আকাবিরদের রমজান : গাঙ্গুহী ও মুহাজিরে মক্কী রাহঃ

আবদুল্লাহ মারুফ : 

রমজান মাসে আমাদের আকাবির ও আসলাফের আমলে যেনো বসন্ত নেমে আসতো। তারা দিনরাত ইবাদত করতেন। কুরআন কারীমের তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, অজিফা আদায় এবং দীর্ঘ দীর্ঘ নামাজ পড়তেন। কেমন ছিলো তাঁদের রমজানগুলো, রমজানের দিনলিপি, কীভাবে তাঁরা সময়যাপন করতেন চলুন একটু দেখে আসি।

হযরত গাঙ্গুহীর দিনরাত

কুতুবে আলম হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির আমলের পরিমাণ রমজানমাসে অতিমাত্রায় বেড়ে যেতো। তাঁর জিকির, তিলাওয়াত, মোজাহাদা-মোরাকাবা এবং দীর্ঘ নামাজ দেখে লোকেরা অবাক হয়ে যেতো। বছরব্যাপী যেই রুটিন ছিলো, রমজান এলে তা আবার নবায়ন হতো। প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে অতিবাহিত করতেন। একদণ্ডের জন্যেও আমল থেকে বিরত থাকতেন না। শুধু আমল আর আমলㅡ তাঁর মহার্ঘ্য মুহূর্তগুলোর কিছুটা উন্মোচন।

রাতের শুরু এবং নিশিরুটিন

মাগরিবের পর তিনি আউয়াবিন নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। ছয় রাকাত নামাজের পরিবর্তে বিশ রাকাতে গিয়ে স্থির হতেন। দিনভর রোজা রেখে ইফতারের পর যখন শরীর দুমড়ে মুচড়ে আসে, ক্লান্তি চেপে ধরে, একটু আরাম করতে মন চায়, সেই তখন সব অলসতাকে পেছনে ফেলে তিনি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ পড়তেন।

তবুও কি, ‘আলামতারা কায়ফাফা’ সূরা দিয়ে হলে এক কথা ছিলো। পাক্কা দুইপারা বা তারো অধিক তিলাওয়াত করে তিনি এই বিশ রাকাত নামাজ শেষ করতেন। রুকু-সিজদাগুলো হতো অত্যন্ত দীর্ঘ। এভাবে আউয়াবিন শেষ হতো।

আউয়াবিনের পর খাবার খেতে ঘরে যেতেন। এই যাওয়া আর ঘরে গিয়ে খাবার শুরু করার মধ্যবর্তী সময়টায় কয়েক পারা পড়ে ফেলতেন। তারপর ইশার নামাজ এবং তারাবীর সময় হয়ে যেতো। তিনি আবার ঘন্টাখানেক বা সোয়াঘন্টা সময় লাগিয়ে তারাবি পড়তেন। তারাবির পর সাড়ে দশটা বা এগারোটায় ঘুমোতে যেতেন। যখন দুইটা বেজে যেতো, বিছানা ছেড়ে দিতেন। তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে যেতেন।

কখনো কখনো খাদেম তাঁকে একটার সময় উঠে অজু করতে দেখতো। তিনটা পর্যন্ত তাহাজ্জুদে মশগুল থাকতেন। আবার মাঝেমধ্যে সাহরির সময় কমে এলে কোনো খাদেম যদি ডাকতে যেতো, তাকে নামাজরত অবস্থায়ই দাঁড়ানো পেতো। সাহরির পর ফজর পড়ে আর শুতে যেতেন না। আটটা সাড়ে আটটা পর্যন্ত তাসবিহ, বিভিন্ন অজিফা এবং মোরাকাবা মোলাহাযায় মগ্ন থাকতেন। তারপর ইশরাকের নামাজ পড়ে বের হতেন। এবার গিয়ে ঘন্টাদুয়েক একটু আরাম করতেন।

দিন চলে যায় আল্লাহ বোলে

কিছুক্ষণ পর রানার চিঠি দিয়ে যেতো। হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি চিঠিগুলোর জবাব লিখতে বসতেন। এই সময়টায় ফতোয়া লেখানোর কাজেও ব্যয় করতেন। তারপর চাশতের নামাজ পড়ে আবার কিছুক্ষণ কায়লুলা করতেন। এই করে জোহরের সময় হয়ে যেতো।

জোহরের পর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে আছর পর্যন্ত তিলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। রমজানে সাধারণত প্রতিটি ইবাদত বৃদ্ধি পেতো, কিন্তু অধিকহারে বৃদ্ধি পেতো কালামুল্লাহ শরীফোর তিলাওয়াত। এতো অধিক পরিমাণে পড়তেন, ঘরে আসা-যাওয়া এবং নামাজ ও নামাজের বাইরে দৈনিক কুরআন কারীমের অর্ধেক খতম হয়ে যেতো।

দিনভর ইবাদত করে যখন কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তখন খাদেম বিনয়ের সঙ্গে বলতো, ‘হুজুর আজকের তারাবীটা বসে পড়লে ভালো হবে।’ খাদেমদের এই কথা শুনে তিনি বলতেন, ‘নেহি জি, তা হয় না; এটি কম হিম্মতের কথা। তারপরো যদি কিছু বলা হতো, তিনি বলতেনㅡ أفلا أكون عبدا شكورا আমি কি শোকরগুজার বান্দা হবো না? এই কথার পর আর উত্তর থাকে না।

টুকরো টুকরো

এই মোজাহাদায় হযরত গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির খাবারের এই অবস্থা ছিলো যে, পুরো রমজানের খাবার হিসেব করতে গেলে পাঁচ সেরে পৌঁছানো মুশকিল হয়ে যেতো। পাঁচ সেরও হতো না!

তাযকিরাতুর রাশীদে হাকিম ইসহাক সাহেব লিখেন, রমজানে তিনি অত্যন্ত কম ঘুমোতেন। কম কথা বলতেন। অধিকাংশ সময় তিলাওয়াত, নফল নামাজ, এবং জিকির-আজকারে ব্যয় করতেন।

তারাবীর বিশ রাকাতের প্রথম অর্ধেক তিনি নিজে পড়াতেন। আর শেষ দশ রাকাত সাহেবজাদা মৌলভী হাফেজ হাকিম মাসউদ আহমাদ সাহেবের পেছনে পড়তেন। বিতরের নামাজের পর দুই রাকাত নামাজ পড়তেন। এই দুই রাকাত কখনো বসে পড়তেন, কখনো দাঁড়িয়ে পড়তেন। কিয়াম অনেক দীর্ঘ হতো। তারপর কেবলামুখী হয়েই সুরা মুলক সুরা সিজদাহ এবং সুরা দুখান পড়ে নিতেন।

হযরত হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীর আমল

হাজী সাহেব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি রমজানমাসে রাতের বেলা ঘুমোতেন না। রাতভর নিজে কুরআন কারীম তিলাওয়াত করে, নাতিনাতকুর বা অন্যান্য হাফেজদের তিলাওয়াত শুনে কাটিয়ে দিতেন।

এমদাদুল মুশতাক কিতাবে হযরত থানুভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হাজী সাহেবের রমজানের মামুলাত সম্পর্কে নকল করেনㅡহযরত হাজী সাহেব বলেছেন, ‘এই ফকির যুবক বয়েস থেকেই অধিকাংশ রাত বিনিদ্র থেকেছি। বিশেষত রমজান মাসে রাত্রিবেলা বিছানায় পিঠ লাগাই নি।

রমজানে মাগরিবের পর আমার নাবালেগ দুই ভাতিজা, হাফেজ ইউসুফ ও হাফেজ আহমাদ হোসাইন পৃথক পৃথক ইশাপর্যন্ত পারা শোনাতো। তারপর ইশার নামাজের পর আরো দুইজন হাফেজ এসে কুরআন শোনাতো। ওদের পর আরেকজন হাফেজ অর্ধরাত পর্যন্ত কুরআন শোনাতো।

তারপর আমরা তাহাজ্জুদে দাঁড়াতাম। দুইজন হাফেজ তাহাজ্জুদে কুরআন পড়তো। রমজানের রাতগুলো এভাবেই অতিবাহিত হয়েছে।’ (এমদাদুল মুশতাক)

বিজ্ঞাপন