ইউরোপকে আলো দেখিয়েছে কর্ডোভার যে জামে মসজিদ

শামীম আনোয়ার:

ঐতিহাসিক ড্রেপার বলেন, ‘অষ্টম শতাব্দীতে যখন কর্ডোভার রাস্তায় বাতি জ্বলতো তার ৭০০ বছর পরেও লন্ডনে কোনো সরকারি বাতি ছিল না।’ (History of The Intellectual Development of Europe, VOL 2,London, 1910,P -230_31)

৭১১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদ এর শাসনামলে সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে মুসলমানরা স্পেন জয় করে। সেই সময় কর্ডোভার সেন্ট ভিনসেণ্ট গীর্জার অর্ধেক অংশে একটি মসজিদ স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ এ আব্দুর রহমান আদ দাখিল স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন।তিনি কর্ডোভা জয় করে সেখানে তার রাজধানী স্থাপন করেন।

এই সময় মসজিদে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তিনি গীর্জার অংশ ১ লাখ দিনারে ক্র‍য় করে একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণ এর কাজ শুরু করেন। ৭৮৬ সালে মসজিদের কাজ শেষ হয়। নির্মাণ কাজে ৮০ হাজার দিনার ব্যয় করা হয়। সময় লেগেছিল ১ বছর। পরবর্তীতে অন্যান্য আমিরদের সময়ে এই মসজিদের নানা রকম সংস্কার ও সম্প্রসারণ ঘটে।

৯২৯ সালে স্পেনে উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন খলিফা ৩য় আব্দুর রহমান। এই সময়ে মুসলিম জাহানে ৩ জন খলিফার অস্তিত্ব ছিল। আব্বাসীয়, ফাতেমীয় ও স্পেনের উমাইয়া খলিফা। স্পেনের উমাইয়া খিলাফত ১০৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল। উমাইয়া আমলে কর্ডোভা নগরী হয়ে উঠেছিল ইউরোপের বাতিঘর। মর্যাদার দিক থেকে এর অবস্থান ছিল বাগদাদ আর কনস্টান্টিনোপল এর পাশাপাশি। এই নগরীর মাঝে ছিল ৩৮০০ মসজিদ, ৮৪০০০ বিপনি, ৯০০ স্নানাগার। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে ছিল ৪ লাখ গ্রন্থ । এমনকি বিভিন্ন অঞ্চলের খ্রিস্টান শাসকদের চিকিৎসক এর দরকার হলে তারা কর্ডোভায় দূত প্রেরণ করত। এভাবেই এই নগরীর নাম হয়ে উঠে ‘Jewel of the World ‘।

মুসলিম আমলে স্পেনে খ্রিস্টান প্রজাদের সকল রকম অধিকার সংরক্ষণ করা হত। হোল বলেন, ‘খিলাফতের পতনের আগ পর্যন্ত নতুন গীর্জা নির্মাণ এর অনুমতি দেওয়া হয় এবং উপাসনার জন্য গীর্জার ঘন্টা বাজানোর উপর কোন নিষেধাজ্ঞা ছিল না।’ (Andalus:Spain under the Muslims,London, 1958) খ্রিস্টানদের রাজকার্যতেও নিয়োগ দেওয়া হত। তারা বিনা বাধায় সব ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারতো।

কিন্তু অপরপক্ষে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে ক্যাসেলের রাজা ৩য় ফার্ডিনান্ড ও রাণী ইসাবেলার নেতৃত্বে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের পরাজিত করে কর্ডোভা দখল করে নেয়।সেইসাথে সেখানে গীর্জা প্রতিষ্ঠা করে। তখন থেকে একে বলা হয় দা মস্ক ক্যাথেড্রাল অব কর্ডোভা। ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো এই মসজিদকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে সেখানে দর্শনার্থীরা টিকেট কেটে ঢুকতে পারেন। সেখানে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ। এভাবেই এক সময়ের বিখ্যাত মসজিদ আজ গীর্জায় পরিণত হয়েছে। ৫০০ বছরের পুরাতন মসজিদ এ থেমে গেছে আজানের সুর। মুসলমান শাসকদের উদারতার বদলে খ্রিস্টানরা এর চেয়ে ভালো কোন প্রতিদান দিতে পারেনি!

গ্রন্থসূত্র :
১.স্পেন ও উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস ,ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান।
২. মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রফেসর এস.এম. ইয়ামামউদ্দিন।
৩.History of the Arabs, P.K. Hitti
৪.The Moors in Spain,Lane Poole.
৫.আরব স্থাপত্য, এ বি এম হোসেন
৬.মমসজিদের ইতিহাস, ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত ৮১৩, মৃত্যু ১৬
পরবর্তি সংবাদ‘ভোট কারচুপি করলে আমার যেন মৃত্যু হয়’