মওলানা ভাসানীর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী : সংগ্রামমুখর জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

মওলানা ভাসানীর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী : সংগ্রামমুখর জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

আবু তাশফি :

১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে সিরাজগঞ্জের ধনপাড়া গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর। পিতা শরাফত আলী। মাত্র ছয় বছর বয়েসে মওলানা ভাসানী পিতাকে হারান। ১১ বছর বয়সে মা এবং দুই ভাইকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। চাচার প্রতিপালনে কিছুদিন থাকার পর একদিন অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।

সিরাজগঞ্জে তখন ইরাকের ধর্মপ্রচারক এক আলেমের আগমন ঘটেছে। নাম তাঁর নাসিরুদ্দিন বোগদাদি। কিশোর আবদুল হামিদ দুবছরের মতো সময় নাসিরুদ্দিন বোগদাদির সান্নিধ্য গ্রহণ করে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করেন। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরুদ্দিন বোগদাদির নির্দেশে জয়পুরহাটজেলার পাঁচবিবি উপজেলার জমিদার শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরীর বাড়িতে গমন করে জমিদারের পরিচালিত স্থানীয় একটি মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিন-চার বছর এখানে শিক্ষকতার পর ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরুদ্দিন বোগদাদির সঙ্গে আসাম গমন করেন। সেখানে আসামের বাঙালি মুসলিমদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি আপন পির নাসিরুদ্দিন বোগদাদির কাছ থেকে গ্রহণ করছিলেন ধর্মীয় শিক্ষার উচ্চতর পাঠ। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরুদ্দিন বোগদাদির নির্দেশে দেওবন্দ গমন করেন এবং দুই বছর সেখানে অবস্থান করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তারপর আবার ফিরে আসেন আসামে।

১৯১৭ খিষ্টাব্দে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে গেলে তাঁর ভাষণ শুনে ভাসানী অনুপ্রাণিত হন। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দশ মাস কারাদ- ভোগ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ পার্টি গঠন করলে ভাসানী সেই দল সংগঠিত করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৫ সালে তিনি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার জমিদার শামসুদ্দিন মুহাম্মদ চৌধুরী, যাঁর বাড়িতে কৈশোরে বেশ কয়েক বছর থেকেছিলেন, তাঁর মেয়ে আলেমা খাতুনকে বিয়ে করেন।

১৯২৬ সালে সহধর্মিণীকে নিয়ে পুনরায় আসাম গমন করেন এবং আসামে প্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯২৯-এ আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসানচরে প্রথম কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করেন। ভাসানচরের কৃষকদের অধিকার আদায় ও জীবনমানের উন্নতি সাধনে অক্লান্ত পরিশ্রম করার কারণে ভাসানচরের মওলানা হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। পরে ভাসানচরের দিকে নিসবত করে তিনি হয়ে ওঠেন ভাসানীর মওলানা। এরপর থেকে তাঁর নামের শেষে ভাসানী শব্দ যুক্ত হয়।

১৯৩০-১৯৬৯ সাল পর্যন্ত প্রায় সবকটি আন্দোলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভূমিকা ছিল অনন্য।

১৯৪৫-৪৬ সালে আসাম জুড়ে বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙ্গাল খেদাও’ আন্দোলন শুরু হলে ব্যাপক দাঙ্গা দেখা দেয়। এ সময় বাঙালিদের রক্ষার জন্য ভাসানী বারপেটা, গৌহাটিসহ আসামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ান। পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়ে ১৯৪৭ সালে আসামে গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৮-এ মুক্তি পান। এরপর তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে ফিরে আসেন। ১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে পূর্ববঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ১১ অক্টোবর আরমানীটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় খাদ্য সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবী করা হয় এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মওলানা ভাসানী ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ১৯৪৯-এর ১৪ অক্টোবর গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ হন।

বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২-এর ৩০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার বার লাইব্রেরি হলে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সহযোগিতার কারণে গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ মাস কারানির্যাতনের শিকার হন। অবশ্য জনমতের চাপে ১৯৫৩ সালের ২১ এপ্রিল তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবি উত্থাপন করেন মওলানা ভাসানী। ১৯৭১-এর মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রদান করেন, তার আগে একই বছরের ১৮ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের জন্য শেখ মুজিবের প্রতি আহ্বান জানান।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত গমন করেন এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। তার আগে ২৫ মার্চ রাতে টাঙ্গাইলের সন্তোষে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। হামলা শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি টাঙ্গাইল ছেড়ে তাঁর পিতৃভূমি সিরাজগঞ্জে চলে যান। পাক বাহিনী তাঁর সন্তোষের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। তিনি ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে নৌকাযোগে ভারত সীমানা অভিমুখে রওনা হন।

অবশেষে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর সাহায্যে মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলাম ১৫/১৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ অতিক্রম করে আসামের ফুলবাড়ি নামক স্থানে উপস্থিত হন। পরে তাঁদের হলদীগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়া হয়।

এরপর মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলামকে বিমানে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং পার্ক স্ট্রিটের কোহিনুর প্যালেসের ৫ তলার একটি ফ্ল্যাট তাদের অবস্থানের জন্য দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরে মওলানা ভাসানী একটি বিবৃতি প্রদান করেন যা ভারতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া মাওলানা ভাসানী চীনের নেতা মাও সেতুং, চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যে পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। সেজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন। পাশাপাশি মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান।

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। ৩১ মে এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই। ৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মওলানা ভাসানী কলকাতা ছাড়াও দেরাদুন, দিল্লি ও অন্যান্য স্থানে অবস্থান করেন। পরবর্তীকালে অনেকে অভিযোগ করেন যে ভারতে থাকাকালীন তিনি নজরবন্দি অবস্থায় ছিলেন।

১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ভারত থেকে তিনি নতুন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি কৃষক শ্রমিক ও এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমানের উন্নতির জন্য রাজনীতি করে গেছেন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে অসুস্থ শরীর নিয়ে ফারাক্কা অভিমুখে লাখো কৃষক-শ্রমিককে সাথে নিয়ে ঐতিহাসিক লংমার্চ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চের কয়েক মাসের মাথায় ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিংবদন্তি ও নির্লোভ এ রাজনীতিবিদ ইন্তেকাল করেন। তাঁকে টাংগাইল জেলার সদর উপজেলার উত্তর-পশ্চিমে সন্তোষ নামক স্থানে পীর শাহজামান দীঘির পাশে সমাধিস্থ করা হয়।

আজ ১৭ নভেম্বর। মওলানা ভাসানীর ৪৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুবার্ষিকীতে মজলুম এই জননেতা’র প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম।