একজন অভ্র এবং বখতিয়ারের জ্বিন

মো. কামরুল হাসান:

‘পৃথিবীতে পৃথিবীর নিয়ম মেনে চলা মানুষ যতদিন থাকবে ততদিন পদে পদে জাগতিক নিয়ম-নীতিকে সস্তা রসিকতায় উড়িয়ে দেয়ার মতো অভ্রদেরও দরকার আছে। অভ্ররা না থাকলে অভ্রত্বতে আক্রান্ত হব কীভাবে আমরা?’

অভ্র এমনই এক মানুষ যার কাছে জগতের বিভ্রান্তিগুলো এসে ঠোকর খেয়ে পড়ে। যত সিরিয়াস ঘটনাই ঘটুক, সে তার হালকা হাস্যরস দিয়ে তার মূল্য কমিয়ে দিবে। তার ট্রেডমার্ক হাসি দিয়ে বিভ্রান্ত করে তোলে প্রতিপক্ষকে। হোক সে কোন রমণী বা কোনো শত্রু! শত্রু? হ্যাঁ, শত্রু। তার কোনো শত্রু থাকবে এটা মানা যায় না। তবে তারও শত্রুর প্রয়োজন হয়।

লেখক আবুল ফাতাহ মুন্নার ‘অভ্র সিরিজ’ আমি সেই শুরু থেকেই পড়ি। রহস্য-প্রিয় এই অভ্রকে নিয়ে লেখক চমৎকার কিছু গল্প আমাদের উপহার দিয়েছেন। অভ্র যেমন রহস্য করতে পছন্দ করে, তেমনি রহস্যের জট খুলতেও পছন্দ করে। ব্যক্তিগতভাবে লেখকের লেখা আমাকে খুব টানে। প্রথম কারণ তার হালকা মেজাজে সুন্দর করে গল্প উপস্থাপন করার পদ্ধতি। দ্বিতীয় কারণ লেখকের হিউমার সেন্স আমার জানামতে খুব ভালো।

এবারও যখন ‘একজন অভ্র এবং বখতিয়ারের জ্বিন’ বইটি প্রকাশের খবর পাই তখন আমার মন পুলকিত হয়ে উঠে। বইটি প্রকাশ করেছে নন্দন প্রকাশনী। বইটিও আমার সংগ্রহ করা হয় ভিন্নভাবে। চলুন কাহিনীর সারাংশে যাই।

বাউন্ডুলে জীবন পার করছে অভ্র। ঋণগ্রস্ত অভ্রকে পাড়ার মুদি দোকানীও আর সদাই-পাতি দিতে চায় না। মাথাঘোরানো ক্ষিদে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে। এমনটা না যে তার পড়াশোনা নেই, তাই চাকরি-বাকরি করতে পারে না। পড়াশোনা মোটামুটি জানা আছে তার। অনেকদিন যাবত বড়লোক বাবার মেয়ে ‘আফরিনকে’ পড়াতো। সেখানে ভালোই মাইনে পেত। তাই আর বাড়তি চিন্তা করেনি। কিন্তু এখন টিউশনিটা আপাতত নেই। তাই এই অবস্থা।
ঝুম বৃষ্টির পর ঘনকালো মেঘের আড়াল থেকে যেমন করে সূর্যের দেখা পাওয়া যায়, তেমনভাবে অভ্রের কাছে হঠাৎই ‘চন্দ্রিমা’ একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে। চন্দ্রিমার চাচাতো বোনের অদ্ভুত এক সমস্যা দেখা দিয়েছে। তার সমাধানের জন্যই অভ্রের কাছে আগমন। ওহ, চন্দ্রিমা হচ্ছে আগের অভ্র সিরিজগুলোর অভ্রের পার্শ্ব চরিত্র।

অভ্র চন্দ্রিমার চাচার মাধ্যমে জানতে পারে যে তার ভাতিজির সাথে অদ্ভুত কিছু ঘটছে। গ্রামের সাধারণ মানুষের ধারণা তাকে জ্বিনে ধরেছে৷ কিন্তু চাচা মনে করেন এর মাঝে আরো কোন রহস্য আছে।

ঘটনা সব শুনে অভ্র মনে করলো এটা তার কাজ না। সে চলে গেল প্রখ্যাত ডিটেকটিভ ‘তারেক ফয়সালের’ কাছে। (আমার পছন্দের আরেক চরিত্র। তিনি শখের গোয়েন্দা। তাকে নিয়েও লেখকের বই আছে) তবে তিনি এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। ঘটনা শুনে কিছু হিন্টস দিয়ে দিলেন।

অবশেষে অভ্র আর চন্দ্রিমা ভিকটিম টগরের গ্রামের বাড়ি আসে। সেখানে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে। তবে সবাই কেমন জানি কথা চেপে রাখে। স্বয়ং ভিকটিমের মা নিজেই কি যেন লুকাতে চেষ্টা করে। জ্বিনের রহস্য সন্ধান করতে করতে অভ্রের সামনে চলে আসে ৮০০ বছর পূর্বের বিখ্যাত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির এক অদ্ভুত তথ্য। তা হচ্ছে ‘বখতিয়ারের জ্বিন’।

৮০০ বছর পর এসে বর্তমানে টগরের সাথে বখতিয়ারের জ্বিনের কীসের সম্পর্ক? আর সেখানেই তৎকালীন সময়ে এক তন্ত্র সাধীকা ‘দামিনীর’ তৈরী করা শেত্বকালী মূর্তিরই-বা কিসের যোগসূত্র?

অভ্রের স্বভাবসুলভ হাস্যরসাত্মক কথাবার্তা, চন্দ্রিমা আর আফরিনের সাথে বিভ্রান্তিমূলক সম্পর্ক, প্রিয় চরিত্র তারেক ফয়সালের ইনক্লুড এবং সবশেষ অভ্রের ধীর স্থীর রহস্যর জটা খোলা বেশ উপভোগ করেছি।

আর কিছুই বলব না। শুধু একটি বার্তা দিবো।

কেবল অভ্র ভক্তদের জন্যই এই বই। যারা জগতের নোংরা, বালখিল্যতা, প্রতিহিংসা, লোভ, ব্যার্থতা নিতে পারে না। আবার এসবের বিপরীতে কিছু করতেও পারেনা। শুধু বুকে চেপে অভিশাপ দিয়ে যায় তাদের জন্য এ বই।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদবাবা এবং জোছনার আলো
পরবর্তি সংবাদ‘হিউম্যান বিয়িং’: কী আছে বইতে?