আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের প্রেক্ষাপট

ড. মুতাজ আল খতিব : 

তুরস্কে আয়া সুফিয়াকে আবার মসজিদ হিসেবে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কোন সন্দেহ নেই, তুরস্কের ইতিহাসে এটা একটা নতুন ঘটনা। তবে এই ঘটনাটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে ঘটনাটি তলিয়ে দেখা। কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এই ঘটনাটি দেখতে পারি—

১. রাজনৈতিকভাবে : আয়া সুফিয়াকে মসজিদ হিসেবে রূপান্তরের সিদ্ধান্তটি তুরস্কের একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। জাতীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি সকলের কাছে গৃহীত হয়েছে। এমনকি তুরস্কের বিরোধী দল পর্যন্ত এই ঘটনাকে সমর্থন করেছেন। তাদের অন্যতম হলেন আহমদ দাউদ উগলু। এছাড়া তিনি বরকতের আশীর্বাদ‌ও করেছেন।

লক্ষণীয় যে, এই আহমদ দাউদ উগলুর হাতে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, প্রায় এক সপ্তাহ আগেই এরদোয়ান সেটা বন্ধ করে দিয়েছেন। সুতরাং আয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যদি কোন ব্যক্তিগত বিনিয়োগের গন্ধ থাকতো, তাহলে উগলুই সর্বপ্রথম সমালোচনায় প্রবৃত্ত হতেন।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, এই ঘটনার উপর ভিত্তি করে কি পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিনিয়োগ হবে? উত্তর হলো— হ্যাঁ। তবে এতে কোন সমস্যা অবশ্য নেই। কারণ, ঘটনাটি যেহেতু সরকারি দল ও বিরোধী দল, উভয় কর্তৃক সমর্থিত—বোঝা যাচ্ছে, এখানে সকল দলেরই একটা রাজনৈতিক স্বার্থ তৈরি হবে।

২. ফিকহ ও আইনের দৃষ্টিতে : এই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছিল তুরস্কের উচ্চ আদালতে। এরপরেই রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করেছেন। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য অনুসারে, আয়া সুফিয়ার ভূমিটি ক্রয় করে নিয়েছিলেন সুলতান ফাতেহ। সে হিসেবে ভূমিটি এখন তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। এখানে তার রয়েছে পূর্ণ অধিকার। এটা কোন দখলকৃত জমি নয়। সুতরাং এরদোয়ান যদি এখানে নামাজের ব্যবস্থা করে থাকেন, এতে আপত্তি করার কিছু নেই।

৩. ঐতিহাসিকভাবে: আয়া সোফিয়ার এই বিশাল স্থাপনাটি প্রায় ৯০০ বছর গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এরপর প্রায় ৫০০ বছর মুসলমানরা এটার মধ্যে মসজিদ হিসেবে নামাজ আদায় করেছেন। উসমানী সাম্রাজ্যের পতন ও তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৯০ বছর এটি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হিসেবে পরিচিত ছিল।

৪. বৈশ্বিক ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে : পৃথিবীতে এমন কিছু স্থাপনা রয়েছে, যা দল মত ধর্ম নির্বিশেষে সামগ্রিক মানব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব স্থাপনার কর্তৃত্ব ও মালিকানা কোন দেশের সাথে সুনির্দিষ্ট নয়। আয়া সোফিয়া যদি এই প্রকারেরই একটা স্থাপনা হয়ে থাকে, তাহলে কর্ডোভার মসজিদ বা উমায়ী মসজিদসহ অন্যান্য যেসব স্থাপনা মুসলমানদের হাতে তৈরি হয়েছে, সেসবও বৈশ্বিক ঐতিহ্যের অংশ। সুতরাং, কিছু গ্রহণ আর কিছু অস্বীকার করা উচিৎ নয় আমাদের। সবার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলা উচিত। আর একটা বৈশ্বিক স্থাপনা, নিরপেক্ষ থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। জাদুঘর হোক, গির্জা হোক, মসজিদ হোক—মোটকথা যাই হোক না কেন, সেটা সামগ্রিকভাবে বিশ্বের সকল মানুষের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের একটা অংশ।

৫. আমার ব্যক্তিগত মতামত : আমার ব্যক্তিগত মতামত হল এই স্থাপনাটি দুটি ভাগে বিভক্ত হওয়া উচিত। একটি অংশ হবে মসজিদ, আরেকটি হবে গির্জা। কারণ খ্রিস্টানরা সারা বিশ্বকে মুসলমানদের প্রতি হিংসাত্মক যে বার্তা পৌঁছায়, সেটার বিপরীতে আমাদের শান্তি ও সৌম্যের বার্তা পৌঁছানো উচিত।

স্পেনে খ্রিস্টানরা মুসলমানদেরকে বিতাড়িত করেছে। কর্ডোভা মসজিদসহ অন্যান্য মসজিদকে বানিয়ে ফেলেছে গির্জা আর অশ্বশালা। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের একটা হিংসাত্মক ছবি মানব সম্প্রদায়ের কাছে ফুটিয়ে তুলেছে। এর বিপরীতে বিশ্বের কাছে আমরা আগ্রাসী বার্তা না পৌঁছিয়ে শান্তির বার্তা পৌঁছাতে চাই।

সবশেষে বলে রাখি, অনেকে বলছেন—আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগণের আস্থা কুড়াতে এরদোয়ান এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন। বক্তব্যটি যদি সঠিক হতো, তাহলে এরদোয়ানের এই সিদ্ধান্তের সর্বপ্রথম বিরোধিতা করত সরকার বিরোধী দল। এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকারদলীয় লোকেরাই স্বাক্ষর দেয়নি, অন্যদেরও স্বাক্ষর ছিল। আহমদ দাউদ উগলু বলেছেন— কয়েক দশক ধরে এ সিদ্ধান্তটি সকলের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। এই উদ্দেশ্যেই ২০১৪ সাল থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের একটি প্রচারণা শুরু হয়।