আলোর পথের রাহবার (৫ম পর্ব) 

[হযরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি (র)-এর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ]
মূল : মুহাম্মাদ হাসান আনসারি
ভাষান্তর : মওলবি আশরাফ
স্বভাব
নিজের সম্পর্কে খোদ মাওলানা আবুল হাসান আলি নদবি কারওয়ানে জিন্দেগি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে লিখেন :
‘আমার বুদ্ধিবৃত্তিক মানস গঠনে পিতৃকুল মাতৃকুল উভয়ের প্রভাব রয়েছে। আমার পারিবারিক পরিবেশ ও তার রীতিনীতি তিন প্রজন্ম ধরে লেখালেখি ও শিল্পসাহিত্য চর্চা বজায় রাখছিল। হজরত সাইয়িদ আহমদ শহিদ (রহ)-এর বংশধর হওয়ায় চিন্তার উদারতা ও ধর্মের পথে লড়াই— প্রতিরোধ-সংগ্রামের স্পৃহা সহজাত ছিল। আমি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলাম আমার শ্রদ্ধেয় অগ্রজ মওলবি ডক্টর সাইয়িদ আবদুল আলি সাহেবের দ্বারা— যিনি আধুনিক ও প্রাচীন উভয় ধারার শিক্ষাপদ্ধতির সার্থক সমন্বয়কারী ছিলেন, এবং ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিমের দুই জ্ঞানসমুদ্রের মিলনস্থল। তাঁর সান্নিধ্য ও নির্দেশনা সবসময় আমার জীবনের অংশ হিসেবে রয়েছে।’
আত্মজীবনীর এই অংশে তিনি আরো বলেন :
‘আমার জন্যে একাধারে কর্মহীন থাকা জীবনের সবচেয়ে বড় সাধনা ও কঠিন শাস্তি তুল্য।’
মাওলানা ডক্টর আবদুল আব্বাস নদবি ২৮ এপ্রিল ১৯৯৬ সালে ‘আবদুল হাই ভবন’ উদ্বোধনের সময় বলেন :
‘আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ও গুরু মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবির মাঝে দয়াধর্ম ও অসহায়দের সহায়ের আগ্রহ স্বভাবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, এবং এ ব্যাপারে তাঁর পঞ্চেন্দ্রিয় সর্বদা সজাগ থাকত।’
আলি মিয়াঁ নদবিকে ১৯৯৮ সালে দুবাইয়ে ‘বিশ্বসেরা ইসলামি ব্যক্তিত্ব’ এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। বিচারক মণ্ডলির অন্যতম ডক্টর আরিফুশ শায়খ তাঁর সম্পর্কে বলেন :
‘আমাদের চোখে মাওলানা আলি মিয়াঁ নদবির ব্যক্তিত্বে তিনটি বুনিয়াদি বিশেষত্ব ধরা পড়েছে— পাণ্ডিত্য, খোদাভীতি ও বিশুদ্ধতা। এর পাশাপাশি ইমান-আমলে জান কুরবানি ও দলমত নির্বিশেষ পুরো মানবজাতির সাথে দরদি সম্পর্ক।’
আলি মিয়াঁ নদবি নিজের সম্পর্কে একবার বলেন, ‘আমার কাছে আমার কর্মের চেয়ে বেশি পছন্দ আমার চিন্তাভাবনা।’
প্রসিদ্ধ কবি শফিক জৌনপুরি বলেন,
‘হে আলি নদবি, তোমার ইসলাম প্রচার আমাদের জন্য অমূল্য সৌভাগ্য। 
তোমার নাম ও খ্যাতি আজ ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বময়। 
অথচ তোমার বিনম্রতায় দেখি হজরত আলি (রা)এর আভাস, 
তোমার পাণ্ডিত্যে পাই হজরত ওমর (রা)এর আন্দাজ (শৈলী)।…’
হাজি আবদুর রাজ্জাক সাহেব চল্লিশ বছর আলি মিয়াঁ নদবির খাস খাদেম হিসেবে তাঁর সংশ্রবে ছিলেন। তিনি বলেন, বিনয় ছিল তাঁর সহজাত স্বভাব। চল্লিশ বছরের এই পুরো সময়ে একবারমাত্র আমার কথায় অত্যন্ত নারাজ হয়ে বলেছিলেন ‘খুব কষ্ট পেয়েছি’। তাঁর ভাষ্যমতে আলি মিয়াঁ নদবির জীবনে সবচে সুখময় মুহূর্ত ছিল ১৯৯৮ সালে যখন তাঁর সম্মানে কাবা ঘরের দরজা খোলা হয় এবং  তিনি পবিত্র কাবায় প্রবেশের খোশ নসিবি হাসিল করেন। আর তাঁর জীবনের সবচে দুঃখময় মুহূর্ত ছিল যখন তাঁর বড় ভাই ইন্তেকাল করেন কিন্তু তিনি বার্মা সফরে থাকায় জানাজায় শরিক হতে পারেননি।
মওলবি নিয়াজ আহমেদ, যিনি দীর্ঘদিন আলি মিয়াঁ নদবির খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, তিনি বলেন, ‘মওলানা এতোটাই হৃদ্যতাপূর্ণ ছিলেন যে আমি কখনো তাঁকে অসন্তুষ্ট হতে দেখিনি।’
মওলানা নিসারুল হক নদবি বলেন, আমি চল্লিশ বছর তাঁর ‘অনুলিপিকার’ ছিলাম, এই দীর্ঘ সময়ে তাঁকে আমি সবসময় আল্লাহর জিকিরে ফানা হয়ে থাকতে পেয়েছি, সুফিদের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফানা ফিল্লাহ’।
১৯৩৪ সালের নভেম্বরে আলি মিয়াঁ নদবি বিয়ে করেন। তার কোনো সন্তানাদি ছিল না বটে, কিন্তু রুহানি সন্তানের সংখ্যা যদি নির্ধারণ করতে হয় তাহলে তা লক্ষ নয় কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদমার্কেট খোলার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভ
পরবর্তি সংবাদবুধবার থেকে চলবে গণপরিবহন