রাষ্ট্রধর্ম কি জরুরী : মাওলানা মুসা আল হাফিজের সঙ্গে আলাপ

রাকিবুল হাসান :

বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা চালু করার দাবিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ১০ জনকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। রোববার (১৬ আগস্ট) নোটিশটি পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অশোক কুমার সাহার পক্ষে পাঠানো লিগ্যাল নোটিশটি পাওয়ার দিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা শুরু করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জনগণের পক্ষে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।

বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়ার প্রসঙ্গটি নতুন করে আবার সামনে আসার পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন। বিষয়টির যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন বিজ্ঞ ইসলামি স্কলারগণ। তারা বিশ্লেষণ করছেন রাষ্ট্রধর্ম কেন জরুরী? আসলেই জরুরী কিনা। এই সময়ে কেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়ার প্রসঙ্গটি উঠে এলো?

এ বিষয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সঙ্গে কথা বলেন আলেম কবি, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা মুসা আল হাফিজ। রাষ্ট্রধর্ম কেন জরুরী? এটা আসলেই জরুরী কিনা—তার কাছে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘সেক্যুলার রাষ্ট্রে রাষ্ট্রধর্ম সাধারণত একটা ম্যাকিয়াভেলিয়ান ধাপ্পা। সেক্যুলার রাষ্ট্রের রাষ্ট্রধর্ম মানে সোনার পাথরবাটি। এটা স্ববিরোধী কিন্তু লোকরঞ্জনে খুবই কার্যকর। লোকরঞ্জন ছাড়া এর কোনোই কার্যকরিতা দেখা যায়নি। জনগোষ্ঠী ও নাগরিকদের পরিচয় নির্মাণে তার কার্যকারিতা থাকার প্রশ্নটিও অগুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রবিজ্ঞান এভাবে জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্মাণের ধারণাকে প্রশ্রয় দেয় না। তাহলে ইসলাম কী চায় রাষ্ট্রধর্ম হয়ে থাকতে? চায়। কিন্তু সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে, আধুনিক ভৌগলিক জাতীয়তাবাদের সাথে কিংবা পশ্চিমা আইনের বিচার ব্যবস্থা এবং পূঁজিবাদ ও শোষণ-বৈষম্যের সাথে অকার্যকরভাবে সহাবস্থান করতে ইসলাম কোনোভাবেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে না।’

মুসা আল হাফিজ বলেন, ‘রাষ্ট্রধর্মের দরকার আছে, আবার নাই। যদি রাষ্ট্রধর্ম রাষ্ট্র,সমাজ,সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক অর্থে কার্যকর ভূমিকা রাখে, তাহলে সেটা ইতিবাচক। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার আদত কাঠামোটাই যদি ঘোষিত রাষ্ট্রধর্মের চাহিদাকে অগ্রাহ্য করে পরিচালিত হয়, সেখানে অলঙ্কারিক একটি নাম হিসেবে রাষ্ট্রধর্মের বিব্রত হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।’

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের নোটিশে অশোক কুমার ঘোষ বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদে বিষয়টি বিল আকারে উত্থাপনসহ বিলটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্য দ্বারা পাস করাও আবশ্যক। অন্যথায় বাংলাদেশ চিরতরে সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর নিকট স্বীকৃতি পাবে।’ তাহলে ইসলাম কি সাম্প্রদায়িক? এর প্রতিবাদ জানিয়ে মুসা আল হাফিজ বলেন, ‘ইসলাম সাম্প্রদায়িক নয়, সেটা যেমন ইসলামের তত্ত্বে প্রমাণিত, তেমনি মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসেও এটা স্পষ্ট। ধর্মের কারণে অমুসলিমদের উপর নির্যাতন, অবিচার, শোষণের কোনো জায়গা নেই ইসলামে। মদীনা রাষ্ট্রে যেমন বহু ধর্ম ও বহুজনগোষ্ঠীর সহাবস্থান নিশ্চিত হয়েছিলো, তেমনি পরবর্তীকালেও সহাবস্থান, নাগরিক অধিকার, ধর্মপালনের অধিকারসহ প্রতিটি অধিকার অমুসলিমরা উত্তমভাবে ভোগ করেছে মুসলিম রাষ্ট্রে।’

আলেম এই চিন্তক আরও বলেন, ‘সর্বমানবিক কল্যাণ ইসলামের শিক্ষা, সাম্প্রদায়িকতা নয়। বেশি দূর যাবার দরকার নেই। বাংলা ও ভারতে ইসলাম আগমনের পরে শত শত বছর ধরে অসাম্প্রদায়িকতার যে বাতাবরণ তৈরী হয় ও জারি থাকে, সেটা ছিলো ইসলামী শিক্ষারই ফসল। এখানে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ জন্ম দেয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা। ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির আলোকে তারাই ছড়িয়ে দেয় সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা, সংঘাত ও হিংস্রতা। ইসলাম কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে কায়েম থাকলে সেখানে অমুসলিমরা অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করেছে, এটাই ইতিহাস। এটা শুধু আমার কথা নয়। নিষ্ঠাবান অমুসলিম ঐতিহাসিকরাও এটা না মেনে পারেননি। টমাস আর্নল্ড এটা প্রমাণ করেছেন, আর্নল্ড টয়েনবি এটা প্রমাণ করেছেন, গোস্তাব লি ভাঁ এটা প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা আরো প্রমাণিত, সত্য। আট শতাব্দীর ইতিহাসের দিকে চোখ রেখে কথাটি বলছি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম নেই। যদি থাকতোও, তাতে সাধারণ অমুসলিম নাগরিকদের দিক থেকে আতঙ্কিত হবার কিছুই ছিলো না। কারণ ইসলাম বরাবরই তাদের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের আশ্বাস ।’

বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিতে এই সময়ে নোটিশ কেন পাঠালো হিন্দু এই আইনজীবী? কী মনে করেন আপনি? আলেম চিন্তাবিদ বলেন, ‘বহু আগ থেকেই এদেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। যদিও এটা নিতান্তই অলঙ্কারিক, তবুও একে অমুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য অপমানকর বলেই চালানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে অমুসলিম নাগরিকদের সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন বানানো হয়েছে। হিন্দু- বৌদ্ধ – খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এ বিষয়কে মুখ্য করে নিজেদের তৎপরতাকে সবলে জোরদার করেছে। অথচ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বা মুসলিমদেরকে বিন্দুমাত্রও অতিরিক্ত সুবিধা দেয়নি। অমুসলিম নাগরিকদের ধর্ম ও ধর্মাচারকে কোনোভাবেই বিব্রত করেনি।’

বাংলাদেশ সরকারকে বিশেষ চাপে রাখার একটি ইস্যু দাঁড় করাতে এমনটি করা হয়েছে বলেও দাবি এই আলেমের । তিনি বলেন, ‘সংবিধানে যেখানে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সেখানেই স্পষ্ট বলা আছে, ‘তবে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মপালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।’ রাষ্ট্র সেটা করে আসছিলো পরিপূর্ণভাবে। এখন এ ইস্যুকে সামনে এনে উপমহাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকারকে বিশেষ চাপে রাখার একটি ইস্যু খাড়া করা হলো। দেশের ভেতরে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার একটি জ্বলন্ত প্রসঙ্গ সরকারকে নানাভাবে বিব্রত করবে।’

এই প্রসঙ্গ উসকে দেয়ার পেছনে কারা থাকতে পারে তা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘এ ইস্যু সহসা হাজির হলেও সহসা নয়। এর পেছনে ভারতের উগ্র সংঘপরিবারের রাজনৈতিক লক্ষ্যের যোগসাজশ থাকা অস্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নামে প্রচারণার ধারাবাহিক নজির আমরা দেখে আসছি। ট্রাম্প অবধি বিচার দেয়া হয়েছে। এ ধারাকে আরো সবল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার প্রচেষ্টা এখানে থাকতেই পারে। নতুবা অমুসলিমদের প্রতি অত্যন্ত সহযোগী ও প্রসন্ন এক সময়কালে এমন অভিযোগের হেতু মিলে না। যতদূর মনে হয়, যারা বলছেন, রাষ্ট্রধর্ম বাতিল হোক, তারাও বোধ হয় এখনই সেটা চান কী? একে ব্যবহার করে বহুমাত্রিক ফায়দা তারা হাসিল করছে, করবে। সরকারকেও বার বার চাপে ফেলতে পারবে একে সামনে এনে।’

ইসলামপন্থীরা যার যার জায়গা থেকে প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু প্রতিবাদ কেমন হওয়া উচিত তাও তুলে ধরেছেন কবি মুসা আল হাফিজ। তিনি বলেন, ইসলামপন্থীদের উচিত সাংবিধানিক এই ধারাকে সুরক্ষায় সচেষ্ট থাকা। অপরদিকে এই প্রচারকেও চ্যালেঞ্জ করা যে, বাংলাদেশে অমুসলিম বা হিন্দুনাগরিকরা কষ্টে আছেন বা বঞ্চিত হচ্ছেন কিংবা ইসলামী বিশ্বাসে উজ্জীবিত মানুষ তাদেরকে কোনোভাবে পীড়া দিচ্ছে। এখানে যে আসলে প্রচারের উল্টো বাস্তবতা, সেটা প্রচার পাচ্ছে না। ইসলামপন্থীরা সাধারণত যে ভাষায় দাবি করেন, তার মধ্যে অনেক সমস্যা আছে। আমরা যখন বলি, এই দেশ মুসলিমদের দেশ, তখন মালিকানা দাবি করি এবং অন্যদের বঞ্চিত সাব্যস্ত করে ভাবি ঠিকই বলেছি। কিন্তু একই যুক্তিতে যখন ভারতীয় হিন্দুরা বলে, ভারত হিন্দুদের দেশ, তখন আমরা কষ্ট পাই। মনে করি, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অন্যায় করা হলো, তাদের বঞ্চিত করা হলো। আসলে রাজনীতিতে কালের ভাষা ও বাস্তবতা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একে উপেক্ষা করলে ক্ষতি ডেকে আনা হয়।’

মুসা আল হাফিজ বলেন, ‘মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রধর্ম থাকলে যে ইসলামের বিশেষ ভালো কিছু হয়ে যাচ্ছে, তা মোটেও নয়। তবুও একে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টাটি যেহেতু মনুবাদের বিশেষ প্রকল্পের অংশ, যে প্রকল্পের মোকাবেলা আমাদের করতেই হয়। ফলত রাষ্ট্রধর্ম রক্ষার আওয়াজকে সরব করা এবং সরকারের উপর অব্যাহত প্রেসার জারি রাখা যে, একে শুধু কথার কথা হিসেবে সংবিধানে নয়, বরং এর ইতিবাচক কার্যকরিতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে রাষ্ট্রের সকল স্তরে।’

এদিকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার দাবিকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন। এক বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়ে খেলাফত মজলিস বলেছে, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ নিয়ে যেকোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করবে না। ৯২ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের সংবিধান হতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়ার জন্য অতীতেও বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে কিন্তু তা সফল হয়নি। বর্তমান বা ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র সফল হবে না।’ বিবৃতিতে দলটি ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বাদ দেয়ার জন্য প্রেরিত উকিল নোটিশ প্রত্যাহরের দাবি জানায়।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেয়া আইনি নোটিশে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিবৃতিতে বলেছে, ‘শতকরা নব্বইভাগ মুসলমানের দেশে হাইকোর্ট এবং জাতীয় সংসদে অনুমোদিত আইনটি বাতিলের জন্য যারা লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে, তারা আসলে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারতের আরএসএস বজরংদলের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী এমন কাজ করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।’

বিজ্ঞাপন