মুহিউদ্দীন খান : যে কারণে এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক

রাগিব রব্বানি

২৫ জুন, এ দেশে ইসলামি সাহিত্য সাংবাদিকতা ও রাজনীতির অগ্রপথিক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহমতুল্লাহি আলায়হির ইন্তেকালের ৩ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের এ দিনে তিনি ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলাভাষায় আলেম শ্রেণির সাহিত্য ও সাংবাদিকতা চর্চার পেছনে জীবনভর কাজ করে গেছেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ময়দানেও সমান মাত্রায় রেখেছেন সক্রিয় ভূমিকা। তাঁর সম্পাদিত মাসিক মদীনা পত্রিকার মধ্য দিয়ে এ দেশের সব ঘরানার শিক্ষিত মুসলিম জনসাধারণের কাছাকাছি পৌঁছুতে পেরেছিলেন তিনি। বাংলাভাষায় সিরাত ও ইসলামের ইতিহাস চর্চার সূচনা ব্যাপকভাবে তাঁর হাত ধরে এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষণেই হয়েছিল। গণমানুষের কাছে মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবনীচর্চাকে আগ্রহের বিষয়বস্তু বানিয়েছিলেন তিনি তাঁর মাসিক মদীনার মাধ্যমে।

বাংলাদেশে বর্তমানে আলেম ও মাদরাসা-পড়ুয়াদের মধ্যে সাহিত্য-সাংবাদিকতার যে ঝোঁক ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে, এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। তাঁর সম্পাদিত মাসিক মদীনা ও অধুনা বিলুপ্ত সাপ্তাহিক মুসলিম জাহানের কল্যাণে আজকের প্রথিতযশা অনেক লেখক-সাংবাদিকের হাতেখড়ি হয়েছিল।

প্রাসঙ্গিকতা বিচারে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান বর্তমানে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, জানতে চেয়েছিলাম প্রথিতযশা আলেম লেখক মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীনের কাছে।

উত্তরে মাওলানা যাইনুল আবিদীন বলেন, ‘প্রাসঙ্গিকতার বিচারে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহমতুল্লাহ আলায়হি এই সময়ে অনেক অনেক স্মরণযোগ্য মনীষী। রাজনীতির দিক থেকে তিনি কতটা সরব ছিলেন, কতটা সরব ছিলেন বলিষ্ঠ সম্পাদনা ও লেখালেখির বিচারে, তা আলাদাভাবে বিচার করা মুশকিল ছিল। লেখালেখি ও সম্পাদনায় যতটা সক্রিয় ছিলেন, ঠিক ততটাই সক্রিয় ছিলেন তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও। বর্তমান বাংলাদেশের ইসলামি ঘরানার রাজনৈতিক অঙ্গনে যে-একটা শূন্যতা বিরাজ করছে, এই শূন্যতায় মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের মতো তুখোড় ও সচেতন একজন রাজনীতিবিদের অভাব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়।’

মাওলানা আবিদীনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মাওলানা মুহিউদ্দীন খানকে চর্চা করা বর্তমান তরুণ শ্রেণির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তরে তিনি বলেন, ‘অনেক, অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহমতুল্লাহ আলায়হি আমাদের বাংলাদেশে মুসলমানদের চিন্তা নির্মাণ এবং স্বকীয়তা বজায় রেখে তাঁদের সম্মানজনক জীবনযাপন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রথমসারির একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আজকের সচেতন তরুণ, যাঁরা এ দেশে ইসলামের পুনর্জাগরণ চান, ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেন, তাঁরা যদি ইতিহাসের ১০ জন মনীষীকে এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয় ও অনুপ্রেরণা হিসেবে নিতে চান, তাহলে এর মধ্যে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানকে অবশ্যই রাখতে হবে।’

আমরা আমাদের অঙ্গন থেকে মাওলানা খানকে–তাঁর জীবদ্দশায় হোক কিংবা তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী এই তিন বছরে–কতটা মূল্যায়ন করতে পেরেছি? এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রথিতযশা এ আলেম লেখক বলেন, ‘এটা খুব দুঃখজন ব্যাপার। শুধু মুহিউদ্দীন খানই নন, আমাদের স্মরণীয় বরণীয় এবং অনুসরণীয় কোনো ব্যক্তিত্বকেই আমাদের জায়গা থেকে আমরা সেভাবে কখনও মূল্যায়ন করতে পারিনি। এটা বড় ধরনের একটা দুর্বলতা আমাদের ইসলামি অঙ্গনের জন্য।’

মাওলানা যাইনুল আবিদীন বলেন, ‘মুহিউদ্দীন খান রহমতুল্লাহ আলায়হির কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং স্বপ্নের যে জায়গাটি ছিল, সেটা হচ্ছে লেখালেখি। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি এ দেশের সাধারণ শ্রেণির মানুষের কাছে ইসলামের শুদ্ধ বার্তাগুলোকে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করে গেছেন জীবনভর। আজকে আমরা যাঁরা লেখালেখির সঙ্গে জড়িত, আমাদের ওপর অনেক ঋণ আছে তাঁর। তাই আমরা যদি কাউকে বড় পরিসরে মূল্যায়ন করতে চাই, তাহলে এরজন্য সবচেয়ে উপযোগী ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন বর্তমানে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান।’

মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন টানা একদশকের মতো সময় কাজ করেছেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত অধুনা বিলুপ্ত সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান পত্রিকায়। মাওলানা খানের সঙ্গে এই দশ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে মাওলানা আবিদীন বলেন, ‘মুহিউদ্দীন খান কাজ শেখাতে এবং কাজে উৎসাহ ও পরামর্শ দিতে অতুলনীয় ছিলেন। মুসলিম জাহানে যখন কাজ করি, তখন আমি বয়সে একদম তরুণ, তিনি আমাকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়েছেন। কোনটা কীভাবে করতে হবে যত্নসহকারে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে কাজ করার সীমাহীন প্রেরণা পেয়েছি। মাসিক মদীনার কুরআন সংখ্যা বেরিয়েছিল ৯৬ সনে। অনেক সমৃদ্ধ এবং বিপুল সাড়া ফেলেছিল এই সংখ্যাটি। কুরআন সংখ্যায় তিনি আমার কাছ থেকে এত পরিমাণে কাজ নিয়েছেন যে, পরবর্তী সময়ে ১০ ফর্মা কলেবরে আমার স্বতন্ত্র একটি বই হয়েছে এসব কাজ দিয়ে। মোটকথা তরুণদের দিয়ে তিনি কাজ করাতে পারতেন এবং এমনভাবে কাজ করাতেন, এতে বিরক্তিবোধের বদলে আরও উৎসাহ তৈরি হতো। আল্লাহ পাক তাঁর ওপর রহম করুন।’