সালমান রুশদি : সাহিত্য ও ব্লাসফেমির পার্থক্য কোথায়?

হামমাদ রাগিব

১৯ জুন, বহুল বিতর্কিত ব্রিটিশ ভারতীয় ঔপন্যাসিক আহমেদ সালমান রুশদির জন্মদিন আজ। ১৯৪৭-এর এ দিনে তাঁর জন্ম। সালমান রুশদির উপন্যাসের গদ্যমান ও কাহিনির বুনন তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম পুরস্কার ম্যান বুকার প্রাইজ, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাইট ব্যাচেলর উপাধি, দ্য টাইমসের জরিপে ব্রিটেনের সেরা ৫০ সাহিত্যিকের একজন হবার ‘সৌভাগ্য’ এনে দিলেও বিশ্ব মুসলিমের কাছে তিনি তাঁর চতুর্থ উপন্যাস দ্য স্যাটানিক ভার্সেসের কারণে চরম নিন্দিত, বিতর্কিত ও ঘৃণার পাত্র হয়ে আছেন।

দ্য স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। প্রকাশের পরপরই মুসলিম দুনিয়া থেকে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সালমান রুশদির বিরুদ্ধে। সালমান রুশদি জাদু বাস্তবতার সমন্বয়ে ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি লিখতে গিয়ে এই উপন্যাসের একটি অংশে তিনি মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও কুরআন প্রসঙ্গে তুমুল আপত্তিকর কথা ও কাহিনির অবতারণা করেছেন। ইতিহাসের দুর্বল কয়েকটি সূত্রকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, কুরআনের কিছু কিছু আয়াত শয়তান কর্তৃক অনুপ্রাণিত।

এসবের বাইরে নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে নানা ধরনের ব্যঙ্গাত্বক কাহিনিরও অবতারণা করেছেন তিনি বইটিতে। চরমভাবে আঘাত করেছেন মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে।

সালমান রুশদি ও তাঁর দ্য স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে আজ আলাপে বসেছিলাম ক্রিটিক আলেম লেখক ও অনুবাদক মনযূরুল হকের সঙ্গে। মনযূরুল হকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম দ্য স্যাটানিক ভার্সেসের ধর্মানুভূতিতে আঘাতমূলক কাহিনি এবং সালমান রুশদির তুখোড় সাহিত্যপ্রতিভা বিষয়ে; জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমরা তো তাঁর এই বইটিকে বিশ্বাসের প্রতি ব্যঙ্গাত্মক বলে আসছি, এদিকে তিনি বিশ্বসাহিত্যে বিপুলভাবে বরিত হয়ে আসছেন, এখন কথা হলো সাহিত্য ও ব্লাসফেমির মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

Related image
মনযূরুল হক : ক্রিটিক আলেম লেখক ও অনুবাদক

উত্তরে মনযূরুল হক বলেন, ‘সালমান রুশদি নিঃসন্দেহে একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক। তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। বুকার প্রাইজ পেয়েছেন। লস্ট ম্যান বুকার পেয়েছেন। মিডনাইটস চিলড্রেনের (১৯৮১) মতো উপন্যাস লিখেছেন। কথা হলো, তিনি একাই এসব খ্যাতি ও পুরস্কার পেয়েছেন, তা কিন্তু নয়। আরও অনেকে পেয়েছেন। নোবেল পাওয়া সাহিত্যিকও পৃথিবীতে রয়েছেন। কিন্তু রুশদির মতো ধর্ম অবমাননা করেননি তাঁরা। বরং ধর্মীয় উপাদান নিয়ে লেখা সাহিত্যও পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়েছে, এমন নজির আছে ভুরি ভুরি। পাওলো কোয়েলহোর মতো বর্তমান বিশ্বের বেস্টসেলার লেখকের প্রায় সবক’টি উপন্যাস ধর্মীয় রাহসিকতায় ভরপুর।’

মাওলানা মনযূর বলেন, ‘সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেসকে ‘বিশ্বাসের প্রতি ব্যঙ্গাত্মক’ বললে তাঁকে বরং সম্মান দেওয়া হয়। তিনি তো মিথ্যাচার করেছেন। স্যাটানিক ভার্সেস বা শয়তানের বাণী বলে তিনি রসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি খোদায়ি প্রত্যাদেশ বলে একটি জ্বলন্ত সত্যকে কেবল প্রত্যাখ্যানই করেননি, বরং মনগড়া কাহিনি রচনা করেছেন; যার সঙ্গে ঐতিহাসিক কোনও প্রমাণই সাযুজ্যপূর্ণ নয়।

তিনি আরও বলেন, ‘এ-জাতীয় মিথ্যাচার সাহিত্যকে কলুষিত করে। সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ যে আনন্দময় পাঠের মধ্য দিয়ে মানবিকতার পাঠ নেয়, তাঁর স্যাটানিক ভার্সেস ঠিক এর বিপরীত। সাহিত্য কেবল শব্দের মালা ও গাঁথুনির উৎকর্ষ নয়, কোনও সাহিত্যকই সাহিত্যের এমন সংজ্ঞা দেননি। তাহলে তার এই বইকে সাহিত্য বলা হবে কেন?

‘সেই অর্থে স্যাটানিক ভার্সেস কোনও সাহিত্য নয়। তাঁর এই বইকে যদি সাহিত্য বলা হয়, তাহলে প্যারোডি পর্ন মুভিকে মৌলিক চলচ্চিত্র থেকে বেশি মূল্যায়ন করতে হবে। আমি রুশদির সাহিত্যকে পর্ন মুভির সাথে তুলনা করতে চাই, যৌন অর্থে নয়; বরং মানুষকে ক্লেদ ও মিথ্যা বর্ণনার কারণে।

‘তিনি নিজেই যেহেতু ধর্ম মানেন না, সুতরাং তাঁকে ব্লাসফেমির কথা বললেই-বা কী, না বললেই-বা কী… তবে তিনি যদি সত্যিকারের মানবিক গুণের অধিকারী হতেন, তাহলে অন্তত মানুষের স্পর্শকাতর ও দুর্বল স্থানে আঘাত করে–এমন রচনা সামনে আনতেন না। অথচ খ্যাতি চাইলে তিনি মিডনাইটস চিলড্রেনের মতো উপন্যাস লিখেও পেতে পারতেন। কেননা, সেটাও বুকার পেয়েছে।’

কিন্তু উপন্যাসটির যে অংশে শয়তানের বাণী-সম্পর্কিত বিষয় আছে সে অংশটুকু প্রথম সহস্রাব্দের ইসলামি পণ্ডিত আল-ওয়াকিদি এবং তাবারির সূত্র অনুসরণ করে লেখা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, এ ব্যাপারে কী বলবেন?

এমন জিজ্ঞাসার উত্তরে মনযূরুল হক বলেন, ‘এই সূত্রগুলো তো তিনি কোনো বিধি মেনে নেননি। দেখুন, ইসলামের পূর্বে যে-সকল ধর্ম ও শরিয়ত খোদা-তায়ালাই দান করেছিলেন, ইসলাম এসে সেগুলো বাতিল করেছে। অথচ কুরআনের বহু আয়াত ও বিধান এমন দেখবেন যা পূর্বের বিধানের সাথে সাদৃশ্য রাখে। এর মানে কি পূর্বের বিধান বহাল আছে? তা তো নয়.. বরং এটাই নতুন বিধান। আবার পূর্বের বিধানের সর্বাংশ কি রাখা হয়েছে, তা-ও কিন্তু নয়।

‘এইভাবে যে-কোনও বিধান নাজিলের প্রথম দিকে, কিংবা পার্থিব উপমার দিকে তাকালে দেখব, যে-কোনও দেশের রচিত সংবিধানের প্রথম দিকে বারংবার প্রথম বিধান ও ভার্সেসকে বাতিল করে নতুন বিধান ও ভার্সেস আনয়ন করা হয়। স্যাটানিক ভার্সেস পৃথিবী ও সর্ব ধর্মে স্বীকৃত এই পদ্ধতিকে অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ কোরাইশদের সাথে একটা সমঝোতার বিধান নাজিল হওয়ার পর সেটা আবার যখন বাতিল ঘোষণা করা হলো, সেটাকে তিনি খোদায়ি না-মেনে মক্কার চতুর কোরাইশদের সুরে সুর মিলিয়েই যেন বললেন যে, “এটা তো খোদার বাণী হতে পারে না; এটা শয়তানের বাণী। কেননা, এইমাত্র এক বাণী এলো আবার পরক্ষণেই পাল্টে গেল!” তাতে করে সাহাবিদের ইমানে কোনও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেনি। বরং কাফেরদের কুফরিই বৃদ্ধি পেয়েছে।

‘রুশদিও তেমনই চাতুর্যের সাথে একটা স্বীকৃত ধর্মীয় বিধানের প্রবর্তন-পদ্ধতিকে ব্যঙ্গ করেছেন এবং সাহিত্যের উসিলায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন।’

মনযূরুল হক বলেন, ‘ধর্মীয় তথ্যের সাথে মিথ্যা গুলানোর ইতিহাস মুসলিমদের মধ্যেও অনেক সময় আমরা দেখেছি। কিন্তু কেউ ধর্মীয় অলঙ্ঘনীয় সত্যকে অস্বীকার করেননি; রুশদি যা করেছেন। সে-হিসেবে ন্যায়নিষ্ঠ ও ইনসাফগার বিচারকদের আদালতে যাচাই করা হলে তিনি স্যাটানিক ভার্সেস দিয়ে এতটা খ্যাতি পেতেন না, বরং মিডনাইটস চিলড্রেন অথবা রুকা অ্যান্ড দ্য ফায়ার অফ লাইফ লিখে সাহিত্য খ্যাতি পেতে পারতেন, একজন সত্যিকার সাহিত্যিকের মতোই। কিন্তু স্যাটানিক ভার্সেস লিখে তিনি তাঁর প্রতি ধর্মপরায়ণ মানুষের আস্থা নষ্ট করেছেন। ফলে দেখবেন, বিশ্ব সাহিত্য-প্রেমিক বিপুল মানুষ রুশদির রচনা পাঠ থেকে বিরত থাকে। তারা ভাবে, এতে মন্দ কিছু অবশ্যই আছে।

‘দ্বিতীয়তঃ ওয়াকিদি বা তাবারির গ্রন্থে যা আছে, তা মানুষের রচনা। এরমধ্যে যেমন শুদ্ধ জিনিস, শুদ্ধ বর্ণনা আছে, ঠিক তেমনি ভুল জিনিস, ভুল বর্ণনা থাকাটাও স্বাভাবিক।কারণ, ওয়াকিদি বা আল-তাবারি, কেউ-ই রাসুলের যুগের প্রত্যক্ষ সাক্ষী না। তাঁরা রাসুলের জীবনী লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে যেখানে যার কাছে যা পেয়েছেন, তা-ই লিপিবদ্ধ করে ফেলেছেন। ভুল-শুদ্ধ কতটুকু, তা নির্ণয়ের চেয়ে আপাতত সংরক্ষণ করে ফেলতে পারাটাকেই তাঁরা প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাঁদের রচনায় যে ভুল থাকতে পারে, তা স্বয়ং তাঁরা নিজেরাও স্বীকার করে গেছেন।

‘তাঁরা শুধু তা-ই কিতাবে স্থান দিয়েছেন যা তাঁদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। এখন কেউ যদি তাঁদের কিতাবে কোনও আপত্তিকর বিষয়াদি খুঁজে পায় যা ইসলামের ফান্ডামেন্টাল জিনিসের সাথে সাংঘর্ষিক এবং অন্যান্য সহি সূত্রে তা বাতিলযোগ্য দেখা যায়, তাহলে তাঁর দায় আল তাবারির বা ওয়াকেদির নয়, বরং তাঁরা যার কাছ থেকে পেয়েছেন, কেবলই তার। তাঁরা তো এখানে কেবল একজন ‘লিখিয়ে’র ভূমিকায়।’

মনযূর বলেন, ‘এখনকার বিশ্বের স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে তথ্য যাচাই করার আধুনিক নানা মেথডোলজি আছে। একটি সূত্রকে কীভাবে অন্য অনেক ও প্রাথমিক সোর্স থেকে যাচাই করতে হয় এবং প্রেক্ষিত ও টার্গেট বিচার করতে হয়, বিগ পিকচারটা দেখতে হয়–এগুলো পশ্চিমা বিজ্ঞানীরাই বলেন। সেই হিসেবেও তাবারি ও ওয়াকিদির বর্ণনা টেকে না।

‘কিন্তু যাদের উদ্দেশ্য বিতর্ক তৈরি করা, যারা মানুষকে আঘাত করতে ভালোবাসে এবং ধর্মের খুঁত ধরতে পছন্দ করে, তারা তো “চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি”র মতো আচরণ করবেই। সেখানে নতুন করে বলারই-বা প্রয়োজন কী আছে।’

আগের সংবাদমুরসির মৃত্যুতে তালেবান যা বলল
পরবর্তি সংবাদখাশোগজি হত্যায় সৌদি যুবরাজের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে