আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার দুইশো চল্লিশ বছর : ফিরে দেখা ইতিহাস

হামমাদ রাগিব

ভারত উপমহাদেশে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী জুড়ে ছিল প্রভাবশালী মুসলিম শাসকদের একচ্ছত্র শাসন। ব্যক্তিজীবনে তাঁদের অনেকেই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ইসলামকে মানেননি, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও ইসলামের পরিপূর্ণ প্রতিফলন ঘটাননি—কিন্তু এই কয়েক শতাব্দী জুড়ে ইসলামি শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপক চর্চায় তাঁদের প্রায় সকলেই পৃষ্ঠপোষণ দিয়ে গেছেন অকাতরে। যার ফলে ইসলাম ও জাগতিক জ্ঞান—উভয় ক্ষেত্রেই উপমহাদেশীয় মুসলমানরা অভাবিত সফলতা অর্জন করেছিল। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে কিংবা ব্যক্তিউদ্যোগে উপমহাদেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য শিক্ষাগার। যুগ যুগ ধরে এসব শিক্ষাগারে বিরতিহীনভাবে চলে আসছিল জ্ঞানের আদান-প্রদান।

প্রসিদ্ধ ভারতবিশারদ ও জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলারের (১৮২৩-১৯০০) মতে ১৭৫৭ সালের আগে কেবল বঙ্গ অঞ্চলেই এ ধরনের ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার। তারপর ব্রিটিশরা যখন বঙ্গ অঞ্চলসহ উপমহাদেশের কর্তৃত্ব নানামাত্রিক ষড়যন্ত্র আর কূটকৌশলের কল্যাণে নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে নিলো, প্রায় একযোগেই বন্ধ করে দিল পুরো উপমহাদেশের সব কয়টি ধর্মীয় শিক্ষাগার। এই ভূখণ্ডের মুসলমানদের জীবনে নেমে এলো সর্বগ্রাসী এক ঘোর অমানিশা। শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি—মুসলমানদেরকে সবদিক থেকেই বঞ্চিত করে দুর্বিষহ এক জীবনাচারের দিকে ঠেলে দেওয়া হলো। ফলে অশিক্ষা ও অভাবের অভিশাপে মুসলমানদের পরবর্তী প্রজন্মের বড় একটি অংশ অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন নিয়ে বেড়ে উঠতে লাগল।

ব্রিটিশদের এই পদক্ষেপ গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এ অঞ্চলের মুসলমানদেরকে নিজেদের ধর্মীয় চেতনা থেকে বের করে আনা। কারণ মুসলমানদেরকে ধর্মীয় চেতনা ও শিক্ষা থেকে বের করে আনতে পারলে তারা নিজেদের হাজার বছরের শৌর্যের কথা বিস্মৃত হয়ে যাবে, আর তখনই কেবল ব্রিটিশরা এ অঞ্চলে অনৈতিক উপনিবেশবাদের অবাধ চর্চায় নিশ্চিন্তে মনোনিবেশ করতে পারবে।

আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাধারার সূচনা মুসলমানদের ঘোর এই অমানিশা-কালেই হয়েছিল। এবং আশ্চর্যের কথা হলো, এর সূচনা, প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘ একটা কাল অবধি পরিচালনার সম্পূর্ণটা ব্রিটিশদের সরাসরি তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল। ফলে মুসলিম ইতিহাস-পাঠক মাত্রই আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাধারার সূচনা বিষয়ে খুশি হবার বদলে একরাশ আশঙ্কা নিয়ে সে ইতিহাসের পরবর্তী পৃষ্ঠা ওল্টান।

হ্যাঁ, পাঠকের আশঙ্কাই সত্যি হয়। ব্রিটিশরা এই শিক্ষাধারার সূচনা করে নিজেদেরই একান্ত কার্যসিদ্ধির জন্য; মুসলমানদের শিক্ষিত করে তোলা বা মুসলমান জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে নয়।

উপমহাদেশে উপনিবেশ শাসনের প্রথম দিকে ব্রিটিশরা প্রশাসনিক পরিচালনা পূর্বপ্রচলিত আইন অনুসারেই করত। আর সে-আইনের ভাষা ছিল ফারসি আরবি ও বাংলা। সুতরাং প্রশাসনিক কাজ-কর্মে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের জন্য তাদের প্রয়োজন দেখা দেয় আরবি-ফার্সি-বাংলা জানা লোকের। এ ছাড়া মুসলিম আইনের ব্যাখ্যা এবং মামলার রায় দেওয়ার জন্যও জরুরত পড়ে অনেক মৌলভি ও মুফতির।

ইংরেজরা নিজেদের এইসব কার্যসিদ্ধির জন্যই ১৭৮০ সালে বাংলার ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিসংয়ের নেতৃত্বে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করে মাদরাসা-ই-আলিয়া নামে মুসলমানদের একটি উচ্চমার্গীয় শিক্ষাগার। তবে যে কোনো মুসলিম শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হতে পারত না। ভর্তির সময় শিক্ষার্থীর বংশপরিচয় যাচাই করে দেখা হতো। বংশধারাকে যদি ব্রিটিশদের জন্য হুমকিজনক মনে হতো, মানে এই বংশের লোক ইতিপূর্বে যদি ব্রিটিশ-বিরোধী কোনো কার্যকলাপে জড়িত থাকার সামান্যতম প্রমাণ পাওয়া যেত, অথবা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে যাচাই করে যদি মনে হতো শিক্ষার আলো পেলে এ ছেলের ভেতরে নিজেদের হাজার বছরের শৌর্য আর কৃতিত্বের গৌরব জেগে উঠবে, তবে তার জন্য বন্ধ হয়ে যেত মাদরাসা-ই-আলিয়ার দরোজা। জানিয়ে দেওয়া হতো এ প্রতিষ্ঠান তাঁর জন্য নয়।

হ্যাঁ, এ প্রতিষ্ঠান সত্যিই তাঁর জন্য ছিল না। এ প্রতিষ্ঠান এমন শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল, যারা ধর্ম শিখবে ব্রিটিশদের প্রয়োজনে, এবং ব্রিটিশদের কল্যাণেই ব্যয় করবে নিজের আহরিত জ্ঞানের সমস্তটুকু। জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য কেবল ব্রিটিশের গোলামি; ব্রিটিশ রাজত্বের স্থায়িত্ব উপমহাদেশের মাটিতে দীর্ঘায়িত করা।

মাদরাসা-ই-আলিয়ার শিক্ষা-কারিকুলাম আবার যুগোপযোগী এবং সুবিন্যস্ত ছিল। প্রখ্যাত কারিকুলাম দরসে নেজামির আদলেই সাজানো হয়েছিল সিলেবাস। ১৮৫৩ সাল অবধি সিলেবাসে ফার্সি ভাষা মুখ্যভাবে গণ্য থাকে। পাশাপাশি প্রয়োজন মাফিক গণিত এবং অ্যরিস্টটলের পুরনো দার্শনিক মতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের পাঠও পড়ানো হতো গুরুত্বসহকারে।

মজার ব্যাপার হলো, মাদরাসা-ই-আলিয়া মুসলমানদের বৃহৎ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও দীর্ঘ ৭৭ বছরে একাধারে ২৬ জন খ্রিষ্টান অফিসার এ মাদরাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন।

মাদরাসাটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৭৮০ সালে, তখন থেকে ১৮১৯ সাল অবধি ব্রিটিশ গভর্মেন্টের বিশেষ একটি টিম এর তত্ত্বাবধান করত, যে টিমের সকলেই ছিলেন ব্রিটিশ খ্রিষ্টান অফিসার। ১৮১৯ সালে এসে পরিচালনা-কাঠামোতে খানিক পরিবর্তন এনে বিশেষ টিমের বদলে একজন সেক্রেটারি এবং একজন সহকারী সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়। সেক্রেটারি থাকবেন অনিবার্যভাবে ব্রিটিশ খ্রিষ্টান অফিসার, আর সহকারী থাকবেন মাদরাসা-ই-আলিয়ার ফারেগ মুসলিম কোনো শিক্ষানবিশ। ১৮৫০ সালে আবারও পরিচালনা-কাঠামোতে পরিবর্তন এনে অধ্যক্ষের পদ সৃষ্টি করা হয়। খ্রিষ্টান অফিসার ড. এ স্প্রেংগার প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে মাদরাসা-ই-আলিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯২৭ সাল অবধি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে একে একে আরও ২৫ জন খ্রিষ্টান অফিসার পর্যায়ক্রমে এ মাদরাসার অধ্যক্ষের পদ ‘অলঙ্কৃত’ করেন।

১৯২৭ সালে এসে অবশেষে ব্রিটিশদের ‘করুণা’ ও ‘অপার দয়া’য় মাদরাসা-ই-আলিয়ার অধ্যক্ষের পদে একজন মুসলিম শিক্ষানবিশ আসেন। তাঁর নাম খাজা কামালউদ্দিন আহমাদ। ব্রিটিশদের বদৌলতে ইতিহাস তাঁর নামের শুরুতে শামসুল উলামা লকবখানি সংযুক্ত করেছে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা নিজেদের উপনিবেশবাদের ষোলকলা পূর্ণ করে যখন উপমহাদেশ থেকে বিদায় নিল এবং ভারতকে টুকরো করে মুসলমানদের ‘পাকিস্তান’ জন্ম দিয়ে গেল, কলকাতা থেকে মাদরাসা-ই-আলিয়া স্থানান্তরিত হয়ে ঢাকাতে থিতু হয়। ব্রিটিশ তো নেই, এবার পাক-সরকারের তত্ত্বাবধানে ও নিয়ন্ত্রণে শুরু হয় মাদরাসার নবযাত্রা। ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমান নজরুল কলেজ)-এ প্রথমে বেশ কয়েক বছর মাদরাসার কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে। তারপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ১৯৫৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকার বকশিবাজারে মাদরাসার চারতলাবিশিষ্ট নতুন ভবন ও ছাত্রাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দেন। ১৯৬১ সালে মাদরাসা লক্ষ্মীবাজার থেকে স্থানান্তরিত হয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে বকশি বাজারে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।

মাদরাসা-ই-আলিয়ার শুরুর দীর্ঘ কালের ইতিহাস লজ্জা অপমান এবং দুঃখের হলেও পাকিস্তান আমলে মাদরাসা যখন ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় এবং ব্রিটিশদের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত হয়, তখন বেশ অনেক মনীষী জন্ম দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। হকপন্থী বড় বড় অনেক মনীষীর তত্ত্বাবধান ও নেগরানিরও ছোঁয়া পেয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর মাদরাসা-ই-আলিয়ার তত্ত্বাবধান যথামাফিক সরকারি নিয়ন্ত্রণেই থাকে।

২০০৬ সালে ফাজিল ও কামিলকে ডিগ্রি ও অনার্সের সরকারি মান ঘোষণা দেয়ার পর মাদরাসা-ই-আলিয়া কুষ্টিয়া ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত হয়। বর্তমানে মাদরাসা-ই-আলিয়া-সহ দেশের সব আলিয়া মাদরাসাকে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে।

মাদরাসা-ই-আলিয়ায় বর্তমানে ১৩টি অনুষদ রয়েছে। ২০১০ সালে মাদরাসায় অনার্স চালু করার পর ঢাকা আলিয়ায় কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আল-কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল-হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আরবি এবং ইসলামের ইতিহাস এই চারটি বিষয়ে অনার্স কোর্সের পাঠদান চালু করে।

তবে ২০১৫ সালে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে সারাদেশের আলিয়া মাদরাসাগুলোকে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়।

মাদরাসা-ই-আলিয়া বলি আর অন্যান্য আলিয়া মাদরাসা বলি, সরকারি পৃষ্ঠপোষণের প্রভাব শিক্ষাধারাটির স্বাতন্ত্র্যে যদিও ক্ষুণ্ণতা সৃষ্টি করেছে করছে করবে এবং ইসলামের সঠিক মূল্যবোধের ওপর টিকে থাকার ব্যাপারে বাধ সেধেছে সাধছে সাধবে—তারপরও, এসব বিপত্তির মধ্য দিয়েও, যুগে যুগে অনেক মনীষীর জন্ম হয়েছে এ শিক্ষাধারা থেকে। আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে–আরও আরও মনীষী আলেমের জন্ম দেবে এসব প্রতিষ্ঠান–দিনশেষে এটাই আমাদের বিশ্বাস এবং একান্ত প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, সরকারি ওয়েবসাইট ও ইন্টারনেট