আলোর পথের রাহবার (প্রথম পর্ব)

[হযরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি (র)-এর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ]

মূল : মুহাম্মাদ হাসান আনসারি
ভাষান্তর : মওলবি আশরাফ

পরিচয় পর্ব 

বাড়িতে তাঁর প্রেমময় ডাকনাম ‘আলি’, পুরোনাম ‘সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি’ আর পরিচিতি ‘আলি মিয়াঁ’ নামে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশে লাখনৌ থেকে আটাত্তর কিলোমিটার দূরে রায়বেরেলি শহর অবস্থিত। শহর থেকে পশ্চিমে তিন চার কিলোমিটার তফাতে সাঈ নদী, তার বাঁ দিকে ‘তাকিয়াকেলাঁ দায়েরায়ে শাহ আলামুল্লাহ’ নামে একটি জনবসতি। প্রাচীরঘেরা দশবিঘা জমির ওপর কয়েকটিমাত্র ঘর, যার বেশিরভাগই শক্ত ইঁটের গাঁথুনিতে তৈরি, কিন্তু একদম সাদাসিধে। নদীর পাড়ে একটি মসজিদ। সামনে একটি সমাধীসৌধ— শাহ আলামুল্লাহ (রহ)-এর সমাধী, এই বসতির নামকরণ হয়েছে যাঁর নামে। হিজরি এগারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি দেশত্যাগ করে নাসিরাবাদ থেকে এদিকটায় এসেছিলেন। এই মহান সাধকের হাতে এই বসতির প্রথম ঘর [১] ও মসজিদ [২] নির্মিত হয়।

‘তাজকিরায়ে শাহ আলামুল্লাহ’ নামক কিতাবের ভূমিকায় মাওলানা মুহাম্মদ আল হাসানি লিখেন :

‘এই ছোট্ট জনবসতির অধিবাসীগণ যে মহান সত্তার বংশধর হওয়ায় গর্বিত ছিল, তিনি হিন্দুস্তানের ইসলামি ইতিহাসের উঁচুস্তরের ব্যক্তিত্ব ও সাহেবে নিসবত [৩)] সাধকগণের অন্যতম। ধর্মপালনে যেমন, ধর্মের নামে অধর্মের বিরুদ্ধেও ছিলেন তেমন কঠোর। এবং অভ্যাসে, চরিত্রে, আচার-আচরণে, শখ ও আবেগে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেভাবে তিনি হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য ও অনুকরণ করতেন— তার দৃষ্টান্ত মাশায়েখে তরিকত [৪] পির-আউলিয়াদের মাঝে পাওয়া অসম্ভব না হলেও অবশ্যই খুব কঠিন।

এই সেই ‘দায়েরায়ে শাহ আলামুল্লাহ’, যার মাটিতে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক সাইয়িদ আহমদ শহীদ (রহ) শৈশব কৈশোর কাটিয়েছেন, যেখান থেকে তিনি সমাজে নৈতিকতা ও ধর্ম অনুযায়ী জীবন চালানোর চেষ্টা ও সংগ্রাম শুরু করেন। এবং উপনিবেশবাদী ভিনদেশি লুটেরা শাসকগোষ্ঠী থেকে দেশ ও জাতিকে স্বাধীন করবার জন্য সিপাহি তৈরি করে ধর্মযুদ্ধের ঝাণ্ডা উড্ডয়ন করেন, যার বর্ণনা খোদ ইংরেজদের নির্ভরযোগ্য বইতেও অনুপস্থিত নয়।’

গুলে রা’না ও নুজহাতুল খাওয়াতির গ্রন্থের রচয়িতা মাওলানা হাকিম সাইয়িদ আবদুল হাই (রহ)-এর দিনরাত এই বসতিতেই কাটত। এবং এই দায়েরায়ে শাহ আলামুল্লাতেই বর্তমান সময়ের ইসলামি দুনিয়ার গর্ব মুফাক্কিরে ইসলাম হজরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবির জন্ম।

তাঁর দাদা, যিনি হজরত হাসান বিন আলি (রাদি)-এর বংশধর, ১২১১ খ্রিষ্টীয় সনে সুলতান শামসুদ্দিন উলতুৎমিশের শাসনামলে হিন্দুস্তানে আসেন এবং কাটরামঙ্কপুরে বসবাস শুরু করেন।

হজরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি ৬ মুহাররম ১৩৩৩ হিজরি সনে (৫ ডিসেম্বর ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে) শুক্রবার সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতা মাওলানা হাকিম সাইয়িদ আবদুল হাই (রহ)। মাতার নাম খায়রুন্নিসা (রহ), যিনি ‘বেহতর’ তাখাল্লুসে লিখতেন।

[ পিতামাতার জীবনের ইতিবৃত্ত নিয়ে হযরত মাওলানার লেখা ‘হায়াতে আবদুল হাই’ ও ‘জিকরে খায়র’ (বাংলায় ‘আমার আব্বাজান’ ও ‘আমার আম্মাজান’) পড়ে দেখতে পারেন।]

ডাক্তার মাওলানা সাইয়িদ আবদুল আলি (রহ) তাঁর বড় ভাই। এবং আমাতুল্লাহ তাসনিম ও আমাতুল আজিজ (রহ) তাঁর দুই বড় বোন।

শাহ জিয়াউন্নবি (রহ) তাঁর নানা আর দাদা ছিলেন মাওলানা সাইয়িদ ফখরুদ্দিন আল হাসানি (রহ)।

নয় বৎসর বয়সে পিতার ইন্তেকাল দেখেন[৫], এবং ছাপ্পান্ন বছর বয়সে মায়ের স্নেহছায়া মাথা উঠে যায়[৬]।

তাঁকে প্রতিপালন ও তরবিয়ত করেছেন বড়ভাই ডাক্তার আবদুল আলি, যিনি কিং জর্জ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত (Gold Medallist) ছিলেন।

হযরত মাওলানা নিজ ঘরের পরিবেশ সম্পর্কে বলেন :

‘আমাদের ওপর মহান আল্লাহর করুণা ও নেয়ামত দানের শুকরিয়াস্বরূপ বলছি— আমার আম্মাজান ছিলেন হাফেজে কোরআন। আমার খালা, এক খালাতো বোন, মামি, ফুফু মোটকথা ঘরে পাঁচসাতজন হাফেজে কোরআন ছিলেন। আমার আম্মাজানকে যেভাবে বিশুদ্ধ, প্রভাবকারী ও মন জুড়ানো স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করতেন, বহু ভালো ভালো জায়গায় কোরআন পাঠ শুনেছি কিন্তু তাঁর মত এমন মর্মস্পর্শী তেলাওয়াতকারী পাইনি। তাঁর তেলাওয়াত শুনলে মনে হত যেন আসমান থেকে রিমঝিম ছন্দে বৃষ্টি পড়ছে।’ [৭]

তা’মিরে হায়াত সাময়িকীতে [৮] হযরত মাওলানা নিজ বংশীয়, আত্মিক ও জ্ঞানগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন :

‘আমার বংশীয়, আত্মিক ও জ্ঞানগত সম্পর্ক ছিল সাইয়িদ আহমদ শহীদ (রহ) ও মাওলানা শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ)-এর সাথে, যাঁরা এই দেশে (সমগ্র ভারত উপমহাদেশে) এক আল্লাহয় বিশ্বাস ও সুন্নাহের দিকে দাওয়াতের ঝাণ্ডা উঁচু করেছেন এবং এর জন্য জীবন বাজি লাগিয়েছেন।… আমার এই গর্বময় ইতিহাস খুবই পছন্দ। আমি এই মহামূল্য উত্তরাধিকার কেবল বুকে নয়, চোখেমুখে লাগাই।… আমার সমস্ত লিখনী, অনুসন্ধান, গবেষণা ও চেষ্টা প্রচেষ্টা এই উত্তরাধিকার রক্ষা, এর প্রচার প্রসার এবং নবরূপে ফিরিয়ে আনবার উদ্দেশে উৎসর্গ করেছি।’

প্রফেসর রশিদ আহমদ সিদ্দিকী হযরত মাওলানার রচিত ‘নুকুশে ইকবাল’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন :

‘মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি এমন এক আলোকমশাল : যিনি গত শতক থেকে এখন পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে ধর্মীয়, চারিত্রিক, নীতিনৈতিক, সৎপথপ্রদর্শন, লিখন ও সংকলন, এবং ভাষা ও সাহিত্যে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। তাঁর চরিত্রমাধুরীর জলওয়া শুধু ব্যক্তিত্বে নয় বরং শিক্ষায় সাহিত্যে ও দীনি খেদমতে সমানভাবে পাওয়া যায়। আরবি ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর লিখন ও পঠনে যে অসামান্য সমঝদারি এবং মুসলিমবিশ্বের দীনি ও তহজিব-তমদ্দুনের (সভ্যতা-সংস্কৃতি) প্রশ্নে তাঁর যে অগাধ পাণ্ডিত্য— এসবের কারণে তাঁর কথামালা ভারত উপমহাদেশ ছাপিয়ে সারাবিশ্বে যে ওজন ও গ্রহণযোগ্যতা রাখে, (সম্ভবত এই ভাগ্য বর্তমান সময়ের ভারতীয় আলেমেদীনের মাঝে কেবল তাঁরই হয়েছে) এর ভিত্তিতে সাইয়িদ সাহেব এই জাতির প্রতিনিধি হবার পুরোপুরি হক রাখেন।’

বংশলতিকা 

মাওলানা হাকিম সাইয়িদ আবদুল হাই গুলে রা’না গ্রন্থে লেখেন :

‘আমাদের বংশপরম্পরা ইমাম হাসান (রা)-এর জ্যেষ্ঠপুত্র ইমাম হাসান মুসান্না (রহ)-এর সাথে গিয়ে মিলে। হাসান মুসান্না (রহ) শ্রদ্ধেয় পিতৃব্য শহীদে কারবালা ইমাম হুসাইন (রহ)-এর সাহেবজাদি ফাতিমায়ে সুগরাকে বিয়ে করেন। সেই সূত্রে আমাদের পরিবারের লোকদের হাসানি এবং হুসায়নি দু’টোই বলা হয়।’

হযরত হাসান (রাদি)
হযরত হাসান মুসান্না (রহ)
হযরত আবদুল্লাহ আল মাহদ (রহ)
সাহিবুন নাফসিজ জাকিইয়া (রহ)
————
বিশ পুরুষ পর
————-
সাইয়িদ কুতুবুদ্দিন মুহাম্মদ আল মাদানি (রহ)
————
কয়েক পুরুষ পর
————
সাইয়িদ কুতুবুদ্দিন মুহাম্মদ সানি (রহ)
সাইয়িদ আলাউদ্দিন (রহ)
সাইয়িদ কাজী মাহমুদ (রহ)
সাইয়িদ মুহাম্মদ মুয়াজ্জাম (রহ)
সাইয়িদ মুহাম্মদ ইসহাক (রহ)
সাইয়িদ হিদায়েতুল্লাহ (রহ)
সাইয়িদ আবদুর রহিম (রহ)
সাইয়িদ মুহাম্মদ তাকি (রহ)
সাইয়িদ মুহাম্মদ শাহ (রহ)
সাইয়িদ আকবর শাহ (রহ)
সাইয়িদ আলি মুহাম্মদ (রহ)
সাইয়িদ আবদুল আলি (রহ)
সাইয়িদ ফখরুদ্দিন (রহ)
সাইয়িদ আবদুল হাই (রহ)
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি (রহ)[৯]

টিকা :
[১] হিজরি ১০৫০ সনে। ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ।
[২] হিজরি ১০৮৪ সনে। ১৬৭৩ খ্রিষ্টাব্দ।
[৩] সাহেবে নিসবত মানে যিনি আল্লাহর ওপর খুশি, আল্লাহও তাঁর ওপর খুশি এবং আল্লাহর সাথে তাঁর সম্পর্ক সার্বক্ষণিক।
[৪] মাশায়েখে তরিকত একটি সুফি পরিভাষা। একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছুলে তাঁদের এই নামে অভিহিত করা হয়।
[৫] হিজরি ১৩৪১ সনে। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ।
[৬] হিজরি ১৩৮৮ সনে। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দ।
[৭] আল বালাগ, মুহাররম সংখ্যা, ১৩৯৯ হিজরি।
[৮] মার্চ ১০, ১৯৮০
[৯] মাওলানা মুহাম্মদ সানি হাসানি (রহ)-এর সূত্রে প্রাপ্ত।

বিজ্ঞাপন