সমাপ্তির পদধ্বনি : মহামারী ও কেয়ামত

মুনশী নাঈম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ইতোমধ্যেই দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। একপ্রকার ঘরবন্দী হয়েই আছি। বাইরে বেরুচ্ছি না, বাজারে যাচ্ছি না, উঠোনে বসে বাড়ির কারও সঙ্গে আড্ডাও দিচ্ছি না। পাশাপাশি বাড়ি, কিন্তু তবুও মনে হয় শত মাইল দূরত্বে বসবাস করছি আমরা। ভয়ে কেউ কারও কাছে আসতে চাইছে না, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। সবাই আপনাকে বাঁচাতে ব্যস্ত, আপনাকে নিয়েই শঙ্কিত। কেয়ামতের ময়দানের মতো সবাই জপছে ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি।

দমবন্ধ হয়ে আসে, এতদিনের বাইরে বেরুনোর অভ্যাস বিদ্রোহ করতে চায়। জায়নামাজে বসে মা তসবি পড়েন। বারবার আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এগুলো সব কেয়ামতের আলামত। আখেরি যামানা এসে গেছে। তাই এই অবস্থা।’ মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও তেলাওয়াত করি সূরা মুহাম্মদের ১৮ নং আয়াত—

فَهَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَن تَأْتِيَهُم بَغْتَةً فَقَدْ جَاء أَشْرَاطُهَا فَأَنَّى لَهُمْ إِذَا جَاءتْهُمْ ذِكْرَاهُمْ

‘তারা শুধু এই অপেক্ষাই করছে যে, কেয়ামত অকস্মাৎ তাদের কাছে এসে পড়ুক। বস্তুত, কেয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসেই পড়েছে। সুতরাং কেয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কেমন করে?’

করোনাভাইরাস ভয়ংকর মহামারী রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন মৃত্যুবরণ করছে হাজার হাজার মানুষ। অনেক হাদিসেই বলা হয়েছে, মহামারী কেয়ামতের অন্যতম একটি আলামত। তাহলে কি কেয়ামত খুব সন্নিকটে? এত মৃত্যুর কফিন থেকে আমরা কি আসলে সমাপ্তির পদধ্বনিই শুনতে পাচ্ছি?

তাবুক যুদ্ধের দিন রাসূল সা. চামড়ার তৈরী তাবুতে বসে আছেন। তাবুর পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন হজরত আওফ বিন মালেক রাদি.। রাসূল সা. বললেন, কেয়ামতের ছয়টি নিদর্শন শুনে রাখো।

১. مَوْتِي অর্থাৎ আমার মৃত্যু।

২. فَتْحُ بَيْتِ المَقْدِسِ অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়।

৩. مُوتَانٌ يَأْخُذُ فِيكُمْ كَقُعَاصِ الغَنَمِ অর্থাৎ বকরির পালের মহামারীর মতো প্রাণহানি।

৪. اسْتِفَاضَةُ المَالِ حَتَّى يُعْطَى الرَّجُلُ مِائَةَ دِينَارٍ فَيَظَلُّ سَاخِطًا অর্থাৎ সম্পদের প্রাচুর্য; এমনকি এক ব্যক্তিকে একশ দিনার দেওয়ার পরও সে অসন্তুষ্ট থাকবে।

৫. فِتْنَةٌ لاَ يَبْقَى بَيْتٌ مِنَ العَرَبِ إِلَّا دَخَلَتْهُ অর্থাৎ এমন এক ফেতনা আসবে, যা আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে।

৬. هُدْنَةٌ تَكُونُ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ بَنِي الأَصْفَرِ، فَيَغْدِرُونَ فَيَأْتُونَكُمْ تَحْتَ ثَمَانِينَ غَايَةً، تَحْتَ كُلِّ غَايَةٍ اثْنَا عَشَرَ أَلْفًا অর্থাৎ যুদ্ধ বিরতির চুক্তি, যা তোমাদের ও বনি আসফার বা রোমকদের মাঝে সম্পাদিত হবে। অতঃপর তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং আশিটি পতাকা উড়িয়ে তোমাদের বিপক্ষে আসবে; প্রত্যেক পতাকার নীচে থাকবে বার হাজার সৈন্য। (সহিহ বুখারি:৩১৭৬)

রাসূল সা. মহামারীকে কেয়ামতের অন্যতম একটি আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইবনে আব্বাস রাদি. বলেন, “مَا ظَهَرَ الْبَغْيُ فِي قَوْمٍ قَطُّ إِلَّا ظَهَرَ فِيهِمُ المُوتَانُ”. অর্থাৎ কওমের মাঝে যখন অবাধ্যতা-অশ্লীলতা বৃদ্ধি পাবে, তাদের মধ্যে দেখা দিবে ‘মুতান’ (মহামারী)।

হাদিস শরিফে কেয়ামতের একটি আলামত বুঝাতে ‘মুতান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কাজি ইয়াজ রহ. বলেন, ‘প্লেগ এবং গণমৃত্যুর সমন্বিত নাম মুতান।’ ইবনু আসির রহ. বলেন, ‘মহামারীতে গণমৃত্যুকে বলা হয় মুতান।’ মুতান শব্দের ধারণকৃত দুটি অর্থ হজরত আয়েশা রাদি. এর বর্ণিত এক হাদিসে পাওয়া যায়। রাসূল সা. বলেন, “لَا تَفْنَى أُمَّتِي إِلَّا بِالطَّعْنِ وَالطَّاعُونِ অর্থাৎ আমার উম্মত ধ্বংস হবে হত্যা এবং প্লেগে।

হিজরী প্রথম শতাব্দীতে বড় বড় চারটি মহামারী দেখা দিয়েছিল। এতে মৃত্যুবরণ করেছিল লাখ লাখ মানুষ।

১. ষষ্ঠ হিজরিতে, হুদাইবিয়ার সন্ধির বছর একটি মাহামরীর প্রকোপ দেখা দেয়। মহামারীটি পারস্যে সংক্রমিত হয়। মদিনার মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।

২. হজরত ওমর রাদি. এর খেলাফতকালে শাম দেশে দেখা দেয় ‘তাউনে আমওয়াস’ তথা আমওয়াস মহামারী। এই মহামারীতে প্রসিদ্ধ কয়েকজন সাহাবি ইন্তেকাল করেন। তারা হলেন—হজরত মুআয ইবনে জাবাল, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, শুরাহবিল ইবনু হাসানাহ এবং ফজল বিন আব্বাস রাদি. প্রমুখ। তিন দিন স্থায়ী এই প্রকোপে সত্তর হাজারের অধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।

৩. ৬৯ হিজরিতে ইবনে যুবায়ের রাদি. এর রাজ্যে দেখা দেয় জারিফ মহামারী। এতে প্রতিদিন মৃত্যুবরণ করে প্রায় সত্তর হাজার মানুষ।

৪. বসরা, শাম এবং কুফায় ৮৭ হিজরিতে দেখা দেয় ‘তাউনে ফাতায়াত’। এতে মৃত্যুবরণ করেন খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান। অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই প্রকোপে মারা যান বলে এটাকে ‘তাউনে আশরাফ’ও বলা হয়।

এরপর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে মহামারী সংক্রামিত হয়েছে। এলোমেলো করে দিয়েছে পৃথিবী। গত বিংশ শতাব্দীতেই দেখা দিয়েছে কতগুলো মহামারী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

গুটি (১৯০০) : বিগত শতাব্দীতে বিভিন্ন সময় গুটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। মূলত উত্তর আমেরিকায় এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।

স্প্যানিশ ফ্লু (১৯১৮-১৯১৯): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রধানত ইউরোপের শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এ ভাইরাস। পরে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন লোক সংক্রমিত হয়েছিল। এতে ৫০-১০০ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যারা মারা গিয়েছিলেন, তাদের দ্বিগুণের সমান।

এশিয়ান ফ্লু (১৯৫৬): এ ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ১৯৫৬ সালে প্রথমে চীনে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৯৫৭ সালে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমায়। সারা বিশ্বের প্রায় ১ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগে।

সার্স (২০০৩): ২০০৩ সালে চীনে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) ভাইরাস। সে সময় ২৫টি দেশে ৮ মাসে সার্স ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিল ৮ হাজার ৯৮ জন। সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তখন ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

সোয়াইন ফ্লু (২০০৯): ভাইরাসটি শূকর থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে কৃষক ও প্রাণী চিকিৎসকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোয় এ মহামারী দেখা দেয়। এতে ১৮ হাজার ৫০০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এক গবেষণায় দেখা যায়, শূকরের সঙ্গে না মিশলেও এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

ইবোলা (২০১৪): ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ভাইরাসটি দেখা দিয়েছিল। পরে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ এবং বিশ্বের কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়।

করোনাভাইরাস কি মহামারী নাকি অন্যকিছু? ভাইরাসটিকে আমরা মহামারী হিসেবেই দেখছি। তবে এখন খুব জোরেশোরে অভিযোগ উঠছে—চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের একটি সামরিক গবেষণাগারে করোনাভাইরাস তৈরি করা হয়েছে। এরপর সেখান থেকে ভুল করে ভাইরাসটি বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। চীন এই জৈবাস্ত্র তৈরি করেছে বিশ্ববাণিজ্য দখলে নিতে ও দুনিয়াজুড়ে নিজের কর্তৃত্ব বাড়াতে।

ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি শোহাম ‘কোভিড ১৯’ বা করোনাভাইরাসকে চীনের উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির গবেষণাগারে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেন। ড্যানি শোহাম চীনের জীবাণু যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তিনি মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজিতে ডক্টরেট করেছেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা শাখার জীবাণু এবং রাসায়নিক অস্ত্রের জ্যৈষ্ঠ বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন তিনি।

করোনাভাইরাসকে মহামারী না বলে যদি চীন কিংবা অন্য কারও তৈরী তৈরী জৈবাস্ত্রও বলা হয়, তাহলেও এটাকে কেয়ামতের আলামত হিসেবেই দেখতে হবে। কারণ কেয়ামতের একটি আলামত ছিল ‘মুতান’; শব্দটি গণহত্যা এবং মহামারী দুটো অর্থই ধারণ করে। ভাইরাসটি মানুষের তৈরী অস্ত্র হলে, এর মাধ্যমে বর্তমান পৃথিবীতে যত মৃত্যু হচ্ছে, সেগুলোকে অভিহিত করা যায় গণহত্যা হিসেবে। হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়া কেয়ামতের অন্যতম একটি আলামত।

আবু মুসা আশআরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. আমাদেরকে বলেছেন, কেয়ামতের পূর্বে হারাজ ঘটবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, হারাজ কী? তিনি বললেন, হত্যা। (ইবনে মাজাহ: ৩৯৫৯)

আবু হুরাইরা রা. সূত্রে রাসূল সা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, কেয়ামত নিকটতর হতে থাকবে, আমল কমে যেতে থাকবে, কৃপণতা ছড়িয়ে দেওয়া হবে, ফেতনার বিকাশ ঘটবে এবং হারজ ব্যাপকতর হবে। সাহাবায়ে কিরাম রা. জিজ্ঞেস করলেন, হারজ কী? নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হত্যা, হত্যা। (বুখারি: ৭০৬১)

যত মহামারী আসে পৃথিবীতে, অধিকাংশই সংক্রামক। তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে গ্রাম, শহর, দেশ। তবুও যদি স্পর্শ করে ভাইরাস, মরণ আসে আচমকা, আমাদের জন্য রয়েছে শহীদের সাওয়াব। হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, ‘তিনি রাসূল সা.-কে প্লেগ রোগ (মহামারি) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। রাসূল সা. বলেন, এটি হচ্ছে এক ধরনের শাস্তি। আল্লাহ যার ওপর তা পাঠাতে ইচ্ছে করেন, পাঠান। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনের জন্য রহমত বানিয়েছেন। অতএব প্লেগ রোগে কোনো বান্দা যদি ধৈর্য ধরে এবং এ বিশ্বাস নিয়ে আপন শহরে অবস্থান করতে থাকে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো বিপদ তার ওপর আসবে না; তাহলে সেই বান্দার জন্য থাকবে শহীদের সাওয়াব।’ (বুখারি: ৫৭৩৪)

তাওবা, ইস্তেগফার, দোয়া, মুনাজাতে কাটুক ঘরবন্দী এই সময়। সবাইকে আল্লাহ হেফাজত করুন।

বিজ্ঞাপন