মাদরাসায় মেধাবী শিক্ষক সংকট : করোনা আরেকটি পেরেক ঠুকে দিবে

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর:

সংকটের শুরুটা আগেই হয়েছিল, করোনা এসে সেই সংকটের গোড়ায় জোরসে আরেক ধাক্কা মেরে দিল। বলছিলাম কওমি মাদরাসায় মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষক সংকটের কথা। বেশ ক’ বছর ধরে বন্ধু-বান্ধব যারা মাদরাসায় পড়ান তাদের সঙ্গে আলাপ করেছি বিষয়টা নিয়ে—কওমি মাদরাসায় কি সত্যিই মেধাবী শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে? এদিক সেদিক ঘুরিয়ে তাদের সকলের স্বীকারোক্তিই ছিল ইতিবাচক—হ্যাঁ, মেধাবী শিক্ষার্থীরা মাদরাসা থেকে পাশ করে মাদরাসায় শিক্ষকতার চেয়ে অন্যকোনো পেশা নির্বাচনে অধিক আগ্রহী হচ্ছেন।

কেন এভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা মাদরাসায় পড়ানোর মতো ‘সম্মানজনক’ পেশা ছেড়ে অন্য পেশাকে নিজেদের গন্তব্য করছেন? এর উত্তর বিবিধ। মাদরাসাগুলোতে ‘অসম্মানজনক’ বেতন-ভাতা, বেতন পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতা, মাদরাসায় মুহতামিম/প্রিন্সিপাল/পরিচালকদের একচ্ছত্র আধিপত্য, শিক্ষক নির্বাচনে পরিচালকদের স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি আরও নানা ধরনের বিষয় আছে যেগুলো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে মাদরাসার শিক্ষক হতে অনুৎসাহিত করছে।

আশংকা করা হচ্ছিল, এর ফলে মাদরাসাগুলোতে পাঠদান এবং শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী হতে পারে। মাদরাসার দীর্ঘকালীন শিক্ষাধারাও পড়তে পারে নানা সংকটের মুখে। করোনা এসে সেই শংকায় আরেকটি পেরেক ঠুকে দিল।

দুই

করোনা মহামারী পরবর্তী সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর সকলেই মনে করেছিল, মাস-দুই মাস পর হয়তো পরিস্থিতি ফের স্বাভাবিক হয়ে যাবে। মাদরাসাগুলোও তখন সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। কারণ, যখন মাদরাসা বন্ধ হয় তখন পরীক্ষা পূর্ববর্তী প্রস্তুতিমূলক ছুটি (খেয়ার) চলছিল এবং তার পর রমজান মাস সমাগত ছিল, যে সময়টাতে মাদরাসাগুলো এমনিতেও পুরোপুরি বন্ধ থাকে। কিন্তু রমজানের পরও যখন ছুটি দীর্ঘ হতে লাগল তখন স্বাভাবিকভাবে টনক নড়তে লাগল মাদরাসার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদেরও।

দুর্যোগকালীন অবস্থায় পরিবারের ভরন-পোষণ এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মাদরাসার শিক্ষকগণ নানামুখী ব্যবসা, কৃষি বা বিকল্প আয়ের দিকে ঝুঁকতে লাগলেন। এরই মধ্যে কেউ কেউ বিকল্প চাকরি বাকরিও জুটিয়ে নিয়েছেন। অবশ্য এ ছাড়া উপায়ই বা কী ছিল!

এই লকডাউনের সময়টাতে অধিকাংশ মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষকদের বেতন-ভাতার ব্যাপারে আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অনেক মাদরাসা ছুটির সময়টাতে শিক্ষকদের এক টাকাও বেতন দেয়নি, কোনো কোনো মাদরাসা এক-দুই মাসের বেতন দিলেও পরবর্তীতে শিক্ষকদের আর কোনো খবর রাখেনি, হাতেগোনা কয়েকটি মাদরাসা মাত্র তাদের শিক্ষকদের শতভাগ বেতন পরিশোধ করেছে।

মাদরাসাগুলো পরিচালনা করে যেসব শিক্ষাবোর্ড, তারাও এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অবশ্য সাহায্যের ঘোষণা এসেছিল বলে শুনেছিলাম, কিন্তু কোনো শিক্ষক সেই সাহায্যের টাকা পেয়েছেন কি-না, আমার জানা নেই।

রইল বাকি সরকার মহোদয়। সংবাদমাধ্যমে যতদূর জানতে পেরেছি, সরকার কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য আট কোটির অধিক অর্থ সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছিল। তারপর একবার শুনলাম, বোর্ড কর্তৃপক্ষ নাকি মিটিং করে সেই ‘খয়রাতি’ টাকা নেবে না—এমন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। কর্তৃপক্ষ ওই টাকা নাক সিঁটকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। বড়ই মহৎ আঞ্জাম। ‘শির দেগা নেহি দেগা আমামা’ টাইপের স্লোগান প্রযোজ্য হবে এখানে। মাদরাসার শিক্ষকগণ পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকুক তাতে কী? সরকারের সঙ্গে আমরা তো কোনো আপোস করতে পারি না!

ওদিকে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ প্রতি মাসে বেতন পাচ্ছেন। ঈদে বোনাস পেয়েছেন, সামনের ঈদেও পাবেন। কওমি মাদরাসার শিক্ষকগণ গত ঈদেও বেতন-বোনাস পাননি, কুরবানির ঈদেও পাবেন না। সুতরাং খেয়ে-পরে বাঁচতে হলে বিকল্প আয়ের সন্ধান ছাড়া উপায় কী?

মাদরাসাগুলো তো আর তাদের মা-বাপ না যে ঘরে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে।

তিন

এবার তাহলে একটা সিদ্ধান্তে আসা যাক। আমিই বরং প্রশ্ন করি—কেন তাহলে মাদরাসার মেধাবী শিক্ষার্থী/শিক্ষকগণ মাদরাসায় পড়াবেন? তার যথোপযুক্ত বেতন নেই, সঠিকভাবে তার মেধার মূল্যায়ন নেই, তার সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই; না মাদরাসা আর না মাদরাসার হর্তাকর্তা বোর্ড গোত্রীয় কেউ। তবু আপনি তাকে ধর্মরক্ষার অজুহাত দিয়ে, ইসলামি জ্ঞান বিস্তারের মহান দায়িত্বের কথা বলে, ইলমি দরস-তাদরিসের আকাবিরীয় হেকায়েত শুনিয়ে মাদরাসায় পড়ানোর জন্য আটকে রাখবেন! কোন যুক্তিতে?

এটা কি এক ধরনের ব্ল্যাকমেইলিং হয়ে গেল না? সোজাকথায়, ধর্মের কাঁধে বন্দুক রেখে আপনি একজন কওমি শিক্ষককে কেন বছরের পর বছর সামান্য বেতনের আশায় ব্ল্যাকমেইলিং করবেন? এগুলো কি অনৈতিকতা নয়? শিক্ষকদের অল্পেতুষ্টির কথা বলে মাদরাসার প্রিন্সিপাল টয়োটা/নোয়াহ গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করবেন, এগুলো তো ভালো কথা নয়। শিক্ষকদের বেতন হয় না ছয় মাস/আট মাস ধরে অথচ মাদরাসার নতুন ভবন ঠিকই উপরের দিকে উঠছে। এমনতর অবিচার এবং অমানবিক আচরণ মাদরাসায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাদরাসা—যেটি ইসলামের সকল বিধি-বিধান শিক্ষার আতুড়ঘর, সেখানেই যদি ইসলাম পরিপালন না হয় তাহলে মানুষ ইসলাম আর কোথায় গিয়ে খুঁজবে?

চার

যে কাজটি ভবিষ্যতে আবশ্যিকভাবে করতে হবে, হয় শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে, নয়তো মেধাবী শিক্ষক ছাড়াই কল্পনা করতে হবে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার আগামী। যে শিক্ষক বিকল্প পেশায় গিয়ে নিজের আয়ের বন্দোবস্ত নিজেই করে নিয়েছেন, তাকে আবার মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে ফেরানো যাবে কি-না, এটা ঘোরতর সন্দেহের বিষয়। মেধাবী শিক্ষকদের বড় একটি অংশ এই করোনা পরবর্তী সময়ে মাদরাসা থেকে দূরে সরে যাবেন। এটা আপনার মানতে কষ্ট হলেও বাস্তব সত্য এমনই। যিনি নিজে শ্রম দিয়ে মাসশেষে ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারছেন, তিনি কেন মাদরাসার আট-দশ হাজারী বেতনের জন্য তীর্থের কাকের মতো প্রিন্সিপালের সুমর্জির অপেক্ষায় তিন মাস/ছয় মাস ধরে বসে থাকবেন?

‘সম্মানজনক বেতন’ যদিও একটি আপেক্ষিক শব্দ, তবে আমি মনে করি এ ব্যাপারে সরকারি বেতন স্কেলকে মানদণ্ড ধরা যেতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রবেশনারি শিক্ষকের শুরুর বেতন হয় কমপক্ষে ১৮ হাজার টাকা। মাদরাসার শিক্ষকদের জন্যও এই বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হোক। প্রতি বছরই সরকারি বিধি মোতাবেক যেভাবে নির্দিষ্ট হারে বেতন বাড়ে সেভাবে মাদরাসায় বেতন বাড়াতে হবে এবং বছরের বিভিন্ন ছুটি ও উৎসবে নির্ধারিত ভাতার বন্দোবস্তও থাকা বাঞ্চনীয়। যদি এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা যায় তাহলে হয়তো মাদরাসায় মেধাবী শিক্ষক সংকট কিছুটা হলেও রোধ করা যাবে।

সম্মানজনক জীবিকা সবার কাম্য। মাদরাসায় শিক্ষা প্রদানও অন্যতম সম্মানজনক পেশা। কিন্তু সেই পেশাকে ধর্মের কথা বলে, আকাবির আর নববি ইলমের দোহাই দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং করা শিক্ষার নামে সবচে অসম্মানজনক কাজ। এই প্রবণতা থেকে বের হতে না পারলে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সামনে অপেক্ষা করছে অশনি সংকেত।