ঋতু বদলের জ্বর: যেভাবে সুরক্ষা নিবে মাদরাসাগুলো

রাকিবুল হাসান:

কখনো হালকা ঠাণ্ডা আবার কখনো হালকা গরম। এই যখন আবহাওয়ার অবস্থা, অনেকেই এই সময়টায় অসুস্থ হচ্ছে; কারও জ্বর হচ্ছে, গলা ব্যথা, খাবারে অরুচি, মাথা ব্যথা, নাক বন্ধ থাকায় নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট, বার বার হাঁচি দেওয়া, আর কাশির সমস্যায় স্বাভাবিক জীবনযাপনে বেশ প্রতিবন্ধকতাই দেখা দিচ্ছে। এটাকে বলা হয় ভাইরাল ফিভার বা মৌসুমি জ্বর। বছরের যে সময়টিতে, ঋতু বদলের ধারায় মৌসুমি জ্বর থাকে, ঠিক এই পিক টাইমেই খুলে দেয়া হয়েছে মাদরাসাগুলো। করোনায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাদরাসাগুলো খুললেও মৌসুমি জ্বরের প্রকোপে পড়ছে ছাত্ররা।

ঢাকার বিভিন্ন মাদরাসায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই মৌসুমি জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে সদ্য মাদরাসায় ফেরা কিছু ছাত্র। তবে মাদরাসায় মৌসুমি জ্বরের ভোগান্তিটা বেশ কয়েক বছর ধরেই বলে জানিয়েছেন জামিয়া আরাবিয়া রহমানিয়া মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মাহফুজুল হক। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে তিনি বলেন, ‘মৌসুমি জ্বরের ভোগান্তিটা বেশ কয়েকবছর ধরেই আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। এমনকি বছরে দুতিন বারও আমাদের ছাত্ররা এ জ্বরের কবলে পড়ছে।’

এখন যেহেতু বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের মহামারি চলছে, তাই অনেকে আগের চেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে। তবে চিকিৎসকগণ উদ্বিগ্ন না হয়ে স্বাস্থ্যসম্মত বিষয়গুলো মেনে চলার ওপরই জোর দিয়েছেন। করোনাকালীন এই মৌসুমি জ্বরে কওমি মাদরাসাগুলো কিভাবে সুরক্ষা নিতে পারে—এই নিয়ে দুজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর। তাদের নির্দেশনাগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো।

মৌসুমি জ্বর কিভাবে ছড়ায়

ঋতু পরিবর্তনের কারণে জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীর ব্যথা ইত্যাদিকেই মৌসুমি জ্বর ধরা হয়। হাঁচি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে থাকা, সারা শরীরে ব্যথা, মাথা ভার হয়ে থাকা, খাওয়ায় অরুচি, মুখে তিতাভাব ইত্যাদি ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ।

মৌসুমি জ্বর কিভাবে ছড়ায় জানতে চাইলে চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে অবস্থিত মাসিহ’স ডায়াবেটিক কেয়ারের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মাওলানা মাসিহুল্লাহ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন,’আসলে মৌসুমি জ্বর ছোঁয়াচে নয়। তবে রোগীর হাঁচি-কাশির মাধ্যমেই এই ভাইরাসটা ছড়ায়। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে যারা থাকবে, সতর্ক না হলে তারাও আক্রান্ত হতে পারে নতুন করে।’

আইসোলেশন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা

করোনা পরিস্থিতির বিবেচনায় জ্বরে আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সার্জন ডা. শামসুল আরেফিন শক্তি। ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সঙ্গে এক আলাপে তিনি বলেন, ‘মাদরাসাগুলোকে প্রথমেই একটি কাজ করতে হবে। কারো মধ্যে জ্বর-কাশি দেখা দিলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে আলাদা করে ফেলতে হবে। অন্যদের সঙ্গে রাখা যাবে না। কারণ মৌসুমি জ্বর হাঁচি-কাশির মাধ্যমেও ছড়ায়। দ্বিতীয়ত, জ্বরাক্রান্ত ছাত্রদের করোনা পরীক্ষার প্রতি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের তৎপর হতে হবে। একমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে, এটা শুধুই ভাইরাস জ্বর, নাকি তা করোনার দিকে মোড় নিচ্ছে।’

ডা. মাসিহুল্লাহ বলেছেন, বিভিন্ন ধরনের জ্বর কমানোর ওষুধ রয়েছে। আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বর কমানোর ওষুধ খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ধরনের ওষুধ সেবন করা যাবে না। তবে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে প্যারাসিটামল এবং কুসুম গরম পানি পানের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। রোগীর মাথায় পানি ঢালা এবং কপালে জলপট্টি দেওয়ার কথাও বলেছেন।

কী খাবে মৌসুমি জ্বরাক্রান্ত ব্যক্তি

জ্বরাক্রান্তকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. শামসুল আরেফিন শক্তি। তিনি বলেছেন, ‘এই সময়ে পুষ্টিকর খাওয়াটা ভালো। আরেকটা জিনিস করা যেতে পারে। সেটা হলো—প্রত্যেক ছাত্রকে প্রতিদিন একটা করে ‘সিভিট’ খাওয়ানো যেতে পারে। জ্বর সারাতে ভিটামিন-সি আছে এমন ফল যেমন- আনারস, জাম্বুরা, কমলা, আমড়া, লেবু ইত্যাদি অত্যন্ত উপকারী।’

ডা. মাসিহুল্লাহ বলেছেন, ‘মৌসুমি জ্বরে আক্রান্ত হলে সব খাবারই খেতে পারবে। তবে তরল পান করতে হবে একটু বেশি। পানির পাশাপাশি ডাবের পানি, স্যালাইন, ফলের সরবত ইত্যাদি পান করতে হবে।’

মৌসুমি জ্বর সংক্রমণ রোধে কী করবে মাদরাসাগুলো

ডা. শামসুল আরেফিন শক্তি বলেন, ‘চেষ্টা করতে হবে জ্বরটি যেন আমার থেকে অন্যের কাছে না যায়। অন্যের কাছ থেকে আমার কাছে না আসে। এটা করার জন্য নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, ঘনঘন হাত ধুতে হবে, বাইরে কম যেতে হবে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। আগে যেমন সবাই একসাথে ক্লাসে বসতো, এখন সেটা পরিহার করতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাসে বসতে হবে। মোটকথা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া নিয়মগুলো এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নশীল হতে হবে।’

ঘুমের সময় ছাড়া বাকি সবসময় মাস্ক পরিধানের পরামর্শ ডা. মাসিহুল্লার। তিনি বলেন, ‘মাস্ক শুধু যে করোনা সংক্রমণ রোধ করবে তা না, বরং এটা মৌসুমি জ্বর সংক্রমণও রোধ করবে। তাই মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক।’

বিজ্ঞাপন