ইসলামি সভ্যতায় শিক্ষা সমাপ্তি ও সমাবর্তন

মুজাহিদুল ইসলাম : 

ভার্সিটির ক্যাম্পাস। লাল-নীল আলোকবাতির ঝলকানি; গাউন ও হ্যাড পরিহিত বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে শিক্ষাসমাপনের পরিচয়-বহনকারী হ্যাড-গাউনের দৃশ্য ইসলামি সমাবর্তনের বিকাশ যুগে ঠিক এভাবে দেখা যায়নি। এভাবে না দেখা যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

মুসলমানরা বিশেষ স্থান ও কালের প্রেক্ষিতে বিভিন্নভাবে সমাবর্তনের স্বতন্ত্র আনুষ্ঠানিকতা উদযাপন করেছেন। ঠিক কোথা থেকে ও কীভাবে মুসলমানদের সমাবর্তন আয়োজনের শুরু, কেমন ছিল ইসলামি যুগে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাসমাপন উপলক্ষে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাকদের আনন্দ-প্রকাশের অনুষ্ঠান, এই লেখায় আমরা সেটাই দেখানোর চেষ্টা করবো।

সমাবর্তনকে তারা যে শব্দে প্রকাশ করতেন

আজকের গ্রাজুয়েশন ও গ্রাজুয়েটকে সে যুগে বলা হত যথাক্রমে ‘হিযক’ ও ‘হাযিক’।  শিক্ষার্থীর দক্ষতা ও কর্মক্ষেত্রে তার উপযোগিতার স্বীকৃতি দিতে আয়োজন করা হতো এমন অনুষ্ঠান। মুসলিম ইতিহাসে কুরআন-হিফজকে ’হিযক’ শব্দ দ্বারা নির্দেশ করার পাশাপাশি হাদীস, ইসলামি আইন, ব্যাকরণ, চিকিৎসা, গণিত ও সংগীতসহ যেকোন বিষয়ে দক্ষতার স্বীকৃতি দিতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ইসলামি সভ্যতায় শিক্ষা সমাপনকারীদের সম্মানিত করার সূচনা মক্তবে কুরআনশিক্ষা সমাপ্তির মাধ্যমে শুরু হয়।

শিক্ষকদের বিশেষ সম্মানীপ্রদান

ইমাম আবু আবু হানিফা  রহ.এর সন্তান হাম্মাদ যখন কুরআন হিফজ সমাপ্ত করেন, সন্তানের শিক্ষককে আবু হানিফা  ৫০০ দেরহাম প্রদান করেন। বর্তমানে বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমাণ প্রায় এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা। (তারীখু বাগদাদ ১৫/৩৪৪,দারুল গারবিল ইসলামী) ) অবশ্য এর বিপরীত চিত্রও আছে; কুরআন পাঠদানের বিনিময়ে কোন কিছু গ্রহণ করাকে অনেক আলেম নিজেদের জন্য হারাম মনে করতেন।

ধনাট্য ব্যবসায়ী হিশামের পুত্রকে পাঠদান করতেন মুহাম্মাদ বিন সাঈদ আল কুফী আল উকদাহ। বিন সাঈদ কুফার বাজারে কাগজের ব্যবসা করতেন। শব্দতত্ত্ব ও সাহিত্য-শিক্ষাদানে বেশ সুনাম ছিল বিন সাঈদের। শিক্ষাসমাপ্তি উপলক্ষ্যে ব্যবসায়ী পিতা হিশাম প্রিয় পুত্রের শিক্ষকের হাতে দিনারের থলে তুলে দিলেন। তবে বিন সাঈদ আল কুফী সেটা ফিরিয়ে দিলেন। হিশাম ধারণা করলেন, শিক্ষক হয়তো একে সম্মানজনক মনে করেননি। তিনি আরো কিছু দিনারসহ থলেটি শিক্ষকের নিকট বিনয়ের সাথে তুলে দিলেন। কিন্তু শিক্ষক বললেন, কুরআন শিক্ষার বিনিময়ে পুরা দুনিয়া দিলেও আমি সেটাকে হালাল মনে করি না! (তারীখু বাগদাদ ৬/১৪৭,দারুল গারবিল ইসলামী)

বরং হাম্মাদ বিন সালামার বিষয়ে তার ছাত্র মুহাম্মাদ বিন হাজ্জাজ বলেন, আমাদের সাথে একজন শিক্ষার্থী হাদীস শুনতো। সে একবার চীন সফরে যায়। ফিরে আসার সময় শায়খের জন্য কিছু হাদিয়া নিয়ে আসে এবং তা শায়েখের সামনে পেশ করে। শায়েখ বললেন, আমি যদি এটা গ্রহণ করি, তাহলে তোমার কাছে আমি আর হাদীস বর্ণনা করবো না। আর যদি কিছু গ্রহণ না করি, তবে তোমার কাছে হাদিস বর্ণনা করবো। ছাত্র বলল, আপনাকে কিছু গ্রহণ করতে হবে না, আমার কাছে আপনি হাদীসই বর্ণনা করুন। (সিয়ারু আলামিন নূবালা ৭/৪৪৯, দারুল গারবিল ইসলামী)

সাধ্যানুসারে সন্তানের কুরআন পাঠের অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখতে দরিদ্র ব্যক্তিরাও মিষ্টান্ন দ্রব্য নিয়ে আসতেন।

ইতিহাসের প্রথম কুরআন-সমাপনী অনুষ্ঠান

কুরআন হিফজ সমাপ্তি বিষয়ক আনুষ্ঠানিকতার সূচনা বিষয়ে বায়হাকীর আস সুনানুল কুবরার একটি বর্ণনা উল্লেখ করা যেতে পারে। মক্তবের একটি ছেলে কুরআন হিফজ সম্পন্ন করে। আবু মাসউদ আনসারী রা. এক দিরহাম দিয়ে বাচ্চাদের জন্য আখরোট কিনেন। আখরোট ছিটিয়ে দিলে বাচ্চাদের ভেতর বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে, এই আশংকাতে নিজেই তাদের মধ্যে আখরোট বন্টন করে দেন। (বায়হাকী, আসসুনানুল কুবরা ৭/৪৬৮,দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)

সচ্ছল ব্যক্তিরা আবার বেশ জাঁকজমকের সাথে শিক্ষাসমাপ্তির আনুষ্ঠানিকতা উদযাপন করতেন। উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে সোনারুপার টুকরো ছিটিয়ে দেয়া হতো। কখনো উটনী জবাই করে একত্রে খাওয়াদাওয়াসহ আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন করা হতো।

হুমাইদ আত তাবীল (মুত্যু, ১৪২) বলেন, আমরা বড়দের দেখেছি, বাচ্চারা কুরআন শেষ করলে তারা উট জবাই করতেন। সবাইকে দাওয়াত দিয়ে একত্রে খাওয়া-দাওয়া হতো। (ইবনু তুলুন, ফাসসুল খাওয়াতীম ফিমা কিলা ফিল ওলায়িম ১/৯, মাকতাবাতুশ শামিলা)

ইতিহাসের জমকালো এক সমাবর্তন

ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে একাধিক কর্মপন্থা থাকা তো মুসলিম সংস্কৃতির অন্যতম দান। তার ধারাবাহিকতায় শিক্ষাসমাপনে কখনো খুবই সাদামাটা আবার কখনো খুবই জমকালো, কখনো তো শিক্ষকই শিক্ষার্থীর জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।

আহমাদ ইবনু হাম্বলের যুগ। খলিফা হলেন মুতাওয়াক্কিল। যুবরাজ মু’তাজ। অনুষ্ঠিত হবে যুবরাজের শিক্ষাসমাপনী অনুষ্ঠান। সামরা শহরের রাজকীয়  ‘হানা’ প্রাসাদ আম্বরের সুগন্ধিমিশ্রিত আলোকবাতিতে ঝলমল করছে। প্রাসাদের আলোয় দজলার পাড় আলোকিত। দজলা-নদীতে আলোর প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হচ্ছে। তিন দিন ধরে আসছে বিভিন্ন স্থান থেকে অতিথিদের কাফেলা।

প্রাসাদের সামনে বিশাল প্যান্ডেল। রাষ্ট্রীয় পদক্রম অনুসারে সবাই আসন গ্রহণ করছেন। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ও শ্লোগান হলো ‘যুবরাজ মু’তাজ’ এর শিক্ষাসমাপনীর সাক্ষী থাকুক সবাই’ ।

প্রাসাদের অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে যুবরাজ এগিয়ে আসছেন মঞ্চের দিকে। অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে সবাই অপেক্ষমান। অবশেষে মঞ্চে এলেন যুবরাজ এবং আমিরুল মুমিনীনকে সালাম দিয়ে শুরু করলেন তাঁর আলোচনা। আলোচনা শেষে শিক্ষক মুহাম্মাদ বিন ইমরানের হাতে রুপার তশতরীতে ৫০০০ দিনার (৮৩০০০০ডলার) তুলে দিলেন। উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ১ লক্ষ দিনার (১৬.৬মিলিয়িন ডলার) এর মূল্যের জওহর উপহার দেয়া হয়। (তারিখু দিমাশক ১৮/৩১৫, দারুল ফিকরি লিত তাবায়াতি ওয়ান নাশরি)

এভাবে অর্থ অপচয় করে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা নিয়ে সাওয়াল করার দায়িত্ব যারা নিতে চায় নিবে, তবে সেই যুগেও যে শিক্ষাসমাপনী অনুষ্ঠান ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, তা বলার জন্যই এ উদ্ধৃতি। রাষ্ট্র কিংবা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা জ্ঞানসাধনার জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ রাখতেন। নির্দিষ্ট বইপাঠে ও মুখস্থে দিতেন মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ।

কৃতি শিক্ষার্থীদের প্রণোদনা ও পুরুষ্কার প্রদান

কৃতি শিক্ষার্থীদের পুরুষ্কার প্রদানের কথা বলতে গেলে, প্রথমেই আসবে মুসলিম ইতিহাসের সেরা হাদীস সংরক্ষক আবু হুরাইরার কথা। তিনি এই পুরুষ্কার গ্রহণ করেছেন মহান শিক্ষক রাসূল সা. থেকে। রাসূল সা. তাঁর কৃতি শিক্ষার্থীকে পুরুস্কার দিয়েছেন উৎসাহ ও কাজের মাধ্যমে। (বুখারী)

অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ইমাম শাফেয়ী রহ. বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছিলেন। তারা প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতো। বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান তাদের খরচ বহন করত।  (ইমাম বায়হাকী, মানাকিবুশ শাফেয়ী৭৬, মাকতাবাতু দারুত তুরাস)

শাফেয়ী মাযহাবের ‘মুখতাসারুল মুযানী’ মুখস্থ করলে ১০০ দিনার (প্রায় ১৬৬০০ডলার) পুরুস্কার বরাদ্দ রাখতেন কাযী আবু যুরআহ।(মৃত্যু,৩০২)। (যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, ২৩/৭১, আল মাকতাবুত তাওফীকিয়্যাহ)। সুলতান মুআযযাম (মৃত,৬২৪) কর্তৃক ঘোষণা ছিল, যারাই ইমাম যামাখশারীর ‘মুফাসসাল’ মুখস্থ করবে, তাদেরকে তিনি ১০০ দিনার ও বিশেষ পোশাক উপহার দিবেন।(ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আয়ান ৩/৪৯৫, দারুস সাদর)

ফারেগীনদের বিশেষ পোষাক

আজকে গ্রাজুয়েটরা যেমন তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ পোশাক গ্রহণ ও পরিধান করে, ইসলামি ইতিহাসেও এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ইসলামি বিশ্বের বিশাল অংশজুড়ে এ ধরনের পোষাক পরিধানের বিশেষ প্রচলন ছিল। বরং তৎকালীন যুগে ইসলামী আইনজ্ঞদের জন্য নির্ধারিত পোশাকের বাহিরে অন্য পোষাক পরিধানকে খুবই নীচু দৃষ্টিতে দেখা হতো। (নিহায়াতুস সূল ১/২৬৮, দারুল কলাম)

ইসলামী আইনজ্ঞ ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশক পোষাকের প্রচলন করেন ইমাম আবু ইউসূফ রহ.। আলেপ্পোর আলিমদের বর্তমান পোশাক তারই সাক্ষ্য দেয়। এর পূর্বে আলিম ও অন্যদের মধ্যে পোষাকের তেমন ভিন্নতা ছিল না।(ইবনু খাল্লিকান, ওফায়াতুল আয়ান ৬/৩৭৯, দারুস সাদর)

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির অনুষ্ঠানে বিশেষ পোশাক প্রদানের রীতি আজও অনেক জায়গায় চালু আছে। যেখানে প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট দেওয়ার সময় বিশেষ পোশাক পরিয়ে দেন। আন্দালুসে শিক্ষা-সমাপনকারীদের ‘কালিজ’ নামক সন্মানসূচক বিশেষ টুপি পরিয়ে দেওয়া হতো।(নাফহুত তীব মিন গুসনিল আন্দালুসির রাতিব)

প্রাতিষ্ঠানিক উপাধি

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরকে প্রফেসর ও ডক্টর ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে থাকে। ইসলামি ইতিহাসেও একেক বিষয়ের ওপর শিক্ষা সমাপ্তকারীদের জন্য একেক রকম উপাধির প্রচলন ছিল। যেমন- হাদিসে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের জন্য স্তর ভেদে ‘মুসনিদ’ ‘হাফিজ’ ‘হাকিম’  উপাধি দেওয়া হত।(তাদরীবুর রাবী)

মুসলমানরা সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অবশ্যই উপকৃত হবে, তবে তারা যাতে তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির কথা ভুলে না যায়। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে, যার সাথে সমকালীন যুগের সংস্কৃতির বিশেষ মিল রয়েছে। অবশ্য শুধু মিল নয়, রয়েছে অনেক নিজস্ব উদ্যোগ ও বৈশিষ্ট্য।