ইসলামের উন্মেষকালে কবিতাচর্চা

আবদুল্লাহিল বাকি:

“শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম,
শুধু কবিতার জন্য কিছু খেলা,
শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধেবেলা
ভূবন পেরিয়ে আসা,
শুধু কবিতার জন্য
……
মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা,
শুধু কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।”
(সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শুধু কবিতার জন্য)

কবিতা ও জীবন— সেই আদিম কাল থেকে একসাথে চলে এসেছে হাতে হাত রেখে। যেখানে জীবনের হাতছানি, সেখানেই কবিতার উন্মীলন। জীবন যেন মানুষের আচরিত যাপিত গতানুগতিক ধারা। আর এই ধারাকে সদা চলমান গতিশীল রাখে জীবনেরই এককোণে ঠাঁই নেওয়া কবিতার রূপকথাময় জগত। জীবনের ব্যস্ততা জরাজীর্ণতা আর কষাঘাত কাটিয়ে মানুষ যখন বিশ্রাম করতে চেয়েছে অন্য কোনও জগতে, তখন সে পথ খুঁজে পেয়েছে কবিতার।

কবিতা হল উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের সাহায্যে প্রকাশিত মনের অনুভব-উপলব্ধি, আবেগ ও সূক্ষ্ম কল্পনা। কবিতার জগত এতটাই বিস্তৃত যে, এর কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এর চরিত্র ধরা পড়ে কয়েকজন কাব্য সমালোচকের ব্যাখ্যায়। কবি এডগার এলান বলেছেন, ‘কবিতা হলো সৌন্দর্যের ছন্দময় সৃষ্টি।’ কবি এলিয়ট বলেছেন, ‘কবিতা রচনা হলো রক্তকে কালিতে রূপান্তর করার যন্ত্রণা।’ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছেন, ‘কবিতা সব জ্ঞানের শ্বাস-প্রশ্বাস আর সূক্ষ্ম আত্মা।’ কবি কার্লাইল বলেছেন, ‘কবিতা হলো মিউজিক্যাল থট।’

ইসলাম যেহেতু নিছক আধারনাসর্বস্ব কোনও ধর্ম নয়, বরং একটি সামগ্রিক ও প্রয়োগকেন্দ্রিক জীবনবোধ— তাই কবিতা নিয়ে ইসলামেরও রয়েছে নিজস্ব প্রস্তাবনা। ইসলামের কাব্যদর্শন শিল্পের জন্য শিল্প নয়, বরং জীবনবোধ ও আদর্শের জন্য শিল্প। সে হিসেবে কবিতার সংজ্ঞায় কবি জনসন যা বলেছেন, তার সাথে ইসলামের কাব্যদর্শনের কিছুটা মিল আছে। তিনি বলেছেন, ‘কবিতা হলো মেট্রিক্যাল কম্পোজিশন। আনন্দ ও সত্যকে মেলানোর শিল্প, যেখানে রিজনকে সাহায্য করার জন্যে ইমাজিনেশনের ডাক পড়ে।’

বিশ্বাসবোধ ও পবিত্র যাপিত জীবনের অঙ্গীকার-কেন্দ্রিক কবিতার সাথে রূপকথাময় শিল্প-গোলকধারার যে বিভাজন— তার উচ্চারণ আমরা দেখতে পাই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে। সুরা শুআরায় (২২৪ – ২২৭ আয়াত) আছে, “বিভ্রান্তরাই কবিদের অনুসরণ করে, তুমি কি দেখ না, তারা বিভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? কিন্তু তারা ব্যতীত, যারা ঈমান আনে ও সৎকার্য করে এবং আল্লাহকে বার বার স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হবার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়?”

এই আয়াতে দুই ধরণের কবি ও কবিতার উল্লেখ রয়েছে। দুটি দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে এখানে। ১. শিল্পের জন্য শিল্প। ২. আদর্শ, বিশ্বাস ও জীবনবোধের জন্য শিল্প। প্রথম ধারাকে ইসলাম সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছে। আর দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে দিয়েছে সমর্থন।

প্রথম ধারার শিল্পসর্বস্ব কবিতার ক্ষেত্রে হাদীসে রয়েছে সুস্পষ্ট কটাক্ষপূর্ণ সমালোচনা। বলেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ‘কবিতা দিয়ে পেট ভর্তি করার চেয়ে পুঁজ দিয়ে পেট ভর্তি করা অনেক উত্তম।’ (বুখারী ৮/৪৫, দারুশ শা’ব)

অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্বাসবোধ সম্বলিত দ্বিতীয় ধারার কাব্যচর্চা সম্পর্কে বলেছেন, ‘কবিতায় রয়েছে প্রজ্ঞা।’ (বুখারী ৮/৪২)

এভাবেই কুরআন ও হাদীসে কাব্যচর্চা সম্পর্কে আমরা মুখোমুখি হই ইসলামের নিজস্ব ডিসকোর্সের। একে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে মুসলিম কবিদের জীবন ও কবিতা।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির সময় মক্কায় বেশ কয়েকজন কবি ছিলেন। মদিনায় হিজরতের পর মক্কার কবিরা নিজেদের কবিতাকে বানিয়ে নিল ইসলামের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের অস্ত্র। এদিকে মুসলিম কবিরাও মদিনায় নিস্তব্ধ থাকেননি। তারাও ইসলামের পক্ষ হয়ে তাদের কবিতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিলেন। এই ধারার মুসলিম কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাসসান বিন সাবিত, কাব বিন মালিক, আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা প্রমুখ। আর মক্কায় কাফেরদের পক্ষে কবিতা লিখছিল তখন আবদুল্লাহ বিন যাবা’রী, যিরার বিন খাত্তাব, আবু সুফিয়ান বিন হারিস প্রমুখ। মক্কা-মদিনার অধিবাসী না— এমন কয়েকজন বহিরাগত মুসলিম কবির দেখা আমরা পাই ইসলামের শুরুর যুগে, যদিও তাদের সংখ্যা নগণ্য। যেমন, লাবীদ বিন রাবীয়াহ আল-আমেরী, কাব বিন যুহাইর প্রমুখ।

ইসলামের উন্মেষকালে কবিতার বিষয়বস্তু

এই যুগে যেসব বিষয়ে আরবি কবিতা রচিত হয়েছে মুসলিম কবিদের হাতে, তা ঐতিহ্যবাহী আরবি কবিতার ধারায়ই বহমান ছিল। তবে বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে পূর্বের বিষয়গুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে কেবল ইসলামী বিজয়ের প্রতি আবেগ ও দাওয়াতী আঙ্গিক।

বিষয়বস্তু ঐতিহ্যবাহী আরবি কবিতার ধারায় বহমান থাকলেও, মর্মগত দিক থেকে জাহেলী যুগের কবিতা থেকে ইসলামী কবিতার ছিল যোজন যোজন ফারাক। কবিতার বিষয়বস্তুগুলোর বর্ণনা তুলে ধরলেই এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে অনেকটা। তখন কবিতার বিষয়বস্তু ছিল:-

১. মাদহ বা প্রশংসাগাঁথা: ইসলামী যুগের সূচনাকালে প্রশংসাগাঁথামূলক কবিতার প্রতিপাদ্য ছিল ইসলাম ধর্ম ও ইসলামের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আর জাহেলী যুগে কবিগণ প্রশংসাগাঁথা লিখত সাধারণত ধন-সম্পদ, বিত্তশীল বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নামে। কিন্তু ইসলাম আগমণের পর, কবিদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, সকল প্রকার ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাদ দিয়ে কেবলমাত্র ইসলামকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। এক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হল আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার এই কবিতা:

‘হে বনু হাশিম বংশের গৌরব, এই সারা জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন আপনাকে আল্লাহ, কালের বিবর্তনেও এর কোনও পরিবর্তন হবে না।
আমার দৃষ্টির মহিমা আপনাতে যে কল্যান দেখেছে, তা দেখেনি, অন্য কারও মাঝে।
আপনার এই মহান কাজের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি কুরাইশ।
ফলে আল্লাহ আপনাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন মূসার মতই। করেছেন অন্যান্য নবীদের মত সহযোগিতা।’
(তাবাকাতু ফুহুলিশ শুআরা, ১/২২৬)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রশংসাগাঁথা নিয়ে রচিত সুন্দর একটা কবিতা হল কাব বিন যুহাইরের ‘বানাত সুআদ’ (প্রেমাস্পদ সুআদের বিরহ-বেদনা); এই কবিতাটি তিনি আল্লাহর রাসূলের সামনে আবৃত্তি করেছিলেন। এখানের একটা অংশ ছিল:

‘খোদার নবী নুরের রবি জগৎ লভে জ্যোতি তাহার,
খোদার অসিগুলোর তিনি অসি যে এক তীক্ষ্ম দ্বিধার।’

(অনুবাদ: কবি রুহুল আমীন খান, দৈনিক ইনকিলাব, ৭ জুলাই, ১৯৯৮)

কবি নাবেগা জা’দী রাসূলের প্রশংসায় লিখেছেন:

‘আমি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছি, যখন তিনি ধরায় আগমন করেছেন পথবর্তিকা নিয়ে,
তিনি ঐশিগ্রন্থ পাঠ করে শুনিয়েছেন, আন্তঃনাক্ষত্রিক জ্বলন্ত ছায়াপথের মত।’

(আল-আগানী ৫/৯)

এই ধারার প্রশংসাগাঁথার মধ্যে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, তারা নবীর প্রশংসায় নিছক সাহসিকতা, বদান্যতার কথা আনতেন না; যেমনটা জাহেলী যুগের কবিতায় প্রচলিত ছিল। বরং তাদের প্রশংসাগাঁথায় নবীর সাথে উৎপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর কথাই জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন, কুরআন, পথপ্রদর্শন, নূরের অবতরণ ইত্যাদি। সাথে সাহসিকতা, বদান্যতার মত গুণগুলোর উল্লেখও ছিল বটে, কিন্তু তা গৌণ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রয়াণের পর প্রশংসাগাঁথামূলক কবিতার ধারা গৌণ হয়ে আসে। তাই দেখা যায়, খোলাফায়ে রাশেদিনকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনও প্রশংসাগাঁথা রচিত হয়নি।

২. হিজা বা ব্যাঙ্গ-কবিতা: মদিনায় হিজরতের পর এই ধারার কবিতার চর্চা শুরু হয় ব্যাপকভাবে। মক্কার কুরাইশপন্থী কবিরা একদিকে, অন্যদিকে মদিনার ইসলামপন্থী কবিগণ।

মদিনার মুসলিম কবিদের ব্যাঙ্গ-কবিতার প্রতিপাদ্য ছিল বিভিন্ন ধরণের। কখনও কবি ব্যাঙ্গ করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক চিরচেনা বিষয়গুলোর অবতারণা করতেন। যেমন, যুদ্ধের ময়দান থেকে প্রতিপক্ষের পিছু হটে যাওয়া, দুর্বলতা, ভীতি, কার্পণ্য ইত্যাদি। কখনও আবার নতুন বিষয় টেনে আনতেন ব্যাঙ্গ করার ক্ষেত্রে। যেমন, কুফর-শিরকসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিষয়ে আক্রমণ করা। হাসসান বিন সাবিতের ব্যাঙ্গ-কবিতায় সাধারণত ব্যবহৃত হত ঐতিহ্যবাহী বিষয়বস্তু, যেই ব্যাঙ্গ-ধারার সাথে গভীর পরিচয় ছিল কুরাইশদের। তাই তার কবিতাগুলোর আঘাতও ছিল মারাত্মক।

মক্কা বিজয়ের পর ব্যাঙ্গ-কবিতার জোয়ারে ভাটা পড়ে। তখন ব্যাঙ্গ করার মত মুখোমুখি কোনও ধর্মীয় প্রতিপক্ষ ছিল না। তাছাড়া পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে, মানুষের ইজ্জত ও মর্যাদার সাথে সম্পর্কিত আক্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সে হিসেবে ব্যাঙ্গ-কবিতার ধারা আর বাকি থাকেনি।

৩. হামাসা বা বীরত্বগাঁথা: ইসলামী ইতিহাসের সূচনা থেকেই বীরত্বগাঁথা কবিতা দাওয়াতী মনোভাবের হাতে হাত রেখে চলেছে। এই ধারার কবিতা মুসলিম যোদ্ধাদের বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণা ও মানসিক শক্তি জোগায়। এই কবিতা তুলে ধরে মুসলিমদের বিজয়ের আখ্যান। এই ধারার কবিতায় আমরা প্রথমযুগে দেখতে পাই কাব বিন মালিককে। আল্লাহর রাসূলের অধিকাংশ যুদ্ধের ক্ষেত্রেই তার রচিত কবিতা বিদ্যমান। উহুদ যুদ্ধের করুণ পরিণতি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন:

আমরা আছড়ে পড়েছি উত্তাল তরঙ্গের ধারায় এক মহাসমুদ্রের মাঝে, যেখানে চারিদিক ঘিরে ব্যূহরচনা করেছে শত্রুর সকল মিত্রদল। তাদের কেউ অস্ত্র-বর্মে সজ্জিত, কেউ বা আবার অস্ত্রহীন।
সৈন্য-সংখ্যা তাদের তিনহাজার। আর আমরা এর তুলনায় নগণ্য। আমরা ছয়শত মাত্র, অথবা এরচেয়ে কিছুটা বেশি।
তারা এগিয়ে এল হাসতে হাসতে, দ্রুতগামী অশ্বের মত। যেন তারা বৃষ্টিহীন অনাদ্র মেঘ। বাতাস শুষে নিয়ে গেছে যার জল।
আমরা এগিয়ে গেলাম। কিন্তু… শত্রুদল আমাদেরকে পিষ্ট করে চলে গেল, শীতের প্রকোপে ঝরে পড়া খড় লতা পাতার মত।’

মু’তা যুদ্ধের দিনে একে একে সেনাপতিদ্বয় যায়েদ বিন হারেসা ও জাফর বিন আবী তালিব শহীদ হয়ে গেলেন। নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা। যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি আবৃত্তি করেছিলেন:

‘শপথ হে আত্মসত্তা, যদি তুমি যুদ্ধের উত্তপ্ত আগুনে নিজেকে সঁপে না দাও, তাহলে পরবর্তীতে তোমাকে ঘৃণা করা হবে।
কত দীর্ঘ কাল তুমি নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করেছ। এখন কেন জান্নাতের শামিয়ানায় আশ্রয় নিতে ভয় পাচ্ছ…’

৪. রিছা বা শোকগাঁথা: ইসলামের প্রথম যুগে কবিতার ধারায় শোকগাঁথা কবিতাও গড়ে উঠেছিল বেশ। লাগাতার যুদ্ধ, একের পর এক বিপদ, শঙ্কা ও ফিতনাহ মুসলমানদের জীবনে চলে এসেছিল রাসূলের বিদ্যমানতায় ও এর পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে। মানুষের জীবনের সাথেও মিশে গিয়েছিল সামগ্রিক বেদনাগুলো। সেখান থেকে জন্ম নিয়েছে শোকগাঁথা কবিতা। হাসসান বিন সাবিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শোকগাঁথায় বলেছেন:

‘মদিনায় রয়েছে রাসূলের উজ্জ্বল স্মৃতিস্তম্ভ রওযা শরীফ। একদিন হয়ত এই স্তম্ভ হারিয়ে যাবে কালের বিবর্তনে।
তবে কখনও হারিয়ে যাবে না সেই স্মৃতিগুলো— হারামের মসজিদ থেকে। যেখানে এখনও দাঁড়িয়ে আছে পথপ্রদর্শনকারী প্রেরিত পুরুষের মিম্বার।’

এটা নবীজির প্রয়াণের পর তার স্মৃতির শোকে লেখা দীর্ঘ একটা কবিতা। তার লিখিত আরেকটা কবিতা আছে, শুরুটা নিজেকে সম্বোধন করে:

‘তোমার চোখের কী হল.. সে কতদিন ঘুমায়নি..
যেন কোটরে মেখে গেছে সমিদ্ধ কয়লার গুঁড়ো গুঁড়ো সুরমা।’

এই কবিতার একস্থানে তিনি লিখেছেন:

‘প্রতিপালক, আমাদেরকে আপনার প্রেরিত পুরুষের সাথে একত্র করুন সেই অনন্তের আলয়ে— যার উজ্জ্বলতায় ঢেকে গেছে হিংসুকদের চোখ।
মহান আল্লাহ, তার আরশের বহনকারী ফেরেশতা ও পুণ্যবান লোকেরা— করুণার দরুদ পাঠ করে পবিত্র আহমাদের নামে।’

আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা লিখেছেন হামযা বিন আবদিল মুত্তালিবের নামে শোকগাঁথা:

‘আমার চোখ অশ্রুতে প্লাবিত। আর তা তো হবেই। যিনি ছিলেন আল্লাহর বাঘ, তার বিরহে শত কান্না আর মর্সিয়াও অতি নগণ্য।
গতকালও মানুষ অবাক হয়ে বলত, এই হামযাই কি সেই মহান বীরসেনানী…
চিরন্তন উদ্যানে তোমার প্রতি আল্লাহর করুণা ও শান্তি বর্ষিত হোক, যেখানে কোনও সুখই আর ফুরোবে না।’

খোলাফায়ে রাশেদিনকে নিয়েও বেশ কিছু শোকগাঁথা কবিতা রচিত হয়েছে। আবু বকর রাযি. সম্পর্কে হাসসান বিন সাবেত বলেছেন:

‘তুমি যদি বেদনার দগদগে স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চাও, তাহলে স্মরণ করো আবু বকর ও তার অবদানের কথা।
তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূলের সবচে’ প্রিয় ব্যক্তি। যার সমপর্যায়ে নেই দুনিয়ার অন্য কোনও মানুষ।’

জায বিন যিরার যাবইয়ানী শোকগাঁথা রচনা করেছেন দ্বিতীয় খলিফা উমর রাযি.-এর নামে। সেখানে তিনি বলেছেন:

‘আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন আমিরুল মুমিনীনকে। বরকত দিন তার ছিন্ন দেহে।
জীবনের মরুসাহারায় পদবিক্ষেপে তুমি যতদূর এগিয়ে গেছ (হে আমিরুল মুমিনীন), তোমাকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারবে না কবুতরের দ্রুতগামী পাখনায় উড়াল দিয়েও।
তুমি শান্তির সমীরণ ছড়িয়ে দিয়েছ দিকে দিকে। তোমার মৃত্যুর উদর থেকেই জন্ম নিল পরবর্তীতে অশান্তির ফেতনা আর গোলযোগের আগুন, যা আর কখনওই নিভেনি।’

(তাবাকাতু ফুহুলিশ শুআরা, ১/১৩৩)

উসমান বিন আফফান রা.-এর শোকগাঁথায় আইমান বিন খারিম বিন ফাতিক আল-আসদী লিখেছেন:

‘তারা উসমানের রক্ত ঝরিয়েছে পবিত্র মাসে। তাদের হাত কেঁপে উঠেনি একটিবারের জন্যও।
এই পবিত্র রক্তের বন্যায় তারা যে ফায়দা লুটে নিতে চেয়েছিল, আল্লাহ তা ধ্বংস করে দিন।
যারা তার হত্যার সাথে জড়িত, তারা ঘৃণ্য পাপী, ধ্বংস। তারা নিজেদের কর্মফল ভোগ করবে একদিন। লাভবান হতে পারবে না তারা কখনোই।’

(আল-কামিল, ২/ ৭৩৮)

আলী রাযি.-কে নিয়ে প্রচুর মর্সিয়া কবিতা রচিত হয়েছে। সেখান থেকে এখানে তুলে ধরছি আবুল আসওয়াদ দুআলীর একটি কবিতার অংশ:

‘রমজানের মৌসুমেই তোমরা কষ্ট দিয়েছ আমাদেরকে,
হত্যা করেছ আমাদের মাঝে বেঁচে থাকা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে।
কুরাইশ যেখানেই গিয়েছে, যে উপত্যকায়ই আশ্রয় নিয়েছে, শুনতে পেয়েছে শুধুই তোমার গুণগান, (হে আলী)।’

(আল-আগানী, ১২/৩২৯)

ইসলামের উন্মেষকালে শোকগাঁথা কবিতার দিকে লক্ষ্য করলে আমরা বুঝতে পারি, তাদের শোকগাঁথায় প্রাচীন প্রতিপাদ্যের সাথে এসে যুক্ত হয়েছিল আধুনিক অনুষঙ্গ। প্রাচীন প্রতিপাদ্য ছিল সাহসিকতা, অবদানের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তির স্মরণ। আর নতুন ছিল মৃত ব্যক্তির জন্য ঐশি রহমত-করুণা, জান্নাতে প্রবেশের আকুতি, নবীজির নৈকট্য লাভ, ইসলামের প্রসারে তার অবদান ইত্যাদি বর্ণনা করা। মর্সিয়াকৃত ব্যক্তি যদি নিহত বা শহিদ হন, তাহলে শোকগাঁথার মধ্যে খুনির কদর্যতা, নিকৃষ্টতা, নীচুতা ফুটিয়ে তোলা হত।

৫. বিজয়-সংগ্রাম ও দাওয়াতকেন্দ্রিক কাব্য: ইসলামের অন্যতম একটি অবিছেদ্য অনুসঙ্গ হল, অন্যান্য মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা ও দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন স্থানে এর প্রতি বিশেষ তাগাদা দেখতে পাই। তাদের জীবনে যতটুকু উপকরণ ছিল, তা দিয়েই তারা অনবরত দাওয়াত ও সংগ্রামের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। মুসলিম কবিদের জীবনে দাওয়াতের অন্যতম উপকরণ ছিল তাদের কাব্যপ্রতিভা। তারা এই উপকরণ দিয়েও দাওয়াতের কাজ করেছেন। যেমনটা আমরা দেখতে পাই হাসসান বিন সাবেত, কাব বিন মালেক, আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা প্রমুখের কাব্যভাণ্ডারে। তখন তাদের কবিতাই ছিল ইসলামের দাওয়াত প্রসারের একটি মাধ্যম।

বুজাইর বিন আবী সুলমার কবিতা তার ভাই কাবের উপর বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। কাব তখনও ছিল কাফের। কিন্তু বুজাইরের কবিতার প্রভাবে মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বুজাইর তার ভাই কাবের কাছে যে কবিতাখানা পাঠিয়েছিলেন, তার কিছু অংশ এমন:

‘লাত উজ্জা নয়, মুক্তি বলে যদি কোনও কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটা আল্লাহর পথেই…
আমাদের চোখের সামনে অপেক্ষমান এমন একটি দিন, যেদিন পবিত্র অন্তরের আত্মসমর্পনকারী মুসলিম ছাড়া আর কেউই মুক্তি পাবে না।
যুহাইরের ধর্ম নিষ্ফল মরিচিকা। আর আবু সুলমার ধর্ম আমাদের জন্য নিষিদ্ধ।’

এই কবিতার পরই ইসলাম গ্রহণ করেন তার ভাই কাব। এরপর তিনি নিজেই একটা কবিতা রচনা করেন ‘বানাত সুআদ’ নামে। যেখানে তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সঙ্গী-সাথীদের প্রশংসা করেছেন।

সাহাবীদের জীবন ছিল সংগ্রামময়, সদা বিপ্লবের মুখোমুখি। এক যুদ্ধের ময়দান থেকে তাদেরকে ছুটে যেতে হয়েছে অন্য ময়দানে। সেই অন্তহীন ছুটে চলার পথে তাদেরকে ত্যাগ করতে হয়েছে সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী, বাবা-মা আর প্রিয় স্বজনদের মায়া। জীবনে সয়ে নিতে হয়েছে সকল ধরণের বিরহ-বেদনা। জীবনের কষাঘাতে তাদের হৃদয়ের স্বতঃস্ফুর্ত নির্ঝর থেকে ঝরে পড়েছে আবেগাপ্লুত কবিতা।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের অন্যতম কবি নাবেগা জাদী। তিনি একবার বেরিয়ে পড়ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। বাঁধ সাধলেন প্রাণপ্রিয় স্ত্রী। কিন্তু তার কি সাধ্য আছে— ইসলামের সংকটময় মুহূর্তে স্বজনপ্রিয়তার বশবর্তী হয়ে জীবন ও সংগ্রামের ময়দান থেকে পিছিয়ে পড়ার। তিনি হৃদয়াবেগ সংবরণ করতে পারেননি। আবৃত্তি করেছিলেন স্বরচিত কবিতা:

‘শপথ প্রভুর, প্রতিটি নিঃসঙ্গ দীর্ঘ রজনীতে তোমার স্মৃতিগুলো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু হয়ে ঝরতে থাকবে।
হে প্রেয়সী আমার, আল্লাহর অবতীর্ণ গ্রন্থই আমাকে জীবনের পথে নামিয়ে দিয়েছে। আমি কিভাবে তাকে অমান্য করি…
আমি যদি আবার প্রত্যাবর্তন করি, তাহলে প্রভুর দয়ার মাধ্যমেই…
আর যদি কখনও ফিরে না আসি, তাহলে তুমি আমার পরিবর্তে খুঁজে নিও অন্য কোনও জীবনসঙ্গী।’

(আশ-শি’রু ওয়াশ শুআরা, ১/২৯৩)

ইরাক, প্রাচ্যদেশ, শাম, মিসর, মরক্কোসহ মুসলমানগণ যুদ্ধ-অভিযান পরিচালনা করেছেন, তাদের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হিসেবে ছিল কবিতা। তাই আমরা প্রথম যুগের প্রতিটি অভিযানের ক্ষেত্রেই একাধিক কবির কবিতা দেখতে পাই। সেসব কবিতায় ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ময়দানের কষ্ট, ধৈর্য, অবিচলতা, সৈন্যদের সাহসিকতা, যুদ্ধের বর্ণনা, বিজয়ের আনন্দ ইত্যাদি। কাদেসিয়ার ময়দান নিয়ে বিশর বিন রাবীয়াহ যে কবিতা রচনা করেছিলেন, তার কিছু অংশ হল:

‘আল্লাহ তোমাকে পথ প্রদর্শন করুন। মনে পড়ে কি সেই দিনের কথা, যখন আমাদের তরবারি আর অস্ত্রগুলো ঝনঝনিয়ে উঠেছিল কাদেসিয়ার দুর্ভেদ্য প্রাচীর-ফটকের উপর
যুদ্ধবাজ বীর সেনানিরা পর্যন্ত মনে মনে বলছিল, হায়.. যদি পাখির মত আমাদের ডানা থাকত, আর উড়ে যেতাম প্রাচীরের ওপারে
একটা দলকে যখন আমরা পরাজিত করতাম, এগিয়ে যেতাম অন্য দলের দিকে— চলিঞ্চু পর্বতের মত।
মুসলিম বীরদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল সেদিন অবিচলতার গাম্ভীর্য। যেন তারা মরুতে দীর্ঘ পথ চলা বহনক্লান্ত উট।’

(আল-আগানী, ১৫/২৪৩)

যুদ্ধ-সংগ্রাম ও কবিতা— একসাথে একধারায় এগিয়ে চলেছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগে। এই সময় এমন কয়েকজন কবির জন্ম হয়েছে, যারা ‍যুদ্ধের উত্তাল পরিবেশ, তরবারির ঝনঝনানি, তীরের তীক্ষ্মতা থেকে তুলে এনেছেন কবিতার রূপ-রস-গন্ধ-অলংকার। যারা একাধারে ছিলেন বীরযোদ্ধা ও রূপকল্পময় কবি। এই ধারার কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কা’কা বিন আমর আত-তামীমী, আমর বিন মা’দ আয-যুবাইদী প্রমুখ। বিজয়-সংগ্রামের কবিতার বিষয়বস্তু খুঁজতে গেলে আমরা দেখি, এর প্রতিপাদ্য ছিল সাহসিকতা, বীরত্ব, শোকগাঁথা, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি।

ইসলামের উন্মেষকালে কবিতার বৈশিষ্ট্য

ইসলামের উন্মেষের পর যেসব কবিতা রচিত হয়েছে, সেগুলোর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যার মাধ্যমে এ যুগের কবিতা জাহেলী যুগের কবিতা থেকে স্বাতন্ত্র্য লাভ করেছে। এই স্বাতন্ত্র্য আমরা দেখতে পাই মূলত দুইভাবে, ক) মর্মগত, খ) আঙ্গিকগত।

ইসলামী যুগের সাথে জাহেলী যুগের কবিতার মর্মগত পার্থক্যগুলো হল,

১. মুসলিম কবিদের কবিতার মর্মগত কেন্দ্রিকতা ছিল ইসলাম নির্দেশিত জীবনবোধ ও বিশ্বাস। তাই তাদের কবিতার অনুচ্চারিত লক্ষ্য ছিল ইসলামের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ।

২. মুসলিম কবিদের বেশ কিছু কবিতা যতটা না নিজস্ব কল্পনার শস্য ছিল, তারচেয়ে বেশি ছিল কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন উক্তির দর্পিত দর্পন। হাসসান বিন সাবিত রাযি. সূরা তাওবার ১২৮ নং আয়াতের মর্ম নিয়েও কবিতা রচনা করেছিলেন। আয়াতটি হল, “তোমাদেরকে যা কিছু কষ্ট দেয় তা তার (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট খুবই কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মু’মিনদের প্রতি করুণাসিক্ত, বড়ই দয়ালু।”

এই আয়াতের মর্ম নিয়ে তিনি যে পংক্তি রচেছিলেন, তা হল:

‘মানুষের সরল পথ থেকে বিচ্যুতি তাকে পীড়া দেয়।
তাই তিনি মনে প্রাণে কামনা করেন, মানুষ সত্য ও সুন্দরের পথে অবিচল থাকুক ও পথের দিশা লাভ করুক।’

৩. ইসলামী যুগের কবিতা মর্মের খোঁজে কল্পনা ও রূপকথার অজানা উপত্যকা আর মরুপ্রান্তরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়নি। ইসলাম যে সীমারেখা টেনে দিয়েছে সত্য ও মিথ্যা, ভাল ও মন্দের মাঝে— তার মধ্য থেকেই তারা সংগ্রহ করেছেন মর্মের মণি মুক্তা।

৪. সামগ্রিকভাবে ইসলামী যুগের কবিতা কবিদের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রভুভীতি, পরহেজগারিতা ও সৎকর্মপরায়ণতার প্রতিনিধিত্ব করে।

এসব ক্ষেত্রে বিশেষ স্বাতন্ত্র্যের দরুণ ইসলামী কবিতা জাহেলী যুগের ধারাবাহিকতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। এসব ক্ষেত্রে পার্থক্যের মাধ্যমে মুসলিম কবিদের রচনা নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। আর সিদ্ধ বিষয়গুলো আগের মতই উপস্থিতির জানান দিয়েছে ইসলামের উন্মেষকালের কবিতায়। জাহেলী কবিতায় যেমন উপস্থিত ছিল প্রশংসাগাঁথা, ব্যঙ্গকবিতা, মর্সিয়া— তেমনিভাবে ইসলামী যুগেও সেগুলোর অস্তিত্ব আমরা দেখতে পাই, তবে তাতে ফুটে উঠেছে স্বাতন্ত্র্য।

এ তো গেল জাহেলী যুগের কবিতার সাথে ইসলামী যুগের কবিতার মর্মগত পার্থক্য। আঙ্গিকগত স্বাতন্ত্র্যের দিকে লক্ষ্য করলেও আমরা বেশ কিছু পার্থক্য দেখতে পাই। যেমন:

১. কুরআন ও হাদীসের নতুন ভাষাশৈলী ও উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রকরণ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে তখনকার মুসলিম কবিদের কবিতা।

২. আঙ্গিক ও শৈলীর ক্ষেত্রে রূঢ়তা ও রুক্ষতা থেকে সরে এসে কবিতায় কোমলতা ও ঋজুতা আনয়ণ করেছে মুসলিম কবিগণ। এক্ষেত্রে ইসলামী আবেগদীপ্ততার প্রভাবও কম ছিল না।

৩. শব্দ ও উপমা ব্যবহারে সহজবোধ্যতা ছিল, যাতে এর মর্মগুলো সাধারণ মানুষও উপলব্ধি করতে পারে, যাদের ভেতর কবিতার রসবোধ সীমিত।

৪. কবিতার ক্ষেত্রে নতুন নতুন শব্দ ব্যবহারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যেসব শব্দ গৃহিত হয়েছে কুরআন সুন্নাহর সাহিত্য থেকে। যেগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি ছিল না পূর্বের আরবি কবিতায়। যেমন, জান্নাত, জাহান্নাম, কুফফার, মুশরীকুন, ফাসিক ইত্যাদি। এবং এগুলোর ব্যবহার এমনভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যাতে কবিতার নন্দনতাত্ত্বিক কোনও ক্ষতি হয়নি, বরং উৎকর্ষ হয়েছে।

৫. কৃত্রিমতা, অনর্থক শব্দ ব্যবহারের মেদবহুলতা, কষ্টকল্পিত অন্ত্যমিল— মুসলিম কবিদের কবিতায় ছিল একেবারেই অনুপস্থিত। অথচ জাহেলী যুগের কবিতার সাথে এগুলো ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। অন্ত্যমিল আর অনুপ্রাসের যে গৎবাঁধা নিয়ম-নীতি জাহেলী যুগের কবিতার উপর ছড়ি ঘুরিয়েছে, তার বন্ধন অনেকটা শিথিল হয়ে পড়েছিল ইসলামী যুগের কবিতায়। মর্মরক্ষার প্রয়োজনে তাদের কবিতা নিয়মকে অবজ্ঞা করার সাহস দেখিয়েছে। ফলত, আমরা দেখতে পাই, সাবলিল কল্পনার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে হাসসান বিন সাবিত, আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা প্রমুখের কবিতা। জাহেলী যুগের কবিতায় নিয়মাবলিতে যেখানে গুহার অন্ধকার সীমাবদ্ধতা, সেখানে ইসলামী যুগের কবিতার আঙ্গিকে ফুটে উঠেছে উন্মুক্ত আকাশের প্রতি উদ্যগ্র বাসনা। এভাবেই ইসলামের আগমনের মধ্য দিয়ে আরবি কবিতায় একটি নির্মল সতেজ নতুন যুগের সূচনা হয়েছে, যা পরবর্তী কবিদেরকে কষ্টকল্পনা আর ভাষাগত আড়ষ্টতা থেকে মুক্তি দিয়ে এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন