আম্পান দুর্গত এলাকায় আলেমগণ : কেমন আছে সাতক্ষীরার মানুষেরা?

রাকিবুল হাসান:

বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্ট সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা। এরমধ্যে সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা। সাতক্ষীরার ক্ষয়ক্ষতি অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ১০ হাজার ২৫৭ টি মাছের ঘের সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে করে ১৭৬ কোটি টাকার চিংড়ি ও সাদা মাছ নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, ‘সাতক্ষীরায় ১৩৭ কোটি টাকার ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৬ হাজার ২৯৬ টন আমের ক্ষতি হয়েছে, যার মূল্য ৬৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা, সবজি নষ্ট হয়েছে ৩১ হাজার ৮০ টন যার মূল্য ৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, পান নষ্ট হয়েছে ১০ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং তিল নষ্ট হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।’

শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, গবুরা ও আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কয়েকটি স্পটে ভেঙে গেছে কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ। বাঁধভাঙা পানিতে তলিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। আসন্ন পূর্ণিমায় এলাকাগুলো আরও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তাই ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত হচ্ছে বেরীবাঁধ। ইউনিয়নের শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই নেমে এসেছে বাঁধ নির্মাণে। তারা বলছেন, ভাতের আগে বাঁধ চাই। বাঁধের জন্য চাই বাঁশ, বস্তা।’

দুর্গত সাতক্ষীরায় ত্রাণ বিতরণ করছেন আলেমদের দাতব্য সংস্থা ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের সদস্যরা। সংস্থাটির প্রচার সম্পাদক মাওলানা এহসান সিরাজের গ্রহণ করা ভিডিও বার্তায় প্রতাপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন খান বলেন, ‘বাঁধভাঙার কারণে অনেক গ্রাম তলিয়ে গেছে। কিছু করার নেই। আমার জনগণকে নিয়ে আমি বাঁধ নির্মাণ করছি। আমার জনগণকে আল্লাহ তায়ালা রক্ষা করবেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আমাদের জন্য আপনারাও দোয়া করবেন।’

জল-কাদায় মাখামাখি হয়ে দুর্গত এসব এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন আলেমগণ। এ দলে রয়েছেন ইকরামুল মুসলিমীন ফাউন্ডেশনের আহবায়ক মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহ, ফাউন্ডেশনের প্রচার সচিব এহসান সিরাজ, ইকরামুল মুসলিমীনের যুগ্ম মহাসচিব ও আল মাদানী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ হোসেন সাব্বির।ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সচিব আবদুর রহমান কোব্বাদী, ফাউন্ডেশনের সদস্য আকন সিরাজুল ইসলাম এবং অতিথি হিসেবে আরও আছে মাওলানা মো. মনযূরুল হক।

মাওলানা এহসান সিরাজ বলেন, ‘২৮ মে আমরা সাতক্ষীরায় এসেছি। জেলার আশাশুনি থানার প্রতাপনগরের ৯টি ওয়ার্ড প্রায় ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্যামনগর থানাও। শ্যামনগরে ত্রাণ বিতরণ করছে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ। তাদের ব্যবস্থাপনা যেহেতু সুষ্ঠু, আমরা তাদের হাতে অনুদানের অর্থ তুলে দিয়েছি। আন্দোলনের কর্মীরা তা বিলিয়ে দিবেন। তবে আমরা ত্রাণ বিতরণ করছি প্রতাপনগরে। ত্রাণ সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে—চাল, ডাল, তেল, স্যালাইন, বাচ্চাদের জন্য চকোলেট, বিস্কুট ইত্যাদী।’

তবে প্রতাপনগরের বাসিন্দারা খাবারের চেয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন বাঁধ নির্মাণকে। দিনরাত এক করে তারা শ্রম দিচ্ছেন বাঁধ নির্মাণে। বলা হচ্ছে—বাঁধ নির্মাণ করা না হলে আগামী পূর্ণিমায় আবার জোয়ার আসবে লবণাক্ত পানির। ফলে লবণাক্ত পানির প্রভাবে আগামী পঞ্চাশ বছরেও সেখানে কোনো ফসল জন্মাবে না।

বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রম পরিদর্শন করে মাওলানা মনযূরুল হক বলেন, ‘ভাতের চেয়েও বাঁধ নির্মাণকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি। বাঁধ নির্মাণের জন্য তাদের দরকার বাঁশ এবং বস্তা। নির্মাণ কার্যক্রমে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, মূর্খ-শিক্ষিত সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আলেমদের ষাট জনের একটি দল আজ বাঁধ নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করছে।’

আম্পান পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান বলেছিলেন, আম্পান দুর্গত জেলায় ঘরবাড়ি প্রচুর নষ্ট ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাই ঘরবাড়ি সংস্কার ও নির্মাণে প্রতি জেলায় ৫০০ বান্ডিল টিন এবং ১৫ লাখ টাকা এবং ত্রাণের জন্য পর্যাপ্ত চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে সাতক্ষীরার জনগণ বলছেন, তান্ডবের দশদিন পেরিয়ে গেলেও তাদের নিকট কোনো সহায়তা এসে পৌঁছায়নি।

মাওলানা এহসান সিরাজের ধারণকৃত ভিডিওতে এমনই অভিযোগ করেছেন ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলা এক বৃদ্ধ। নিজের বাড়ির ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ বললেন, ‘সরকারি কোনো ত্রাণ আসেনি। তবে দুএকবার শুধু খিচুরি দেয়া হয়েছে।’

দুর্গত সাতক্ষীরা পরিদর্শনকারী আলেমরাও বলছেন একই কথা। তারা বলছেন, ত্রাণ বিতরণে আলেমদের ছাড়া অন্য কাউকে দেখা যায়নি। মানুষের ঘরে খাবার নেই, পেটে দানা নেই। ঘূর্ণিঝরে ভেসে গেছে তাদের আয়-রোজগারের যাবতীয় মাধ্যম। আম বাগান, কলা বাগান, সবজি বাগান, মাছের ঘের—কিছুই অক্ষত নেই। লবনাক্ত পানিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে। বাঁধ নির্মাণের জন্য দরকার বাঁশ এবং বস্তা। জনগণ চাইছে, সরকার এবং দেশের মানুষ তাদের পাশে দাঁড়াক। যা নষ্ট হবার হয়েছে। কিন্তু আসন্ন দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে এখন তাদের আশু সহায়তা দরকার।