অস্থির পার্বত্য চট্রগ্রাম : স্বাধীন জুমল্যান্ডের দিকেই কি এগোচ্ছে উপজাতিরা?

রাগিব রব্বানি 

পার্বত্য চট্টগ্রাম। Chittagong Hill Tracts। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি—তিনটি জেলা নিয়ে এ জনপদের বিস্তৃতি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সাইনো তিব্বতি মঙ্গোলিয়েডসহ প্রায় ১৪টি জাতিগোষ্ঠী ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেছে। প্রায় ৫ লাখ জনসখ্যার এ উপজাতীয় অঞ্চলের প্রধান দুটি উপজাতি হলো চাকমা এবং মারমা। এরা ছাড়াও আছে ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই, পাংখো, ম্রো, খিয়াং, বম, খুমি, চাক, গুর্খা, আসাম, সাঁওতাল এবং বিপুল সংখ্যক বাঙালি। কিন্তু আধিপত্যবাদী উগ্র উপজাতির হাতে অব্যাহতভাবে নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে এসব বাঙালি।

গত ১৮ মার্চ সোমবার পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটিতে উপজেলা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের নৃশংস আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এ পর্যন্ত সাতজন নিহত হয়েছেন এই হামলায়। আহত আরও ১৫জনকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ঘটনার একদিনের ভেতর গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতাকে হত্যা করেছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা।

বিভিন্ন সংস্থার হিসাব বলছে, গেল দেড়বছরে ৭০ জনেরও বেশি মানুশ মারা গেছেন পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের এই তাণ্ডবে। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর থেকেই দুর্গম পাহাড়ি এই অঞ্চলে উপজাতীয়রা অস্থিরতা তৈরি করে আসছে। সার্বক্ষণিক সেনা মোতায়েনের পরও থামছে না এই সহিংসতা।

উপজাতিদের হাতে এখানে নানাভাবে নীপিড়ন ও নিগ্রহের শিকার হয়ে আসছে বাঙালিরা। উপজাতীয় এই সন্ত্রাসীদের আক্রমণের কৌশল ও শক্তি দেখলে বিস্ময় মানতে হয়। প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর মতোই তাদের আক্রমণের ধরন ও প্রকৃতি। পাহাড়ে বসবাসরত সাধারণ মানুষ জিম্মি সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাডারদের হাতে। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা দিয়ে খুব সহজেই ক্যাডারদের হাতে অস্ত্র আসছে। তাদের কাছে এমন সব অত্যাধুনিক সয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়েছে যা দেশের কোনো কোনো বাহিনীর কাছেও নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রের বরাত দিয়ে এমন সংবাদ করেছে দৈনিক ইত্তেফাক।

পত্রিকাটি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দার বরাত দিয়ে আরও জানায়, পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে ৪৪ কিলোমিটার পথ অরক্ষিত রয়েছে। বিশাল সীমান্ত এলাকা পাহারায় নেই কোনো ‘পর্যবেক্ষণ পোস্ট’। এমনকি টহল দেয়ার জন্য পায়ে-হাঁটা পথও নেই। দুর্গম জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল দিতে পারেন না। তাই ওই সীমান্ত এলাকাটি থাকছে অরক্ষিত। কিছুসংখ্যক বর্ডার অভজারভেশন পোস্ট (বিওপি) থাকলেও সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ফলে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবাধে অস্ত্র ও মাদক ঢুকছে পার্বত্য অঞ্চলে। টেকনাফে কড়াকড়ির পর মাদক ও অস্ত্র চেরাচালানে এ পথ ব্যবহার করছে মাদক চোরাকারবারী ও সন্ত্রাসীরা।

জানা গেছে, পাহাড়ে বিবদমান সংগঠন জেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত) প্রতিপক্ষ হলেও এবার তারা এক হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে। তাদের এই ঐক্যবদ্ধ হামলা এবং অব্যাহত সন্ত্রাসী প্রক্রিয়া কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? তবে কি স্বাধীন জুমল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকেই এগোচ্ছে উপজাতীয় এই বাহিনী?

দাঙ্গা-সহিংসতার আড়ালে কী হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে?
দাঙ্গা-সহিংসতার দিকে মানুষের মনযোগ আকর্ষিত করে পাহাড়ি এই অঞ্চলটির ইতিহাস, ঐতিহ্য, এমনকি পুরো চেহারাই বদলে দিতে মরিয়া একশ্রেণীর এনজিও নামক খ্রিষ্টান মিশনারি। এক সময় এ তিন জেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাধিক্য থাকলেও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে সেই হিসাব। ধর্ম প্রচার ও আর্থিক প্রলোভনে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছেন অনেকেই।

এ অঞ্চলে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭%-এরও বেশি পাহাড়ি উপজাতিকে বানানো হয়েছে খ্রিষ্টান।

ওই এলাকার মানুষের দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও মানবসেবার নাম করে তাদেরকে ধর্মান্তরিত করার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে মিশনারিগুলো। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫৪টি পরিবারের ৪৭৫ জন সদস্য খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। বান্দরবানের চিম্বুক, ম্রো, শৈল, প্রপাত এলাকায় বম, ত্রিপুরা ও নাইক্ষংছড়িতে চাকমাদের খ্রিস্টান বানানো হচ্ছে। রুমা-থানচি উপজেলার গভীরে একেকটি পাড়া-কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে অসংখ্য গির্জা।

খাগড়াছড়ি জেলার সাজেক ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে খেয়াং, বম, পাংখু ও লুসাই উপজাতির ১০ হাজার মানুষের বাস। ২০ বছর আগেও এখানে খ্রিষ্টান ধর্মের চিহ্নও ছিল না। তবে এখন এদের অধিকাংশই খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেছে। এ অঞ্চলে থাকা দরিদ্র পরিবারগুলোকে টার্গেট মাফিক পরিচালিত করে খ্রিষ্টান মিশনারি এনজিওগুলো। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা দিক থেকে বঞ্চিত ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে অর্থের প্রলোভন ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে তারা। পাশাপাশি এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হাসিল করে নিচ্ছে নিজেদের উদ্দেশ্য।

খ্রিষ্টান মিশনারিগুলো এতই ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে যে, ইতিমধ্যে খাগড়াছড়িতে ৭৩টি এবং বান্দরবানে ১১৭টি গির্জা নির্মাণ করে নিয়েছে। এখানে একই সময়ে খ্রিষ্টান হয়েছে ছয় হাজার ৪৮০টি উপজাতীয় পরিবার। রাঙ্গামাটিতে তারা চারটি গির্জার তত্ত্বাবধানে খ্রিষ্টান বানিয়েছে এক হাজার ৬৯০ টি পরিবারকে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, পাহাড়ি যেসব জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা কম, তাদের প্রায় শতভাগ খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। এমন একটি উপজাতি পাংখু। যাদের পুরো জনগোষ্ঠীই এখন খ্রিষ্টান। নিজেদের ধর্ম বদলের সাথে সাথে ইংরেজিকেও তারা নিজেদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। তাদের জীবন-পদ্ধতি বা লাইফ স্টাইল দেখলে মনেই হবে না এরা পাহাড়ি এলাকার লোক। বরং মনে হবে, যেন ইউরোপ-আমেরিকার কোনো আধুনিক শহরের বাসিন্দা এরা।

আধুনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব নব্য খ্রিষ্টান অত্যন্ত সক্রিয়। অনলাইনে তাদের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট রয়েছে। আছে পত্র-পত্রিকাও। নামে-বে নামে ফেসবুকে তাদের বেশ কয়েকটি পেজ আছে। এই তো কিছু দিন আগে বিতর্কিত লেখালেখি ও মন্তব্যের কারণে ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের প্রসিদ্ধ (CTH-Jummaland) বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবাসহ ইত্যাদি নাগরিক সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও তারা নিজেদেরকে বাংলাদেশি বলে স্বীকার করে না।

তাদের কিছু কিছু মন্তব্য খুবই মারাত্মক ও দেশদ্রোহী। কিছুদিন আগে তাদের একটি ফেসবুক ক্লিপিং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। সেখানকার তাদের কিছু লেখা ছিল এরকম—’রাজনৈতিক পটভূমিতে এই মাটি এখন বাংলাদেশ। তবে এই নয় যে আমরা বাঙালি। তুমি যদি যমুনার দূরত্বের চেয়ে নাফ নদীর সীমানাকে বেশি দূর ভাবো, তাহলে বড়ই ভুল করবে। We want free jummaland.’

একদিকে খ্রিষ্টান মিশনারি এবং তাদের চেষ্টায় কনভার্ট হওয়া পাহাড়ি নব্য খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের তৎপরতা, আর অপরদিকে উন্নত ও ভারি ভারি অস্ত্র এবং শক্তিতে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বলীয়ান হয়ে ওঠা কীসের ইঙ্গিত করে? বিশ্বস্ত বিভিন্ন প্রমাণ এবং বিশ্লেষণে ইতোমধ্যে তো এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা নিজেদের একটি সেনাবাহিনী গঠন করেছে—যাদের রয়েছে নিজস্ব ইউনিফর্ম এবং আগ্নেয়াস্ত্র (সাম্প্রতিক হামলাগুলো যার জাজ্বল্য প্রমাণ)। জানা গেছে, স্বাধীন জুমল্যান্ডের জন্য নিজস্ব পতাকাও তারা তৈরি করে নিয়েছে। তারা বাংলাদেশকে অস্বীকার করে।

এ যদি হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতি, তাহলে এই অঞ্চল দক্ষিণ সুদান বা পূর্ব তিমুর হতে বেশি দিন সময় লাগবে না। ইসলামি দাওয়াত ও তাবলিগের অভাবে সেখানকার স্থানীয়রা যে হারে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে, খুব দ্রুতই এমন একটি সময় আসবে, সেখানে খ্রিষ্টানরা সংখ্যাধিক্য লাভ করবে। তারপর হবে গণভোট। ভোটে নিশ্চিতভাবে তারা জিতে যাবে। আর তখনই তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে পুরো খ্রিষ্টান জগত, ইউরোপের তামাম দেশগুলো। স্বাধীন জুমল্যান্ডের বাস্তবায়ন ঠেকাবে, এমন হিম্মত তখন আর থাকবে কার?