আলোর পথের রাহবার (দ্বিতীয় পর্ব)

[হযরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ.-এর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ]

মূল : মুহাম্মাদ হাসান আনসারি
ভাষান্তর : মওলবি আশরাফ

শিক্ষা ও দীক্ষা

তাঁর পড়ালেখায় বিসমিল্লাহ হয়েছে রায়বেরেলিতে চাচা মওলবি সাইয়িদ আজিজুর রহমান নদবির হাতে। প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষার বিষয়ে খোদ আলি মিয়াঁ নদবি বলেন :

‘সর্বপ্রথম যে পাঠশালায় আমি অধ্যয়ন করি, তা ছিল নবি-জীবনচরিতের পাঠশালা। এমন বয়সে সেখানে প্রবেশ করি যে-বয়সে সাধারণত শিশুদের পাঠশালায় ভর্তি করানো হয় না। এটা ছিল পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার ফসল, যা আমাদের বাড়িতে ছিল। দীর্ঘকাল ধরে আল্লাহর রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনচরিত শিক্ষা আমাদের পারিবারিক ও বংশীয় কৃষ্টিকালচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, যে-শিক্ষার সাজে বাড়ির প্রতিটি শিশুকিশোরের জীবন সজ্জিত হওয়া অতীব জরুরি মনে করা হতো। এই বাড়ির বাচ্চাদের গড়ে ওঠার পেছনে ভ্রাম্যমাণ শিশুতোষ লাইব্রেরির অবদান ছিল অসামান্য, যেখানে গদ্য ও পদ্য দু’ধরনের কিতাবেরই সংগ্রহ ছিল।

তার পরে আমার জীবনে সবচেয়ে বড় অংশ হলো শ্রদ্ধেয় বড়ভাই ডক্টর হাকিম মওলবি সাইয়িদ আবদুল আলী সাহেব (রহ)-এর প্রাজ্ঞতাপূর্ণ তালিম, শিক্ষা-দীক্ষা ও পথনির্দেশনা। এর ফলে অল্পসময়ে, একেবারে অল্পবয়সে উর্দু ভাষায় রচিত মহানবি সা.-এর সবচেয়ে উঁচুমানের জীবনীগ্রন্থগুলো পড়ে ফেলি।[১০]

উর্দু হলো আরবি ভাষার পরে নবি-জীবনের ওপর লেখা কিতাবের সবচে বড় খাজানা, কেননা নিকট অতীতে উর্দুতে এর ওপর যেসব বড় বড় কাজ হয়েছে, অন্য কোনো ভাষায় তা হয়নি।

যখন আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি কিছুটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, তখন নিজের সমস্ত মনোযোগ আরবি ভাষার মৌলিক নবি-জীবনীর কিতাবগুলোতে নিবদ্ধ হলো। এর মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য দু’টি কিতাব হলো— ইবনে হিশাম রহ. রচিত ‘আস সীরাতুন নাবাবিইয়াহ’, অপরটি ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর ‘যাদুল মাআদ’। এসব কিতাব কেবল জানার জন্য কিংবা গতানুগতিক পদ্ধতিতে পড়িনি, বরং এসবই ছিল আমার জীবন ও কর্ম, এর মাঝে ডুবেই আমি অতিবাহিত করতাম রাত্রিদিন।

ওই সময় আমি অন্তরে ইমান ও একিনের সুমিষ্টতা আস্বাদন করি, জজবা ও ভালোবাসার খোরাকি পাই এবং নবিপ্রেমের বাগান সিক্ত হয়ে ওঠে। এই জন্য যে, নবি-জীবনের মর্মস্পর্শী ঘটনাবলি আত্মশুদ্ধি ও আলোর পথ দেখানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম, এবং কোরআনের পর মানুষের মনমানসিকতা গঠন ও বিকাশে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও কার্যকরী পন্থা।

উল্লিখিত দু’টি কিতাবের পর আরবি ও ইংরেজি ভাষায় রচিত নবি-জীবনের আধুনিক ও অনাধুনিক যেকোনো কিতাব হাতে এসেছে, নিরলস পাঠ চালিয়ে গেছি। এই কারণেই আমার যেকোনো কিতাবে ও লিখনীতে সবসময় নবি-জীবনী প্রধানতম ভিত্তি, এবং নবি-জীবনীকে কেন্দ্র করেই আমার লেখার রূপ-রস ও শোভা-সৌন্দর্য আবর্তিত হচ্ছে। নিজ আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দেশ্য বর্ণনার জন্য শক্তিশালী থেকে অধিকতর শক্তিশালী দলিল এবং আলঙ্কারিক উপমা এই নবি-জীবনীর সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা থেকেই পেয়েছি। নবি-জীবনী থেকেই স্বভাবে পেয়েছি বাকপটুতা ও তেজস্বিতা, প্রেরণা ও গতি এবং জেগে উঠেছে সুপ্ত প্রতিভা। তাই আমার এমন কোনো উল্লেখযোগ্য লিখনী নেই, যেখানে মুহাম্মাদ স.-এর জীবনের গভীর প্রভাব ও সৌন্দর্যের ঝলকানি নেই।’

শৈশব

১৯৮৬ সালের ৬ অগাস্ট তাকিয়াকেলাঁয় আসর নামাজের পর এক মজলিশে আলাপচারিতায় [১১] শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন :

‘আমি তখন চার পাঁচ বৎসরের ছিলাম। একদিন আমিনাবাদ গিয়েছি, আমার কাছে তখন হাতখরচার জন্য কিছু পয়সা ছিল। আমি সোলোমন অ্যান্ড কোম্পানি নামের এক ওষুধের দোকানে গিয়ে দুই পয়সা দিয়ে বলি, ‘একটা বই দিন’। দোকানি আমাকে একটা ‘ঔষুধের মূল্য তালিকা’ দিয়ে পয়সা ফেরত দেন। আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে ঘরে ফিরে আসি।…
বইপ্রেমের এই গল্পটা আমি কোনো একটি বইতে লিখেছি। দক্ষিণ ভারতের একটি প্রকাশনাসংস্থা ওদিকে প্রচলিত শিশুতোষ বইতে সেই গল্পটা সংকলন করেছে।…’

মাওলানা সাইয়িদ আবু বকর যখন শৈশবকালীন খেলাধূলার কথা আলোচনা শুরু করেন, তখন আলি মিয়াঁ নদবি বলেন :

‘ছেলেবেলায় হকি ও টেনিস বেশি খেলতাম। হকিতে লেফট আউট খেলতাম। সাঁতারের খুব শখ ছিল। ক্রিকেটও খেলেছি, তবে খুব কম। কুস্তি খেলারও শখ ছিল।’

তারপর বলেন, ‘আমার শৈশবকালীন শিক্ষা দীক্ষায় সাইয়িদ হাবিবুর রহমান ও সাইয়িদ আবুল খায়র রহ. অনেক অবদান আছে, যাঁরা প্রতিটি বিষয়ে আমাকে যথাযথ নীতিশিক্ষার ব্যাপারে খেয়াল রাখতেন। এমনকি কুস্তি খেলার ছড়া শেখাতেন, আমার কাছ থেকে শুনতেন, এবং অর্থ বুঝিয়ে দিতেন।’

টীকা :
[১০] বিশেষত কাজী মুহাম্মদ সালমান মনসুরপুরি রচিত অনবদ্য সিরাতগ্রন্থ ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ দ্বারা হযরত মাওলানা আবুল হাসান নদবি গভীর প্রভাবিত হয়েছিলেন।
[১১] সেখানে মাওলানা আলি মিয়াঁ নদবির সমবয়সী ও অন্তরঙ্গ বন্ধু জওহরলাল য়ুনিভার্সিটির সাবেক প্রফেসর মাওলানা সাইয়িদ আবু বকর হাসানি (র), মুহাম্মদ ইসমাইল মরহুম ও সাইয়িদ মুহাম্মদ মুসলিম প্রমুখ বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন।

আগের সংবাদদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত ৩৫৮৭, মৃত্যু ৩৪
পরবর্তি সংবাদচাঁদাবাজ হিজড়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি গুরুমাতাদের