ইজরাইলকে স্বীকৃতি নয়: সরকারকে অনড় থাকার আহ্বান ইসলামি দলগুলোর

রাকিবুল হাসান:

সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়েকদিন আগে ইজরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে এবং আগামী মঙ্গলবার তাদের একটি চুক্তি করার কথা রয়েছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ইজরাইলের সাথে গোপন সম্পর্ক নিয়ে এগুচ্ছে। জর্ডান এবং মিশরের সাথে আগে থেকেই সম্পর্ক রয়েছে। সুদানসহ মুসলিম কয়েকটি দেশ ইজরাইলের সাথে সম্পর্ক করার কথা বলেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান ছাড়া অন্য দেশগুলো ইজরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্পর্ক করেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে ইজরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও দৃশ্যমান। ইজরাইল থেকে ভারতীয় এক সাংবাদিক হারিন্দার মিশ্র বলেছেন, ইজরাইল মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়াতেও নতুন সম্পর্ক তৈরীর চেষ্টা করছে। ইজরাইল বাংলাদেশের স্বীকৃতি পেলে গুরুত্বের সঙ্গে স্বাগত জানাবে।

স্বাধীনতার পর বিগত ৫০ বছরেও ইজরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক করেনি বাংলাদেশ। তবে ইজরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া এবং দেশটির সঙ্গে সর্ম্পোন্নয়নের পক্ষে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা শুরু করেছে কিছু মহল। কিন্তু ইজরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো। তারা বলছেন, ইজরাইলের মতো অবৈধ একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আলম ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘যে আরব দেশগুলো ইজরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক করছে, সেই দেশগুলোতে প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্র বা একক শাসন। জনগণ তাদের পক্ষে নেই। জনগণের মতামত উপেক্ষা করেই তারা ইজরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক করছে। তা করছে নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য। আরব দেশগুলো এখন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করে না। যতটুকু ইসলামি আইন জারি রাখলে জনগণকে মানানো যায়, ততটুকুই রাখছে।’

ইমতিয়াজ আলম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তাদের চেয়ে ভিন্ন। এ দেশ স্বাধীন; এখানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মতামত উপেক্ষা করা কখনো সম্ভব না। ইজরাইলের মতো অবৈধ একটি রাষ্ট্র, পুরো মুসলিম বিশ্বে যে ত্রাস সৃষ্টি করো বেড়াচ্ছে, ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে চলছে, তার সঙ্গে সম্পর্ক করা এ দেশের জনগণ কখনোই মেনে নিবে না। এই বিষয়ে সরকারকে আপোষহীন থাকতে হবে।’

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে এবং এশিয়ায় ইজরাইল হলো একটি বিষফোঁড়া। এটাকে সমর্থন দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইজরাইল জবরদখলকারী, রক্তখেকো, মানবতা-বিবর্জিত একটি জারজ রাষ্ট্র। জবরদখলকারী ইহুদি এই রাষ্ট্রটি অভিশাপ। এটাকে সমর্থন দেয়া মানে নিজের ওপর অভিশাপ টেনে আনা। অবৈধ একটি ইহুদি রাষ্ট্রকে ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ কখনোই সমর্থন দিতে পারে না। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি নাসিরুদ্দিন খান বলেন, সবাই জানে ইজরাইল একটি অবৈধ রাষ্ট্র। জোর করে বাড়ি দখলের মতো এরা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। বিশ্ব মোড়লদের উৎকোচ দিয়ে, উপঢৌকন দিয়ে নিজেদের সমর্থন আদায় করে নিচ্ছে। আরব বিশ্বগুলো এখন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করে না। সুতরাং এদের স্বীকৃতি মুসলমানদের স্বীকৃতি বলে গণ্য হবে না। বরং তাদের এই স্বীকৃতি প্রদান তাদের পদস্খলন বলেই বিবেচিত হবে।’

হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জমিয়তের এই নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশ ইজরাইলকে সমর্থন করার কোনো সুযোগ নেই। সরকারের কাছে জোরালো আবেদন—এ বিষয়ে যেন কোনো আপোষ না করা হয়। স্বীকৃতি দেয়াই যাবে না। দরকার হলে আমরা পথে নামবো, আন্দোলন করবো। সর্বশক্তি দিয়ে সবকিছু ঠেকাবো।’

১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইজরাইল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। তখন স্বাধীন বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার লিখিতভাবে ইজরাইলের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে। সেই অবস্থানের পিছনে মূল বিষয় ছিল ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সমর্থন। ৫০ বছর পরেও ইজরাইল প্রশ্নে বাংলাদেশের সেই অবস্থানে কোন পরিবর্তন আসেনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতি পেলে তা ইজরাইলের বৈধতার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মাত্রা যুক্ত হবে। কারণ বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ চতুর্থ বৃহত্তম দেশ। তাই ইজরাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়াতেও নতুন সম্পর্ক তৈরীর চেষ্টা শুরু করছে। ইজরাইল বাংলাদেশের স্বীকৃতি পেলে গুরুত্বের সঙ্গে স্বাগত জানাবে।

বিজ্ঞাপন