আল্লামা আজিজুল হক : বাংলাদেশের কিংবদন্তী শায়খুল হাদীস

কাজী মাহবুবুর রহমান

(শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহমতুল্লাহি আলায়হি এ দেশের ইলমি আকাশে যেমন নক্ষত্র হয়ে উদিত হয়েছিলেন তেমনি ইসলামি রাজনীতি এবং ইসলামি স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনেও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ছিলেন বাংলাদেশের তওহিদি জনতার ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে ফাতেহের পাঠকদের জন্য লিখেছেন কাজী মাহবুবুর রহমান।)

শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. আনুমানিক ১৯১৯ ঈসায়ি সালে বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ) জেলার ভিরিচ খাঁ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হাজি এরশাদ আলী। জীবনের শুরুতেই মাত্র ৪/৫ বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। এরপর নানির কাছে লালিত পালিত হন। তাঁর মাতুলালয় ছিল একই জেলার কলমা অঞ্চলে। এই সুবাদে শৈশবের কিছুটা সময় তাঁর এখানেই কেটেছে। এরপর ৭/৮ বছর বয়সে নিজ জেলা ছেড়ে বিবাড়িয়া শহরে চলে আসেন। কারণ তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা হাজি এরশাদ আলী রহ. তখন ব্যবসার কাজে সেখানেই অবস্থান করতেন। বাংলাদেশের তিনজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি সেসময় বিবাড়িয়ায় ছিলেন। তাঁরা হলেন–হজরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, হজরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর ও হজরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর রহ.। তিনজনের সাথেই হাজি এরশাদ আলী সাহেবের গভীর ভক্তির সম্পর্ক ছিল। তাই তিনি তাঁর সৌভাগ্যপুত্রকে হজরত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর বিশেষ তত্ত্বাবধানে অর্পণ করেন।

শিক্ষাজীবন

নানাবাড়ি কলমা এলাকার স্থানীয় মসজিদেই হজরত শায়খুল হাদিস রহ.-এর লেখাপড়ার সূচনা হয়। সেখানে তিনি কুরআন মজিদের নাজেরা সমাপ্ত করেন। এরপর আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর দায়িত্বে জামিআ ইউনুসিয়ায় আরবি শিক্ষা শুরু হয়। শায়খুল হাদীস রহ.-এর বড় সৌভাগ্য ও তাঁর প্রতি আল্লাহ তাআলার বড় অনুগ্রহ এই যে, শিক্ষাজীবনের সূচনা থেকেই তিনি হজরত শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর মতো শায়খ ও মুরবিবর সাহচর্য ও তত্ত্বাবধান লাভ করেছেন। যিনি ছিলেন ছাত্রদের তালিম ও তরবিয়তের বিষয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এমনকি হজরত ফরিদপুরী রহ.-এর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শায়খুল হাদীস রহ. তাঁর স্নেহের ছায়ায় থাকার সৌভাগ্য লাভ করেছেন।

বিভিন্ন কারণে হজরত ফরিদপুরী রহ. জামিআ ইউনুসিয়া থেকে পৃথক হয়ে ঢাকায় চলে আসেন৷ শায়খুল হাদীস রহ. যেহেতু মূলত হজরত আল্লামা ফরিদপুরী রহ.-এর শাগরিদ ছিলেন এজন্য তিনিও ঢাকা চলে আসেন এবং এখানেই বড় কাটারা মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করেন। হজরত ফরিদপুরী রহ. ছাড়াও তিনি এখানে আল্লামা রফিক আহমদ কাশ্মীরি রহ.-এর বিশেষ সান্নিধ্য লাভ করেন।

শায়খুল ইসলাম যফর আহমদ উসমানি রহ. তখন ঢাকায় থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ছাড়াও তিনি বড় কাটারা মাদরাসার শায়খুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসিন ছিলেন। এ সুবাদে ১৯৪০-৪১ ঈসায়ি সালে শায়খুল হাদীস রহ. তাঁর নিকট তাফসিরে বায়জাবি, জামে তিরমজি ও সহিহ বুখারি পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

বড় কাটারায় দাওরায়ে হাদিসের বছর শায়খুল হাদীস রহ. যেসব কিতাব ও শরাহ মুতালাআ করেছেন তার মধ্যে ‘ফাতহুল মুলহিম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ কিতাব অধ্যয়নের সময়ই তিনি শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানি রহ.-এর ভক্ত হয়ে যান। তাঁর নিকট দ্বিতীয়বারের মতো সহিহ বুখারি পড়ার ইচ্ছা তীব্র হয়ে ওঠে। আল্লামা উসমানি রহ. তখন জামিআ ইসলামিয়া ডাভেলে ছিলেন এবং সেখানেই তাঁর বিখ্যাত দরসে বুখারি হতো। তাই শায়খুল হাদীস রাহ. দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ডাভেল যান এবং ১৩৬২-৬৩ হিজরিতে আল্লামা উসমানি রহ.-এর কাছে বুখারি পড়ার গৌরব অর্জন করেন।

ডাভেল যাওয়ার পথে মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুরে কয়েকদিন অবস্থান করেন। এ সময় হজরত থানভি রহ.-এর খলিফা হজরত মাওলানা আসআদুল্লাহ রামপুরি রহ.-এর সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং হজরত তাঁকে মুসালসালাতের ইজাজতও প্রদান করেন।

আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানি রহ.-এর নিকট বুখারি শরিফ পড়ার সময় শায়খুল হাদীস রহ. তাঁর বুখারির তাকরিরগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লিপিবদ্ধ করতেন। বছর শেষ হওয়ার পর লিখিত তাকরিরগুলো পরিষ্কার করে লেখা, উদ্ধৃতিসমূহের নিরীক্ষা ও সম্পাদনার জন্য উসমানি রহ. আরও এক বছরের জন্য তাঁকে দেওবন্দে নিজের কাছে রেখে দেন।

অবস্থানের সুবিধার্থে শায়খুল হাদীস রহ. দারুল উলূম দেওবন্দের দাওরায়ে তাফসিরে ভর্তি হন। সেখানে তিনি শায়খুত তাফসির আল্লামা ইদরিস কান্ধলভি রহ.-এর নিকট পড়ার সৌভাগ্যও লাভ করেন।

কর্মজীবন

আল্লাহ তাআলা শায়খুল হাদীস রাহ.-কে দেশ, জাতি ও দীনের বিভিন্ন খেদমতের তওফিক দান করেছেন। এর ফলে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলেমদের একজন, যাঁদের সবিশেষ অবদান বাংলার কোটি মুসলমানের প্রতি রয়েছে। তবে কয়েকটি বিশেষ অঙ্গন ছিল তাঁর খেদমতের প্রধান ক্ষেত্র।

প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবন শেষে ১৩৬৪ হিজরি, মোতাবেক ১৯৪৪ ঈসায়ি সালে ঢাকা আশরাফুল উলুম বড় কাটারা মাদরাসায় শায়খুল হাদীস রহ.-কে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর দুই বছর আগে শায়খুল হাদীস রহ. এই মাদরাসা থেকেই শিক্ষা সমাপণ করেছিলেন। আকাবির ওলামা ও আসাতিজা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে উঁচু স্তরের কিতাব দেওয়া হয়। তিনি এখানে ৮ বছর তাদরিসের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫২ সালে হজরত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. ঢাকার প্রসিদ্ধ লালবাগ এলাকায় ‘জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ’ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ে মাদরাসাটি খুব প্রসিদ্ধি ও মাকবুলিয়ত লাভ করে। হজরত শায়খুল হাদীস রহ. তখন এই জামিআয় চলে আসেন। এখানে ১৯৫৫ সালে তাঁর ওপর বুখারির দরসদানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি শায়খুল হাদীস হিসেবে বুখারি শরিফ ও অন্যান্য কিতাবের দরস দিতে থাকেন লালবাগে। একই সময়ে ঢাকার অপর প্রসিদ্ধ দীনী প্রতিষ্ঠান জামিআ ইসলামিয়া তাতিবাজার ইসলামপুরেও শায়খুল হাদীস রহ. তাদরিসের খেদমত আঞ্জাম দেন। ১৯৬৫ সালে হজরত মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রহ- এর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা নূরিয়া ঢাকায় দাওরায়ে হাদিসের জামাত শুরু হলে দরসে বুখারির জন্য হযরতকেই আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। এ ছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর বুখারি শরিফের দরস দিয়েছেন।

১৯৬৫ সালে হজরত ফরিদপুরী রহ. ইন্তেকাল করেন। শায়খুল হাদিস রহ. তখনও জামিআ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগেই তাদরিসের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর বিভিন্ন কারণে সেখান থেকে পৃথক হয়ে যান। এরপর ১৯৮৬ সালে ঢাকার পশ্চিমে মুহাম্মদপুরে ‘জামিআ মুহাম্মদিয়া আরাবিয়া’ নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বুখারি শরিফের দরস প্রদান করেন। এর দুই বছর পর জামিআটি একই এলাকার ঐতিহাসিক সাত মসজিদের পাশে নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরিত হয়। এ সময় এর নামে কিছুটা পরিবর্তন এনে ‘জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মদপুর’ নাম রাখা হয়। ১৯৮৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই জামিআই ছিল শায়খুল হাদিস রহ.-এর দরসে বুখারি ও অন্যান্য তাদরিসি খেদমতের প্রধান কেন্দ্র। তবে তলাবাদের আগ্রহ ও অনুরোধে তিনি ঢাকার কয়েকটি বড় মাদরাসায়ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন এবং বুখারির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দরস প্রদান করেন। এর পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্ররাও বুখারি শরিফের প্রথম কয়েকটি পারা তাঁর নিকট পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া ছাড়াও শায়খুল হাদীস রহ. যেসব মাদরাসায় বুখারি শরীফের সবক পড়িয়েছেন সেগুলো হলো, জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা, মাদরাসা দারুস সালাম মিরপুর ঢাকা, জামিআ ইসলামিয়া লালমাটিয়া ঢাকা, জামেউল উলুম মিরপুর-১৪ ঢাকা।

বুখারি শরিফের দরস

শায়খুল হাদীস রহ. তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে বিভিন্ন শাস্ত্রের অনেক কিতাবের দরস দিয়েছেন। যার মধ্যে কুরআন মজিদের তরজমা ও তাফসির এবং হাদিসের কিতাবসমূহ, মানতিক, নাহু, সরফ, আরবি সাহিত্য, ফিকহ, উসুলে ফিকহ অন্তর্ভুক্ত। তবে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিশেষভাবে বুখারি শরিফের দরস ও এর খেদমতের জন্য মনোনীত করেছিলেন। এ কারণে ১৯৫৫ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় তিনি এই কিতাবের সফল দরস দিয়েছেন। এ কারণেই তাঁর শিক্ষকজীবনের প্রায় শেষ ২০ বছর বিভিন্ন মাদরাসা থেকে বুখারি শরিফ পড়ানোর জোর আবেদন আসতে থাকে। এজন্য প্রতিদিন ৪/৫ মাদরাসায় তাঁকে বুখারি পড়াতে হতো। ফলে তাঁর নিকট শুধু বুখারি শরিফ পড়েছেন-এমন তালিবে ইলমের সংখ্যাও প্রায় ৫ হাজারে পৌঁছে গেছে।

এখানে এ কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, শায়খুল হাদীস রহ. ছাত্রজীবনেই আল্লামা উসমানি রহ.-এর বুখারি শরিফের তাকরির লিপিবদ্ধ করে কিতাবটির এক মূল্যবান উর্দু শরাহ প্রস্তুত করে ফেলেন। আর কর্মজীবনে প্রবেশের পর তিনি বাংলা ভাষায় বুখারি শরিফের এমন শরাহ লেখেন, যা এ ভাষায় পূর্ণ বুখারির সর্বপ্রথম শরাহ। যা সবচেয়ে বিশদ ও গ্রহণযোগ্য শরাহ। বৃহৎ দশ খণ্ডে তা প্রকাশিত হয়েছে।

সহিহ বুখারির এমন নানামুখী খেদমতের কারণে ‘শায়খুল হাদীস’ উপাধিটি তাঁর নামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। দেশের মানুষ তাঁকে ‘শায়খুল হাদীস’ উপাধিতেই স্মরণ করে। আর সাধারণভাবে ‘শায়খুল হাদীস’ বললে সকলের মনে তাঁর কথাই ভেসে উঠে।

লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে কর্মজীবনে প্রবেশের পরও রচনা ও সংকলন ছিল তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততা। এক কালে তাঁর পূর্ণ মনোযোগ বাংলা ভাষার কাজের প্রতি নিবদ্ধ হয়। যেন বাংলাভাষী কোটি মানুষের জন্য দীনী পঠনসামগ্রী প্রস্তুত হয়। যা থেকে তারা তখনও ছিল প্রায় বঞ্চিত। বাংলার যে সকল আলেম প্রথম এই দীনী প্রয়োজন অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তাঁদের মধ্যে শায়খের উস্তাদ ও মুরশিদ আল্লামা ফরিদপুরী রহ. ছিলেন সবার শীর্ষে। তিনি এই অঙ্গনকে নিজের কর্ম ও মনোযোগের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অনেক বড় খেদমত আঞ্জাম দেন। শায়খুল হাদীস রহ. মূলত নিজ শায়খ ও মুরশিদের প্রবর্তিত ধারাকে আরও অগ্রসর করেছেন এবং নিজের খেদমত দ্বারা একে উন্নতির পথে ধাবমান রেখেছেন।

শায়খুল হাদীস রহ.-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, বুখারি শরিফের বঙ্গানুবাদ। একেবারে তরুণ বয়সেই এই কিতাব রচনা শুরু করেন। তখন বাংলাভাষায় শুধু মিশকাতের কয়েকটি খণ্ড ছাড়া হাদিসের কোনো মৌলিক কিতাবের অনুবাদ প্রকাশিত হয়নি। আর বাংলাভাষায় কুরআন মজিদের তাফসির বিষয়েও কোনো বিস্তারিত কিতাব ছিল না। শায়খুল হাদীস রহ. অত্যন্ত পরিশ্রম ও পূর্ণ একাগ্রতার সাথে দীর্ঘ ১৬ বছর এই কাজে নিমগ্ন থাকেন। প্রথমে এটি সাত খণ্ডে প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়গুলোতে এর পুনঃসম্পাদনা ও পরিবর্তন-পরিবর্ধনের ধারা অব্যাহত থাকায় কিতাবটির কলেবর এত বেড়ে যায় যে, এখন তা বৃহৎ দশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কিতাবটিকে এত গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন যে, বাংলা ভাষায় খুব কম দীনী কিতাবেরই এমন গ্রহণযোগ্যতা আছে। অবশ্য এই রচনায় ফরিদপুরী রাহঃ এরও অংশগ্রহণ ছিল।

রাজনৈতিক সক্রিয়তা

রাজনীতির অঙ্গনেও শায়খুল হাদীস রহ.-এর খেদমত ও অবদান অনস্বীকার্য। পাকিস্তান গঠন-আন্দোলনে তিনি নিজ শায়খ ও মুরশিদ হজরত ফরিদপুরী রহ.-এর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেন। আর পাকিস্তান গঠনের পর হজরত মাওলানা আতহার আলী রহ. ও শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন আলেম ইসলামি বিধান বাস্তবায়নের জন্য ‘নেজামে ইসলাম পার্টি’ গঠন করলে শায়খুল হাদীস রহ. তার নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং দলের পক্ষে গণমত আদায়ের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সফর করেন।

পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান কুরআন-সুন্নাহবিরোধী পারিবারিক আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করলে গোটা পাকিস্তানে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পূর্বপাকিস্তানে হজরত শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. সাহসিকতার সাথে পূর্ণ শক্তি নিয়ে এর বিরুদ্ধে ময়দানে অবতীর্ণ হন। শায়খুল হাদীস রহ. তাঁর শায়খ ও মুরশিদের মূল শক্তি হয়ে এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুধু এই আন্দোলনই নয়; বরং হজরত ফরিদপুরী রহ.-এর নেতৃত্বে যত আন্দোলন হয়েছে তিনি তাতে নিজ শায়খের মুখপাত্র হিসেবে বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়। তখন এদেশে ইসলামকে সমুন্নত রাখতে এবং ইসলাম-বিরোধী সকল আক্রমণ প্রতিহত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম ও আন্দোলনগুলোতে শায়খুল হাদীস রহ. বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এ কারণে তিনি দেশ ও জাতির মহান নেতা ও সিপাহসালারের মর্যাদা লাভ করেন। বাংলাদেশে ওলামায়ে কেরামের প্রথম রাজনৈতিক দল ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ’ গঠিত হলে তিনি এর সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮১ সালে তাঁর শায়খ হজরত মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রহ. যখন ‘তাহরীকে খেলাফত বাংলাদেশ’ নামে দল গঠন করলেন তখনও শায়খুল হাদীস রহ. ছিলেন হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর ডানহাত ও মুখপাত্র। সেসময় তিনি স্বপদে থেকে বিরাট অবদান রাখেন।

১৯৮২ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে এবং দুই দেশের মাঝে সমঝোতা করার উদ্দেশ্যে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এক ঐতিহাসিক সফরে ইরাক ও ইরান যান। এ সফরে তিনি সাদ্দাম হোসেন ও আয়াতুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে সাক্ষাত করে যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং সমঝোতার চেষ্টা করেন। এই সফরেও হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর মুখপাত্র হিসেবে শায়খুল হাদীস রহ. গুরুত্বপূর্ণ খেদমত আঞ্জাম দেন।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর হিন্দুস্তানে মুসলমানরা এক চরম বিপদের শিকার হন। সেখানকার উগ্র হিন্দুরা অত্যন্ত নির্মমভাবে ৪শ বছরের পুরানো ‘বাবরী মসজিদ’ শহিদ করে দেয়। এর সাথে মুসলমানদের ওপরও শুরু হয় গণহত্যা। এই ঘটনায় মুসলমানদের অবস্থা কী হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সারা বিশ্বের মুসলমান এর তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং এই জুলুম ও বর্বরতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে বাংলাদেশে শাইখুল হাদিস আজিজুল হক ও মুফতি ফজলুল হক আমীনীর নেতৃত্বে বিশাল আন্দোলন গড়ে উঠে।  ওলামা-তলাবা, সাধারণ মুসলমান, বৃদ্ধ-যুবক-সব ধরনের মানুষই এতে ছিলেন। লাখো মুসলিমের এই মিছিল খুলনা পৌঁছার পর সীমান্ত অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছামাত্র তাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে দুজন শহিদ হন। বিশ্বমিডিয়ায় এই ঐতিহাসিক লংমার্চের খবর প্রচার করা হয়। ইসলামি বিশ্বে তাঁর এই কীর্তি অভিনন্দিত হয়।

এ ছাড়া চারদলীয় ঐক্যজোটে অংশগ্রহণ ও ফতোয়া বিরোধী রায়ের বিরোধী আন্দোলনেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। অবশ্য শেষ জীবনে আওয়ামীলীগে যোগ দেবার কারণে ধর্মীয় মহলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

ইন্তেকাল

শত আন্দোলন ও দায়-দায়িত্বের ভেতর দিয়ে এক সময় ধীরে ধীরে তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েন। অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। আল্লাহর নাম আর মদিনার রুজা পাকের জিকির ছাড়া সবকিছুই ভুলে যান। দীর্ঘদিন এই অবস্থায় কাটাতে হয়৷ অবশেষে ১৯ রমজান ১৪৩৩ হিজরি, মোতাবেক ৮ আগস্ট ২০১২ বুধবার প্রায় ৯৫ বছর বয়সে শায়খুল হাদীস রহ. আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

২০ রমজান ১৪৩৩ হিজরি, মোতাবেক ৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে শায়খুল হাদীস রাহ.-এর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শায়খের ছেলে মাওলানা মাহফুজুল হক নামাজের ইমামতি করেন।

জানাজাশেষে রাজধানীর কেরাণীগঞ্জের আটিবাজার সংলগ্ন ঘাটারচর পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।