পাকিস্তানে যেভাবে খুলছে কওমি মাদরাসা

মুনশী নাঈম:

করোনাভাইরাস উপেক্ষা করেই ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে পাকিস্তানের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি হেফজখানা খুলে দেয়া হয়েছে। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তান ঘোষণা করেছে তাদের কেন্দ্রীয় পরীক্ষার রুটিন। ১১ জুলাই শুরু হয়ে পরীক্ষা শেষ হবে ১৬ জুলাই। তবে মাদরাসা খুললেও তেমন উপস্থিতি নেই ছাত্রদের।

লকডাউনের আগে মসজিদে মুহাম্মদ মাদরাসার ছাত্রসংখ্যা ছিল ১৫০ জন। কিন্তু লকডাউন শেষে মাদরাসা খোলার পর এখন ছাত্রসংখ্যা কেবল ৩৫ জন। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে, মুখে মাস্ক পড়ে ক্লাস করছে ছাত্ররা। মাদরাসাটির শিক্ষক মাওলানা সুলাইমান ‘দ্য ন্যাশনাল’ পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনা মহামারীর কারণে ছাত্র কমে গেছে। অধিকাংশ ছাত্রই মাদরাসায় আসেনি।’ মাদরাসাটির ১৬ বছর বয়সী এক ছাত্র হুজাইফা আমিন। ‘দ্য ন্যাশনাল’কে সে জানায়, ‘আমার সহপাঠীদের মধ্যে কারো কারোনার লক্ষণ নেই। আমি হেফজ শেষ করেছি। এখন পুনর্বার শুনাচ্ছি।’

পূর্ণ সতর্কতা বজায় রেখেই মাদরাসা খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মসজিদে মুহাম্মদ মাদরাসার প্রধান মাওলানা মুহাম্মদ ইবরাহিম। ‘দ্য ন্যাশনাল’কে তিনি বলেছেন, ‘ভাইরাস যেকোনো সময় ছড়াতে পারে। তাই আমাদের শিক্ষার্থীরা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি অনুসরণ করছে। হার্টের রুগী এবং প্রবীণ শিক্ষকদের মাদরাসায় না আসতে বলেছি।’

তবে দেশের সর্বাধিক শক্তিশালী ধর্মীয় শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের অধীন মাদরাসাগুলো এখনো খুলেনি। আগামি ৫ আগস্ট থেকে সব মাদরাসা খুলে যাবে। মাদরাসা খোলার আগেই করোনাভাইরাস রোধে যাবতীয় সরঞ্জাম বেফাকের দায়িত্বে মাদরাসাগুলোতে পৌঁছে দেয়া হবে। কিন্তু সব মাদরাসা খোলার আগেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আগামী ১১ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত গত শিক্ষাবর্ষের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বেফাকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে কেন্দ্রীয় পরীক্ষার রুটিনও জানানো হয়েছে।

ইতোমধ্যে যেসব মাদরাসা খোলা হয়েছে, তার ব্যাপারে বেফাকের বক্তব্য ইতিবাচক। সংস্থাটির মুখপাত্র মাওলানা আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে পাকিস্তানজুড়ে মাদরাসা না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মাদরাসা খোলা নিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব চাই না। তবে যেসব মাদরাসা খুলে গেছে, সেখানে হয়তো সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেই খোলা হয়েছে।’

সাধারণত মাদরাসাগুলোতে এক রুমে একসঙ্গে অনেক ছাত্র থাকে। তারা একসঙ্গে খায়, দায়, ঘুমায়। ফলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. কায়সার সাজ্জাদ। তিনি বলেছেন, ‘মাদরাসায় অল্প বয়স্ক শিশুরা প্রায়শই সামাজিক দূরত্বের নিয়মগুলো ভঙ্গ করে। তাই বোর্ডিং মাদরাসাগুলোয় ভাইরাস ছড়াতে পারে। হয়তো আমরা জানতেও পারবো না কতজন আক্রান্ত হয়ে পড়বে।’

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, সমাজিক দূরত্বের নির্দেশনা অনুসরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তান ইতোমধ্যেই ঝুঁকির মধ্যে আছে। পাকিস্তান ইন্সটিটিউট ফর পিস স্টাডিজের প্রধান আমির রানা বলেছেন, ‘জমায়েত হলো করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার হটস্পট। তাই সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার অনুমতি দেয়নি। তবুও যারা খুলছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’

তবে দেশটির আলেমসমাজ মনে করছেন, ধর্মীয় শিক্ষাকে বন্ধ করে রাখা উচিত নয়। বরং সমাজের মানুষকে ইসলামি শিক্ষার সাথে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া উচিত। আর মাদরাসাগুলোও সতর্কতার সঙ্গেই খুলছে। বেফাকভুক্ত মাদরাসাগুলোয় করোনা প্রতিরোধে যাবতীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দিবে বেফাক নিজেই।