আগামীর মিডিয়া ও আমাদের ভাবনা

আতাউর রহমান খসরু

 

আগামী দিনের মিডিয়া নিয়ে লিখতে বসে শৈশবে পড়া একটি রূপকথা মনে পড়ল।রাজকুমারী জাদুকরের আয়নানামের গল্পটি এক দুষ্টু জাদুকরের খপ্পড়ে পড়া রাজকুমারীর কাহিনি উপজীব্য করে লেখা। যাতে দেখানো হয়, রূপ সৌন্দর্যে  মোহে পড়া এক রাজকুমারীকে বশীভূত করার জন্য এক জাদুকর তাকে স্বর্ণে মোড়ানো দৃষ্টিনন্দন আয়না উপহার দেয়। আয়নাটি জাদুর। যা জাদুকরের ইচ্ছে অনুযায়ী কাউকে সুন্দর বা কুৎসিত দেখাতো। জাদুকর একদিকে রাজকুমারীর প্রকৃত সৌন্দর্য্য গোপন করে তার ভেতর হাহাকার জাগিয়ে তুলত, অন্যদিকে তার কেন অনিন্দ্য সুন্দরী হওয়া উচিত সেই যুক্তিতে রাজকুমারীর রূপতৃষ্ণা বাড়িয়ে দিত। আবার রাজকুমারী তার কথার তামিল করলে তাকে রূপময়ী দেখিয়ে বিভ্রান্ত করত জাদুর আয়না। এভাবে রূপপিয়াসী রাজকুমারীকে বশীভূত করে রাজপরিবারের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে জাদুকর এবং পুরো পরিববারকে একটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে।

আমার মনে হয়, আগামী দিনের মিডিয়ামিরর অব নেশনবা জাতির আয়না থেকে দিনদিন সাম্রাজ্যবাদের জাদুকরি আয়নায় পরিণত হচ্ছে। যা সমাজের আসল চিত্র তুলে ধরার পরিবর্তেপ্রভুর প্রত্যাশিতচিত্র তুলে ধরতেই বেশি সচেষ্ট। সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন, মিডিয়া একদিকে আমাদের ধর্ম, সমাজ, সংস্কার মূল্যবোধের ব্যাপারে সন্দিহান করে তুলছে, অন্যদিকে আমাদের ভেতর জাগিয়ে তুলছে ভোগের তীব্র তৃষ্ণা। অবাস্তব অলীক জীবনের স্বপ্নে সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্তহীন প্রতিযোগিতায়। সাম্রাজ্যবাদের জাদুকরি আয়না কেড়ে নিচ্ছে আমাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা জীবনের আশাবাদ পর্যন্ত। ফলে বিভ্রান্ত আমরাই ভাঙছি আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, স্বপ্ন, সমাজ সংস্কার। তাই শঙ্কা হয়, আগামীর মিডিয়া হবে বস্তুবাদী সাম্রাজ্যবাদের একান্ত আস্থাশীল অনুগত বাহক। আমরা হবো তার মায়াজালে আবদ্ধ স্বপ্নবিভোর বিপথগামীরাজকুমারী

ক্রোশিয়ার বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব প্রফেসর মির্জা মেসিক তাঁর এক লেখায় বর্তমান বিশ্বের মিডিয়ার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। যা থেকে সহজেই মিডিয়ার গতিপথ নির্ণয় করা যায়। তিনি লিখেছেন–‘আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার এই যুগে যুদ্ধের শুরু, শেষ এবং মধ্যবর্তী সময় সবকিছুই মিডিয়াকেন্দ্রিক। মিডিয়া তাদের দৃষ্টিভঙ্গির আদলে জনমত গড়ে তোলে এবং বাস্তবতাকে উপস্থিত করে নিজস্ব রঙে। গণমাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে। এখানে উত্তরাধুনিকতা মিডিয়ার মধ্যে একটি নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। মিডিয়া পৃথিবীকে সেভাবেই তুলে ধরছে যেভাবে আমরা (মিডিয়া) চাই।’ (প্রবন্ধ : দ্য পারসেপ্শন অব ইসলাম অ্যান্ড মুসলিমস ইন দ্য মিডিয়া অ্যান্ড দ্য রেসপন্সিবিলিটি অব ইউেরোপিয়ান মুসলিমস টুওয়ার্ডস দ্য মিডিয়া)

প্রফেসর মির্জা মেসিক তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধে পশ্চিমা বিশ্বে মিডিয়া, মিডিয়ায় মুসলিমবিদ্বেষ, মিডিয়ার পেছনে শক্তি তাদের উদ্দেশ্য এবং ইসলামিক মিডিয়ার চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের নির্যাস হলো, ১১ সেপ্টেম্বরের পর পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম মুসলমানের ব্যাপারে যে বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে তা উস্কে দিয়েছে পশ্চিমা মিডিয়া। মিডিয়ার অব্যাহত প্রচারণায় পশ্চিমের মানুষ এখন বিশ্বাস করেমুসলমানের সঙ্গে পশ্চিমের চলমান সংকট’-এর সাথে তাদের সার্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।

ফলে এমন একটি শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা মিডিয়ায়ইসলামবিদ্বেষজিইয়ে রাখতে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সমর্থন দিতে প্রস্তুত। যদিও নিরাপত্তাপ্রশ্নের আড়ালে পশ্চিমা বিশ্বের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। নিরাপত্তা স্বার্থ সুরক্ষার শঙ্কা ছড়িয়ে দিতে না পারলে হয়তো ইউরোপীয় সমাজ রাষ্ট্রের অনেক আগ্রাসী অমানবিক কাজের অনুমোদন করত না। অথচ মানবাধিকারের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ইউরোপের কেউ কেউ মনে করে ইউরোপ মুসলিম বিশ্বকে মানবাধিকারের একই মাপকাঠিতে মাপা উচিত নয়। লেখকের মতে, বর্তমান বিশ্বের গণমাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের বিনিয়োগ, প্রভাব আধিপত্য এতো বেশি প্রবল যে, তার বিপরীতে ইসলামি মিডিয়ার টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। আর পশ্চিম সম্ভবত তা চায়ও না।

গণমাধ্যমে পশ্চিমের এই প্রভাব প্রতিরোধ করা না গেলে তারা মুসলিম বিশ্বে তাদের চিন্তা, চেতনা মূল্যবোধের বিস্তার ঘটাবে। ফলে মুসলিম সমাজে যৌনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে, সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি হবে এবং নৈতিকতার প্রশ্নে চরম অসততা দেখা দেবে। সেটা হবে মুসলিম সমাজের চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল সময়। তখন নিজস্ব শক্তি সামর্থ্যে আত্মরক্ষা করতে পারবে না তারা। এতে পথ সুগম হবে সাম্রাজ্যবাদীদের। তাদেরকে, তাদের চিন্তাচেতনা, শিল্পসংস্কৃতি, তাদের পণ্যকে স্বাগত জানানো হবে মুসলিম বিশ্বে।

তাহলে কি পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়াআগ্রাসনের মুখে ইসলামি মিডিয়া তৈরির সব প্রচেষ্টা থেমে যাবে? এটা কি একেবারেই ফলশূন্য? উত্তর হলো, না। আমাদের প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে হবে। এবং তাকে কিছুতেই ফলশূন্য বলা যায় না। কারণ, পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়াযুদ্ধের বিপরীত একটি দিক হলো, স্বয়ং পশ্চিমা সমাজেই প্রশ্ন উঠছে, মুসলিমরা কেন আমাদের শত্রু? তারা কতটা সন্ত্রাসী আর সন্ত্রাসে কতটা আক্রান্ত? দীর্ঘ এই যুদ্ধ পশ্চিমকে নিরাপদ করছে নাকি তার সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে?

এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে নেই। যা আছে ইসলামি মিডিয়ার কাছে। এসব প্রশ্ন মুসলিম বিশ্বের সমাজে আছে, বরং আরও জোরালো অনেক প্রশ্ন আছে যার উত্তর স্থানীয় আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে নেই বা থাকলেও তারা তা প্রকাশ করতে চায় না, প্রকাশ করতে পারে না। এজন্য স্থানীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামি মিডিয়ার আবেদন খুব সামান্য নয়। যদিও চলমান মিডিয়াযুদ্ধের বিপরীতে ইসলামি মিডিয়ার আয়োজন সামর্থ্য খুব সামান্য। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়োজনেই ইসলামি মিডিয়া এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, প্রশ্নগুলো জাগিয়ে তুলতে পারে এবং ছড়িয়ে দিতে পারে যতটা সম্ভব।

নানামাত্রিক মিডিয়া আগ্রাসনের মুখে ইসলামি মিডিয়ার যাত্রা অনেকটা ঘর বাঁচানোর মতো। যখন নিজের ঘরে আগুন লাগে এবং চতুর্পাশে লুটেরারা ভিড় করে, তখন সামর্থ্যের চেয়ে সাহস, মমত্ব দায়িত্ববোধের প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়ায়। অস্তিত্ব রক্ষার আকুতিই অসাধ্য সাধনের প্রধানতম উপায়। ইসলামি মিডিয়ার উদ্যোক্তা, রূপকার কর্মীসবার ভেতর জাতিরক্ষার আকুতিটুকু থাকা আবশ্যক। নিখাঁদ দেশপ্রেম, উম্মাহর প্রতি মমত্ববোধ এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যতীত চলমান মিডিয়াস্রোতের বিপরীতে ইসলামি মিডিয়ায় প্রাণ সঞ্চার করা যাবে না, তা টিকিয়ে রাখা যাবে না। এবং তা প্রয়োজনসংশ্লিষ্ট সবার ভেতর।

সব প্রতিকূলতার পরও দেশে ইসলামি মিডিয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বিশেষত অনলাইন মিডিয়া এই সম্ভাবনাকে আরও বড় করেছে। বিপুল আয়োজনসাপেক্ষ প্রিন্ট মিডিয়ার বিপরীতে অনলাইন মিডিয়া সহজসাধ্য। ইসলামি ধারার দুটি জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টালে (আওয়ার ইসলাম ইসলাম টাইমস)- কাজ করার অভিজ্ঞতাই ইসলামি মিডিয়ার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমাকে আশাবাদী করে তুলেছে। দুটি প্রতিষ্ঠানেরই সীমিত সীমাবদ্ধ আয়োজনের পরও মানুষের যে সাড়া, আবেগ, অনুভূতি প্রত্যাশা আমি দেখেছি তা অনন্য। আমার ধারণা, অভিজ্ঞতা অধিকাংশ অনলাইন ইসলামি পোর্টালের ব্যাপারেই সত্য।

সাধারণত ইসলামি উদ্যোগ আয়োজনগুলো প্রত্যাশার তুলনায় খুবই অপ্রতুল হয়। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাহিদার বিবেচনা করতে গিয়ে আয়োজন, প্রস্তুতি, সামর্থ্য ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। মসজিদমাদরাসা থেকে রাজনীতি পর্যন্ত ইসলামি ধারার প্রায় সব আয়োজনেই অপূর্ণতাগুলো থেকে যায়। আবার সেটা যে সবসময় অপারগতার কারণে হয়, তাও নয়। বরং দায়িত্ববোধ সদিচ্ছারও অভাব থাকে সেখানে। অনলাইন পোর্টালগুলো দেখলে অপূর্ণতার সংকট খুব সহজেই চোখে পড়ে। সবচেয়ে বড় সংকট দক্ষ পেশাদার কর্মীর। এটাই ইসলামি মিডিয়ার আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমার ধারণা। তাই ইসলামি মিডিয়া হাউজ, উদ্যোক্তা, রূপকার সংবাদকর্মীকে দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশলায় মনোযোগী হতে হবে। পাশাপাশি পেশাদারিত্ব তৈরির লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ শিষ্টাচারে সংযত সচেতন হতে হবে। ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে ইসলামি ধারার মিডিয়াগুলো মূলধারার গণমাধ্যমকে অনুসরণ করতে পারে।

একের পর এক ইসলামি ধারার অনলাইন পোর্টাল হওয়া যেমন আশাজাগানিয়া, তেমনি যাচ্ছেতাই মানের পোর্টাল করা এবং কিছুদিন পরপর তা বন্ধ হয়ে যাওয়াটাও নিন্দনীয়। এতে পুরো ইসলামি ধারার প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা তৈরি হতে পারে। প্রস্তুতি পরিকল্পনা ব্যতীত পোর্টাল করা এবং তাতে ইসলামের নাম ব্যবহার করা আমার কাছে একটি সংকটই মনে হয়। কিছুদিনের ভেতরেই এই প্রবণতার ভালোমন্দ সবাইকে ভোগাবে।

স্বল্প সম্পদ, সামর্থ্য অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইসলামি ধারার মিডিয়াগুলো পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারে। মতবিনিময়, সমন্বয়, সংযোগ সহযোগিতা ধারার বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অনেক বেশি সহায়ক হবে এবং বিপরীতমুখী প্রবল স্রোতের মোকাবেলায় সবার অস্তিত্বকে দৃঢ় করবে। ইসলামি মিডিয়াগুলো কাজের ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতিযোগী হতে বাধা নেই। সৎ প্রতিযোগিতার প্রয়োজনও, তবে দেশ, জাতি ইসলামের প্রশ্নে, সমগ্র ইসলামি ধারার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে তারা যেন পরস্পরকে সহযোগীই মনে করে। সম্মিলিত প্রয়াসই ইসলামি ধারার মিডিয়াগুলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াসকে সাফল্যমণ্ডিত করতে পারে।


লেখক : সহ-সম্পাদক, দৈনিক কালেরকণ্ঠ

আগের সংবাদজাতীয়তাবাদের বিবর্তন এবং একটি মুসলিম দরদি মন
পরবর্তি সংবাদইসলামোফোবিয়া