আবদুল লতিফ নেজামি : এক সরল জীবনের যাদুকর

আবদুল্লাহ  মারুফ:

গতকাল যখন প্রথমবার সংবাদটি শুনি, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম নাㅡ এই কী কথা! কোথাও ভুল হচ্ছে না তো! মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি সাহেবের নাম গুলিয়ে ফেললাম নাকি আমি! আরো গভীর হয়ে যখন তথ্যটি অনুসন্ধান করতে লাগলাম, দেখি, হ্যাঁ, সংবাদটি সত্যㅡ নেজামি সাহেব আর নেই আমাদের মাঝে। তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। বুকের বিজনে শুরু হয় হাহাকার। যেন এক লাখ মর্মাহত আত্মা ক্রন্দন শুরু করে বুকের ভেতরে, আমি নিশ্চল হয়ে পড়ি; চোখ অশ্রুতে ভরে ওঠে। শুধু ভাঙা-ভাঙা শব্দে উচ্চারণ করি ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’।

এই প্রবীণ জ্ঞানবৃদ্ধকে আমি খুব কাছ থেকে খুঁটিয়ে-খুঁচিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম একদিন। ফেলে আসা সেই অতীত যেন আমার সামনে পুনর্বার এসে দাঁড়াল। আমার মনে পড়ে, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে নিয়ে হেরার জ্যোতির বিশেষ সংখ্যাটি করতে গিয়ে আমরা নানাজনের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। এর-ওর কাছ থেকে নানাভাবে মাওলানা খানকে পড়তে চেয়েছিলাম। ঢাকা শহরে, ময়মনসিংহে, সিলেট-চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের ননানাপ্রান্তে অনেকের কাছে তাই আমাদের যেতে হয়েছিল।

সেই ধারাবাহিতায় একদিন গিয়ে উঠলাম পল্টনে নেজামে ইসলাম পার্টির কার্যালয়ে, সোজা মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি সাহেবের টেবিলে।

আমি এই মুখাবয়বটি তো কৈশোর থেকেই দেখে আসছি। একটু যখন বয়স বেড়ে বুঝসুঝ হয়েছে, পত্রিকার পাতায় প্রায়শই ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামের ‘বিপ্লবী’ ব্যানার হাতে দাঁড়ানো মহামানবদের কাতারে তাঁকে দেখতাম। যেই মহামানবগণ সহস্রচোখে নির্ঘুম পাহারা দিয়ে চলতেন এই আমাদের পুরো শহরটাকে।

আমার পছন্দের ব্যক্তি এবং অত্যাধিক ভালো লাগার নেতার মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী। রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাঁকে আমার খুব ভালো লাগত। তাঁর যেই চিত্রগুলো আমাকে সবচেয়ে আলোড়িত করত, তা হলোㅡ বাঘের মতো হুংকার ছুড়ে আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। আমি এই চিত্রটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার দেখতাম। আর তখনই, নিত্য চোখে পড়ত মাওলানা নেজামি সাহেবের মুখ।

আমি ভেবেছিলাম তিনিও হয়তো গুরুগম্ভীর হবেন। হয়তো রোদের মত চড়া অথবা একটু কঠোর মেজাজ থাকবে তাঁর। কিন্তু মাওলানা নেজামির সঙ্গে আমি যখন করমর্দন করছিলাম, অনুভব করছিলাম আমার ভেতরের সীমানাগুলো ভেঙে যাচ্ছে, ভয়ের সীমানা, ধারণার সীমানা, নানান ভাবনার সীমানা।

মামুন ভাই আর আমি তাঁর মুখোমুখি বসলাম। তাঁর মুখখানা ছিল শান্ত ও নিরুদ্বিগ্ন। তিনি আমাদেরকে বসিয়ে, চা-পানি দিয়ে যাবার অর্ডার করেন একজনকে। তারপর কথা বলা শুরু করেন। আশ্চর্য, বহুবর্ণিল বিচিত্র অভিজ্ঞতার অধিকারী এই প্রবীণ জ্ঞানবৃদ্ধটি কথা বলছেন হেসেখেলে, একেবারে বন্ধুর মত! কিছু একটা বলে হেসে হেসে ভেঙে পড়ছেন, আবার সোজা হয়ে বসছেন চেয়ারটিতে।

আমার এতো ভালো লাগলো, তিনি শক্তচোখে তাকিয়ে তাঁর মতামতটি বলে থামছেন, তারপর আমাদেরকে বলতে দিয়ে, যদি প্রাসঙ্গিক মজার কোনো ব্যাপার থাকে সেটা তুলে এনে হো হো করে হেসে ভেঙে পড়ছেন। আহ, কী সরলতা!

আমি লক্ষ্য করলাম, কথা বলার সময় হাসতে গিয়ে আঙুলের ফাঁক গলে দুইখণ্ড চানাচুর আর একটি বাদামের দানা গড়িয়ে পড়লো শাদা পাতার উপর, তিনি তা উঠিয়ে নিলেন, খেয়ে ফেললেন কড়মড় করে। তারপর মুখে তৃপ্তির শব্দ।

সভ্যভব্য এই লোকটির পুরো জীবনটাই ছিলো সহজসরল, অনাড়ম্বর এবং সাদামাঠা। তাঁর চোখের সামনে কত আন্দোলন সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে, সাদা, কালো, হলুদ তাদের রং। তিনি চাইলেই ন্যায়-অন্যায় বোধে সামান্য তারতম্য করে, চারপাশে জড়ো করে নিতে পারতেনㅡ কোলাহল, প্রাচুর্য ও শক্তির দম্ভ। কিন্তু তিনি ‘কালো টাকা’র হাতছানিকে সরল একটি হাসি দিয়ে উপেক্ষা করে গেছেন বরাবরই। ফলে এমন হয়েছে, গাড়ি-বাড়ি তো দূরে থাক, পকেটে রিক্সা-ভাড়া পর্যন্ত থাকত না।

মুফতি আমিনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কবর জিয়ারত করতে গেছেন। রিক্সা থেকে নেমে দেখেন পকেটে টাকা নেই; নেড়েচেড়ে দেখেন, উঁহু, নেই। রিক্সাচালক তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে, ‘এ কেমন বুড়ো, দশবিশ টাকাও থাকে না এই যুগে, কী আজব!’ তিনি চালকের মুখ-পড়ে নম্র করে বলছেন, ‘বাজান, একটু এখানে দাঁড়ান আমি ভেতর থেকে আসছি।’ এই বলে তিনি ফয়জুল্লাহ সাহেবের রুমে গিয়ে তাঁর থেকে পনেরো-বিশ টাকা এনে ভাড়া দিচ্ছেন রিক্সাচালককে। এই হলো দেশের শীর্ষ একটি ইসলামি সংগঠনের চেয়ারম্যানের অবস্থা।

আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি হাস্যরসের মধ্যেই খুলে ধরেছেন ইতিহাসের শতবর্ষের পাতা। আমি তাঁর সঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছি দুই চোখ, আর দেখতে পাচ্ছি, ঐ তো আমাদের ইতিহাস, আমাদের পূর্বসূরি আর ধুলো-উড়িয়ে ছুটে চলা দিগবিজয়ী অশ্বারোহী।

কিছুক্ষণ পর তিনি আড়মোড়া ভেঙে বললেনㅡ ‘এখন দ্যাখো তো, দ্যাখো, কী অবস্থায় এসে পৌঁছেছি আমরা।’ তারপর তিনি আরো কথা বললেন। সাহিত্যশিল্প নিয়ে বললেনㅡ ‘সাহিত্যবিষয়ক সব পড়বা, সব।’ মাওলানা খানের কথা বলে উদাহরণ দিলেন। বললেন তাঁর সম্পাদিত ‘দৈনিক সরকার’ এর কথা।

আমি মুগ্ধমনে তাঁর কথাগুলো শুনেছিলাম, তাঁর সরলতায় খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। আজকে এই সময়ে এসে, আমার বুক ভেঙে আসছে বারবার, কেবল তাঁর লাজুক হাসিটি চোখে পড়ছে। আরো খারাপ লাগছে, এই ‘মনখারাপের দিস্তা’ সিরিজটি শুরু করার পর নিকট-অতীতে হারিয়ে যাওয়া আমাদের মনীষীদের নিয়ে যখন লিখেছি, তিনিও পোস্ট করতেনㅡ ‘আনোয়ার শাহ’র ইন্তেকালে আবদুল লতিফ নেজামির শোক, হজিগঞ্জির ইন্তেকালে শোক, আনসারির ইন্তেকালে শোকㅡ আর আজকে তাঁকে নিয়েই আমার শোকগাথা রচনা করতে হচ্ছে, আহ হা!

ভেতরটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে; হে ঋষি, ভালো থাকুনㅡ রবের আতিথেয়তা গ্রহণ করুন, উপভোগ করুন এখন মনভরে।