াজ করতে পারবেন।

ফিতনার ভয়ে কখনো শাসকরাই স্তব্ধ করে দিয়েছেন ওয়ায়েজদের মুখ। সুলতান মাহমুদ গজনভি (মৃ:৪২১) যখন রায় শহরে প্রবেশ করেন, সেখানের বাতেনিদের হত্যা করেন। একমাত্র আবু হাতেম ইবনে খামুশ রাজি (মৃ: ৪৪৫) ছাড়া সব ওয়ায়েজের ওয়াজ নিষিদ্ধ করেন। রায় শহরে যেই আসত, তাকে আবু হাতেমের সামনে আনা হতো। যদি তিনি রাজি হতেন, তবেই ওয়ায়েজ ওয়াজ করার অনুমতি পেতেন।

ওয়াজে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা

ওয়াজের মাহফিলগুলো গমগম করতো অংশগ্রহণকারীদের পদচারণায়। কারো কারো মাহফিলে এত জনসমাগম হতো, উদ্যোক্তারা জায়গা দিতে পারতেন না। সংকীর্ণ মসজিদ কিংবা বাড়ি থেকে মাহফিল স্থানান্তর করতে হতো বিশাল কোনো ময়দানে। ইবনু নাজ্জার (মৃ: ৬৪৭) ‘যাইলু তারিখি বাগদাদ’ গ্রন্থে লিখেন—হাম্বলি ফকিহ আবদুল মুনইম ইবনে আলী (মৃ: ৬০১) ওয়াজের মজলিস বসিয়েছিলেন মসজিদে ইবনুল ওয়াসিতে। ক্রমান্বয়ে জনসমাগম বেড়ে উঠে। ফলে জুফরিয়া মহাসড়কের নিকট বড় একটি মসজিদে তার মজলিস স্থানান্তর করতে হয়।

আমির বলে পরিচিত বিখ্যাত ওয়ায়েজ মুজাফফার ইবনে আরদশির আব্বাদি (মৃ: ৪৯৬)। তার ওয়াজের মজলিসে ৩০ হাজার নারী-পুরুষ উপস্থিত হতো তার ওয়াজ শুনতে। মানুষ তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। তার মজলিসের খ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিলো ইমাম গাজালি রহ. (মৃ: ৫০৫) এর কাছে। ‘আল ওয়াফি বিল ওফায়াত’ গ্রথে সাফাদি লিখেছেন, ‘ইমাম গাজালি রহ. তার মজলিসে উপস্থিত হতেন।’

শায়খ আবদুর কাদের জিলানি রহ. (মৃ: ৫৬১) তার নিজের মজলিসের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। আল্লামা যাহাবি ‘তারিখুল ইসলামে’ তা উদ্ধৃত করেছেন—’প্রথম প্রথম আমার মজলিসে ৩২ জন বসতো। তারপর ধীরে ধীরে আমার কথা ছড়িয়ে পড়লো। মজলিসে বাড়তে লাগলো জনসমাগম। একসময় আমার মজলিসে একসঙ্গে ৭০ হাজার লোকও ওয়াজ শুনেছে।’

ইমাম ইবনুল জাওযি জন্মগ্রহণ করেন ৫১০ হিজরিতে। দশ বছর বয়স থেকেই তিনি ওয়াজ শুরু করেন। তিনি বলেন, দশ বছর বয়সে ইবনু নাসির আমাকে আবুল কাসেম আলাভির কাছে নিয়ে যান। তিনি আমাকে ওয়াজের কিছু টেকনিক এবং শব্দ শিখিয়ে দিলেন। তিনি বাগদাদ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। তিনি চলে যাবার দিন আমাকে মিম্বরে বসিয়ে দিলেন। মিম্বরে বসে আমি ওয়াজের শেখানো শব্দগুলোই বলে গেলাম। সে মজলিসে উপস্থিত ছিলো ৫০ হাজার শ্রোতা।’

‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে ইবনে কাসির লিখেছেন, ৫২৭ হিজরিতে যখন ইবনুয যাগুনি ইন্তেকাল করেন, ইবনুল জাওযি তার মজলিসে ওয়াজ চালিয়ে যাবার অনুমতি চান। কিন্তু তার অল্প বয়সের কারণে তিনি অনুমতি পাননি। তবে উজির নওশেরওয়া (ইবনু খালেদ কাশানি, মৃ:৫৩২) তাকে ওয়াজ করার অনুমতি দেন। এ বছর তিনি বাগদাদের বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ করেন।

তারপর জামে মনসুরে যখন তাকে ওয়াজের সুযোগ দেয়া হলো, তখন অনেক ফকিহগণও তার মজলিসে উপস্থিত হতো। প্রবল জনস্রোত তো আছেই। ইবনুল জাওযি বলেন, ‘তখন আমার মজলিসে নিয়মিত দশ-পনেরো হাজার স্রোতা থাকতোই। জামে মনসুরে আশুরার দিন এক মজলিসে এক লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।’

ইসলামের ইতিহাসে ইবনুল জাওযি-ই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি ওয়াজের মজলিসে ধারবাহিকভাবে কুরআনের পুরো তাফসির শেষ করেছিলেন। সেই অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না—কোন ওয়ায়েজ ওয়াজের মজলিসে কুরআনের পুরো তাফসির শেষ করতে পারে। আমি ধারাবাহিকভাবে তাফসির শুরু করি। মিম্বরে যেদিন তাফসির করা শেষ হলো, আমি সেজদাতুশ শোকর আদায় করেছি।’

ওয়াজের মাহফিলের প্রভাব

ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে এসব মজলিসে-মাহফিলে ওয়াজের প্রভাবের কথাও উল্লেখ আছে। ওয়াজ শুনে কান্নার রোল পড়ে যেতো কারও মজলিসে। কখনও অমুসলিম কেউ মুসলিম হতো। পাপ থেকে তাওবা করতো হাতে হাত রেখে। আল্লামা যাহাবি ‘তারিখুল ইসলামে’ আবদুল কাদের জিলানির একটা কথা উদ্ধৃত করেছেন—’আল্লাহ তায়ালা চেয়েছেন আমার দ্বারা মানুষের উপকার হোক। তাই আমার হাতে পাঁচ শতাধিক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। এক লাখের অধিক চোর তাওবা করেছে। এটাই সবচে বড় সৌভাগ্য আমার।’

ইবনুল ফুয়াতি (মৃ: ৭২৩) ‘মাজমাউল আদাব’ গ্রন্থে লিখেন—প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল মুহিউদ্দিন ইবনুল হারাবির (মৃ: ৬৭৬) ওয়াজের মজলিস। তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছে অনেক মোগল এবং তুর্কী। তার হাতে তাওবা করে মানুষ হয়েছে অনেক অমানুষ। তারা নামাজ পড়া এবং যাকাত আদায় করা শুরে করেছে।’

‘আল ওয়াফি বিল ওফায়াত’ গ্রন্থে সাফাদি লিখেছেন— শরফুদ্দিন আবদুল মুমিন ইবনে হিবাতুল্লাহ ইস্পাহানি হানাফি (মৃ: ৫৭০) দামেশকে ওয়াজের মজলিস কায়েম করেছিলেন। তার মজলিসে উপস্থিত হয়েছিলেন নুরুদ্দিন মাহমুদ জঙ্গি (মৃ:৫৬৯)। তার মজলিসের প্রথম দিনই এক খৃস্টান বালক ইসলাম গ্রহণ করেছিলো।’

ওয়াজের মজলিসে অনেক তাওবাকারী মাথা মুণ্ডন করে ফেলতো। ইবনুল জাওযি ‘যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলাতি’ গ্রন্থে বলেন, ‘আরাফার দিন আমি বদর গেইটে ওয়াজ করছিলাম। এতে অনেক মানুষ তাওবা করে। তাদের অনেকেরই মাথা মুণ্ডন করা।’

পর্যটক ইবনু জুবাইর ইবনুল জাওযির বিভিন্ন ওয়াজে অংশগ্রহণ করেছেন। মজলিসের দৃশ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তিনি যখন ওয়াজ করতেন, গুরুগম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি হতো। তাওবাকারীরা চিৎকার করতো। তারা ইবনুল জাওযির ওপর লাফিয়ে পড়তো, যেভাবে পতঙ্গ লাফিয়ে পড়ে প্রদীপে। তারা কপালে হাত চাপড়াতো। কেউ কেউ বেহুশ হয়ে যেতো। দেখলেই বুঝা যায়, তাদের হৃদয় অনুতাপ অনুশোচনায় দগ্ধ।’

ইবনু জুবাইর তুলে ধরেছেন শাফেয়ী ফকিহ আবুল খায়র কাজবিনি (মৃ: ৫৯০) এর ওয়াজের মজলিসের দৃশ্য। তিনি বলেন, ‘তার বয়ানের প্রভাব সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করে। ফলে খুশুখুজুর পরিবেশ তৈরী হয়। মানুষ কান্না শুরু করে। তার ওপর লাফিয়ে পড়ে। লাফাতে গিয়ে কত কপাল রক্তাক্ত হয়। কত হাঁটু ভেঙ্গে যায়।’

সবচে ভয়ংকর হলো—ওয়াজের প্রভাবে মৃত্যুবরণ করা। ‘ইমতাউল আসমা’ গ্রন্থে মাকরিজি লিখেছেন, ওয়াজের মজলিসে কত উম্মত মৃত্যুবরণ করেছে। ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান।’ ‘নাফহুত তাইয়্যিব’ গ্রন্থে তিলিমসানি (মৃ: ১০৪১) লিখেছেন—’শায়খ আবু মাদইয়ান আল গাওস (মৃ:৫৯৪) এক মজলিসে ওয়াজ করতেন। অনেক মানুষের সমাগম হতো। তার মজলিসে অনেক মানুষ মারাও যেতো।’

ইবনে কাসির ‘তাবকাতুল ফুকাহাইশ শাফিয়িয়্যিন’ গ্রন্থে লিখেন—ফখর রাজির (মৃ:৬০৬) ওয়াজের বিরাট মজলিস ছিলো। তিনি দারুণ সব কথা বলতেন। আরবি এবং তুর্কী—উভয় ভাষায় ওয়াজ করতে পারতেন। বিভিন্ন গোত্রের, বিভিন্ন মাজহাবের লোক তার মজলিসে আসতো। আসতো আমির-উমারা, রাজা-বাদশারাও। এতটাই খুশুর পরিবেশ সৃষ্টি হতো, প্রভাবে অনেকেই মারা যেতো।’

ওয়াজে ছিল না সুর

শাফেয়ী ফকিহ আবুল খায়র কাজবিনি ওয়াজের মজলিস কায়েম করেছিলেন। তার জনসমাগম দেখে আমির-উমারাগণ চোখ বাঁকা করে তাকিয়েছিলো। তবে জনসাধারণ তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো। তিনি ওয়াজের মজলিস করতেন নেজামিয়াতে। তার মজলিসে অনেক শ্রোতা উপস্থিত হতো। আল্লামা যাহাবি লিখেছেন, ‘তার কথায় মাধুর্য ছিলো, বর্ণনাভঙ্গিতে মুগ্ধতা ছিলো। তিনি অনেক নস এবং উদ্ধৃতি মুখস্থ পারতেন। তিনি ওয়াজে ছন্দ মিলিয়ে, সুর করে ওয়াজ করতেন না। তার ওয়াজ ছিলো তাফসির, হাদিস, ফিকহে ভরপুর।’

শায়খ সোহরাওয়ার্দী (মৃ:৬৩২) এর মজলিসেও অনেক লোকের সমাগম হতো। তিনি মজলিস কায়েম করেছিলেন দজলার তীরে তার চাচার মাদরাসায়। তিনিও সুর করে, ইনিয়ে বিনিয়ে ওয়াজ করতেন না। কিন্তু তার মজলিসে সাধারণ লোক থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের সব লোকই অংশগ্রহণ করতো। তখনই তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিলো দিকবিদিক।

সাপ্তাহিক ওয়াজ

মুসলিম সভ্যতায় সময় নির্দিষ্ট করে নির্দিষ্ট জায়গায় সাপ্তাহিক ওয়াজের প্রচলনও ছিলো। ফলে যারা সাপ্তাহিক ওয়াজ করতো, তাদেরকে বলা হতো ‘মিআদ’ বা মাওয়াইদ’। জীবনী গ্রন্থগুলোতে তাই অনেকের পরিচয় দেয়া হয়—’তিনি ছিলেন মাওয়াইদ।’

শুক্রবার যেহেতু বিশেষ একটি দিন, তাই অনেকে সাপ্তাহিক ওয়াজের জন্য শুক্রবারকেই বাছাই করেছিলেন। ইবনুল জাওযি মন্ত্রী ইবনু হাবিরার (মৃ:৫৬০) বাড়িতে শুক্রবারে ওয়াজ করতেন। ইবনুল জাওযির ছাত্র ইবনুল আবকারি বাগদাদি প্রতি শুক্রবারে ওয়াজ করতেন পশ্চিম বাগদাদের ইবনে বাহলিকা মসজিদে।

তবে কেউ কেউ ভাবতেন, শুক্রবারে জুমার দুই খুতবা মানুষের জন্য যথেষ্ট। তাই তারা সপ্তাহিক অন্যদিন মজলিস করতেন। ইবনুল জাওযির নাতি ইউসুফ ইবনে আব্দুল্লাহ (মৃ: ৬৫৪) দামেশকে ওয়াজের মজলিস করতেন রোববার সকালে। রাত থেকেই মানুষ জামেয়ায় অপেক্ষা করতো। খেত-খামার ছেড়ে চলে আসতো নির্দিষ্ট সময়ে ওয়াজ শুনার জন্য। রোববার সকালে ওয়াজ করতেন কাযিউল কুযাত নেজামুদ্দিন ইবনে মুফলিহ মাকদিসিও।

কোনো কোনো ওয়ায়েজ পাঠদান পদ্ধতিতে তার কথাগুলো লিখিয়ে দিতেন। কথাগুলো মুখস্থ করে এসে সপ্তাহান্তে শুনাতে হতো।

কিছু কিছু পরিবার ওয়াজের জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে যেতো। সেই পরিবারে ছোটদেরও শিক্ষা দেয়া হতো ওয়াজ। ফলে কারও কারও পরিচয়ে বলা হয়—’তিনি ওয়াজ সংস্কৃতি ধারণকারী পরিবারের।’ যেমন—কাজি ওয়ায়েজ আবদুস সালাম ইবনে ইয়াহইয়া তাগলিবি (মৃ: ৬১৬)। তার পরিচয়ে বলা হয়—তিনি কাজি এবং ওয়ায়েজ পরিবারের।

তবে সবাই যে নির্দিষ্ট জায়গায় বসেই সবসময় ওয়াজ করতো—বিষয়টা এমন নয়। কেউ কেউ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে ওয়াজ করতো। বাগদাদের ওয়ায়েজ ছিলেন ইবনুল জাওযির ছাত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহহাব আনসারী হাম্বলি (মৃ: ৬৫৭)। তার সম্পর্কে ‘আয যাইলু ওয়াত তাকমিলাতু’ গ্রন্থে আবদুল মালেক মারাকেশি (মৃ: ৭০৩) লিখেন, ‘তিনি ৬৫২ হিজরিতে মারাকেশে পৌঁছেন। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তারপর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছেন আন্দালুসে। এভাবেই বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ান। ওয়াজের মজলিস করেন। আন্দালুস থেকে তিনি যান মিসরে।’

নারী ওয়ায়েজ

শুধু পুরুষরাই ওয়াজের ময়দানে কাজ করেনি, বরং নারীরাও কাজ করেছে। এজন্য অনেক নারীর লকব দেয়া হয়েছে ‘ওয়ায়েজা’। ‘তারিখুল ইসলাম’ গ্রন্থে আল্লামা যাহাবি দশের অধিক নারী ওয়ায়েজার জীবনী লিখেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বিনতুল মা’মার আনসারী (মৃ:৫৮৫)। তিনি ছিলেন শায়খ আবুন নাজিব সোহরাওয়ার্দীর স্ত্রী। তিনি নারীদের মজলিসে ওয়াজ করতেন।

আরেকজন প্রসিদ্ধ ওয়ায়েজ উম্মে যায়নাব ফাতেমা বিনতে আব্বাস বাগদাদি (মৃ:৭১৪)। ‘আ’ইয়ানুল আসর’ গ্রন্থে সাফাদি লিখেছেন—তিনি মিম্বরে বসে নারীদের ওয়াজ করতেন। দামেশকে তার মাধ্যমে একদল নারী সঠিক পথে এসেছিলো। তবে সপ্তম শতাব্দীর পর তিনি মিসরে চলে যান। মিসরেও একদল নারী তার মাধ্যমে উপকৃত হয়।’

ওয়ায়েজদের অর্থলিপ্সা

উম্মতের ইসলাহ এবং সংশোধনের মাধ্যম হিসেবে অনেকে ওয়াজকে গ্রহণ করলেও, অনেকেই আবার গ্রহণ করেছে নিছক টাকা কামানোর মাধ্যম হিসেবে। তারা মানুষকে কাঁদাতো পকেট ভারী করার জন্য। ‘তারিখুল ইসলামে’ আল্লামা যাহাবি বলেছেন—’হানাফি ফকিহ আবু সাদ গিয়াসি মাহানি (মৃ: ৫৫৪) একজন ওয়ায়েজ। তার অনেক নস মুখস্থ ছিলো। তবে অর্থ উপার্জনের প্রতিও ছিলো তার প্রবল আগ্রহ। আরেক ওয়ায়েজ ইবনু নাজিয়্যাহ আনসারী (মৃ: ৫৯৯)। তার ছিল আয়েশের জীবন। তার ঘরে বাঁদী ছিল বিশজন। তাদের প্রত্যেকের মূল্য এক হাজার দিনার। বর্তমানের হিসেবে ১৬৭ হাজার ডলার। খলিফা, বাদশারা তাকে অনেক দিনার-দিরহাম দিতো। তবুও তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলে নিঃস্ব অবস্থায়।’

‘আয যওউল্লামি’ গ্রন্থে সাখাবি (মৃ:৯০২) বলেন, ‘শাফেয়ি ফকিহ ওয়ায়েজ শাহাবুদ্দিন ইবনে আব্বিয়াহ মাকদিসি (মৃ:৯০৫) শামে বসবাস করেন এবং ওয়াজের মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এমনিভাবে মিসরে বসবাস করতেন ওয়ায়েজ আবুল হাইসাম মাদানি। তিনিও ওয়াজের মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।

তবে কোনো কোনো ওয়ায়েজ টাকা চাইতেন মজলিসের খরচপাতির জন্য। ‘তারিখুল ইসলামে’ আল্লামা যাহাবি লিখেছেন—একবার ওয়ায়েজ আবু বকর ইবনে আবদুল জাব্বার সামআনি (মৃ:৫১০) তার মজলিসে উপস্থিত লোকদের কাছে অর্থ চাইলেন। তারা তার কাছে এনে এক হাজার দিনার জমা দিলো।’

উপসংহার

যেহেতু অনেক ওয়ায়েজের লক্ষ্যই থাকে অর্থ উপার্জন, তাই মানুষকে যেভাবে খুশী করা যায়, সেভাবেই কথা বলেন তারা। অনেক সময় উদ্ভাবন করেন নতুন নতুন ইবাদাত। তৈরী করেন গল্প। শরীয়তবিরোধী অনেক কথাই বলে ফেলেন তারা। তাই তাদের ওপর দ্বীনি নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ।

‘সায়দুল খাতির’ গ্রন্থে ইবনুল জাওযি লিখেছেন—’এমন অনেক বিষয় আমার জানা আছে, যেগুলোকে সাধারণ মানুষ এবং অজ্ঞ ওয়ায়েজগণ ইবাদাত মনে করছেন। অথচ এগুলো নিতান্তই শরিয়ত পরিপন্থী কাজ। ওয়ায়েজ সুর করে ওয়াজ করেন, লাইলি-মজনুর গল্প বলেন রসিয়ে রসিয়ে—এটাকেই মনে করেন সাওয়াবের কাজ। কিন্তু এই সুর এবং ইনিয়ে বিনিয়ে বলা গল্প মানুষকে কেবল গানের মতো আনন্দিতই করে। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হচ্ছে অনেক ভুল রীতি, রসুম-রেওয়াজ। এই ক্ষেত্রে অন্তত ওয়ায়েজদের লাগাম টেনে ধরা দরকার।’

‘ইম্বাউল গুমর’ গ্রন্থে আল্লামা ইবনে হাজার বলেছেন, ‘নাজমুদ্দিন তুম্বুজি (মৃ: ৭৯৪) দরিদ্র ফকিহদের নিয়োগ দিয়েছিলেন, তারা যেন দোকানদারকে সূরা ফাতেহা এবং নামাজের ফরজগুলো শেখায়। তবে ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প-কেচ্ছা বলে ওয়াজ করা ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ।’

ইবরাহিম দুয়াইরির লেখা অবলম্বনে