
সমুদ্রের পানি পরিশোধন করে শত শত কিলোমিটার পাইপলাইনে মরুভূমির শহরগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি
নদীবিহীন মরুভূমিতে ঘেরা সৌদি আরবে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। দেশটির অধিকাংশ এলাকাই শুষ্ক মরুভূমি। অনেক অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতও খুব কম। এর সঙ্গে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় পানির চাহিদা পূরণে দেশটিকে নির্ভর করতে হয় আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশাল অবকাঠামোর ওপর।
সৌদি আরবের এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সমুদ্রের পানি পরিশোধন বা ডিস্যালিনেশন। উপকূলীয় এলাকায় স্থাপিত ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে সাগরের পানি সংগ্রহ করে তা পরিশোধনের মাধ্যমে মিঠা পানিতে রূপান্তর করা হয়। এরপর বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেই পানি দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
মরুভূমির ভেতর দিয়ে বিশাল পাইপলাইন
উপকূল থেকে দূরের মরুভূমি ও শহরগুলোতে পানি পৌঁছে দিতে সৌদি আরব গড়ে তুলেছে দীর্ঘ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। এসব পাইপলাইন শত শত কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় আকারের পাইপ তৈরিতে উচ্চক্ষমতার কার্বন স্টিল ব্যবহার করা হয়। প্রায় ২৫ মিলিমিটার পুরু স্টিলের পাত রোলিং মেশিনের মাধ্যমে প্রায় ১ দশমিক ৮ মিটার ব্যাসের পাইপে রূপ দেওয়া হয়। ১২ থেকে ১৮ মিটার দীর্ঘ প্রতিটি পাইপের অংশে আল্ট্রাসনিক পরীক্ষা এবং ক্ষয়রোধী আবরণ দেওয়ার পর সেগুলো নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
কীভাবে মরুভূমিতে বসানো হয় পাইপ?
পাইপলাইন স্থাপনের কাজও বেশ জটিল। প্রথমে জিপিএস ও আধুনিক জরিপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাইপলাইনের পথ নির্ধারণ করা হয়। বালুর টিলা, নরম বা অনিরাপদ মাটি এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় নিয়ে রুট নির্ধারণ করা হয়।
পথে পাহাড়ি বা পাথুরে এলাকা পড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী খাত তৈরি করে সেখানে পাইপ বসানো হয়। এভাবে কঠিন মরুভূমির ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়েও পানির সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
পানির উৎস সমুদ্র
সৌদি আরবের এই বিশাল পানি সরবরাহ ব্যবস্থার মূল উৎস হলো সমুদ্র। উপকূলের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে সাগরের পানি পরিশোধনের পর তা পাইপলাইনে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি পাইপ দিয়ে দিনে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি পরিবহন করা সম্ভব। দীর্ঘ পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এভাবে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে দেশের অভ্যন্তরে পানি পৌঁছে দেওয়া হয়।
বিপুল ব্যয়ের অবকাঠামো
এ ধরনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। একইভাবে বড় ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট নির্মাণেও শত শত মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।
প্রাকৃতিকভাবে মিঠা পানির উৎস সীমিত হওয়ায় সৌদি আরবের জন্য ডিস্যালিনেশন ও পানি পরিবহনের এই অবকাঠামো এখন জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে।
নদী না থাকলেও সমুদ্রের পানি পরিশোধন, বিশাল পাইপলাইন নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে মরুভূমির দেশ সৌদি আরব তার কোটি কোটি মানুষের পানির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে।
