স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিল

স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিল

রাগিব রব্বানি :

শীতের মওসুম শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন। গ্রামে গঞ্জে শহরে উপশহরে—দেশের প্রায় প্রতিটা অঞ্চলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো জায়গায় থাকছে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন।

আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও ওয়াজ মাহফিলের এত ছড়াছড়ি ছিল না। ১০-১৫ বছরের ব্যবধানে ওয়াজ মাহফিল এত বিস্তৃতি লাভ করেছে যে, এ ধরনের মাহফিল এখন বাংলাদেশের স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।

একটা সময় ছিল, ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হতো কেবল মাদরাসা ও মসজিদকে কেন্দ্র করে। শহরের তুলনায় গ্রামে এ ধরনের আয়োজনের সংখ্যা বেশি ছিল। শহরের মাদরাসা কিংবা মসজিদ খুব একটা উদ্যোগী না থাকলেও গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটা মাদরাসা ও মসজিদে বছরে একটা বা দুটো মাহফিলের আয়োজন হতো।

বর্তমানে এটা তুমুল ব্যাপকতা লাভ করেছে। ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন কেবল মসজিদ-মাদরাসার উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ নেই, উদ্যোগে ব্যাপকভাবে শামিল হয়েছেন ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষও। মাহফিলকে উপলক্ষ করে এখন দেশের প্রায় প্রতিটা এলাকায় গড়ে উঠেছে সামাজিক সংগঠন। প্রতি বছর শীতের মওসুমে এসব সংগঠনের উদ্যোগে ‘তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে’র আয়োজন করা হয়। গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহর-বন্দরেও আয়োজিত হচ্ছে এসব মাহফিল।

আর এসব উদ্যোগের অগ্রভাগে অধিকাংশ জায়গায়ই থাকছেন তরুণ শ্রেণি। একটা সময় দেশের তরুণ সমাজের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের আগ্রহ ছিল নাচ-গান ও যাত্রাপালার অনুষ্ঠান আয়োজনের দিকে। গ্রামাঞ্চলে মোটামুটি ব্যাপকভাবে এইসবের আয়োজন হতো একসময়। কিন্তু গত ১০-১৫ বছরে মাহফিলের আয়োজন ব্যাপকতা লাভ করায় তরুণ সমাজের অনুষ্ঠান আয়োজনের ঝোঁক অনেকাংশেই মাহফিলের দিকে ফিরেছে। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠছে মাহফিল ভিত্তিক তরুণ সংগঠন। সংগঠনগুলোর আয়োজনে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাফসির মাহফিল।

তরুণ বা যুব সমাজের উদ্যোগে যে সমস্ত তাফসির মাহফিল হয়, সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় আলোচনা শোনানো এগুলোর মৌলিক উদ্দেশ্য থাকলেও তরুণ সমাজ এর পাশাপাশি উৎসবমুখরতার একটা আমেজ নিজেদের ভেতর তৈরি করার চেষ্টা করেন এসব মাহফিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে। মাহফিল আয়োজনের যাবতীয় খরচাদিও তাঁরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিচিত বিত্তশালীদের সমন্বয় করে ব্যবস্থা করেন।

তবে মসজিদ মাদরাসার উদ্যোগে যে মাহফিলগুলো হয়, সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় আলোচনা শোনানোর পাশাপাশি সে সমস্ত মাহফিল আয়োজনের বড় একটা উদ্দেশ্য থাকে ‘কালেকশন’। মাহফিলের আগে এবং মাহফিলের দিন ওয়াজ শুনতে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষ সোৎসাহে ব্যাপকভাবে দান-খয়রাত করেন মাহফিলের আয়োজক মাদরাসা বা মসজিদে। মসজিদের তুলনায় মাদরাসাগুলোতে কালেকশনের উদ্যোগ ও চাহিদা বেশি।

গ্রামের মানুষ নগদ অর্থকড়ি দানের পাশাপাশি মৌসুমি ফল-ফসলের নির্ধারিত একটা অংশ ফসল কাটার পর মাদরাসায় দেওয়ার ওয়াদাও করেন এসব মাহফিলে। ফলে মাহফিলগুলো থেকে প্রতি বছর মাদরাসা মসজিদ ভালো একটা আয় করতে পারে।

গ্রামাঞ্চলের প্রাচীন বা মোটামুটি পুরনো মাদরাসাগুলোর মাহফিলকে ঘিরে উৎসবমুখর একটা পরিবেশও তৈরি হয় সংশ্লিষ্ট এলাকার ঘরে ঘরে। ওয়াজ উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন আসেন, নানা ধরনের খাবার-দাবারের আয়োজন হয়। সব মিলিয়ে ওয়াজ মাহফিল একদিকে যেমন ব্যাপকতা লাভ করছে, তেম্নি তা হয়ে উঠছে বাংলাদেশের স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ।

মাহফিলের এই ব্যাপকতা লাভ বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখছে জানতে চেয়ে কথা হয়েছিল ইসলামি চিন্তাবিদ, লেখক ও আলোচক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের সঙ্গে।

মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, বর্তমানকার ব্যাপক মাহফিলগুলো সামাজিক এবং দীনিভাবে কতটা উপকার করছে, এটা বলতে গেলে উত্তরটা দুইভাবে দিতে হয়। উপকার বলতে যদি আমরা শুধু উপরের দিকে ওঠা বলি তা হলে একরকম কথা আসবে আর যদি বুঝি অবক্ষয়ের কমতি তা হলে আরেক রকম উত্তর আসবে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ চারিত্রিক, নৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়ের আয়োজন মিডিয়া এবং সমাজের পরতে পরতে প্রচলিত আছে, মাহফিলগুলোর দ্বারা আমি মনে করি এই অবক্ষয়ের মাত্রাটা কিছুটা স্তিমিত আছে। দাওয়াহমূলক অন্যান্য কাজও এতে বড় ভূমিকা রাখছে, বরং ওসব কাজের ভূমিকাটাই মুখ্য, তারপরও আমি বলব, মাহফিলগুলোও এতে বড় একটা নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, মাহফিলের মাধ্যমে মানুষ নৈতিকতা, ইসলামের সাথে নিজের সংযুক্তি, ইসলামের ইতিহাস জানা, নবি-রাসুলের ঘটনা জানা, গোনাহ কমানো, নেক আমল বেশি করে করা—এই সব বিষয়ে একটা প্রেরণা পায়। তো, নৈতিক ঘাটতি যে পরিমাণ হবার কথা, তারচেয়ে কম হওয়াটাও কিন্তু সফলতা। আর এই সফলতা অর্জনে বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিলগুলো উল্লেখযোগ্য একটা ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, প্রচলিত ধারার মাহফিলগুলোর মাধ্যমে হয়তো সবসময় আমরা উপরের দিকে উঠতে পারছি না, তবে সমাজ যতোটা নিচে নামার কথা ছিল, যতোটা অবক্ষয়ের শিকার হবার কথা ছিল—মাহফিলের কারণে ততোটা হচ্ছে না, হয়নি।