‘আমি বড়ই হয়েছি শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের গুলি খেয়ে মরতে দেখে’

হুযাইফা পণ্ডিত একজন কাশ্মীরি কবি, অনুবাদক ও গবেষক। কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অকুতোভয় সমর্থক। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘প্রতিরোধ কবিতা’র তিন দিকপাল–ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, আগা শহীদ আলি ও মাহমুদ দারবিশের উপর পিএচডি করেছেন। অনুবাদ করেছেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, গোলাম আহমদ মাহজুরসহ অনেকের কবিতা। কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন, কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর অত্যাচারসহ আরো নানা বিষয়েই বেশ খোলামেলা কথা বলেছেন এই কবি। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন ইণ্ডিয়ান-আমেরিকান কবি ও ফিল্মমেকার কল্পনা সিং। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন ফাতেহের সহযোগী সম্পাদক তুহিন খান।

কল্পনা সিং : আপনি একজন কাশ্মীরি লেখক, কবি, অনুবাদক। আপনার শৈশব, বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনার সময়গুলো কাশ্মীরসহ ভারতের আরো বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে। বর্তমানে অনেক কাশ্মীরিই নিজেদের ‘ভারতীয়’ বলতে চান না। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? নিজেকে কী বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন— কাশ্মীরি, ভারতীয়, নাকি ভারতীয় কাশ্মীরি?

হুযাইফা পণ্ডিত : আমি কাশ্মীরি পরিচয়েই পরিচিত হতে চাই। ২০০৮ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্তও হয়ত আমি নিজেকে ভারতীয় কাশ্মীরিই ভাবতাম। কিন্তু সেই গ্রীষ্মে কী হয়েছিল, আপনারা জানেন। কাশ্মীরে ভয়ানক এক বিভীষিকা নেমে এসেছিল সেই গ্রীষ্মে, যা চূড়ান্ত রুপ নেয় ২০১০-এ, সে বছর ভারতীয় বাহিনী ও কাশ্মীরি পুলিশের হাতে খুন হয় ১১০ জন কাশ্মীরি, আরো বহু মানুশ আহত ও বন্দী হয়।

২০০৮ সালে বনভূমি সাফ করে ইন্ডিয়ার হিন্দু তীর্থযাত্রীদের জন্য অস্থায়ী আবাসন বানানোর সরকারী উদ্যোগের বিরুদ্ধে কাশ্মীরে প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়, সে বছর অমরনাথ মন্দির যাত্রা স্থগিত করা হয়। সরকার চাপে পড়ে তাদের সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। কিন্তু জম্মুর উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ভারতের সাথে কাশ্মীরের যোগাযোগের একমাত্র রাস্তাটি অবরোধ করে রাখে। বহু কাশ্মীরি ট্রাকচালককে লাঞ্চিত করা হয়, এক হতভাগাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।

এরপর ২০০৯ সালের শোপিয়ান রেপ কেস। কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলায় আর্মি ক্যাম্পের ঠিক পরপরই, একটা নালায় আসিয়া ও নীলুফার নামের দুজন নারীর লাশ পাওয়া যায়। এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ঐ দুই নারীকে ধর্ষণের পর খুন করে সেই নালায় ফেলে রেখে গিয়েছিল ইন্ডিয়ান আর্মি। সে বছরও প্রচণ্ড গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে, কিন্তু ইন্ডিয়ান সরকার তার সেনাদের নির্দোষ ঘোষণা করে।

সর্বশেষ, ২০১০-এ, পাথরিবালের মিথ্যা এনকাউন্টার কেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ফুঁসে ওঠে কাশ্মীরের আপামর জনগণ। শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি করে, শক্ত কার্ফ্যু জারি করে, অসংখ্য মানুশকে জেলে পুরে সরকার সেই আন্দোলন দমন করে। সেসময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, এই আন্দোলন পাকিস্তানের মদদে হচ্ছে। অথচ, এই আন্দোলন ছিল কাশ্মীরিদের আন্দোলন।

এসব ঘটনাই আমাকে মিথ্যা ‘ভারতীয়’ পরিচয় ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।

কল্পনা সিং : ‘ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, আগা শহীদ আলি ও মাহমুদ দারবিশঃ শোক, সঙ্গীত ও প্রতিরোধ’-শিরোনামে আপনি পিএইচডি থিসিসের কাজ করছেন কাশ্মীর ইউনিভার্সিটিতে। ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিস্তিনের এই ভিন্ন তিনজন কবিকে বেছে নেওয়ার কারণ কী? এই তিন কবির দৃষ্টিভঙ্গির মিল ও অমিলগুলো আসলে কী? আর ব্যক্তিগতভাবে আপনি এদের সাথে নিজের যোগ খুঁজে পান কীভাবে?

হুযাইফা পণ্ডিত : এই প্রশ্নের উত্তরও ২০১০ থেকে শুরু করতে হবে। কার্ফ্যুর সময় ঘরে বসে বসে দুঃসহ সময় কাটছিলো। সেসময় আমি ফরিদা খানমের কণ্ঠে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের একটা গজল শুনি। গজলের একটা লাইন ছিল এমন— ‘হৃদয়ে হৃদয়ে বইছে ঝড়, প্রিয়তমা তুমি দেখছ না?’ এই গজলের দুটি লাইন শুনে আমার মনে হলো, এই লাইন দুটিতে কাশ্মীরের বর্তমান নেতৃত্ব-সংকটের— মেইন্সট্রিম ও বিচ্ছিন্নতাবাদী, দুই ধারায়ই— সঠিক রুপটা ধরা দিয়েছে। লাইন দুটি ছিল এমনঃ ‘মেম্বার খালি, মেহরাব খালি, তবু পাগড়ির ঢেউ/ সব মাথা আজ নীচু হয়ে আছে, সাহসী নেই কি কেউ?’

ছোটবেলায় স্কুলে আমি ফয়েজের কবিতা পড়েছিলাম। কিন্তু এই লাইন দুটি পড়ে তার ব্যাপারে নতুন করে আগ্রহী হলাম। আমি ফয়েজের অনেক কবিতা পেলাম ইন্টারনেটে, এবং মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলাম। তার প্রতিটি কবিতাই, আমার মনে হল, শুধু আমার না, প্রত্যেক কাশ্মীরির আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এভাবেই তার সাথে আমার পরিচয়। আগা শহীদের করা ফয়েজের কবিতার তরজমা ‘বিদ্রোহীর ছায়ামূর্তি’ আমি পড়েছিলাম, আরো পড়েছিলাম তার বিখ্যাত কাব্য ‘ডাকঘরহীন দেশ’, যেটা কাশ্মীরে সবচে বহুল উদ্ধৃত বই। এই বইতে কাশ্মীরের নব্বই দশকের ভয়ানক দিনগুলোর বর্ণনা আছে। তো, আগার সাথে এভাবেই যোগাযোগ। আর দারবিশ তো অবধারিতভাবেই এসে পড়েন, কারণ ফিলিস্তিন আর কাশ্মীরের মানুশের অভিজ্ঞতা তো একইরকম। তার কবিতা পৃথিবীর যেকোন নিপীড়িত মানুশের অভিজ্ঞতা ও প্রতিরোধের প্রকাশ।

আমার মনে হয়েছে, এই তিনজন কবিই ‘প্রতিরোধ কবিতা’র সবচে কার্যকর উদাহরণ। তাদের কবিতার উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির দিকটা খুবই পষ্ট। সাধারণত এই ধরণের কবিতাকে প্রতিক্রিয়ামূলক এবং প্রোপাগান্ডিস্ট ভাবা হয়। আমি দেখাতে চেয়েছি যে, এই তিন কবি তিনটি ভিন্ন আঙ্গিকে এই ধরণের কবিতার তিনটি দিক উন্মোচন করেছেন, এবং দেখিয়েছেন যে, এ ধরণের কবিতা কেবল প্রতিষ্ঠিত মতামতের প্রতিক্রিয়ামূলক-ই হয় তা না, বরং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ধরণ কেমন হবে সেটাও এসব কবিতার অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য। যেমন, ফয়েজের ‘আমার জীবন তোমার জন্য উৎসর্গিত, হে মাতৃভূমি’ কবিতাটি, দখলদার বাহিনীর কবলে থাকা মানুশের অনুভূতির একটা নিখুঁত বর্ণনা।

আমার থিসিসে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, এ ধরণের টেক্সট কীভাবে একটা জনগোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে সব ধরণের দখলদারিত্বের মোকাবেলা করার শক্তি যোগায়। এই তিন কবির তিনটি ধরণ আমাদের সব ধরণের উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে একটা বহুজাতিক প্রতিরোধের ধারণা দেয়।

কল্পনা সিং : জম্মু-কাশ্মীরে বসবাসরত সাধারণ মানুশের দৈনন্দিন জীবন কেমন? ইন্ডিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী যেকোন পরিবারের তুলনায় আপনার পরিবারের জীবনযাপন আলাদা কেন ও কীভাবে?

হুযাইফা পণ্ডিত : কাশ্মীরে বসবাসরত একজন সাধারণ মানুশের জীবন জম্মু বা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসরত লোকজনের চাইতে মৌলিকভাবেই আলাদা। একটা সাধারণ তফাত হল, কাশ্মীরে আপনাকে সবসময়ই আইডি কার্ড সাথে নিয়া ঘোরা লাগবে, কারণ আর্মি বা পুলিশ যখন তখন এইটা চাইতে পারে। কাশ্মীরে প্রায় ৬.৫-৭.৫ লাখ আর্মি আছে, যাদের হাতে আছে ইচ্ছামত খুন, গ্রেফতার, হয়রানি ও লুটপাট চালানোর ক্ষমতা–আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট বা পাবলিক সার্ভিস অ্যাক্টের আওতায়। আমাদের যে কেউই সবসময়ই সন্দেহভাজন এবং অনিশ্চিতিই আমাদের জীবনের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। আমাদের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যবসাবানিজ্য এমনকি জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রই ধুঁকছে, কারণ আমাদের একইসাথে মোকাবেলা করতে হয় ক্র্যাকডাউন, কার্ফ্যু, আন্দোলন, খুন ও অস্থিরতা। একটা অব্যাহত শোক, সমর্পণ, উদ্বগ আর অস্বীকৃতির ভেতর আমাদের বসবাস। পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভবত আপনি ভাবতেই পারবেন না যে, একটা শিশু ৭-৮ মাস টানা স্কুলে যাচ্ছে না, বা এই দীর্ঘ সময় যাবত ব্যবসায়ীরা ঘরে বসে আছে। এটা কাশ্মীরে সম্ভব হয়েছে। ভারতের অন্য যেকোন জায়গায়, আপনি যত রাত ইচ্ছা বাইরে ঘোরেন, কেউ কিছু বলবে না; আর্মির গাড়ির সামনে গাড়ি থামালেও আর্মি কিছু করবে না। ঘর থেকে সকালে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একজন ভারতীয় মোটামুটি নিশ্চিত থাকে যে, সে আবার ঘরেই ফিরবে। কাশ্মীরিদের জন্য এটা লটারির মত, আপনি ফিরে আসতে পারেন, পুলিশের হাতে মার খেতে পারেন, গ্রেফতার বা আহত, এমনকি খুনও হতে পারেন।

কল্পনা সিং : কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং স্বাধীনতার পর উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের সরকার এবং পাকিস্তান সরকারের আক্রমণ ও হামলার হুমকি পেয়ে আত্মরক্ষার্থে ভারতের কাছে সাহায্য চান এবং ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব এক্সেসন’ সাইন করেন। আপনি কি মনে করেন যে, এর মধ্য দিয়েই ইন্ডিয়া কাশ্মীর ‘দখল’ করেছিল বা কাশ্মীর ইন্ডিয়ার অংশ হয়েছিল? ১৯৫৭ সালের ২৫ জানুয়ারি কাশ্মীরের জাতীয় সংসদ নিজেরাই নিজেদের ‘ডিস্লভ’ ঘোষণা করল। সেসময়কার আইনি ধারাগুলির ক্রমঃপরিবর্তন কীভাবে ঘটল, যা পরে ইন্ডিয়ার সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হল?

হুযাইফা পণ্ডিত : এটা জোর করে দখল করে রাখা ভূমি, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। ইন্ডিয়া ব্যাপারটা জাতিসংঘে নেওয়ার পর জাতিসংঘে এ ব্যাপারে ২ টি রেজুলেশনপাশ হয়েছে। প্রথমত, হরি সিং সাহায্য চাওয়ার পর ইন্ডিয়ার হস্তক্ষেপের যে ঘটনা বিবরণী, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এজি নুরানি এবং অন্য অনেক ঐতিহাসিক দাবি করেছেন যে, ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব এক্সেশন’ সাইনের আগেই ভারতীয় বাহিনী কাশ্মীরে ল্যান্ড করে। দ্বিতীয়ত, হরি সিং আইনত বৈধ শাসক ছিলেন, কিন্তু জনগণের ম্যাণ্ডেট পাওয়া শাসক ছিলেন না। ডোগরারা খুবই অল্পমূল্যে কাশ্মীর কিনে নিয়েছিল, যে বেচাকেনারনজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল, যেমনটা মৃদু রায় তার ‘হিন্দু শাসক, মুসলিম প্রজা’ বইতে লিখেছেন। মহারাজা জনগণের শাসক ছিলেন না। একজন ম্যাণ্ডেটহীন শাসক, যার পূর্বপুরুষও ছিল অত্যাচারী একনায়ক (মহারাজা প্রতাপ সিঙ্গয়ের আমলে কাশ্মীরে গো-হত্যা নিষিদ্ধ ছিল, এর শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড) তার একতা অস্থায়ী ও সাময়িক সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে একটা জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারিত হবে, এটা কেমন কথা!

ইন্ডিয়ার সরকার এই পন্থা হায়দ্রাবাদেও অ্যাপ্লাই করেছে, যখন হায়দ্রাবাদের নিজাম ইন্ডিয়ার সাথে একীভূত হতে অস্বীকৃতি জানালো। ১৯৫৩ সালের ৮ আগস্ট কাশ্মীরের সাংবিধানিক প্রধান হরি সিংয়ের ছেলে কারান সিং, প্রধানমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহকে সাংবিধানিক সমর্থন হারানোর খোঁড়া যুক্তিতে অপসারণ করেন। পরে মির্জা আফজাল বেগ ও অন্য ২২ জনের সাথে তাকে কাশ্মীর ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতারও করা হয়। তার জায়গায় ইন্ডিয়ার তাঁবেদার বাখশি গুলাম মোহাম্মদকে ক্ষমতায় বসানো হয়। কার্যত, স্বাভাবিকভাবেই অ্যাসেম্বলি কোনরকম সিদ্ধান্ত ছাড়াই ভেঙে যায়। শেখ আব্দুল্লাহকে গ্রেফতার করার মাধ্যমেই ইন্ডিয়া কাশ্মীরে লেজিটিমেসি হারিয়েছে। বাকিসব বানানো বুলি।

কল্পনা সিং : জম্মু-কাশ্মীরের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা যেকোন ধরণের সেন্সরশিপ, যেটা আপনিও ফেস করেছেন, সেগুলো নিয়ে কিছু বলুন। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর তেমন একটা পাওয়া যায় না কেন? আর বর্দার এরিয়ায় কাশ্মীরি যুবক ও চরমপন্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে পাকিস্তান ও চায়নাও কি এই অঞ্চলের অস্থিরতা বজায় রাখতে সমান ভূমিকা রাখছে না?

হুযাইফা পণ্ডিত : হাহ, কতগুলো বলব বলেন! আমার উপরই তিনবার গুলি চালানো হয়েছে, একতা মিছিলের মধ্যে, যদিও আমার গায়ে লাগে নাই, লেগেছিল আমার পাশেরজনের গায়ে। ২০১০ সালে নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় সিয়ারপিএফের লোকেরা আমাকে বেশ বাজেভাবে মারধোর করে। আমি বড়ই হয়েছি আসলে শৈশক-কৈশোরের বন্ধুদের গুলি খেয়ে মরা দেখে দেখে। ইকবাল, আমার চাইতে ছোট ছিল, অত্যাচারের ধকলে শরীরটা রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছিলো। আমার জীবনের প্রথম যে স্মৃতিটা আমি মনে করতে পারি সেতা হল, আমাদের নওয়াব্বাজার লেনে এক আর্মি আমাদের এক প্রতিবেশীকে বন্দুকের মুখে প্যারেড করাচ্ছে। তারপর রউফের রক্তাক্ত জুতাজোড়ার কথাও মনে পড়ে, আর্মি ক্রাকডাউনের সময় ও পাশের এক বাড়ি থেকে ওদের বাড়িতে ঢুকতে গিয়েছিলো। এত মানুশ আর এত স্মৃতি–একতা পুরো বই লিখতে হবে আসলে।

চায়না আর পাকিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর আমরা কম শুনি, কারণ সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন কমই হয়। চায়না কাশ্মীরের যেটুকু অঞ্চল দখল করে রেখেছে, সেখানে জনবসতি নাই। সুতরাং অত্যাচারের প্রশ্ন আসে না। আর পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের ব্যাপারেও কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘনের রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। ২০০৬ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, আযাদ কাশ্মীরে প্রধাণত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খুবই কম, ভিন্নমতের রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টদের উপর সরকারী নির্যাতন বেশ ব্যাপক। তবে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের মত, ওখানে অত্যাচারটাই প্রধান না। গত বছর শর্তসাপেক্ষে ইউএনএইচসিআর-কে কাশ্মীরে ঢোকার অনুমতি দিয়েছিল পাকিস্তান, কিন্তু ভারত সেতা দেয় নাই। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও একই কথা বলেছে।

দেখুন, পাকিস্তান যে কাশ্মীরে অস্ত্র সরবরাহ করে এ ব্যাপারে আমরা অনবগত নই। পাকিস্তানের এই কাজ নিন্দার্হ। কিন্তু এটা হল একজনের দোষে আরেকজনের সুযোগ পাওয়া। যেসব অবস্থা কাশ্মীরকে মিলিট্যান্সির দিকে ঠেলে দিয়েছে, সেগুলো তৈরি করেছে নয়াদিল্লি। কাশ্মীরে ভোট রিগিং হয় সেন্তা গভমেন্টের আদেশে, পাকিস্তানের না। আর টেরোরিস্টদের ব্যাপারে যেতা বললেন, এ ব্যাপারে আইপিএস অফিসার শৈলেন্দ্র মিশ্রা, শ্রীনগরের এসএসপি, কিছুদিন আগে বলেছেন যে, কাশ্মীরের সশস্ত্র আন্দোলনকারীরা জঙ্গি না। এবং বুরহান ওয়ানি ও ওয়াসিম মাল্লার উদাহরণ টেনে তিনি দেখিয়েছেন যে, এরা সবাই এই নষ্ট সিস্টেমেরই বাই-প্রোডাক্ট।

কল্পনা সিং : কাশ্মীরের অবস্থা স্বাভাবিক কীভাবে হতে পারে? ভারত এবং সারা বিশ্বের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় কাশ্মীরের লোকজনকে, যারা কেবল মুসলিমই না, সেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের লোকও আছে, তাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারে এবং কীভাবে তাদের পক্ষে কথা বলতে পারে?

হুযাইফা পণ্ডিত : চটকদার কথাবার্তা ও প্রকল্প বাদ দিয়ে সত্যিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই কেবল কাশ্মীরের অবস্থার পরিবর্তন আসতে পারে। প্রথম পদক্ষেপ হল, সবার জন্য নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত পরিবেশ তৈরি করা, বিশেষত সংখ্যালঘুদের জন্য, যেহেতু তারাও সমান ভোগান্তির শিকার। দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চল থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং এএফএসপিএ বাতিল করতে হবে। এই দাবির বাস্তবায়ন পিডিপি এবং এনসি–দুই দলেরই প্রতিশ্রুতি ছিল। এমনকি পিডিপি একটা রেজুলাশন পাশও করেছিল, কিন্তু নয়াদিল্লি সেটা আমলে নেয় নাই। বিভিন্ন মধ্যস্ততাকারীর পরামর্শ, ধরা যাক, ২০১১ সালে ইউপিএ রেজিমের পরামর্শও আমলে নেওয়া হয় নাই। কাশ্মীরকে নিজের কথা তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে, এটাই মূলকথা।

বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবীরা যেটা করতে পারে, প্রথমত, জনমত গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, কাশ্মীর এবং কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ধরণের ডকুমেন্ট ও রিসার্চ আর্কাইভ গড়ে তোলা, লবি গ্রুপ তৈরি করা। বিশ্বের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে তরুণ মেধাবী ও উদীয়মান কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের একত্র করা এবং স্কলারশিপ ও অন্যান্য মাধ্যমে তাদের মেধাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা। এর মাধ্যমে কাশ্মীরে একটা নতুন তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা সুবিধাবাদী নেতৃত্বের বদলে কাশ্মীরিদের সত্যিকারের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে।

কল্পনা সিং : কাশ্মীরের মানুশ কি ভারতের কাছ থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসলেই চায়? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে প্রশ্ন হল, কাশ্মীরের সাধারণ নির্বাচনে সবসময় উলটা ফল দেখা যায় কেন? কেন কাশ্মীরের সরকার কাশ্মীরিদের পলিটিকাল প্রকল্পকে সমর্থন করে না?

হুযাইফা পণ্ডিতঃ হ্যাঁ, কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুশই স্বাধীনতা চায়। কাশ্মীর ইস্যুকে নির্বাচন দিয়ে ডিল করাটা ভুল পদক্ষেপ। নির্বাচন হয় দৈনন্দিন বিষয়গুলির উন্নয়নের জন্যঃ রাস্তা, পানি, হাসপাতাল। কিন্তু কাশ্মীরের মানুশের আগে দরকার বাঁচার মত বাঁচা। যেমন পিডিপি কাশ্মীরে শান্তি আনার কথা বলেছিল। সাবেক সিএম ওমর আব্দুল্লাহ আর বর্তমান সিএম মেহবুবা মুফতি দুজনই এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। গতানুগতিক এই নির্বাচন কাশ্মীরিররা অনেক আগেই বয়কট করেছে। যেমন, বাদ্গামে মাত্র ২% ভোট কাউন্ট হয়েছে, আর অনন্তনাগে তো, খুন-খারাপি ছাড়া নির্বাচনই হয় না, তাই সেখানে নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত আছে। ১৯৯৬-এ পুলিশ গুলির মুখে লোকজনকে বুথ থেকে বের করে দিয়েছে, ভোটবাক্স ভরার জন্য। ইলেকশনের ফল ভিন্ন হয় সবসময়, এটা যেমন সত্য, তেমনি এও সত্য যে, এই ইলেকশন শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্যেই, এর সাথে কাশ্মীরি জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার কোন মিল নাই।

কল্পনা সিং : JNU থেকে ‘আজাদি ফর কাশ্মীর’ শ্লোগান উঠেছিল। এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে, ইন্ডিয়ায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক লেখক, কবি, এক্টিভিস্ট, বুদ্ধিজীবী একে সমর্থন দিয়েছিলেন। বহুজন বহুভাবে এই শ্লোগানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আন্দোলনটা এখন কোন পর্যায়ে আছে?

হুযাইফা পণ্ডিত : আন্দোলন ঐক্যবদ্ধভাবেই চলছে। সঞ্জয় কাক, অরুন্ধতী রায়, নিতাশা কাউল, দিব্যেশ আনন্দসহ আরো বহু লেখক, তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবীরা কাশ্মীর আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছেন। এরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাশ্মীর ইস্যুতে অনবরত কাজ করে যাচ্ছেন এবং যাবেন। যদিও ফেসবুক সবসময় স্টাব্লিশমেন্টের পাশেই থাকে, তবু অনলাইন ও অফলাইনে সমানতালে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

কল্পনা সিং : স্বাধীনতা তো অনেক রকম। কাশ্মীরের কাছে ‘আযাদি’ বা স্বাধীনতার অর্থ কী?

হুযাইফা পণ্ডিত : পৃথিবীর সর্বত্রই স্বাধীনতার একটাই অর্থ–সম্মান ও নিরাপত্তার জিন্দেগি। ফয়েজ তার বিখ্যাত কবিতা ‘সুবহে আযাদি’-তে এটাই বলেছেন।

কল্পনা সিং : কাশ্মীরে স্বাধীনতাকামীরা স্পন্সরড টেরোরিজমের সাথে হাত মিলিয়েছে, যার ফলে কাশ্মীরের নন-মুসলিম, যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে থাকছে, তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তারা বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে ইন্ডিয়ার বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি তাদের অনেকেই তো এখনও জম্মুর রিফিউজি ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

হুযাইফা পণ্ডিত : প্রথমত, এই যে ‘স্পন্সরড টেরোরিজম’ শব্দটা বললেন, একটু ক্ষুব্ধ হয়েই এর বিরোধিতা করছি। যদি কাশ্মীরিরা ভারতের বিপক্ষে অস্ত্র তুলে নিতে চায়, সেই কর্তাসত্তা তাদের আছে। বলিউডের ‘যাব যাব ফুল খিলে’টাইপ চিন্তাধারা, যে কাশ্মীরিরা খুব সরল, তাদের কেউ ভুল বোঝাচ্ছে, এগুলো ঠিক না। পাকিস্তান এখানে আগে থেকে তৈরি পরিস্থিতির সুযোগ নেয় শুধু। যেমন ধরেন, মহারাষ্ট্র বা ইউপিতে তারা কিন্তু এটা করতে পারে না। আপনি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জানাযার ছবিগুলো দেখুন, আবার বিপরীতে, ধরেন সাবেক সিএম মুফতি সাইদের জানাযাও দেখুন। এতেই বুঝতে পারবেন, সশস্ত্র বিদ্রোহীরা কাশ্মীরেরই স্থানীয় জনগণ।

আর এটা আমি আমার বিভিন্ন লেখায় বলেছি, অন্যান্যরাও বলেছেন যে, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের গণহত্যার ঘটনাটা লজ্জাকর। সংখ্যালঘুরা এতে উদ্বিগ্ন বোধ করেছেন, এবং এটা যুক্তিযুক্ত। আমার অনেক বন্ধু সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে নাজেহাল হয়েছেন এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আমার বিশ্বাস, জেকেসিসিএস অবশ্যই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করবে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকগুলি তুলে ধরবে। কিন্তু এসবই মূলত সরকারের ব্যর্থতা। সশস্ত্র বিদ্রোহীরা কোন আইন মেনে চলে না, তারা চলে নৈতিক বৈধতার উপর। সরকারের দায়িত্ব ছিল এই পণ্ডিতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই হস্তক্ষেপ করেনি তখন, আর সেজন্যেই মূলত এই গণহত্যা সংঘটিত হতে পেরেছে। আর সরকার তারপর তাদের পুনর্বাসনেও ব্যর্থ হয়েছে। যেমন আপনি বললেন, অনেকেই এখনও জাগতি-তে বসবাস করছেন। এখন তাদের চাকরি, পার্ক এসবের অফার দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কাশ্মীরের অবস্থা পুরোপুরি নিরাপদ হওয়ার আগে তো কাশ্মীরি পণ্ডিতরা সকলেই কাশ্মীরে ফিরতে পারবেন না। সরকার কাশ্মীরের মেজরিটি জনগণকেই নিরাপত্তা দিতে পারে না, মাইনরিটিদের কীভাবে দেবে!

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ইতিহাস সম্পর্কে আমি বিশেষজ্ঞ না, তাই তাদের ভবিষ্যতের কথা বলতা পারব না। কিন্তু গণহত্যার ঘটনার পরে জন্ম নেওয়া তাদের নতুন প্রজন্মের অধিকাংশের ভবিষ্যতই বেশ ভালোই মনে হয়। তাদের বাবা-মায়েদের মত, এই পুরাতন ভূমির প্রতি তাদের কোন স্মৃতিকাতরতা নাই। অনেকে তাদের কালচার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বলেন, আমি তেমন মনে করি না। কম্যুনিটি একটা কল্পিত ধারণা, যার ভিত্তি হল কিছু কমন পরিচয়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যতভাবেই বিভক্ত হয়ে পড়ুক, আমার মনে হয় না যে, কাশ্মীরি পণ্ডিতরা নিজেদের কম্যুনিটির পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে। সাংস্কৃতিক শুদ্ধতা অবশ্য ভিন্ন ব্যাপার, সব কালচারেই সময়ের ধারায় পরিবর্তন আসে, তাদেরও আসবে, এটাই স্বাভাবিক।