ইসলামি চেতনার ওপর শয়তানি মিশনের হামলা

মুফতী ফয়জুল্লাহ

মানব সৃষ্টি নিয়ে মহান আল্লাহর ঘোষণা হলো–‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।’ –(সুরা আয- যারিয়াত, আয়াত ৫৬)। অতএব প্রতিটি নরনারীর কর্তব্য হচ্ছে, মহান আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। ইবাদতের ক্ষেত্রে তারা পরিপূর্ণ একাত্ম হবে কুরআন-ঘোষিত এই নীতির সাথে–‘নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার বেঁচে থাকা ও আমার মৃত্যু মহান রাব্বুল আলামিনের জন্য।’

মুসলিম শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং একমাত্র আল্লাহর অধীনতা। মহান আল্লাহর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পালন ও নিজিকে বিলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় আধ্যাত্মিকতা। আর আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে বান্দা মহান আল্লাহর জন্য এবং তাঁর প্রেরিত দীনের হেফাজতের জন্য অর্থ, শ্রম ও মেধাসহ নিজের জীবনেরও নজরানা পেশ করে। নামাজ-রোজা, হজ-জাকাত, কুরআন তেলাওয়াত, দাঁড়ি, টুপি, হিজাব, টাখনুর ওপরে কাপড় পরিধান, হঠাৎ করে আল্লাহমুখী হওয়া এবং নীরবে ইবাদতে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদির ন্যায় প্রতিটি ইবাদতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য মুমিনের জীবনে রুহানি বা আধ্যাত্মিক বিপ্লব আনা।

ইবাদত আঘাত হানে অস্ত্রধারী শয়তানের মূল অস্ত্রগুলির ওপর। আল্লাহর বিধান ও আল্লাহর ইবাদাত আঘাত করে দুনিয়ার মোহ, মৃত্যুর ভয়, অশ্লীলতা, যৌনতার লিপ্সা, অতিকথন এবং কুৎসা ও গিবত রটনাসহ সকল পাপাচারের নেশার ওপর। মূলত শয়তান দ্বারা অধিকৃত মানুষ নামের হিংস্র প্রাণীগুলোর ভয় এখানেই।

অন্য দিকে শয়তানি চক্রের মূল এজেন্ডা হলো, মানব জাতির জন্য জান্নাতের পথে চলা, সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর অটল থাকাকে অসম্ভব করে তোলা। মানব সন্তান যাতে জান্নাতের পথে চলতে না পারে, সেটিই শয়তান ও তাঁর অনুসারীদের সর্বদেশে এবং সর্বসময়ের মূল লক্ষ্য। আর জান্নাতের পথ থেকে দূরে রাখার সহজতম উপায় হলো পৃথিবীর বুকে পরিপুর্ণভাবে ইসলাম-পালন অসম্ভব করা। সে লক্ষ্যটি পূরণ করতেই তারা ইসলামি ইবাদত এবং ইসলামের নিদর্শনাবলি ও নিয়ম-নীতির বিরোধিতা করে, করছে ও করবে।

বাংলাদেশি মুসলমানদের প্রতি ইসলামদ্রোহীদের আচরণটা উগ্র। ইসলামবিদ্বেষীরা অবলম্বন করেছে চরমপন্থা ও তাদের অপতৎপরতা জঘন্য উস্কানিমূলকও। অত্যান্ত নীচ, হীন ও আক্রমণাত্মক তাদের ভাষা। তারা মুসলমানের আকিদা-বিশ্বাসের ওপর নিষ্ঠুর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ দিন থেকে।

বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ইসলামি চেতনা, ইসলামের প্রতি মানুষের সীমাহীন দরদ ইসলামবিদ্বেষীদের দেহ-মন পুড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আল্লাহদ্রোহীরা ইসলামি চেতনাকে সবসময় নিজেদের নিরাত্তার জন্য হুমকি মনে করে। ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত মানুষগুলোকে যে দমন করা অসম্ভব, সেটি এই অপশক্তি খুব ভালো করেই বোঝে। তাই তারা রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করেছে দেশ থেকে ইসলাম ও ইসলামি ইবাদাত নির্মূলে।

পূর্ণ মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো শয়তানি চক্রের বিরুদ্ধে অনিবার্য লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়া। যেখানেই লাগাতার লড়াই, সেখানেই লাগাতার প্রশিক্ষণ জরুরি। মুসলিমজীবনে প্রশিক্ষণের পর্বটি তাই আমৃত্যু। নামাজ-রোজা-হজ-জাকাত, দাঁড়ি, টখনুর ওপরে কাপড় পরিধান ইত্যাদি ইবাদত তো মুসলিমজীবনে সে-প্রশিক্ষণেরই অংশ।

দীনি প্রশিক্ষণ অন্য জীবজন্তু বা কীটপতঙ্গের জীবনে প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু মানুষকে মানবিক পরিচয় পেতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দীর্ঘ স্তর অতিক্রম করতে হয়।

পাপুয়া নিউগিনি বা আন্দামানের দ্বীপে বহু মানব সন্তান আজও পশুর ন্যায় জঙ্গলের গুহায় উলঙ্গভাবে বাঁচে মূলতঃ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সে-প্রক্রিয়া পাড়ি না দেয়ার কারণে। অথচ অন্য মানুষদের থেকে দৈহিকভাবে তাদের মাঝে কোনো ভিন্নতা নেই। এমনকি যারা নিছক বাঁচার স্বার্থে বাঁচে তেমন মানুষরূপী বহু ভদ্রবেশী পশুও ইসলামি প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বোঝে না। এরাই ঘৃণা ও বিদ্বেষের অস্ত্র হাতে পেলে পশুর চেয়েও হিংস্রতর হয়ে ওঠে ইসলামের বিরুদ্ধে ।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, আমাদের আলেম-ওলামা অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে এবং অমুসলিমের সাথে মুসলিমের নিরাপদ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি এবং ইসলামের সম্পূর্ণ ইনসাফপূর্ণ ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়ে বলে আসছেন, লিখে আসছেন। আমরা মনে করি এই অনুশীলন অমুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিস্তার লাভ করা প্রয়োজন। কোনো অমুসলিমের মাধ্যমে ইসলাম অবমাননার কোনো ঘটনা ঘটলে ঐ ধর্মের ধর্মগুরু ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকেও এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত।

তথাকথিত ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ এবং এর প্রধান পীযূষ বন্দোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অমুসলিমদের পক্ষ থেকেও সোচ্চার প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। মসজিদে মসজিদে যদি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার আলোচনা কাম্য হয় তাহলে মন্দিরে মন্দিরে, গির্জায় গির্জায় মুসলিম জনগণের ধর্মানুভূতি এবং ধর্মীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের, মহান আল্লাহর ইবাদাতের মর্যাদা রক্ষার আলোচনাও কাম্য।

সবাই জানেন, ইসলামি শরিয়তের ইজ্জত রক্ষার দায়িত্ব আল্লাহর খলিফা রূপে প্রতিটি ঈমানদারের। সে মহামর্যাদাকর দায়িত্ব পালনে প্রকৃত মুমিন যে প্রয়োজনে সর্বস্ব বিলিয়ে দেবে সেটিই স্বাভাবিক।

আমরা মনে করি, এখনো সময় আছে, তথাকথিত ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ এবং এর প্রধান পীযূষ বন্দোপাধ্যায়রা উগ্রতা, চরমপন্থা, সন্ত্রাস ও উসকানিমূলক তৎপরতা পরিহার করবেন এবং অবিলম্বে তারা তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে মানুষের মনের ক্ষোভ, কষ্ট ও বেদনা লাঘবে সচেষ্ট হবেন। পাশাপাশি সরকার ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামক উগ্রবাদী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পীযূষ বন্দোপাধ্যায়দের গ্রেপ্তার করে তাদের শিকড় খুঁজে বের করবে।

যদি তা না করেন, তবে আল্লাহর খলিফাগণ আগামীতে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন। উম্মতের অস্তিত্ব রক্ষা ও নবচেতনায় ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে সুচিন্তিত পরিকল্পনার আওতায় গঠনমূলক এবং দেশ-জাতির জন্য কল্যাণমুখী কর্মসূচি নিয়ে তাঁরা এগিয়ে আসবেন।

কে কতটা মানুষ না অমানুষ, সভ্য না অসভ্য–সেটি পোষাক-পরিচ্ছদ বা চেহারা-সুরতে বোঝা যায় না, বোঝা যায় ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ থেকে। সে বিচারবোধ পাপাচারী ও আল্লাহদ্রোহীদের থাকে না। সে বিচারবোধটি না থাকার কারণেই আল্লাহ-নির্দেশিত ইবাদতের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ভয়ানক অপরাধও তাদের কাছে অপরাধ মনে হয় না। এটি হলো তাদের মনের অসুস্থতা ও অসভ্যতা। সভ্য সমাজে এজন্যই এসব অসুস্থ ও অসভ্য গুলো জাহেল রূপে চিহ্নিত হয়। এই জাহেলদের জবাব দেয়ার ভদ্র এবং সভ্য ভাষা ও সুন্দর করণীয় বিষয় আমাদের জানা আছে ।

লেখক : মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট ও যুগ্মমহাসচিব, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ