বাজেট : ধর্মীয় সমাজে নেই গঠনমূলক আলোচনা

রাগিব রব্বানি

গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। আগের ধারাবাহিকতায় এবারও বৃদ্ধি পেয়েছে বাজেটের সামগ্রিক আকার ও খাতওয়ারি আয়-ব্যয়ের পরিমাণ। এবারের বাজেটের আকার ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।

বরাবরের মতো এবারের বাজেটও উচ্চাভিলাষী এবং এমন বাজেট ধনীকে আরও ধনী আর গরিবকে আরও গরিব করবে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের।

বাজেট পেশের পর বাজেটের ভালো-মন্দ নিয়ে নানা অঙ্গন থেকে আলোচনা উঠলেও ধর্মীয় সমাজে এ নিয়ে নেই গঠনমূলক কোনো পর্যালোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ধর্মীয় সমাজের সাধারণ শ্রেণীর মধ্যে ভাসাভাসা ও তীর্যক কিছু মন্তব্য দৃষ্টিগোচর হলেও ধর্ম বিষয়ে বিজ্ঞজনদের বিশ্লেষণধর্মী কোনো আলোচনা চোখে পড়ে না। অথচ প্রতিবছরই প্রস্তাবিত বাজেটে রাষ্ট্রীয় ঋণের সুদ পরিশোধ খাতে সর্বোচ্চ বা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়। যথা নিয়মে এ বছরও ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা বাজেটের মধ্য থেকে কেবল বিভিন্ন জায়গা থেকে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধ খাতেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭ হাজার ১ শো ১৮ কোটি টাকা।

অথচ সুদ ইসলামে কঠোরভাবে হারাম। ৯০ ভাগ মুসলমানের রাষ্ট্র কীভাবে এতটা সুদী ঋণ-নির্ভর হয়ে যায়, ধর্মীয় পণ্ডিতগণের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির কোনো প্রয়াসই লক্ষ করা যায় না। বাজেটের আগে-পরে প্রস্তাবনা ও বিশ্লেষণেও থাকে না তাঁদের কোনো উদ্যোগ কিংবা অংশগ্রহণ। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওলামায়ে কেরাম রাষ্ট্রের বড় একটা পক্ষ এবং দেশের জনগণের ওপর তাঁদের আশ্চর্য রকমের একটা প্রভাব রয়েছে। বাজেটের আগে প্রস্তাবনা আকারে যদি তাঁরা কিছু বিষয় উপস্থাপন করতে পারতেন সরকারের কাছে এবং বাজেট পেশের পর যদি এ নিয়ে গঠনমূলক বিশ্লেষণ করতেন, তবে এর কম-বেশি একটা প্রভাব পড়ত বাজেটে। এমনটাই মনে করেন সচেতন মহল।

এ ব্যাপারে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে কথা হয়েছিল আলেম লেখক ও ইসলাম টাইমস টোয়েন্টি ফোরের সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের সঙ্গে। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘বাজেট আলোচনায় ওলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণ যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি হলেও এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও ওলামায়ে কেরাম—উভয়েরই অনাগ্রহ আছে।

‘রাষ্ট্রপক্ষের অনাগ্রহিতার কারণ, ওলামায়ে কেরামকে তারা অর্থনীতি বিষয়ে কথা বলার দিক দিয়ে খুব একটা উপযোগী মনে করে না। আর ওলামায়ে কেরামের অনাগ্রহ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ইসলাম-বিরোধী হবার কারণে।

‘তাঁরা যদি অর্থনীতি কিংবা বাজেট নিয়ে কথা বলেন, তবে ইসলামের নির্দেশনাটাই তো বলবেন। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোই দাঁড়িয়ে আছে সুদী ঋণের ওপর, বাজেটের বড় একটা অংশে থাকছে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক খাতসমূহ, যাকে রাষ্ট্রপক্ষ জায়েজ বানিয়ে রেখেছে, তো এখানে ইসলামি বিধানটা বলে তাকে উচ্চকিত করা অনেকটা অসম্ভব। আমার মনে হয়, ওলামায়ে কেরাম এ কারণেই বাজেট বা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে কথা বলতে আগ্রহ পান না।

‘তবে হ্যাঁ, মন্দের ভালো বলে একটা ব্যাপার আছে, পঁচনশীল একটা কাঠামোকে পুরোপুরি পঁচে যাওয়া থেকে রক্ষা করলে কাঠামোর অন্তত কিছুটা অংশ তো রক্ষা পাবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করা যায়। মাসিক আল কাউসারের সম্পাদক মহোদয় যেটা প্রায় প্রতিবছরই করে থাকেন। ফিকহি মুয়ামালাত সম্পর্কে যাঁরা অভিজ্ঞ, এই পর্যালোচনায় তাঁদের অংশগ্রহণও দরকারি। এবং আমার মনে হয় ধীরে ধীরে তাঁরা অংশগ্রহণ করছেনও।

‘ওলামায়ে কেরামের মধ্যে যাঁরা অর্থনীতি ভালো বুঝেন, এ নিয়ে পড়াশোনা করছেন, আমার আশাবাদ, তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে একটা কিছু করবেন। সেটা ফোরাম আকারেও হতে পারে। শুধু বাজেট কেন, রাষ্ট্রের যেকোনো অর্থনৈতিক বিষয়-আশয়ে ইসলামের আলোকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিটা পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁরা সামনে নিয়ে আসবেন। চলমান সিস্টেমের তুলনায় ইসলামের বিধান কতটা উপকারী, কার্যকর, আধুনিক এবং বাস্তবসম্মত—একটা অভিন্ন প্লাটফর্ম থেকে রাষ্ট্রকে তা দেখিয়ে দেবেন। এতে রাষ্ট্রের অর্থনীতি-বিষয়ক যেকোনো সিদ্ধান্তে অন্তত কিছুটা হলেও প্রভাব পড়বে।’