‘পৃথিবীর সবাই মনোরোগী’: আধুনিক মনস্তত্ত্ব কি অপবিজ্ঞান?

‘পৃথিবীর সবাই মনোরোগী’: আধুনিক মনস্তত্ত্ব কি অপবিজ্ঞান?

মুজাহিদুল ইসলাম:

মানুষের অঙ্গ-প্রতঙ্গের যেমন বিভিন্ন রোগ হয়, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞান অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থাকে মানসিক রোগ হিসেবে চিহিৃত করে। তবে মানসিক রোগের লক্ষণ হিসেবে বর্তমানে এমন সকল আচরণকে চিহিৃত করা হচ্ছে, যাকে খোদ শাস্ত্র-বিশেষজ্ঞগণ অতিরঞ্জিত, স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য হুমকি এবং ব্যবসায়িক মানসিকতার অভিপ্রায় বলে অভিহিত করছেন।

মেন্টাল ডিসঅর্ডারের লক্ষণ-নির্দেশিকা প্রণয়নটিমের লিডার প্রখ্যাত মনোবিদ আলান ফ্রান্সিস অবসর গ্রহণের পর আমেরিকান সাইক্লোজিক্যাল কমিটির আমন্ত্রণে সানফ্রান্সিসকো গিয়েছিলেন আমেরিকা। কিন্তু সেখানে সেমিনারে আলোচকগণ মানসিক রোগের লক্ষণ হিসেবে এমন সকল আচরণকে তুলে আনার চেষ্টা করছিলেন, যা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তিনি অবাক হচ্ছিলেন, মানুষের স্বাভাবিক আচরণকে মেন্টাল ডিসঅর্ডারের লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরে কীভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধার করা হচ্ছে! কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য মানুষের ভেতরের অটো বায়োলজিক্যাল সিস্টেমকে ধীরে ধীরে মেডিসিন নির্ভর করা হচ্ছে!

এই লেখায় প্রখ্যাত মনোবিদ আলান ফ্রান্সিসের সেই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হবে।

মানসিক রোগের লক্ষণ-নির্দেশিকা

গত শতাব্দীর আশির দশকে মানসিক রোগের লক্ষণ-নির্দেশিকার খুব একটা গুরুত্ব ছিল না। তবে ধীরে ধীরে গুরুত্ব বাড়তে থাকে। নতুনভাবে মানসিক রোগের লক্ষণ-নির্দেশিকায় উদ্বেগ, বিস্মৃতি, অস্বাস্থ্যকর আহার, সুস্বাদু খাবার–এমনকি মুরগির রান খাওয়ার মানসিকতাকে নিউরোটিক ডিসঅর্ডারের কারণ হিসেবে চিহিৃত করা হয়।

মানসিক রোগ কী?

মানসিক রোগ কী, তা নির্ধারণের জন্য মানসিক সুস্থতার মানদণ্ড নির্ধারণ জরুরি। মানসিক সুস্থতা একটি আপেক্ষিক বিষয়। কোনো আচরণ একটি সংস্কৃতিতে রোগলক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হলে অন্য সংস্কৃতিতে সাধারণ আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই দরকার আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের মানদণ্ড। তবে বিপত্তি হলো মানদণ্ডটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক হয় না। সাধারণত অবসাদ, ক্ষুধামন্দা, ঘুমের ব্যাঘাত, হতাশা ও মনোযোগহীনতা–এই পাঁচটি লক্ষণ যদি একাধারে দুই সপ্তাহ কারও ভেতর থাকে, তাকে মারাত্মক হতাশাজনিত মানসিক রোগী হিসেবে চিহিৃত করা হয়। পাঁচটির মধ্যে চারটি বা পাঁচটির কোনো একটি যদি এক সপ্তাহ কারও ভেতর থাকে, তাকেও ভিন্ন মানসিক রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ডাক্তার ফ্রান্সিস বলেন, আসলে রোগ নির্ণয়ে কোনো জাদুকরী মানদণ্ড নেই। খুব সহজেই মানুষের ভেতর লক্ষ করলে এটাকে ছয়-সাতটা উপসর্গে নেয়া সম্ভব।

মারাত্মক হতাশা সবসময় কি তীব্র হয়?

মানসিক পীড়া আসলে কল্পনার চেয়েও কঠিন। মানুষকে বোঝানো দুষ্কর হয়, কেমন লাগছে। অনেক সময় মারাত্মক হতাশাজনিত রোগের লক্ষণ অবসাদ, ক্ষুধামন্দা, ঘুমের ব্যাঘাত, হতাশা ও মনোযোগহীনতা আমাদের স্পর্শ করে, যা প্রকৃতপক্ষে তীব্র হতাশাজনিত কিছু নয়। এখন এই স্বাভাবিক মানসিক আচরণকে মেন্টাল ডিসঅর্ডার বিবেচনা করে যদি ঔষধ গ্রহণ করা হয়, তবে তা মানুষের ভেতরের অটো সিস্টেমকে দুর্বল করে দেবে। স্বাভাবিক দুশ্চিন্তা কীভাবে রোগের সমার্থক হতে পারে? মানুষের জীবন থেকে অসুস্থতা, অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক সমস্যার বিষয়কে তো দূরে রাখা সম্ভব নয়, এখন যদি জীবনের কোন ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ার কারণে টানা দুই সপ্তাহ আপনি চিন্তা, মনোযোগহীনতা, ক্ষুধামন্দা ও নিন্দ্রা-সমস্যায় ভোগেন, এটাকে কি তবে মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে? কিন্তু স্বাভাবিক মানসিক রোগ নির্দেশিকা অনুসারে এটা মারাত্মক হতাশাজনিত (Major Depressive Disorder) রোগের লক্ষণ হিসেবে কিন্তু বিবেচনা করা হয়।

আঘাত-পরবর্তী স্মৃতিমন্থন কি মানসিক রোগ?

মারাত্মক হতাশার উপসর্গ শুধু পাঁচটির মধ্যে সীমাবন্ধ নয়। বলা হয়ে থাকে, পুরাতন স্মৃতির মানসিক পীড়াও এর মধ্যে পড়ে। কিন্তু মানুষের জীবন তো এমনই। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তাকে চলতে হয়। মানুষ এ ধরনের নেতিবাচক স্মৃতিমন্থন করতে চায় না। কিন্তু পুরাতন স্মৃতি তো তাড়া করে বেড়ায়। তবে কি এই নেতিবাচক স্মৃতির দীর্ঘ মন্থনের মানুষকে (Post-Traumatic Stress Disorder) রুগী বলা হবে? অথচ স্মৃতিমন্থন স্বাভাবিক মানসিক ক্রিয়া। এটাকে মেন্টাল ডিসঅর্ডারের উপসর্গ বলা যায় না। কারণ, ধীরে ধীরে স্মৃতি ও ছবি মানুষের নিকট ক্ষীণ হয়ে আসে, স্মৃতির ভয়াবহতা হ্রাস পায়।

মানসিক ঔষধ শরীরের জন্য হুমকি

মানুষের শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অস্থিরতার স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধব্যবস্থা প্রাকৃতিকভাবে মানুষের ভেতর রয়েছে। যখন এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই মানুষের স্বাভাবিক ক্রিয়া বিঘ্নিত হয়। আক্রান্ত হয় রোগে, তারপর ঘটে মৃত্যু। ক্যান্সার, ফ্যাট, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিকসের মতো রোগের কারণ হিসেবে অটো ব্যবস্থা ভেঙে পড়াকে দায়ী করা হয়। যখন এইচআইভির কার্যকর প্রতিষেধক আবিস্কৃত হয়নি, পরীক্ষার পর আক্রান্ত রোগীরা ভেঙে পড়ত। আক্রান্ত রোগীরা কাউন্সিলিংয়েংর মাধ্যমে দুই-তিন সপ্তাহ পর পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় তাদের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে ফিরে যেতে পারত।

তেমনি রাগ, শোক, কষ্ট ও ভয়ের মতো অনুভূতি মানুষের ভেতরের ব্যালেন্স সিস্টেমের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আমরা সবাই কি রোগী?

আজ আমাদের অবস্থার জন্য আসলেই করুণা হয়। আমাদের ঔষধ গ্রহণ করতে বলা হয়, কিন্তু শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য, ধুমপান ও নেশা দ্রব্য পরিহারে উৎসাহ দেয়া হয় না। এখন আমি-আপনি একটু সুখানুভূতি কম অনুভব করছি, কিংবা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে ব্যর্থ হচ্ছি, তাই বলে আমরা মানসিক রোগীর জগতে অন্তর্ভূক্ত হবো। আর যদি বিষয়টি আমার-আপনার শিশু সন্তান বা ভাইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়, বাবুটা চুপচাপ বা বেশি চঞ্চল, তবে তো সে অবশ্যই মনোজাগতিক রোগের সদস্য হবেই। তাকে ঔষধ গ্রহণ করতেই হবে।

রোগী বাড়লে প্রফিট কোম্পানির

মানসিক রোগের লক্ষণ হিসেবে যখন গবেষকগণ অমনোযোগিতাকে চিহ্নিত করেন, তখন গবেষকগণ রোগীর সংখ্যা ১৫% বেড়ে যাবে বলে আশা করেন। কিন্তু রোগের লক্ষণ হিসেবে রেডিও, টেলিভিশন ইত্যাদিতে অমনোযোগিতার কথা প্রচারের ফলে নজিরবিহীনভাবে তা আরও তিনগুণ বেড়ে যায়। কোম্পানির দায় রোগীদের প্রতি নয় বরং তাদের শেয়ার হোল্ডারদের প্রতি। সবার লক্ষ্য থাকে কীভাবে তার কোম্পানি সর্বাধিক বিক্রি করতে পারে। রোগের লক্ষণ যত বাড়ানো যাবে, কোম্পানির লাভ তত বাড়বে।

মানসিক রোগের লক্ষণ নির্ণয়কারী গবেষকদের অধিকাংশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইউরোপের বিভিন্ন অষুধ কোম্পানির সাথে রয়েছে। ব্যবসায়িক কোম্পানিগুলোর বাৎসরিক লাভ ৭০০ বিলিয়ন ডলার। ঔষধের মার্কেটিংয়ে তারা হতাশার শিকার ও গুটিয়ে যাওয়া যুবকের পিকচার দ্বারা প্রচারাভিযান চালায়। পেপার-পত্রিকায় ‘ডাক্তারকে আপনার মানসিক সমস্যা বলুন’ শিরোনামে চলতে থাকে প্রচারণা।

বিভিন্ন কোম্পানির মার্কেটিংয়ের অনিয়ম বোঝা যায়, যখন শুধুমাত্র ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঔষধ-কোম্পানিকে ১২ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। ২০১৬ সালে মানুষকে ভুল তথ্য দ্বারা অষুধের মার্কেটিংয়ে বিভিন্ন কোম্পানিকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার জারিমানা করা হয়। যার অধিকাংশ মানসিক রোগের সাথে সংশ্লিষ্ট।

প্রকৃত রোগের চিকিৎসা করতে হবে এবং ব্যবসায়িক মানসিকতা ত্যাগ করে মানবকল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে চিকিৎসা শাস্ত্রের দিকপালদের। তবেই প্রকৃতিপ্রদত্ত বায়োলজিক্যাল ক্লককে মানুষ সংরক্ষণ করতে পারবে।

বিজ্ঞাপন