অনলাইনে চলছে অবাধে সমকামিতার প্রচার

মুনশী নাঈম:

ক’দিন আগে ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড পড়ুয়া বাংলাদেশি ছাত্র সামির মুন্তাজিদ সমকামিতাকে সাপোর্ট করে তার ফেসবুক ওয়ালে একটি ছবি পোস্ট করে। তার সেই ছবি এবং তাতে তার সাবেক সহকর্মীদের দু’একটি কমেন্টকে কেন্দ্র করে তৈরী হয় বিতর্ক। উত্তপ্ত হয়ে উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অনালইনে সমকামিতা প্রচারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠে বাংলাদেশের ধর্মীয় মহল। প্রতিবাদ করে তারা বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিতে যেমন সমকামিতা নিষেধ, তেমনি নিষেধ বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ীও। সংবিধানের ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। অনলাইনে প্রকাশ্যে এই সমকামিতার প্রচার ইসলামের পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির জন্যও হুমকি।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী সমকামিতা একটি ফৌজদারি অপরাধ হলেও অনলাইনে প্রকাশ্যেই চলছে এর প্রচারণা। ওয়েবসাইট, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ব্লগ ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে সমকামিতার পক্ষে কথা বলছেন অনেকেই।

বাংলাদেশে প্রথম সমকামিতা প্রচারের প্রকাশ্য প্রয়াস শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। বাংলাদেশের সমকামীদের জন্য প্রথম অনলাইন গ্রুপ ‘গে বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন রেংগু নামক এক কানাডিয়ান নাগরিক। রেংগুর মৃত্যুর পরে এর কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে।এরপর ২০০২ সালে ইয়াহু পোর্টালে প্রকাশ এবং আবরার দ্বারা পরিচালিত ‘টিন গে বাংলাদেশ’ এবং কাজি হক দ্বারা পরিচালিত ‘বয়েস অব বাংলাদেশ’ নামক দুইটি অনলাইন গ্রুপের কার্যক্রম শুরু হয়। ইয়াহু কর্তৃপক্ষ দুইটি গ্রুপই ২০০২ সালে মুছে ফেলে। বিভিন্নভাবে নাম পরিবর্তন ও বারবার চালু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত বয়েজ অনলি বাংলাদেশ যা বর্তমানে ‘বয়েস অব বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত এই গ্রুপটিই টিকে আছে। বর্তমানে তানভির আলম নামে পরিচালিত গ্রুপটি বাংলাদেশী সমকামীদের সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক। এটি ২০০৯ থেকে ঢাকায় এলজিবিটি সচেতনতাবর্ধক অনুষ্ঠান করে আসছে। এই দলটি বাংলাদেশে একটি সুসংহত এলজিবিটি সমাজ গড়তে চায়, এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ প্রযোজ্যতার অবসান চায়।

এ ছাড়াও ইস্টিশন, সামহোয়্যারইন ব্লগ, মুক্তমনা, সচলায়তন সহ আরও বিভিন্ন ব্লগে সমকামিতার পক্ষে জোর প্রচারণা চালানো হয়। সমকামিতার পক্ষে ফেসবুকে সক্রিয় রয়েছে বিভিন্ন পেইজ। যেখানে সমকামিরা তাদের আবেগ, ক্ষোভ, চিন্তা প্রকাশ করে থাকে। ব্লগ এবং ফেসবুক পেইজের লেখাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মৌলিক তারা তিনটি পয়েন্ট ধরে সমকামিতার প্রচারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

১. প্রথমত তারা সমকামিতাকে নর্মালাইজড করার চেষ্টা করে। সমকামিতার বিরুদ্ধে মানুষের যে প্রাকৃতিক সংবেদনশীলতা এবং ঘৃণা, সেটা নষ্ট করে দেয়। তারা কখনো বলে, ‘সমকাম ভালো না মন্দ সেটা দেখার বিষয় নয়। বিষয় হলো এটা আমাদের বাস্তব জীবনেরই একটা অংশ।’ কখনো বলে, ‘সমকামিরা বিনয়ী, ভদ্র, লাজুক হয়। অন্যের প্রতি তারা কেয়ার করে খুব।’ কখনো বলে, ‘যার যার পছন্দ ভিন্ন। কেউ ভ্যানিলা আইসক্রিম খায়, আর কেউ গুগলি।’

২. সমকামিকে তারা ভিক্টিম হিসেবে উপস্থাপন করে। এক্ষেত্রে তারা সমকামকে জেনেটিক এবং জন্মগত বলে দাবি করে। এটাকে জেনেটিক এবং জন্মগত সাব্যস্ত করে নৈতিক বৈধতা দিতে চায়। বলতে চায়, এতে সমকামির কোনো দোষ নেই। এটা জন্মগত, স্বভাবেই থাকে। এটা মেনে নিতে হবেই। এটা কোনো রোগ নয়, প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। এর প্রমাণে তারা কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জাহেলি যুগের কিছু রেওয়াজ এবং পশু-পাখির সমকাম আচরণ পেশ করে।

৩. সমকামকে অধিকার হিসেবে অভিহিত করে তারা প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার চালায়। এখানে নিয়ে আসে মানবাধিকারের প্রসঙ্গ। এ পয়েন্টে তাদেরকে সমর্থন দেয় বিভিন্ন এনজিও। মানবাধিকার সংস্থা।

ইতোমধ্যেই বিদেশি এনজিওগুলোর অর্থায়নে জেলায় জেলায় সমকামীদের ক্লাব খুলে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সুসংগঠিত করা হচ্ছে। এসব ক্লাবগুলো- লাইট হাউস কনসোর্টিয়াম (বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এদের কার্যক্রম), বন্ধু (সোস্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি), ওডপাপ, সাস (বরিশাল বিভাগে এদের কার্যক্রম), হাসাব। আর সমকামীদের স্বাস্থ্যগত সেবা দিয়ে থাকে- আশার আলো সোসাইটি, মুক্ত আকাশ বাংলাদেশ, জাগরি, ক্যাপ। সমকামীদের আইনগত সহায়তা দিয়ে থাকে- বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বিদেশি সংস্থা বাংলাদেশের সমকামীদের অর্থায়ন করছে- ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনাল, রয়েল নেদারল্যান্ডস এ্যাম্বেসি, ইউনাইটেড নেশন পপুলেশন ফান্ড (ইউএনএফপিএ), ‘হাতি’ প্রকল্প, বিশ্বব্যাংক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, আরসিসি প্রোজেক্ট অব দি গ্লোবাল ফান্ড আইসিডিডিআর।

বাংলাদেশের আইন সমকামিতাকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ মনে করে কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়ার বিধান রেখেছে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সঙ্গে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। এ ধারায় বর্ণিত অপরাধীরূপে গণ্য হওয়ার জন্য যৌন সহবাসের নিমিত্তে অনুপ্রবেশই যথেষ্ট বিবেচিত হবে। আইনের ব্যাখ্যায় পায়ুকাম এবং পশ্বাচারকেই ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

সবচে ভয়ংকর হলো—সমকামিতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ৩৭৭ নং ধারা বাতিল করতে চাপ আসছে খোদ জাতিসংঘ থেকেই। ২০১৩ সালে ‘বাংলাদেশ রিফিউজেজ টু অ্যাবোলিশ ক্রিমিনালাইজেশন অব কনন্সেয়াল সেম-সেক্স টাইস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ২৪তম নিয়মিত অধিবেশনে ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউয়ে বাংলাদেশকে সমকামী বিয়ের পক্ষে সুপারিশ করে। এতে বাংলাদেশ সরকারকে ৩৭৭ নম্বর সেকশন বাতিল করতে বলা হয়। ওই ধারায় সমকামী বিয়েকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এ সুপারিশ মেনে নেয় নি। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক পপুলেশন ডেভেলপম্যান্ট কনফারেন্সেও বাংলাদেশকে একই ধরণের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী আব্দুল কালাম আবুল মোমেন বলেন, অন্যান্য মুসলিম এবং কিছু খ্রিস্টান দেশের মত বাংলাদেশ সমকামীদের অধিকার সমর্থন করবে না, কারণ তা তার মূল্যবোধকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

অনলাইনে সমকামিতার অবাধ প্রচারণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসলাম বিশেষজ্ঞগণ। তারা মনে করছেন, সংবিধান পরিপন্থী একটা কাজের প্রচারণা এমন অবাধে চললে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য এটা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। প্রচারণার এক পর্যায়ে তখন তারা আরও জোরে সংবিধানের আইন পরিবর্তনের দাবি তুলবে। যেটা জাতিসংঘ প্রস্তাব করেছে। সমকামিতা নিতান্তই প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ। এটা বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনাচারের সঙ্গে যায় না। জোর করে মূল্যবোধ পরিপন্থী এবং প্রকৃতিবিরুদ্ধ রুচিহীন কাজকে সংস্কৃতির অংশ বানিয়ে ফেলতে চাওয়াটাই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এটাকে রুখতে হবে। সরকারকেও এই বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে।