হিন্দু সমাজে বৈধব্য: বঞ্চনার করুণ গল্প

হিন্দু সমাজে বৈধব্য: বঞ্চনার করুণ গল্প

মুজাহিদুল ইসলাম: 

রাধা এখন ২৮ বছরের নারী। স্বামীর মৃত্যুর সময় ছিলেন অষ্টাদশী তরুনী। অকাল বৈধব্যের ধকলের মধ্যেই ধর্ষিত হন স্বামীপরিবারের একাধিক সদস্যের দ্বারা। অশ্রুসজল চোখে তুলে ধরেন জীবনের নির্যাতন-নিপীড়নের করুণ কাহিনি। তবে সামাজিক দুর্নাম ও স্বামীপরিবারের হুমকির মুখে চুপ থাকাকেই ভালো মনে করেন বিধবা রাধা।

সুপ্রা দেশাই পরপারের আশায় থাকা ৬৭ বয়সী বিধবা। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানরা সকলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নিজ বাড়ি রেখে এখন চলে গেছেন বহুদূরে। খোলা আকাশের নিচে ঘর বাঁধার পর জনৈক ট্রাকড্রাইভার তাকে আশ্রমে পৌঁছে দিয়েছে।

মনোঘোষ। করুণ অবস্থা যার কাছে হার মানে। ১১ বছর বয়সের মনোঘোষ চল্লিশে এক পুরুষের গলায় মালা দিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর কেউ তার খোঁজ রাখেনি। বাধ্যহয়ে সল্প মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য হন মনোঘোষ। খাদ্য ও পথ্যের অভাবে একটিমাত্র কন্যাসন্তানও চিতায় যায়। হিন্দুসমাজ বিধবাদের অপয়া ও অশুভ মনে করে, তাই তাদের সহযোগিতায়ও আগ্রহী নয় সমাজের কেউ। মনোঘোষ মনে করেন,  ‘এই কষ্টের নরক থেকে বিধবাদের জন্য মৃত্যুই ঢের ভালো।’

প্রমিতা দাস বেঁচে থাকার প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে মৃত্যুর জন্য হাহাকার করছেন। ৮৫ বছর অতিক্রমকারী প্রমিতা স্বামীর ঘরে আসেন ১২ বছর বয়সে। তিন বছর অতিক্রম করতে না করতেই স্বামী মারা যান। তারপর থেকে বৃন্দাবনের রাস্তায় রাস্তায় ১৫ হাজার বিধবার সাথে তিনিও যুক্ত হন।

প্রমিতা বলেন, ‘কাজকর্মে পুরোপুরি শক্তি হারিয়ে আমি বৃন্দাবনে আশ্রয় নিয়েছি। বিভিন্ন বাড়ী পরিস্কারের কাজ করি। এখানে না কেউ আমাকে গুরুত্ব দেয়, না আমাকে ভালোবাসে।’

তা ছাড়াও সিঁথির সিদুর মুছে, দেহের সব অলংকার খুলে ফেলে, চুল কেটে, সাদা থান পরে ও শুধু নিরামিষ খেয়ে তাদের থাকতে হয়। এমনকি অধিকাংশ সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

বিধবাদের সংখ্যা

সরকারি পরিসংখ্যন মোতাবেক ভারতের মোট জনসংখ্যার ৪.৬ শতাংশ বিধবা। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ কোটি ষাট লক্ষ নারী বিধবা।

ভারতের প্রাচীন রীতি অনুসারে বিধবারা সামাজিক সম্মান পাওয়ার অধিকার হারায়। তাদের অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা হয়। দ্বিতীয়বার বিবাহের অধিকার প্রদান ও গ্রহণ পাপ বলে বিবেচিত হয় তাদের নিকট।

উত্তরাধিকার বঞ্চিত হওয়া অবধারিত। পাশাপাশি কখনো আবার বাড়িঘর রেখে বিধবা নারীদের  নির্ধারিত আশ্রম কিংবা হিন্দু মন্দিরে আশ্রয় নিতে হয়।

হিন্দু দেবতাদের জন্য রচিত বিশেষ সঙ্গীত পরিবেশন করার বিনিময়ে বিধবারা আশ্রমে আহার ও থাকার সুযোগ পান। ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত হিন্দুদের পবিত্র স্থানগুলোতেই প্রায় ৮৯ লক্ষ বিধবাদের আশ্রয় রয়েছে।

১০-১৯ বছর বয়সী ০.৪৫%, ২০-৩৯ বছর বয়সী ৯%, ৪০-৫৯ বছর বয়সী ৩২% এবং ৬০ থেকে তদূর্ধ বয়সী ৫৮% নারী বিধবা রয়েছে।

কুসংস্কার ও কথিত রীতিনীতি

হিন্দু সমাজের সবচেয়ে করুণ রীতি ছিল সতিদাহপ্রথা। স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বামীর মরদেহের সাথে স্ত্রীকেও জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতো।

পরবর্তীতে হিন্দু সংস্কারক রামমোহন এ প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। অবশেষে ১৮২৮ সালে ইংরেজ সরকার বিধবাদের জীবন্ত পোড়ানোর কুরীতি আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে।

আইন করে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করা হলেও এখনো সামাজিকভাবে তাদের নিগ্রহের শেষ নেই। আশ্রমের কোন কোন আশ্রয়দাতারা বিধবা নারীদের দিয়ে যৌনব্যবসা পরিচালনা করেন। বিধবা যত অল্পবয়সী হবেন, ঝুঁকি তত বেশি।

বিদ্যমান রীতি অনুসারে বিধবা নারীদের অপবিত্র জ্ঞান করায় সমাজে তাদের সন্মানজনক কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া উত্তরাধিকার বঞ্চিত হয়ে রিক্তহস্ত নারীরা সহজেই কুচক্রীদের শিকার হন।

অনুরূপভাবে বিধবাদের দ্বিতীয় বিবাহ করার ব্যাপারে সামাজিক বাধা থাকায় সাজগোছসহ তাদের যেকোনো সন্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টাকে সমাজ ভ্রুটিকুটির সাথে দেখে।

নুতন প্রজন্ম ও সম্ভাবনা

ভারতে শিক্ষার অগ্রসরতা ও নতুন প্রজন্মের সচেতনার জন্য সকলে অবস্থার ভয়াবহতা ও গভীরতা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

নারীদের স্বাধীনতা ও সামাজিক অধিকার দিতে সরকার ও সমাজ উদ্যোগী হয়েছে।

মাতুরার একটি হিন্দু আশ্রমের ব্রাহ্মণ দাস বলেন, ‘স্বল্প বয়সে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর বিবাহের বিরোধী আমি না। আমরা তো বর্তমানে কিছু বিধবার মাথামুন্ডানো ছাড়া রঙ্গীন পোশাক পরতে দেখছি।’

অনেক যুবক বিধবা নারীদের বিবাহে আগ্রহী হচ্ছে। অনুরূপ প্রাচীন রীতিনীতিতে অভ্যস্থ বয়োজ্যৈষ্ঠ নারী-পুরুষরাও সামাজিক এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছে।

আইনিভাবে বিধবা নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সকল প্রতিশ্রুতি দেয়ার ঘোষণা বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকার দিয়ে আসছে।

বিধবাদের করুণ অবস্থা থেকে বের করে সমাজের মূলস্রোতে আনতে কারিগরি শিক্ষা দিয়ে স্বাবলম্বী করার চেষ্টাও চলছে। সামাজিক নিরাপত্তাস্বরূপ প্রতিমাসে ব্যাংকে অর্থ দেয়ার পাশাপাশি গম, চাল ও চিনি দিচ্ছে সরকার।

কিন্তু দীর্ঘসময় থেকে চলমান রীতি ভাঙতে ও পরিবর্তনের মূলস্রোতে সমাজকে আনতে আরো সময়ের প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মানবউন্নয়নের থেকে সমরাস্ত্রে অঢেল বিনিয়োগের কারণে ব্যহত হচ্ছে সকল সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্পগুলো। তবে একটি জাতির মৌলিক ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়ার বিকল্প নেই।