মহিলা মাদরাসা : বাড়ছে নারীদের ধর্মীয় শিক্ষায় অংশগ্রহণ

রাগিব রব্বানি

বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে এককালে নারীদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য শরয়ি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও বর্তমানে কওমি শিক্ষাধারায় ব্যাপকভাবে গড়ে উঠছে স্বতন্ত্র মহিলা মাদরাসা। মহিলা মাদরাসার এই বিস্তৃতির ফলে অভিভাবকরাও এখন নিজেদের কন্যা সন্তানকে ধর্মীয় পদ্ধতিতে উচ্চশিক্ষা দানে আগ্রহী হচ্ছেন। শরয়ি পর্দা ও নিরাপত্তার ভেতর এসব মাদরাসায় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে প্রতি বছর ‘আলেমা’ হচ্ছেন প্রায় ৭ হাজারের মতো মেয়ে।

কওমি শিক্ষাধারায় প্রচলিত দরসে নেজামির ওপর ভিত্তি করে এসব মাদরাসায় পাঠদান করা হলেও পুরুষ মাদরাসাগুলোর তুলনায় এসব মাদরাসার সিলেবাস ও অধ্যয়নের সময়কাল সংক্ষিপ্ত। ফলে একজন ছেলেশিক্ষার্থী জন্য দরসে নেজামির সবগুলো ক্লাস অতিক্রম করে আলেম হতে ১২ থেকে ১৪ বছর সময় লাগলেও একজন মেয়েশিক্ষার্থী ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১১ বছরে পাশ করতে পারছেন দাওরায়ে হাদিস।

জানা যায়, রাজধানীতে সর্বপ্রথম মহিলা মাদরাসার সূচনা করেন মাওলানা আবদুল কুদ্দুস নামে মিরপুরের এক আলেম। তারপর আশির দশকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি মহিলা মাদরাসা। নব্বইয়ের দশকে এ সংখ্যা বাড়লেও খুব বেশি বিস্তৃতি লাভ করেনি। বিস্তৃতির সূচনা হয় শূন্যের দশকে এসে। এবং সেই বিস্তৃতি আরও ব্যাপকতর হয়ে উঠেছে চলতি দশকে।

বর্তমান বাংলাদেশে মহিলা মাদরাসার সংখ্যা ঠিক কত, জানা না গেলেও অনুমান করা যায়, সারা দেশে এই ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অন্তত ৩ থেকে সাড়ে তিন হাজার। এর মধ্য থেকে সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের অধীনে রয়েছে প্রায় ২ হাজারের মতো মাদরাসা। বেফাকের চারটি মারহালায় নেওয়া কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় এসব মাদরাসা থেকে প্রতি বছর ৩০ হাজারেরও অধিক ছাত্রী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। এ ছাড়া সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে প্রায় ৭ হাজার ছাত্রী।

আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ কওমি মহিলা মাদরাসা আল-জামিআতুত তাইয়িবাহ হজরত শাহ সুলতান রহ., সুলতানপুর, গহরপুর, বালাগঞ্জ, সিলেট। শুরুর দিকে মাদরাসাটির ছাত্রী সংখ্যা নিতান্ত অল্প হলেও ক্রমাগতভাবে বেড়ে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন এই মাদরাসাটিতে। সিলেট বিভাগের প্রতিটা জেলা থেকে আগত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রী আবাসিক ব্যবস্থাপনায় পড়াশোনা করছে এই প্রতিষ্ঠানে।

সুলতানপুর মাদরাসার শিক্ষাসচিব মাওলানা নুমানুল হক চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয় ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে। ছাত্রীসংখ্যা এবং পড়াশোনার মান বিচারে তিনি জানাচ্ছেন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এবং বিশালায়তনের ক্যাম্পাস সম্বলিত কওমি মহিলা মাদরাসা হিসেবে সুলতানপুর প্রথম স্থানেই আছে।

মাওলানা নুমানুল হক জানান, বেফাক ও হাইআতুল উলয়ার সিলেবাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাদরাসাকর্তৃপক্ষ প্রণীত সম্পূর্ণ নিজস্ব সিলেবাসে সেখানে পাঠদান করা হয়। তিনি বলেন, সিলেট জেলার বালাগঞ্জ ও উসমানিনগর থানার সবকয়টি মহিলা মাদরাসা এবং সিলেট বিভাগের অন্যান্য জেলার আরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা মাদরাসা সুলতানপুর প্রণীত এ সিলেবাস অনুসরণ করে পাঠদান করে। প্রতিটা মাদরাসার পড়াশোনার মানই ভালো ও প্রশংসনীয় বলে জানান মাওলানা নুমানুল হক চৌধুরী।

মাওলানা নুমানুল হক আরও জানান, কওমি অঙ্গনে মহিলা মাদরাসার এই বিস্তৃতির কারণে ধর্মীয় শিক্ষায় মেয়েদের শিক্ষিত করতে সাধারণ অভিভাবকদের ঝোঁক দিনদিন আশ্চর্যরকমভাবে বাড়ছে।

কিন্তু মহিলা মাদরাসা দিন দিন বাড়লেও অনেক মাদরাসায় শরয়ি পর্দা এবং পড়াশোনার মানের ঘাটতি রয়েছে। নেই সমন্বিত কোনো সিলেবাস। বেফাক-পরীক্ষার জামাতগুলোতে বেফাকের নির্ধারিত সিলেবাস থাকলেও অন্যান্য জামাতগুলোর সিলেবাসের অবস্থা হযবরল। যে যার মতো করে সিলেবাস সাজাচ্ছে, ফলত ছাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনে থেকে যাচ্ছে ব্যাপক মাত্রার ঘাটতি।

অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠারও ব্যাপক অভিযোগ আছে। তাছাড়া সিংহভাগ মহিলা মাদরাসায় আবাসিক ফি, বেতন ও খোরাকির টাকা বাধ্যতামূলক হবার কারণে দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ পাচ্ছে না মাদরাসায় পড়ার।

এসব বিষয়ে কথা হয়েছিল কওমি মাদরাসা শিক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষক, লেখক ও শিক্ষক মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহর সঙ্গে। মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহ বলেন, মাদরাসাশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ এবং স্থানে স্থানে মহিলা মাদরাসা গড়ে ওঠার এই প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার এবং খুশির বিষয়। তবে অপরিকল্পিতভাবে, ভাড়া বাসায়, বাড়িতে, যেখানে সেখানে মাদরাসা খুলে বসা উচিত না। শুধু মহিলা মাদরাসা না, পুরুষ মাদরাসাও, সার্বিক দিক বিবেচনা করে, এক মাদরাসার সঙ্গে আরেক মাদরাসার অবস্থান স্থলের মোটামুটি দূরত্ব বজায় রেখে খোলা উচিত।

মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহ বলেন, ‘এখন তো একই বিল্ডিংয়ে একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মতো ঘটনাও ঘটছে। তাছাড়া মহিলা মাদরাসায় ব্যাপকভাবে পুরুষ শিক্ষক, শরয়ি পর্দার অব্যবস্থাপনা, সিলেবাসে পরিকল্পনার অভাব ইত্যাদি সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই মহিলা মাদরাসার ব্যাপারে নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ বলতে আমি সরকারি নিয়ন্ত্রণ বলছি না, দেশের নেতৃস্থানীয় ওলামায়ে কেরামই এই কাজটি করতে পারেন, এবং এটা তাঁদের পক্ষে সম্ভব বলেও আমি মনে করি।

মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহ বলেন, মহিলা মাদরাসাগুলোতে সম্পূর্ণ মহিলা শিক্ষিকা দ্বারা পাঠদানের বিষয়ে ব্যবস্থাগ্রহণও জরুরি হয়ে পড়েছে, কেননা এটা ছাড়া শরয়ি পর্দা রক্ষা করা এবং অনভিপ্রেত ঘটনা এড়ানো এখন অনেকটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে; অনভিপ্রেত ঘটনা আমাদের চোখের সামনে অনেক ঘটছেও, মিডিয়ায় হয়তো আসছে না। তাছাড়া মহিলা মাদরাসার জন্য সমন্বিত একটা সিলেবাসও অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহ আরও বলেন, সিলেবাস বিষয়ে আমার দীর্ঘ কথা এবং পর্যবেক্ষণ আছে, সেদিকে যাচ্ছি না। শুধু বলব, কেবল মহিলাই না, পুরুষদের সিলেবাসের যে অবকাঠামো, সেটাও আমাদের ঢেলে সাজানো উচিত।