আলোর পথের রাহবার (৮ম পর্ব)

[হযরত মাওলানা সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি (র)-এর জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ]

মূল : মুহাম্মাদ হাসান আনসারি
ভাষান্তর : মওলবি আশরাফ

লেখালেখির জীবন

হজরত মাওলানা আবুল হাসান আলি নদবি যেসব বিষয়ের ওপর গ্রন্থাদি লিখেছেন তার মধ্যে ইসলামের ইতিহাস, নবি-চরিত, পূর্বসূরি উলামায়ে কেরাম ও সাধকদের জীবনী, কাব্য-বিশ্লেষণ, সফরনামা, আত্মশুদ্ধিমূলক নসিহত, মানবতার বাণী এবং আত্মজীবনী বিশেষ উল্লেখযোগ্য। একাডেমিক বই নিয়েও তিনি কাজ করেছেন, এর মধ্যে ‘মুখতারাত’ বা ‘নির্বাচিত আরবি সাহিত্য’ সর্বজন স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ আরবি সাহিত্যের সংকলন। একবার তিনি বলেন, “কোনো গ্রন্থের কাজ সম্পন্ন হলে আমার মন খুশিতে ভরে ওঠে, কিন্তু ‘তাজকিরায়ে মওলানা ফজলে রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদি’-এর কাজ শেষ হয় তখন মনে হচ্ছিল কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি।”

‘কারওয়ানে মদিনা’ হজরত মাওলানার দৃষ্টিতে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা, মক্কা ও মদিনা সফর নিয়ে এই গ্রন্থটি লেখা। ‘কারওয়ানে জিন্দেগি’ সাতখণ্ডে প্রকাশিত আত্মজৈবনিক রচনা। ‘সিরাতে আহমদ শহীদ’ তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ ও ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা সাইয়িদ আহমদ শহীদের জীবন নিয়ে রচিত। ‘পুরানে চেরাগ’ ৬৯ জন পূর্বসূরি বুজুর্গদের সংক্ষিপ্ত জীবন নিয়ে তিন খণ্ডে প্রকাশিত। ‘তারিখে দাওয়াত ও আজিমত’ (সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস) পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত (বাংলায় সাত খণ্ডে), এই গ্রন্থ রচনার ইতিবৃত্ত খোদ হজরত মাওলানা তাঁর কারওয়ানে জিন্দেগি গ্রন্থে বলেন :

‘বেশ কিছুদিন ধরে আমার মনে হচ্ছিল যে, সুশীল ও বৌদ্ধিক মহলের লোকজনের এমন ধারণা জন্ম নিয়েছে— ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাসে সংশোধন, সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ধারাবাহিক বা অবিচ্ছিন্নরূপে নয়, বরং এর মাঝে শতশত বছরের বিচ্ছিন্নতা রয়েছে, অনেকটা এমন যে, কয়েকশ বছর পর হঠাৎ একজন সংস্কারকের আবির্ভাব হয়েছে যিনি বিগড়ে যাওয়া ধর্মচিন্তা ও সমাজব্যবস্থাকে প্রকৃতরূপে ফিরিয়ে আনার জন্যে ইনকিলাব করেছেন এবং পাঞ্জা লড়েছেন বড় বড় শক্তির সাথে, তাই একজন অনেক লম্বা মানুষকে বামনদের মাঝে যেমন দেখায় তাকেও তেমন দেখায়, তারা ছাড়া এই সময়ের মাঝে যেসব আলেম-উলামা ছিলেন সবাই ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণি আর দুর্যোগ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে না পেরে অতলে ডুবে গেছেন।

অথচ বিষয়টি একেবারেই এমন নয়। আমি এই বিষয়ে আমার ‘সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছি। এই ধারণাটিকে সাদাচোখে দেখলে খুবই সাধারণ মনে হবে, কিন্তু এর ফলাফল খুবই ভয়ানক ও সুদূরপ্রসারী। এটি ইসলামের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও সময়ের সাথে টিকে থাকার যোগ্যতার ব্যাপারে এক ধরনের কুধারণা ও হতাশা। প্রকৃত সত্য হলো প্রতিটি যুগই তার প্রয়োজনমাফিক সংস্কারকের জন্ম দিয়েছে এবং ইসলামের এই বৈশিষ্ট্য একান্ত, অন্য কোনো ধর্মে এর নজির পাওয়া যাবে না।… এই সত্য আড়ালে থাকার কারণ ইসলামের ইতিহাস রচনার ধারা ও বিন্যাসের ত্রুটি, যা কিনা শাসকের পরিবর্তন, রাজনৈতিক ঘটনাবলি আর যুদ্ধ-জেহাদের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইতিহাসবিদগণ ইসলামের প্রতিযুগের নবজাগরণ ও সংশোধনকে বিন্যস্ত ও বৌদ্ধিক ফর্মে উপস্থাপনের চমৎকার কোনো চেষ্টা করেনি। সংক্ষেপে বললে এটা ইতিহাসবিদদের ত্রুটি, কিন্তু ইতিহাসের নয়।’

মোদ্দা কথা, সংস্কারকদের আবির্ভাবের এই ধারাবাহিকতাকে সন্নিবেশ করার নিয়তে হজরত মাওলানা তাঁর এই গ্রন্থটি লিপিবদ্ধ করেন।

‘নুকুশে ইকবাল’ গ্রন্থের মুখবন্ধে সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি বলেন :

‘আমার আল্লামা ইকবালকে পছন্দ করার কারণ অনেক কিছুই হতে পারে, এবং সব মানুষই নিজের পছন্দের ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করার অনেকগুলো কারণ তৈরি করে, এই জন্য যে মানুষ কোনো তাত্ত্বিকের জবানে তার নিজের স্বপ্ন ও ইচ্ছা-অভিলাষের ব্যাখ্যা শুনতে চায়, যেন নিজের বলার মতো শক্তিশালী কোনো ভাষা পাওয়া যায়। মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক আর আত্মমগ্ন, তার ভালো লাগা কিংবা ভালো না লাগা, আশা কিংবা নিরাশার মূল উৎপাদনকেন্দ্র অবিচ্ছেদ্যভাবে তারই মন। এই জন্য সে যেই কাজেরই যৌক্তিক প্রস্তাবনা রাখে, তাতে মূলত তারই খায়েশ সঙ্গ দেয় এবং তার অনুভূতি সেই কাজেই উৎফুল্লতা পায়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। আমি আল্লামা ইকবালকে এইজন্য পছন্দ করি যে তাঁর চিন্তাভাবনা আমার পছন্দের মাপকাঠিতে পুরাপুরি সমান সমান হয়, আর আমার মনে হয় তিনি যেন আমারই জজবা ও অনুভূতির তর্জমা করেছেন। তাঁর কবিতা ও ভাষ্য কেবল আমার ধর্মীয় বিশ্বাস ও ফিকিরের সাথী নয়, আমার আকছার অনুভব-অনুভূতিরও সাথী।

সবচে বড় যেই ব্যাপারটি আমাকে তাঁর দিকে টেনে নিয়ে গেছে তা হলো— সাহস, মহব্বত ও ঈমান, যার সুন্দরতম উপমা তাঁর কবিতা ও ভাষ্যে মিলে। আমিও আমার রক্তে-রন্ধ্রে ওই তিন গুণেরই প্রাধান্য পাই।… ’

একবার হজরত মাওলানা বলেন, ‘আমার বইগুলো আমার জন্য ভিজিটিং কার্ড হয়ে গেছে। আমার যখন ‘মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্ব কী হারালো’ (মা যা খসিরাল আলামু বিইনহিতাতিল মুসলিমিন) বইটি প্রকাশিত হয়, এরপর আমি মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমে সফরে যাই, তখন সৌদি এম্বাসিতে দূতের সাথে সাক্ষাৎকালে তিনি বলেন, “আজকাল দেখছি ভারতীয়রা জ্ঞানের জগতে অনেক এগিয়ে গেছে, তাদের লেখার বিষয় ও শৈলী একেবারেই আলাদা আর খুবই উন্নত স্তরের। সম্প্রতি ভারতীয় এক লেখকের এই বইটি পড়েছি, এমন উচ্চতর চিন্তার বই খুব কমই আছে…” বলে আমাকে ‘মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্ব কী হারালো’ বইটি দেখালেন। আমি তখন পর্যন্ত বইয়ের প্রকাশিত কপি হাতে পাইনি, আর দূতও জানেন না আমিই এই বইয়ের রচয়িতা।… আমি তাকে বললাম, আপনি কি এই বইয়ের লেখকের সাথে পরিচিত হতে চান? তিনি বললেন, “কেন নয়, অবশ্যই!” আমি তখন আমার পরিচয় প্রকাশ করলাম।’

বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি আইনজ্ঞ আল্লামা ইউসুফ আল কারজাবি হজরত মাওলানা আবুল হাসান আলি নদবির লেখালেখি সম্পর্কে বলেন, ‘হজরত মাওলানার সমগ্র রচনা খুবই মূল্যবান ও বিস্তৃত পাঠের সারসংক্ষেপ। তাঁর বই পাঠ করলে একদিকে যেমন গৌরবময় মুসলিম ইতিহাসের ওয়ারিশ হিসেবে গর্বিত হই, অপরদিকে সমকালে আমাদের চিন্তা-ফিকিরে হোঁচট খাওয়া থেকে উঠে দাঁড়ানোর প্রেরণা পাই।… আল্লাহ তাঁকে দেখার আশ্চর্য ক্ষমতা দিয়েছেন, বর্তমান সময়কে নিরিখ করে তিনি তাঁর বই ‘মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্ব কী হারালো’ আর ‘নুকুশে ইকবাল’এ যে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, তাঁর জ্ঞানরাশির গভীরতা সেখান থেকে আমরা কিছুটামাত্র আঁচ করতে পারি।’

জুলাই ১৯৯৫ সালের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সৌদি আরবের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হজরত মাওলানা প্রণীত ‘আস সিরাতুল নাবাবিইয়াহ’, ‘মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্ব কী হারালো’ আর তাঁর সংকলিত ‘নির্বাচিত আরবি সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এবং মিশরের জামেয়া আল আজহার ও জামেয়া কায়রোর শিক্ষার্থীরা তাঁর বইয়ের ওপর পাঠচক্র করে থাকে। সেখানে ইতোমধ্যে ‘মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্ব কী হারালো’ বইয়ের বিশের অধিক এডিশন প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি আরবদের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে যে, ‘এই বই না পড়ে কেউ ইসলামি সভ্যতার ওপর পূর্ণ ধারণা রাখে দাবি করতে পারবে না!’

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদ‘সমগ্র বিশ্ববাসীর ৭০ শতাংশ টিকা না পেলে করোনা নির্মূল সম্ভব নয়’
পরবর্তি সংবাদচলমান লকডাউন বাড়ল আরও ৭ দিন